উবার কেন লাভের মুখ দেখছে না?

উবার বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে উবারের ভ্যালুয়েশন ৭৫ বিলিয়ন ডলার এবং এটি বিশ্বের দ্বিতীয় দামি স্টার্ট-আপ (আগে প্রথম ছিল)। তারপরও কেন উবার প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লস দিচ্ছে!

২০১৮ সালে উবারের অপারেটিং লস ছিল তিন বিলিয়ন ডলার। ২০১৭ সালে এ ক্ষতির পরিমাণ ছিল চার বিলিয়ন ডলার। বছরের পর বছর ধরে এমন উচ্চমাত্রায় ক্ষতির ব্যাপারে উবারের বিনিয়োগকারীদের বোঝাতে প্রতিষ্ঠানটির সিইও সম্প্রতি ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজনের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন।

কিন্তু অ্যামাজন প্রসঙ্গ এখানে কেন?

কারণ, ১৯৯৭ সালে মার্কিন পুঁজিবাজারে প্রবেশের পরও বেশ কয়েক বছর অ্যামাজন ক্রমাগত ব্যবসায়িক ক্ষতির মধ্য দিয়ে গেছে। তবে উবারের ব্যবসায়িক ক্ষতির তুলনা করতে অ্যামাজনের প্রসঙ্গ টানা অনেকেরই পছন্দ হয়নি।

তারা বলছেন, এটা অযৌক্তিক তুলনা। অ্যামাজন যখন আইপিওতে যায়, তখন ই-কমার্স ব্যবসায় তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না এবং তাদের ভ্যালুয়েশনও ছিল মাত্র ৪৩৮ মিলিয়ন ডলার। অথচ গতকাল মার্কিন পুঁজিবাজার ওয়ালস্ট্রিটে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশের সময় উবারের ভ্যালুয়েশন ৭৫ বিলিয়ন ডলার এবং ইতিমধ্যেই বাজারে তাদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী আছে।

যদিও উবারের ধারাবাহিক ব্যবসায়িক ক্ষতি নিয়ে এখনই অনেকে উদ্বিগ্ন হতে চান না। প্রতি বছর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাই নিজস্ব গাড়ির বাইরে যাতায়াত বাবদ ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেন।

উবার এই বাজারের অনেক বড় অংশের নিয়ন্ত্রক। উবার এখন কার ওনারশিপ মডেল থেকে ধীরে ধীরে ট্রান্সপোর্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চাচ্ছে এবং এটাই উবারের বিনিয়োগকারীদের আশার ঝলক দেখাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, মানুষ একটা পর্যায়ে গিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রয়ের বদলে বুবার বা লিফটের মতো অন ডিমান্ড কার সার্ভিসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাবে।

৬৩ টি দেশের ৭০০ টির বেশি শহরে উবার এখন তাদের অপারেশন চালাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী পাঁচ বিলিয়ন রাইড কমপ্লিট করেছে। বিশ্বব্যাপী উবারের ড্রাইভার সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি। রাইড শেয়ারিংয়ের উত্থান কীভাবে মানুষের যাতায়াত অভ্যাসকে পরিবর্তন করে দিয়েছে সেটি আমাদের ঢাকা শহরের দিকে তাকালেও সহজে বোঝা যাবে।

তবে ঢাকার ডাটা যেহেতু আমার কাছে নেই, এখানে যুক্তরাষ্ট্রের চিত্রটা তুলে ধরা যেতে পারে। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাইড শেয়ারিংয়ে ৯৯ শতাংশ দখল ছিল ভাড়ায় চালিত হলুদ ট্যাক্সিক্যাবগুলো। কিন্তু উবার এবং লিফট বাজারে আসার পর ২০১৮ সালে রাইড শেয়ারিংয়ে এই ট্যাক্সি ক্যাব গুলোর দখল মাত্র ১২.৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

রাইড শেয়ারিংয়ের এত রমরমা বাজার সত্ত্বেও উবার কেন এত বিশাল লস দিচ্ছে?

উবারকে তাদের ড্রাইভারদের অর্থ দিতে হয়। উবারের তুলনায় লিফট তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং লিফটের ড্রাইভাররাও উবারের ড্রাইভারদের তুলনায় বেশি অর্থ পাচ্ছেন। এটি উবারকে এক অস্বস্তিকর প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। উবার ড্রাইভাররা তাদের পাওনা বাড়ানোর দাবিতে ক্রমাগত আন্দোলন করে যাচ্ছেন।

উবার বিশ্বের বিভিন্ন শহরে সংশ্লিষ্ট শহরের নিয়ম-কানুন মেনে রাইড শেয়ারিং সেবা দিচ্ছে। তাই শহরের নিয়ম-কানুন মেনে ও নিজেদের ব্যবসা ঠিক রেখে প্রতিটি শহরে ড্রাইভারদের পাওনা বাড়ানোটা উবারের জন্য ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে উবারের রাইড শেয়ারিংয়ের ইনস্যুরেন্স খরচ বেড়েছে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। ক্রেডিট কার্ড প্রসেসিং ফি, ড্রাইভারদের বিশেষ লভ্যাংশ দেওয়ার কারণেও উবারের প্রচুর অর্থ খরচ হচ্ছে।

২০১৮ সালে উবারের মোট লাভ ১১.৩ বিলিয়ন ডলার, যার ৮০ শতাংশই এসেছে রাইড শেয়ারিং থেকে। উবারের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেভিনিউ সোর্স হচ্ছে উবার ইটস। গত বছর এ খাত থেকে ১.৪ বিলিয়ন ডলার লাভ করেছে উবার।

তবে উবার শুধু রাইড শেয়ারিং বা অন ডিমান্ড ফুড ডেলিভারি সার্ভিসের বাইরে নিজেদের সেবার মাত্রা আরও বিস্তৃত করতে চাইছে। বাইসাইকেল, স্কুটারস, মালবাহী গাড়ি, এয়ার ট্যাক্সি এমনকি উবারের নিজস্ব চালকবিহীন গাড়ির দিকে মনোযোগ দিয়েছে উবার। এসব প্রতিটি সার্ভিসের জন্যই উবারের দরকার বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ, যা উবারের ব্যবসায়িক লাভের গতি স্তিমিত করে দেবে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রায় সবাই চালকবিহীন গাড়িকেই রাইড শেয়ারিংয়ের ভবিষ্যৎ বলে মানছেন। এদিক থেকে উবার বেশ এগিয়ে আছে। প্রতিষ্ঠানটি বেশ কয়েক বছর ধরে নিজস্ব চালকবিহীন গাড়ির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। সম্প্রতি চালকবিহীন গাড়ির প্রযুক্তি আরও উন্নত ও নিখুঁত করার জন্য উবার ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছে। উবার অনেক দ্রুত বাড়ছে এবং এসব খাতে তাদের প্রচুর অর্থ খরচ হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী রাইড শেয়ারিং ও ফুড ডেলিভারি সার্ভিসে উবার এখনো এক নম্বরে আছে, ভবিষ্যতেও এক নম্বরে থাকবে।

তবে ভবিষ্যতের উবার হবে অনেক সুসংহত এবং উবারের নেটওয়ার্ক হবে আরও বিস্তৃত। অনেক বিশ্লেষক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, উবার নিশ্চিতভাবে লাভজনক হবে এবং উবারের লাভের অংক হবে বিশাল। তবে সে জন্য উবারকে আরও অন্তত চার-পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।