২০১৮: সেরা ১০ বাংলা নাটক

২০১৮ সালে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে নাটক নির্মানের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। এর ব্যাপ্তি ছিল টেলিভিশন থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত। দর্শক নাটক দেখেছেও বেশ। তবে মানের দিক থেকে কিছু হতাশার মাঝেও অনেক নাটক মন ছুঁয়ে গেছে। এই বছর সেরা দশটি নাটক নিয়ে এই আয়োজন।

  • পাতা ঝরার দিন

বয়সের বার্ধক্যতায় স্মৃতি লোপ পেয়েছে বাবা,তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন নিজ গন্তব্যের,আর তাকে খুঁজে পেতে পথে বেরিয়েছেন তাঁর বড় মেয়ে। বাবা ও মেয়ের মধুর সম্পর্ক নিয়ে একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই ঈদের ভাই- ব্রাদার এক্সপ্রেসের আয়োজনের রেদোয়ান রনির নাটক ‘পাতা ঝরার দিন’। নির্মাতা তাঁর নিজস্ব গল্প বয়ানে সুন্দর ভাবে চিত্রনাট্য সাজিয়ে নিয়েছেন, অনেকদিন পর যেন রেদোয়ান রনিকে নিজের পুরোনো রুপে দেখা গেছে। বাবা চরিত্রে অভিনয় করেছেন বর্ষিয়ান অভিনেতা সৈয়দ হাসান ইমাম,বয়সের ভারে উনার অভিনয় এতটুকুও ম্লান হয়নি। বড় মেয়ের চরিত্রের মধ্য দিয়ে অনেকদিন পর অভিনয়ে ফিরেছেন নন্দিত অভিনেত্রী ঈশিতা। এছাড়া বিশেষ চরিত্রে মৌসুমী হামিদ ও বেশ ভালো।

  • ফেরার পথ নেই

সাম্প্রতিক কালের দুই ইস্যু নিয়ে এই নাটক। আপনার কাছের মানুষ বাসা থেকে বেরোনোর পর আর ফেরে না, হারিয়ে যায় যে,অপেক্ষায় থাকা প্রিয় মানুষগুলোর তাঁর আর ফেরার পথ নেই। ঘটনাবহুল এই ইস্যু নিয়ে আশফাক নিপুণকে নাটক বানানোর জন্য কৃতজ্ঞতা,এই সব নাটক বানাতে সাহস লাগে,যেটা তিনি আয়ত্ত করেছেন, এবং তিনি যে প্রতিভাবান সেটা প্রমান করেছেন। এখন পর্যন্ত যত নাটক দেখেছি,তাঁর মধ্যে এটিই সেরা। অভিনয়ের দিক দিয়ে মেহজাবীন অনেক পরিনত, তাঁর কান্নার দৃশ্য নিয়ে অনেক সময় কথা হয়, তবে এই নাটকে তাঁর কান্নার দৃশ্য আপনার চোখ ভিজিয়ে দিবে। পাশাপাশি মেহজাবীনকে দারুণ সঙ্গ দিয়েছেন আফরান নিশো।

  • সব মিথ্যে সত্যি নয়

মিথ্যে সব সময় খারাপ,তবে কিছু মিথ্যে জীবন কে রঙিন করে তোলে, বাঁচতে শেখায়। মোটামুটি উচ্চবিত্ত পরিবারের গল্প এটি, তবে দিনে দিনে অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশ কমতে থাকে। হঠাৎ করেই মায়ের অসুস্থতা বেড়ে যায়,শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না দেখে হাজির হন এক রিয়েলিটি শো তে, যেখানে তিনি নিজে তুলে ধরেন তাঁর জীবনের মিথ্যের গল্প। জনপ্রিয় নির্মাতা শাফায়েত মনসুর রানা তাঁর গোছালো গল্প চিত্রনাট্য,নির্মানের মুন্সিয়ানায় নাটকটি বেশ ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অভিনয়ের দিক দিয়ে জন কবির, অপর্ণা ও দিলারা জামান সবাই নিজেদের জায়গা থেকে ভালো করার চেষ্টা করেছেন।

