অচেনা রত্নদের জ্বলে ওঠার বিশ্বমঞ্চ

বিশ্বকাপ ফুটবল সবসময়ই কোন না কোন বিস্ময়ের জন্ম দেয়। আর সে কারইেন  বিশ্বকাপকে  ঘিরে সারা বিশ্বের আলাদা একটি মনোযোগ তৈরী হয়। বিশ্বের  সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই আসরে এক মাস যাবত বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়রা নিজ দেশকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়।

প্রত্যেকেরই চোখ থাকে সেই সব বিশ্বসেরা তারকাদের ফর্মের ওপর। এবারও যেমন তার ব্যতিক্রম হবে না, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, নেইমার, মোহাম্মদ সালাহকে ঘিড়ে সমর্থকদের আগ্রহের সীমা নেই। কিন্তু তারা ছাড়াও আরো ৭৩৩ জন খেলোয়াড় রাশিয়া সফরে যাচ্ছেন। যাদের মধ্য থেকে হয়তবা অজানা কোন খেলোয়াড়ই হয়ে উঠতে পারেন এবারের আসরে সবচেয়ে সফল তারকা। চলুন, এই আসরে তেমন সম্ভাবনাময় কয়েকজনের ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যাক।

  • আন্দ্রে সিলভা (পর্তুগাল)

এটা বলতে দ্বিধা নেই যে আন্দ্রে সিলভাকে সেভাবে কেউই তেমন চেনেননা, কিন্তু তাঁর মধ্যে অবশ্যই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সুস্পষ্ট ছায়া রয়েছে। বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে সিলভার কাছ থেকে ১০ ম্যাচে এসেছে ৯ গোল। এবারের মৌসুমে সিলভা এসি মিলানে নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি, কিন্তু ইউরোপা লিগে করেছেন ৮ গোল। বিশ্বকাপে পর্তুগালের আক্রমনভাগে সিলভাকে অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দেখা যাবে। প্রতিপক্ষ যদি রোনালদোকে আটকানোর কাজে ব্যস্ত থাকে এই সুযোগে সিলভা কিছু একটা করে ফেলতে পারেন।

  • কারোল লিনেত্তি (পোল্যান্ড)

‘এইচ’ গ্রুপে পোল্যান্ডের প্রতিপক্ষ সেনেগাল, কলম্বিয়া ও জাপান। পোলিশ তারকা রবার্ট লিওয়ানোদোস্কির উপর সব আকর্ষণ থাকলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার গোলখরা এখনো সেভাবে কাটেনি। কিন্তু অন্যদিকে পোলিশ দলে রয়েছেন আরেক তারকা কারোল লিনেত্তি। ২৩ বছর বয়সী এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে এখনই ডাকা হচ্ছে ‘পোলিশ ইনিয়েস্তা’ নামে। এবারের মৌসুমে পোল্যান্ডের হয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন। কলম্বিয়াকে হারিয়ে গ্রুপের শীর্ষ দল হিসেবে পরের রাউন্ডে যেতে হলে পোল্যান্ডের জন্য লিনেত্তির ফর্মে থাকাটা জরুরী বলেই সংশ্লিষ্ঠরা ধারণা করছেন। তাছাড়া রাশিয়ায় ভাল খেলতে পারলে সেটা তার ক্যারিয়ারেও নতুন মোড় এনে দিতে পারে।

  • হারভিং লোজানো (মেক্সিকো)

শেষ ছয়টি বিশ্বকাপেই মেক্সিকো শেষ ১৬ নিশ্চিত করেছিল। এবারের আসরে মেক্সিকানরা অন্তত আরেক ধাপ উপরে উঠতে বদ্ধপরিকর। এবারের মৌসুমে হল্যান্ডের ক্লাব পিএসভি অাইন্ডোভেনের হয়ে ১৭ গোল করেছেন হারভিং লোজানো। যে কারণে মেক্সিকো তাকে নিয়ে আশা করতে পারে। ২২ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকারের ফর্ম নিয়ে দারুন আশাবাদী জাতীয় দলও। দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইডেনের বিপক্ষে দুটি করে গোল করতে পারলে গোল্ডেন বুট জয়ের ক্ষেত্রে অনেককেই পিছনে ফেলতে পারেন হারভিং।

রডরিগো বেনটানকার (উরুগুয়ে)

এবারের বিশ্বকাপে যে কয়জন লুকায়িত তারকা সামনে চলে আসতে পারেন তার মধ্যে জুভেন্টাসের রডরিগো বেনকানটার অন্যতম। ২০১৫ সালে আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার কার্লোস তেভেজ বোকা জুনিয়সে চলে যাবার পরে তার জায়গায় বেনকানটার জুভেন্টাসে নাম লেখান। এবারের মৌসুমে ২০ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার সিরি-আ লিগে ২০টি ম্যাচ খেলেছেন। রাশিয়ায় উরুগুয়ের হয়ে মূল একাদশে তার খেলা এখন সময়ের ব্যপার।

যদিও দলে রয়েছেন লুইস সুয়ারেজ ও এডিনসন কাভানির মত তারকারা। কিন্তু মধ্যমাঠ অবশ্যই বেনকানটারের দখলে থাকবে।

  • আমিনে হারিত (মরক্কো)

