দুই খান + ট্র্যাজেডি = কালজয়ী দুই ছবি

ট্র্যাজেডি কি?

আদি-মধ্য-অন্ত সমন্বিত যে গুরুগম্ভীর নাট্য কাহিনীতে কোন অসাধারণ গুণসম্পন্ন নায়কের নিয়তির প্রভাবে বা চরিত্রের অন্তর্নিহিত ত্রুটির পরাজয় ঘটে, যা দর্শকচিত্তে উদ্রেক করে করুনা ও ভীতি এবং পরিশেষে ক্যথারসিস বা ভাব মোক্ষণ ঘটায় তাকেই ট্রাজেডি বলে।

ট্রাজেডি নিয়ে ব্যকারণ আঙ্গিকে সংজ্ঞা দিতে শুরু করলাম, কি আজব ব্যপার!! যাইহোক, নাটকের সাথে সাথে সিনেমাতেও ট্রাজেডি অনেক জনপ্রিয় একটি অংশ। ট্রাজেডির কারণে সিনেমা শেষে দর্শকদের কান্নাও নতুন কিছু না। বলিউডেও ট্রাজেডিপূর্ণ সিনেমার সংখ্যা কম না।

২০০৩ সালে বলিউডের দুই খান শাহরুখ ও সালমান খান দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছিলেন ট্রাজেডিপূর্ণ সিনেমা নিয়ে যা দর্শকদের কাঁদিয়েছিলো।

বলিউড ভাইজান সালমান খানের বেস্ট অভিনয় করেছেন যেগুলোতে তাঁর অন্যতম ছিলো তেরে নাম। ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ (১৯৯৯) এর পর পরবর্তী আটটা সিনেমায় ক্লিন হিটের দেখান পাননি সালমান খান। তারপরে ২০০৩ এর আগস্টে মুক্তি পায় তেরে নাম। একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে ১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি তামিল সিনেমার পুন:নির্মান এই ছবিটি আমার দেখা সালমানের সেরা ছবি, সাথে ভূমিকা চাওলা বলিউডের প্রথম ছবিতেই দর্শকদের মন জয় করে নেন। গল্পটা সবারই জানা। তারপরেও নিয়ম রক্ষার্থে দিচ্ছি। যারা দেখেননি (এমন বলিউড দর্শক পাওয়া দুষ্কর) স্ক্রল করে যান।

বখাটে ছেলে রাধে। কোন কাজ নেই, পড়াশোনা নেই। সবসময়ই কারো না কারো পেছনে লেগে থাকা। এই ছিল সালমানের তেরে নাম ছবিটির চরিত্রে। এরপর গল্পে আসে ভিন্নতা। ব্রাহ্মণের মেয়ে নির্ঝরাকে ভালোবেসে ফেলেরাধে। শেষ অব্দি চলে যায় পাগলাগারদে। এদিকে নির্ঝরার বিয়ের প্রস্তুতি চলে। ওদিকে পাগলাগারদ থেকে পালায় রাধে। বিষ খেয়েআত্মহত্যা করে নির্ঝরা। ভালোবাসার টানে সব ফেলে ছুটে আসা রাধে নির্ঝরার লাশ দেখে চুপ হয়ে যায়। পাগলাগারদ থেকে শেকল পরিয়ে ফেরত নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।

শেষ অংশটা সবার কেমন লেগেছিলো জানি না। কিন্তু সত্যিই বলিউডের টপ ইমোশনাল মুভির অন্যতম একটা তেরে নাম। কিছুদিন আগে তেরে নাম গান শুনেও নাকি ক্যাটরিনা কাইফ অশ্রু ঝরিয়েছেন। অভিনয়ের কথা বললে, এটা সালমান খানের বেস্ট পারফরমেন্স বললে ভুল হবে না। যদিও সালমান খান এর জন্য কোনো পুরস্কার পাননি তবে ডিরেক্টর, অলকা ইয়াগনিকসহ অনেকে অনেক পুরস্কার বিজয়ী হন। যদিও এটা ক্লিন হিট এনে দিতে পারেনি কিন্তু সালমান খান নতুনরূপে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন।

