র‌্যাংকিং মানি না! আমরা এমনিই সেরা!

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন আগে একটা ঘটনা ঘটেছে।

সেখানে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় খেলা হচ্ছিলো। তো, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলা চলাকালীন সময়ে জাহাঙ্গীর নগরের ছাত্ররা কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং শিক্ষকদের আচ্ছা মতো মার দিয়েছে।

একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অন্য আরেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং শিক্ষকদের ধরে আচ্ছা মতো মার দিচ্ছে; ব্যাপার’টা পৃথিবী’র অন্য যে কোন দেশের জন্য সপ্তাশ্চর্যের চাইতেও বড় আশ্চর্য জনক ঘটনা হিসেবে দেখা দিত।

কিন্তু আমাদের কাছে ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছে! কারণ এই নিয়ে কেউ তেমন কোন আলোচনা করেনি। এর চাইতেও অবাক কাণ্ড হচ্ছে- কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং শিক্ষকরা মার খেয়ে হাতে-পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে টেলিভিশনের লাইভ টকশোতে এসে বলেছেন -জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক’রা সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ কিছু বলেনি। উল্টো তারা ছাত্রদের উৎসাহ দিয়েছে বলে মনে হয়েছে!

এরপর জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টরকে ওই আলোচনায় যুক্ত করা হলে তিনি বলেন – আমরা চেষ্টা করেছি থামাতে। নইলে আরও ভয়ানক ব্যাপার ঘটে যেতে পারত! যা হোক, একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছে, আমরা ক্ষমা প্রার্থী!

অর্থাৎ তিনি এক রকম মেনে নিয়েছেন- এই ধরনের মারামারি তো ঘটতেই পারে! এ আর এমন কি! এটা কোন অস্বাভাবিক ঘটনাই না! এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং শিক্ষকদের ধরে ধরে মারছে কেন?

এবার আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি। এর আগে দুই একটা লেখায়ও বোধকরি বলেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছি প্রভাষক পদে। গিয়েছি ইন্টার্ভিউ দিতে। বোর্ডে থাকা লোকজন প্রথমেই বলে বসেছেন -আপনি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে’ই পড়েন’নি! আপনি এখানে আবেদন করেছেন কেন! আপনি আপনার নিজের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন!

কি অবাক কাণ্ড – তারা যখন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, সেখানে লিখে দিলেই তো পারত – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাড়া আবেদন করা যাবে না!

বোর্ডে যারা ছিল, তারা আমার দিকে এমন ভাবে তাকাচ্ছিল- আমার মনে হচ্ছিলো আমি মনে হয় কোন ভিন গ্রহের এলিয়েন! হঠাৎ করে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছি।

এইতো গত কাল’ই বিসিএস পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে। কতো লাখ ছেলেপেলে পরীক্ষা দিয়েছে আমার হিসেবে নেই। তবে এদের সবাই নিশ্চয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা দেশের বড় বড় নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েনি।

তবে নিশ্চিত জেনে রাখুন – যারা বড় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েনি, তাদের মাঝে এক ধরনের হীনমন্যতা কাজ করে এই ভেবে – ভাইভা পর্যন্ত যেতে পারলে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েনি বলে বাদ পড়ে যেতে পারে! কারন বোর্ডে যারা থাকে, তাদের আবার বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি একটা আলাদা টান আছে!

এইতো গত সপ্তাহে’ই আমার পরিচিত একজন ঢাকার এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক পদে ইন্টার্ভিউ দিয়েছে। বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার একটা পিএচডি করা আছে। নানা গবেষণা প্রবন্ধ আছে। অথচ ইন্টার্ভিউতে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে – আপনি তো নটরডেম কলেজে পড়েছেন, অমুক স্যারকে চেনেন?

এরপর জিজ্ঞেস করেছে – আপনি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন তমুককে চেনেন!

কি অবাক কাণ্ড! তার পিএচডি, গবেষণা কোন কিছু নিয়েই কোন প্রশ্ন করেনি। যেহেতু সে নটরডেম কলেজে পড়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, এটা’ই হয়ে গিয়েছে তাদের কাছে মুখ্য বিষয়!