গ্রুপ পর্বে ইরান, পর্তুগাল ও স্পেনের সাথে কঠিন লড়াইয়ে মুখে পড়তে হবে মরেক্কোকে। কিন্তু ২০ বছর বয়সী উইঙ্গার আমিনে হারিত দলের জন্য প্রতিপক্ষের কাছে কঠিন প্রতিরোধ হয়ে উঠতে পারেন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তার এসিস্টে সতীর্থ স্ট্রাইকার খালিদ বোতাইব ৪টি গোল করেছেন। নভেম্বরে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে ৪-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত হারিতের কল্যাণে শালকে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ে।

  • মোহাম্মদ আল-সাহলাভি (সৌদি আরব)

বাছাইপর্বে আল-সাহলাভির গোলের রেকর্ড এ পর্যন্ত কেউই ভাঙতে পারেননি। এবারের রাশিয়া বিশ্বকাপের বাছাইর্বে তিনি সৌদি আরবের হয়ে ১৬ গোল করেছেন। ৩১ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে ইতোমধ্যেই ২৮ গোল করেছেন। রাশিয়া বিশ্বকাপ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিন সপ্তাহ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অনুশীলন ক্যাম্প করেছেন। ২০০৬ সালের পরে এটাই সৌদি আরবের প্রথম বিশ্বকাপ। গ্রুপ ‘এ’তে তাদের প্রতিপক্ষ মিশর, উরুগুয়ে ও স্বাগতিক রাশিয়া। আল-সাহলাভির পারফরমেন্সে ১৯৯৪ সালের পরে প্রথমবারের মত সৌদি আরব নক আউট পর্ব নিশ্চিত করলে অবাক হবার কিছুই থাকবে না।

  • সারদার আজমোন (ইরান)

বাছাইপর্বে ২৩ বছর বয়সী সারদার আজমোন দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন। রাশিয়ার টিকিট পেতে এই ইরানিয়ান স্ট্রাইকারের ১১ গোল দারুণ কাজে এসেছে। ইরানের হয়ে তিনি মূল খেলোয়াড় হিসেবে দলে আছেন। পর্তুগাল ও স্পেনের বিপক্ষে সারদারই হয়ে উঠতে পারেন ইরানের তুরুপের তাস। এই ম্যাচগুলোতে সকলের দৃষ্টি রোনালদো, ইনিয়েস্তাদের ওপরে থাকলেও সারদারও নিজেকে প্রমানে মুখিয়ে আছেন।

  • লি সিয়াং উ (দক্ষিণ কোরিয়া)

ইতোমধ্যেই এশিয়ার সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে উ’কে বিবেচনা করা হচ্ছে। যে কারনে ‘কোরিয়ান মেসি’ তকমাটাও বেশ ভালভাবেই নিজের নামের পাশে লাগিয়ে নিয়েছেন। ২০১১ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সেই বার্সেলোনাও তাকে চুক্তিভূক্ত করে। ২০ বছর বয়সী উ বর্তমানে হেলাস ভেরোনার পক্ষে খেলছেন। কিন্তু এখনো দেশের হয়ে মাঠে নামতে পারেননি। নিজের সাধ্যমত খেললে রাশিয়ায় তিনি হয়ে উঠতে পারেন এশিয়া ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বের কাছে এক অনন্য উদাহরন। আর তা প্রমানের এটাই অন্যতম একটি বড় সুযোগ। অনুর্ধ্ব-২০ দক্ষিণ কোরিয়া দলের হয়ে প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই গোল পেয়েছেন উ।

  • আন্টে রেবিচ (ক্রোয়েশিয়া)

বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে ডিএফবি পোকালের ফাইনালে অসাধারণ পারফরমেন্স দিয়ে জার্মান ফুটবলের হল অব ফেমে জায়গা করে নিয়েছেন আন্টে রেবিচ। ক্রোয়েশিয়ান এই উইঙ্গার অলিম্পিক স্টেডিয়ামে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে এইনট্র্যাচ ফ্র্যাংকফুর্টের হয়ে দুই গোল করেছেন। ক্রোয়েশিয়ায় লুকা মোদ্রিচ, ইভান রাকিটিচের মত সুপারস্টার থাকলেও রেবিচ নিজ গুনেই এবারের বিশ্বকাপ মাতাবেন বলে সকলে আশাবাদী।

  • পিওনে সিস্তো (ডেনমার্ক)

গত কয়েক বছর ধরেই ক্লাব ফুটবল ও জাতীয় দলে একমাত্র ড্যানিশ তারকা হিসেবে ক্রিস্টিয়ান এরিকসেন মাঠ মাতিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এবারের রাশিয়া বিশ্বকাপে ডেনমার্কের হয়ে আরেকজন উঠতি তারকার নাম সকলের মুখেই শোনা যাচ্ছে। পিওনে সিস্তো উগান্ডা থেকে এসে ডেনমার্কের নাগরিকত্ব লাভ করেছেন মাত্র দুই মাস আগে। ইতোমধ্যেই ড্যানিশদের হয়ে ১২টি ম্যাচও খেলেছেন।

স্পেনে সিল্টো ভিগোর হয়ে দারুণ এক মৌসুম কাটিয়েছেন এই রাইট উইং, করেছেন চারটি গোল। আগের বছরে সেল্টা ভিগোর হয়ে বার্সেলোনার বিপক্ষে ৪-৩ গোলের জয়েও তিনি গোল করেছিলেন। ২০১৫-১৬ মৌসুমে ইউরোপা লিগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে এফসি মিডটাইল্যান্ডের হয়ে হোম ও অ্যাওয়ে ম্যাচে গোল করেছেন সিস্তো।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।