একটা হারিয়ে যাওয়া তথ্য দিচ্ছি

পঞ্চাশের দশক থেকে সত্তরের শেষ ভাগ অবধি রমরমিয়ে চলত আমাদের বেহালার ‘সুচিত্রা’ সিনেমা হল। দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতা ও বন্দর এলাকার সব দর্শক ছবি দেখতে এই হলে আসত। হাউসফুল রোজ হত। নামকরা সিনেমা হল তখনকার। সুচিত্রা সেনের নাম থেকে নয়। কারণ এখানেই মুক্তি পেয়েছিল উত্তম সুচিত্রা জুটির প্রথম ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’।

তার আগেই হয়েছে প্রেক্ষাগৃহটি। তাই তখন সুচিত্রা সেন বিখ্যাত হননি। দেখুন ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবির অরিজিনাল পোস্টার যাতে উল্লেখ রয়েছে বেহালার ‘সুচিত্রা’ সিনেমা হলের কথা। তবে সুচিত্রা সেনের সব ছবি এখানে হাউসফুল চলেছে। সমগ্র সুচিত্রা চলচ্চিত্র যাত্রাপথের সাক্ষী এই হল। প্রতিটি শো এখানে হাউসফুল হত। বাংলা ছবি সহ হিন্দি ইংরাজী ছবিও চলত।

বাংলা ছবিকে এককালে অগ্রসর করায় অনন্য ভূমিকা পালন করে এই ‘সুচিত্রা’ সিনেমা হলটি। আমরা বেহালার আদি বাসিন্দারা অনেকেই জানি বড়দের কাছ থেকে এ হলের কথা। আমার জন্মের আগেই লুপ্ত হয় হলটি। কিন্তু এই ফেসবুকে-টুইটারের যুগের অনেক বড়রাই হয়তো জানবেন হলটির ইতিহাস।

বেহালা ডায়মন্ড হারবার রোডের উপর চোদ্দো নম্বর ও বেহালা ট্রামডিপোর মাঝে ছিল এই হল। ডায়মন্ড হারবার রোড চওড়া করবার সময় আশির দশকে ভেঙে ফেলা হয় এই সিনেমা হল।তখন বাংলা ছবিও মহানায়ক মহানায়িকার প্রস্থানে বিপর্যস্ত। এখন যেখানে বেহালা হর্কাস কর্নার, প্রিয় বস্ত্রালয় ঐ খানে ছিল সুচিত্রা সিনেমা হল। সবটাই আমার শোনা গল্প। যেহেতু প্রিয় নায়িকার নেমসেক হল তাই সিনেমাহলের নামটা খুব টানত।

কোনো ছবি নেই প্রেক্ষাগৃহটির পাওয়া যায়না। সব ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে। কেউ আর মনেও রাখবেনা। কিন্তু এই প্রেক্ষাগৃহেই হারানো সুর, সপ্তপদী, সাত পাকে বাঁধা, সাগরিকা হাউসফুল চলেছে লোকে লাইন দিয়ে টিকিট কেটে ছবি দেখেছে। আজ যার আর কোন চিহ্ন নেই। অজন্তা ইলোরা অশোকা পুস্পশ্রী সিনেমা হলের পাশাপাশি বেহালায় আরো দুটো হল ছিল এক এই সুচিত্রা ও অন্যটি ছোটো হল পিয়াসী। দুটোই উঠে গেছে। এদের মধ্যে সুচিত্রা সিনেমা হলটি প্রাচীন ও সেরা ছবিগুলোর সাক্ষী ছিল এই প্রেক্ষাগৃহ। যেখানে আজ জামা কাপড়ের দোকান। হলটাই আর নেই।

তখন হিট বাংলা-হিন্দি পুরোনো ছবি হলে ফিরে আসতো! ৫৭-র হারানোসুর ফিরে এল ১৯৭৪-এ… আজকাল যেমন রেট্রো হয় সেরকম না। রি-রিলিজ করত এবং হাউসফুল।

সবার উপরে, ত্রিযামা, সাঁঝের প্রদীপ, শিল্পী, শাপমোচন, সপ্তপদী, আলো আমার আলো চলেছিল রিরিলিজ করে… এসব প্রেক্ষাগৃহ তার সাক্ষী।

আরও তথ্য বহুশ্রুত, যেহেতু বেহালার প্রেক্ষাগৃহটির নাম সুচিত্রা তাই যখন এখানে সুচিত্রা সেনের ছবি রিলিজ করত সুচিত্রা সেন খুব খুশি হতেন। নেমসেক হল তাও আবার খোদ কলকাতায়। যা আশির দশকে ভাঙা পড়েছে। এখন সেখানে মার্কেট।

আমাদের প্রজন্ম কেউ কোনদিন চোখে দেখেনি তার আগেই ওখানে মার্কেট হয়ে যায়। কিন্তু এখনো পুরনো সিনেমার বুকলেটে পাওয়া যায় সুচিত্রা বেহালা সিনেমা হলের নাম।

এভাবে সব সিঙ্গল স্ক্রীন গুলো শেষ হয়ে যাবে আজকাল ছবি শুধু মাল্টিপ্লেক্সে রিলিজ হয়।জানে হয়তো সেসব ছবি সিঙ্গল প্লেক্সে চলার মতো না। মাসের ছবি না। কিন্তু প্রমোদ বিতরণকারী ছবি ও সিঙ্গল স্ক্রীন গুলো ঐতিহাসিক দিক থেকে বাঁচিয়ে রাখা খুব দরকার। যদিও সে গুড়ে বালি।

খুব মন কেমন করে এই ‘সুচিত্রা’ হলের নাম আজও দেখলে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।