‘তেরে নাম’-এর রেশ কাটতে না কাটতে একই বছর নভেম্বরে মুক্তি পায় শাহরুখ খানের কাল হো না হো। শাহরুখ খানের সেরা চরিত্রগুলোর একটি আমান মাথুর। শাহরুখ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে চরিত্রগুলোতে শুধু ভালোবেসে গেছেন সেগুলোর প্রথম সারিতে আমান মাথুর চরিত্রটা থাকবে কোনো সন্দেহ নাই। কাল হো না হো দেখে কাঁদেনি এমন সিনেমাপ্রেমী মানুষ খুঁজে বের করা কঠিনই বটে। আর সবকিছুর পরিপূর্ণতা দিয়েছে আমান নামের চরিত্রটা।

খুব বাহ্যিক সহাস্যমুখের এই চরিত্রটা সবসময় সবাইকে খুশি রাখতেই ভালোবাসে। প্রকৃত ভালোবাসার মানেটা খুব ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন শাহরুখ আমান মাথুর চরিত্রটার মধ্য দিয়ে। সিনেমার শুরুতে দেখলাম সবসময় হাসিখুশী আমানকে। কিন্তু যতই সময় যায় চরিত্রটা আরো জটিল হতে থাকে। সব কষ্ট আড়ালে রেখে সবার সামনে হাসিমুখ প্রদর্শন করার নামই আমান মাথুর। আর প্রপোজ অংশটা নিয়ে নতুনভাবে বলার কিছু নেয়। সংক্ষিপ্ত কথায়, বেস্ট প্রপোজাল এভার। পুরো মুভিতেই ছিলো ভালোবাসার সব কথোপকথনের ছড়াছড়ি। অন্যতম পছন্দের একটা সংলাপ, ‘জিও, খুশ রাহো, মুসকুরাও, ক্যায়া পাতা কাল হো না হো’

জীবনের কঠিন সময়কে পাড়ি দেয়ার অনুপ্রেরণা যোগানো এই সংলাপটি বহু শাহরুখ ভক্তই আওড়েছেন মন্ত্রের মতো। ‘কাল হো না হো’ সিনেমাটি যতখানি দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে, তার চেয়েও বেশি জনপ্রিয় হয়েছে এই সংলাপটি।

বলিউডের সাধারণত যেসব ত্রিভূজ প্রেমের সিনেমা আছে, প্রচলিত ধারার বাইরে এই ত্রিভূজ গল্পটা। ‘রহিত প্যাটেল’ চরিত্রে প্রথমে সালমান খানকে এবং ‘ন্যায়না ক্যাথেরিন কাপুর’ চরিত্রে কারিনা কাপুরকে প্রস্তাব দেউয়া হয় কিন্তু তারা নাকচ করে। পরবর্তীতে এই দুই চরিত্রে অভিনয় করেন সাইফ আলী খান আর প্রীতি জিন্তা অভিনয় করেন। প্রীতি জিনতার ২০০৩ ছিলো অন্যতম সেরা একটা বছর। আগস্টে ‘কোই মিল গায়া’র পর নভেম্বরে ‘কাল হো না হো’!

শেষ অংশটুকু শাহরুখ খান তাঁর সন্তানদেরও দেখাননি এমন কথাও শোনা যায়।

যাইহোক সিনেমার গানগুলো ছিলো অনেক দূর্দান্ত। কাল হো না হো টাইটেল গানটাও ব্যক্তিগতভাবে অন্যতম পছন্দের একটা গান। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের কারণে হয়তো এই সিনেমার আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সিনেমাটি একাধিক এওয়ার্ড অর্জন করে। ফিল্মফেইয়ারে ১১টা ক্যাটাগরির নমিনেশনে ৮টা এওয়ার্ড অর্জন করে। দু’টি জাতীয় চলচিত্র পুরষ্কার জয়ী হয় কাল হো না হো, যার একটি ছিলো সনু নিগামের নামে বেস্ট প্লেব্যাক সিঙ্গার ক্যাটাগরিতে।

দুই খানের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা এই সিনেমা দুটি চিরসবুজ সিনেমাগুলোর অন্যতম। এই দুটো সিনেমা অপছন্দ করে এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।