মনের কুঠুরির আজীবনের নায়ক

ধানমন্ডি স্টেডিয়ামে খুলনা ও ঢাকা মেট্রো পলিটনের ম্যাচ চলছে, বয়স বেশি বলে খেলতে পারলেন না নড়াইলের এক তরুণ। কিন্তু জাহিদ রেজা বাবু ঠিকই হিরকখণ্ড চিনেছিলেন। মেডিকেল পরীক্ষায় করিয়ে বয়সের বাঁধা উতরে দিলেন। পরদিন সেই তরুণেরই আগুনঝড়া গতিতে জয় পেলো খুলনা।

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে আজাদ স্পোর্টিংয়ের হয়ে নড়াইলের সেই তরুণকে খেলতে বলেন, পাগলাটার ক্যারিয়ার শুরু সেদিন থেকেই। এর কয়েক বছর পরেই জিম্বাবুয়ে সিরিজে ডাক পেলেন, অভিষেকেই গ্রান্ট ফ্লাওয়ারের স্ট্যাম্প শূন্যে উড়ালেন, প্রথম ইনিংসেই চারখানা উইকেট। যদিও পথচলাটা সুখের হয়নাই, দু’মাস পরেই ইনজুরি, যা আর কখনো নড়াইলের সেই তরুণকে ছেড়ে যায়নি। ইনজুরির সাথেই এত বছরের প্রেম!

২৬ ডিসেম্বর ২০০৪!

বিজয়ের মাস, গৌরবের মাস, অহংকারের মাস।

টাইগারদের সাথে সেই সময়ের অন্যতম সেরা টিম ভারতের ম্যাচ। বীরেন্দ্র শেবাগ প্রথম থেকেই বাংলাদেশকে হালকা চালে দেখছিলেন। আর তার এই অহংকার একজনের বুকে শেল হয়ে বিঁধলো, বয়সে তরুণ হলেও বাইশ গজে দেশের জন্যে নিজের সর্বোচ্চ দিয়েই লড়ে গেলেন।

ব্যাট হাতে শেষের দিকে নেমেও অপরাজিত ৩১ আর বল হাতে আউট করলেন ধোনি এবং শেবাগকে। বিজয়ের মাসে বাংলাদেশও পায় আরো একটি বিজয়, বয়সে ছোট হলেও মাশরাফি বিন মুর্তজার প্রতি ভালোবাসাটা সেইসময় থেকেই শুরু। যতই বড় হতে লাগলাম মানুষটার প্রতি ভালোবাসাটাও তত বাড়তে লাগলো!

এরপর ২০০৭ সালের বিশ্বকাপের মঞ্চ!

প্রতিপক্ষ সেই ভারত, দিনটা ১৭ মার্চ। এ ম্যাচেও শেবাগের চোখে বাংলাদেশ ‘সাদামাটা’ দল। আর সেদিন বিশ্বকাপের মঞ্চে জাতীয় সঙ্গীত বলার সময় যে ছেলেটার চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়েছিলো, সেই ছেলেটা এবারো বললো, ‘ধরে দিবানি’।

সেদিন একাই তুলে নিয়েছিলেন ভারতের মূল্যবান চার উইকেট। ট্রফি জিততে আসা একটা দলকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় হতে হয়েছিলো এই মানুষ টার জন্যে। অহংকারী শেবাগকে এবারো তিনি আউট করে প্রমান করে দেন, বাংলাদেশ কারো নিকট মাথা নোয়ায় না।

অথচ মাঠে নামার আগে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে হারানোর দুঃসংবাদ পেয়েছিলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অন্যতম প্রতিভাবান অলরাউন্ডার মানজারুল ইসলাম রানা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পরপারে! শোককে শক্তিতে পরিণত করলেন, বন্ধুকে জয় উপহার দিলেন।

এরপর ২০১১ সাল!

ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ, নিজের চেনা আঙ্গিনায় ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদাকর আসর, স্বপ্ন দেশের হয়ে আরেকবার বল হাতে মাঠ কাঁপাবেন, কিন্তু বাধ সাধলো ইনজুরি। গোটা ক্যারিয়ারে কম ত ভোগায় নি এই জিনিষ টা! এরপরেও ইনজুরি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। মাত্র এক মাসের ভিতরে ১২ কেজি ওজন কমিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

কিন্তু বিধি বাম! দলে জায়গা হয়নাই। মিরপুরের মাঠে বাচ্চা শিশুর মতো কেঁদে ছিলেন। কাঁদিয়ে ছিলেন গোটা জাতিকে। যে মানুষটা দেশের জন্যেই প্রতিনিয়ত নিজেকে এক অনিশ্চিয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে, সেই মানুষ টাই যদি দেশের মাঠে বিশ্বকাপে না খেলতে পারলেন না। এরপরেও সব ভুলে তিনি আবারো বাংলাদেশের হয়ে মাঠে নামেন, নিয়মিত লড়াই করেন, দেশকে আনন্দে ভাসান। তবে দরকার ছিলো একটা প্লাটফর্মের, যেটা তিনি পান ২০১৪ সালে। ওই বছর টা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যে ছিলো হতাশাময়, সেখানেই তিনি দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে সব শুরু করেন।

প্রথম পরীক্ষাতেই তিনি পান লেটার মার্কস!

তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জিম্বাবুয়েকে বাংলাওয়াশের ‘বিস্বাদ’ দেয়। এরপরে ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপে, তার নেতৃত্বেই মাঠে নামে বাংলাদেশ। ঠিক ৪ বছর আগে যে মানুষটা মিরপুরে অঝোর ধারায় কেঁদেছিলো, ঠিক চার বছর পর সেই বাইশ গজেই তিনি গোটা জাতির আশা – ভরসার প্রতীক হিসেবে জাতিকে নতুন কিছু দেওয়ার দায়িত্বটা নিজ কাধে নেন।

মাশরাফি নামক হিরকখণ্ডটা আমাদের সেই আশায় গুড়ে বালি দেন নি, বরং দলকে প্রথম বারের মতো স্বপ্নের কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে যান। গোটা বিশ্বই তার নেতৃত্বে দেখেছিলো, বাঘেদের হুংকারে ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ১৬ বছর পর হারানোটাও তার হাত ধরে, পাকিস্তানকে বাংলাওয়াশের স্বাদ টাও তার অধীনেই এসেছে। এরপরে সিরিজ বাঁচাতে পারেনি ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকাও। ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো আইসিসি অনুষ্ঠিত কোন বড় ইভেন্টের সেমিফাইনালে মাঠে নেমেছিলো বাংলাদেশ, এবং তা এই মানুষটার অধীনেই!

বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক, কিংবা বাংলাদেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অধিনায়ক। ইনজুরি না থাকলে ক্যারিয়ারকে কত উঁচুতে নিয়ে যেতেন তা কেউ হয়তো কল্পনা করে উঠতে পারবেন না। তবে  এই লোকটাকে মাপতে এত বিশেষণ, এত পরিসংখ্যান লাগে না।

মাশরাফি মানে তামিমের গ্লাভস কেটে দিয়ে ‘তোকে নামতে হবে’ বলা। মাশরাফি মানে, মুস্তাফিজের হাতে বল তুলে সাহস দেওয়া। মাশরাফি মানে লিটন দাসকে বুকে হাত দিয়ে লড়ে যাইতে বলা। মাশরাফি মানে, মাহমুদউল্লাহ না খেললে আমিও খেলবো না বলে একরোখা মনোভাব দেখানো। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান একবার বলেছিলেন, ‘কৌশিক ভাই কতবড় অলরাউন্ডার হতে পারতেন নিজেও জানেন না।’

চিত্রার পারে দাপিয়ে বেড়ানো সেই তরুণই আজ লাখো মানুষের অনুপ্রেরণা। সারাদিন ক্রিকেট খেলতো বলে বাড়িতে মার খাওয়া সেই ছেলেটাই আজ একটা দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাক্তিত্ব। স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, ‘মাশরাফি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ’।

আমরা ছোটকালে রবার্ট ব্রুসের গল্প পড়তাম, এখন আর ওসব গল্প পড়ে অনুপ্রেরণা নেওয়া লাগে না। আমাদের চোখের সামনেই কৌশিকের দৌড়ঝাপ দেখি, ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে আবারো মাঠে নামতে দেখি, তবে তার সবচেয়ে বড় শক্তি কোন ব্যান্ডেজে মোড়ানো হাত বা পা না! বুকের ভিতরের বড় কলিজাটা। অফুরন্ত শক্তিতে ভরপুর কলিজা, দেশের জন্য লড়ে যাওয়ার গাটস, দৌড়ানো, কিংবা এক হাতে নেওয়া অমানবিক ক্যাচ!

মাশরাফি বিন মুর্তজা এক মহাকাব্য, যা সারাদিন লিখেও শেষ করা যাবে না। ছোটকালে একবার বাবার সাথে ডাক্তারের কাছে গেলেন, দাঁতের মাড়িতে ইনজেকশন নিতে সে কোনমতেই রাজি না, দরকারে দাতের ব্যাথা সহ্য করবে, কিন্তু ইনজেকশন একদম না।

অথচ সেই লোকটাই এখন নিজেই ইনজেকশন নেয়, দেশের জন্য শেষবিন্দু দিয়ে লড়ে যায়। চীনের ফিনিক্স পড়তাম, মাশরাফি বিন মুর্তজা পড়িনাই, শুধু দু’নয়ন জুড়িয়ে দেখেছি।

এইতো আর কয়েকটা বছর, একসময় এই বুড়োটাও থেমে যাবে, আমাদের বাইশ গজে আর সে থাকবে না, জুনিয়র দের আগলে রাখবে না, ছোট পুঁজি নিয়েও আমরা আর স্বপ্ন দেখবো না। একজন নেতাই যে আর আমাদের মাঝে থাকবে না। মাশরাফি বিন মুর্তজার জন্য আমরা শিরোপা চাই, আর তিনি নিজেকে শিরোপার নিক্তিতে মাপতে চান না।

অনেক কিছু বলার আছে, হাত থেমে যায়, চোখের কোনে জল চলে আসে। কিছু কথা থেকে যায় স্মৃতির পাতায়, মনের কুঠুরিতে আজীবন। আরো কয়েকটা বছর না হয় এভাবেই কাটিয়ে দেন। আমাদের জন্য, আপনার প্রিয় দেশের জন্য। আপনাকে ছাড়া ওই ২২ গজ কল্পনাও করতে পারি না যে!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।