  • আমার নাম মানুষ

চারিদিকে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি এইসব যেন আমরা সহ্য করে চলেছি, প্রতিবাদ করি না। তবে কেউ কেউ প্রতিবাদ করতে চান,তাঁরাই তো আসল মানুষ। এই নিয়েই শাফায়েত মনসুর রানার টেলিফিল্ম ‘আমার নাম মানুষ’। সাম্প্রতিক কালের বাংলাদেশে যে দূর্বার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেটাও এসেছে অনুপ্রেরণা হয়ে। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাফায়েত মনসুর রানা, অপর্ণা ঘোষ, ইরফান সাজ্জাদ, সেঁওতি, জন কবির, সুদীপ-সহ আরো অনেকে।

  • শাড়ি

এক নিম্নমধ্যবিত্ত দম্পতির গল্প। কর্পোরেটের অফিসের লিফটম্যান, একদিন তাঁর বসের ফেলে যাওয়া শাড়ি নিয়ে উপস্থিত হন নিজের বাড়িতে, তাঁর নতুন স্ত্রী নিজের শাড়ি ভেবে পড়ে ফেলেন। লিফটম্যান তাঁর স্ত্রীর খুশি দেখে আপ্লুত হয়, কিন্তু পরক্ষনেই মনে পড়ে তাঁর বসের কথা। এক মানসিক টানাপোড়নের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যায় এই গল্প। মাসুম শাহরিয়ারের রচনায় নাটকটি নির্মান করেছেন হিমেল আশরাফ। অভিনেতাদের মধ্যে এই ঈদে আফরান নিশো সবচেয়ে আলোচিত। অভিনয়ের দিক দিয়ে নিশোর সেরা কাজ এটি। স্ত্রীর চরিত্রে সাবিলা নূরের অভিনয়ের উন্নতি চোখে পড়ার মতো। নির্মাতা হিসেবে হিমেল আশরাফ বরাবরই ভালো কিছু করার চেষ্টা করেন, তবে তিনি সেভাবে আলোচিত হন না। আশা রাখছি এই নাটকটি তাঁর ক্যারিয়ারে সৌভাগ্য বয়ে আনবে।

  • হোম টিউটর

‘টিউশনি’ আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। ছাত্র ও এই হোম টিউটরের সম্পর্ক নিয়েই এই গল্প। একজন টিউটর মানেই কি বাসায় কলিং বেল টিপে নির্দিষ্ট সময় পড়িয়ে টাকা গুনে নেয়া, এর বাইরেও ছাত্রের সাথে গড়ে উঠে এক আলাদা মনোজগত,হয়ে উঠেন কাছের মানুষ। যারা যারা এই পেশায় যুক্ত তাঁরা প্রত্যেকেই যেন নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবেন। নাম ভূমিকায় আফরান নিশো বেশ ভালো করেছেন,পুরো নাটকে সেই সর্বেসর্বা। ছাত্রের ভূমিকায় শাওন দারুন,তানজিন তিশা সঙ্গ দেবার চেষ্টা করেছেন। এই ঈদে সবচেয়ে নেশি নাটক বানিয়েছেন মাবরুর রশিদ বান্নাহ, সেগুলির মধ্যে অবশ্যই সেরা কাজ এটি।

  • কাঁনামাছি ভোঁ ভোঁ

২২ বছর দেশে ফিরে পিতৃহত্যার রহস্য ভেদ করছে জেমস, কিন্তু সফল হচ্ছেন না। কারণ এই হত্যার একমাত্র সাক্ষী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। সন্দেহের তীর যার দিকে,সে বলেছে খুন করেনি,তাহলে মূল রহস্য কি? এই গল্প নিয়েই আশফাক নিপুণের থ্রিলার নাটক ‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ’,নাটকের শেষে ফুটে উঠেছে আমাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। নির্মাতা এই থ্রিলার দর্শকদের কাছে বেশ সহজবোধ্য ভাবেই তুলে ধরেছেন। মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ের চরিত্রে অপি করিম দুর্দান্ত,পাশাপাশি জেমসের চরিত্রে জন কবির তাঁর মত করে সঙ্গ দিয়েছেন।