তো, যেই ছেলেটা নটরডেম কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েনি, তাকে আপনারা কি জিজ্ঞেস করবেন?

আমি তখন ঢাকার আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়টি’র বেশ নাম আছে। আমি যেহেতু সমাজ বিজ্ঞান পড়াতাম; একদিন পরীক্ষার হলে ডিউটি দিচ্ছি; সঙ্গে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ায় এক শিক্ষকও আমার সঙ্গে ডিউটি দিচ্ছেন। তিনি আবার বেশ নাম করা শিক্ষক। পড়েছেন বুয়েট থেকে। আমাকে জিজ্ঞেস করে বসলেন -আপনি সমাজ বিজ্ঞান পড়েছেন কেন? এসব পড়ে কি হয়?

শুনে তো আমার চোখ কপালে উঠার যোগার! তাকে আমি এর উত্তর দেয়ারই প্রয়োজন মনে করিনি।

এই হচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর শিক্ষা এবং সংস্কৃতি! বর্তমানে দেশের প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে এমন সংস্কৃতিই বিদ্যমান!

এসব বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে শেখানো হয় আমরাই সেরা! আমরা ছাড়া অন্য আর কেউ মানুষের পর্যায়েই পড়ে না! এই জন্য জাহাঙ্গীর নগরের ছাত্র’রা আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মেরে মনে করছে তাঁরা ঠিকই করেছে! কারণ তারাই তো সেরা!

এই জন্য বুয়েট থেকে পড়ে আসা শিক্ষক আমাকে জিজ্ঞেস করে বসেছে – এই সব সমাজ বিজ্ঞান পড়ে কি হয়! কারণ তার শিক্ষকরা তাকে শিখিয়েছে বুয়েট’ই সেরা। এখানে যা পড়ানো হয় তার বাইরে আর কিছু পড়ার নেই! অথচ এদের জানান’ই নেই হার্ভার্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট গুলো’তে এখন বেশি করে সমাজ বিজ্ঞান এবং মানবিকের সাবজেক্ট গুলো পড়ানো হচ্ছে। কারণ এরা মনে করছে – ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের মানবিক হতে হবে।

এই যে আমাদের ডাক্তাররা তাদের সমালচনা সহ্য করতে পারে না, ইঞ্জিনিয়াররা পারে না, পুলিশ পারে না, বিসিএস ক্যাডার পারে না; কেন পারে না? কারন এরাও এইসব শিক্ষাই পেয়েছে – আমরাই সেরা!

আপনি যদি মনে করে বসে থাকেন- আপনিই সেরা। তাহলে আশপাশের মানুষজন যদি আপনার সমালোচনা করে, আপনি সেটা সহ্য করতে পারবেন না! কারন আপনি মনে করবেন- এইসব গুরু-গাধা আমাদের সমালোচনা করছে কেন!

এই যে আমরা কেউ কোন সমালোচনা সহ্য করতে পারি না; এর কারণ হচ্ছে- ‘আমরাই সেরা’ মনোভাব!

এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমাকে বলে বসলেন – আপনি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়েননি; এখানে আবেদন করেছেন কেন? তো, তিনি কেন এই প্রশ্ন করেছেন?

কারন তাদের ধারণা – অন্য বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে আবার পড়াশোনা হয় নাকি! তারাই হচ্ছে সেরা!

সম্প্রতি টাইমস হায়ার এডুকেশনের ২০১৯ সালের পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর র‌্যাংকিং প্রকাশ করা হয়েছে। এটিকে বলা হয় পৃথিবীব্যাপী সব চাইতে গ্রহণযোগ্য র‌্যাংকিং। অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় গুলো এই র‌্যাংকিং ফলো করে।

তো, সেই র‌্যাংকিং-এ পুরো পৃথিবীর কথা বাদই দিলাম – এশিয়ার সেরা ৪০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। এমনকি নেপালের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পর্যন্ত আছে! শ্রীলঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আছে। চার-পাঁচ লাখ জনসংখ্যার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আছে।

নেই কেবল ১৭ কোটি জনসংখ্যার সেরাদের সেরা বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম! অবশ্য এর কোন দরকারও নেই! আমরা তো এমনিতেই সেরা!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।