  • আয়েশা

এই ঈদের সবচেয়ে আলোচিত নাটক ‘আয়েশা’। তাঁর কারণ অবশ্য অনেক,এর মধ্যে প্রধান কারন প্রায় ১০ বছর পর নাটক নির্মান করেছেন মুস্তফা সরোয়ার ফারুকী, আর তিনি নাটক বানানোর জন্য বেছে নিয়েছেন সত্তর দশকে ঘটে যাওয়া বিমান বাহিবীর নির্মম এক অভ্যুত্থান নিয়ে আনিসুল হকের আলোচিত উপন্যাস ‘আয়শামঙ্গল’। প্রিয়জন হারানোর বেদনার এই গল্পটি সবার মন ছুঁয়ে গেছে,যদিও উপন্যাসটি সম্পূর্ণভাবে তিনি তুলে আনেন নি। ভাই- ব্রাদার এক্সপ্রেসের আয়োজনে ফারুকীর প্রত্যাবর্তন হিসেবে হয়তো এটি আলোচিত থাকবে, তবে বিশেষ ভাবে মনে থাকবে আয়েশা চরিত্রে তিশার দুর্দান্ত অভিনয়, পুরো নাটক তিনি যেন একাই টেনে নিয়েছেন। তিশার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ এটি, স্বল্প সময়ে চঞ্চল চৌধুরীও নিজের প্রতিভা দেখিয়েছেন।

  • সোনালী ডানার চিল

মধ্যবিত্ত পরিবারের সবার ই চাওয়া তাঁর মেধাবী সন্তানটি ডাক্তার হউক,কিন্তু সেই স্বপ্নে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় প্রশ্নফাঁস চক্র। ভাই-ব্রাদার্সের আয়োজনে ঈদের নাটক ‘সোনালী ডানার চিল’-এ এমনই গল্প ফুটে উঠেছে। নির্মাতা আশফাক নিপুণের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশ সাহসী কাজ,শেষটা কিছু নাটকীয় হলেও ‘সকাতরে ঐ কাঁদিছে’র গানের সুন্দর ব্যবহারে চোখ ভিজিয়ে আনবে। ছবিয়ালের সাথে এবারই প্রথম কিংবদন্তি অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ অভিনয় করেছেন, একজন শিক্ষক রুপী বাবার চরিত্রে তিনি শক্তিমান অভিনেতার ই পরিচয় দিয়েছেন। ভর্তিপরীক্ষা শিক্ষার্থী মেয়ের চরিত্রে মেহজাবীন ও খুব ভালো, মা হিসেবেও সাবেরী আলম ও বেশ।

  • কলুর বলদ

নাম নিয়ে বেশ আপত্তি থাকলেও সাজ্জাদ সুমনের এই নাটকটি বেশ ভালো কাজ। এক প্রবাসীর জীবনের নানা টানাপোড়ন,বাস্তবতা নিয়ে গল্পটি লিখেছেন মেজবাহউদ্দিন সুমন। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে অনেকদিন পর আলোচনায় এসেছেন চিত্রনায়ক রিয়াজ, এছাড়া ছিলেন তানিয়া আহমেদ,দিলারা জামান,মামুনুর রশীদ সহ আরো অনেকে। প্রবাসীরা এই নাটকটি দারুণ ভাবে গ্রহণ করেছে,পরবর্তীতে এই নাটকের সিক্যুয়েল ও বেরিয়েছে,সেটাও বেশ জনপ্রিয়তা পায়।

এছাড়া বিশেষভাবে বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধে এক সংখ্যালঘু পরিবারের ভয়াবহ বিপর্যয়নিয়ে হাসান মোরশেদের নাটক ‘সাদাসিধে মানুষের গল্প’। প্রধান ভূমিকায় মোশাররফ করিমের অনবদ্য অভিনয় চোখ ভিজিয়ে আনবে,এছাড়া অভিনয় করেছেন অপর্ণা ঘোষ,বিজরী,মিরানা জামান।

বছরজুড়ে প্রচারিত অন্যান্য পছন্দের নাটকের মধ্যে লায়লা তুমি কি আমায় মিস করো?,নীল গ্রহ, ওগো বধূ সুন্দরী,আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে, সব গল্প রুপকথা নয়, নাইটওয়াচম্যান, সংসার অন্যতম।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।