বছরের আলোচিত ৫ সিনেমা

বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য ২০১৮ সালকে খুব একটা বাজে বছর বলা যাবেনা। ছবির সংখ্যা কমেছে কিন্তু গল্পপ্রধান ছবির সংখ্যা বেড়েছে। দর্শকের রুচির পরিবর্তন হচ্ছে, যদিও পরিবর্তনটা বেশ ধীর।

এ বছর মোট ৫৬ টি ছবি মুক্তি পেয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে সংখ্যাটা হৃষ্টপুষ্ট মনে হলেও আদতে তা নয়। ঢালিউডে একসময় প্রতি সপ্তাহে দুটো করে ছবি মুক্তি পেত। সেই হিসাব এখনকার প্রজন্মের কাছে অবিশ্বাস্য।

এবারের মুক্তিপ্রাপ্ত ৫৬ টি ছবির মাঝে হাতে গোণা কয়েকটি ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়েছে। ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি কিছু ছবি ছিল দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু সকল দৃষ্টিনন্দন ছবি ব্যবসাসফল হয়নি। সবগুলো থেকে পাঁচটি ছবি বেছে নেয়া কষ্টকর। তবে ব্যবসায়িক বিষয়কে পাশে রেখে নির্মাণশৈলী, অভিনয়, গল্প এসব ভেবে কয়েকটি ছবিকে রাখা যায় ছোট্ট তালিকায়। সেই তালিকায় চোখ বোলানো যাক।

  • দেবী

বছরের সবচেয়ে আলোচিত ছবি বোধহয় এটিই। জননন্দিত অভিনেত্রী জয়া আহসান প্রযোজকের ভূমিকায় নেমে সিনেমা প্রচারের নতুন সংজ্ঞা শিখিয়েছেন। প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ‘দেবী’। পরিচালনা করেছেন অনম বিশ্বাস। অভিনয় করেছেন সব্যসাচী অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী, নাটকের প্রিয়মুখ শবনম ফারিয়া, অনিমেষ আইচ, ইরেশ যাকের ও জয়া আহসান।

ছবির গল্প চেনা জানা। কিন্তু নির্মাণের মুন্সিয়ানা এবং অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছবিটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। অভিনয় শিল্পীরা পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। জয়া, চঞ্চলের অভিনয় দেখার জন্য হলেও প্রেক্ষাগৃহে যাওয়া দরকার।

হুমায়ূন আহমেদের গল্প নিয়ে সিনেমা বানিয়ে তা দিয়ে ব্যবসা সবাই করতে পারেনি। হুমায়ূন পারতেন, এবার পারলেন জয়া। এ ছবি দিয়ে জয়ার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘সি তে সিনেমা’ ঢালিউডে আত্মবিশ্বাসের সাথেই প্রবেশ করলো।

মুক্তির এগার সপ্তাহ পার হবার পরেও ছবিটি দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে চলছে। এখানেই জয়া সফল। তিনি সুঅভিনেত্রী শুধু নন, একজন দক্ষ প্রযোজকও বটে!

  • স্বপ্নজাল

পরীমণিকে সবাই জানতো বাণিজ্যিক ছবির নায়িকা হিসেবে। আমাদের কাছে বাণিজ্যিক ছবি মানেই ছকে বাঁধা গল্প, কিছু ‘মাসালা’ দৃশ্য, আইটেম গান ও শেষ ফাইট শেষে পুলিশের আগমন।

এই ছকের বাইরে গিয়ে কিছু করলেন গিয়াস উদ্দীন সেলিম। যিনি নির্মাণ করেছিলেন ‘মনপুরা’। নায়িকা করলেন পরীকে। দর্শক নতুন পরীকে দেখল। অত্যন্ত রূপবতী পরী নিজের অভিনয় দক্ষতা মেলে ধরলেন। বিমোহিত হলো দর্শক। পরীর বিপরীতে তরুণ ইয়াশ রোহানকেও মানিয়ে গেল। ফজলুর রহমান বাবু, ইরেশ যাকেরের অভিনয়েও মুগ্ধ হলো দর্শক।

আফসোস, ছবিটি ভালো ব্যবসা করতে পারেনি। তবে এ বছরের অন্যতম সেরা ছবির একটি হয়ে থাকবে পরীর অভিনেত্রী পরী হবার চলচ্চিত্রটি।

  • পোড়ামন – ২

সিয়াম আহমেদকে সবাই চেনে ছোটপর্দার নায়ক হিসেবে। সেই সিয়ামকে নায়ক বানালো জাজ মাল্টিমিডিয়া। রায়হান রাফির পরিচালনায় ‘পোড়ামন ২’ নতুন এক জুটির জন্ম দিল। সদ্য শিশুশিল্পী থেকে নায়িকা হওয়া পূজা চেরীকে সাথে নিয়ে সিয়াম গড়ে তুললেন নতুন জুটি। প্রেমের গল্পের সিনেমাটিক রূপ দেখে মুগ্ধ হলো দর্শক, প্রেক্ষাগৃহ ‘হাউজফুল’ হলো।

অনেকদিন বাদে শাকিব খানের পর অন্য কোন নায়কের ছবি দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়লো দর্শক। নায়িকা হিসেবে নিজের অবস্থান আরো পোক্ত করলেন পূজা চেরী। সিয়াম প্রবেশ করলেন বড়পর্দায়।

সাফল্যের গল্প বললো ‘পোড়ামন’ ছবির মতোই। এ ছবির গানগুলোও লুফে নিল দর্শক। বছরের অন্যতম হিট সিনেমা ‘পোড়ামন ২’।

  • দহন

সিয়াম – পূজা জুটির দ্বিতীয় ছবি ‘দহন’। পরিচালক যথারীতি রায়হান রাফি। এ ছবির একটি গান সিনেমা মুক্তির আগেই বিতর্কিত হলো। তাতে কি, সিনেমা নিয়ে যথেষ্ঠ হাইপ সৃষ্টি করে ফেললো নেটিজেনরা। আগের সিনেমার সাফল্যের মাঝেই কয়েক মাসের ব্যবধানে সিয়াম ও পূজাকে বড়পর্দায় দেখতে পেল দর্শক। বাড়তি পাওয়া ছিল জাকিয়া বারী মম’র অভিনয়।

এ ছবির গল্পটি দেশের রাজনৈতিক অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত করেছে। গল্পের ছলে রায়হান রাফি সমাজের কিছু কদর্য চিত্র তুলে ধরেছেন। ছবিটি সিয়াম – পূজা জুটির প্রথম ছবির মতো সাফল্য না পেলেও যথেষ্ঠ আলোচিত। এ ছবিটি মূলত সিয়ামকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দিল। পূজাকে তো একসময়ের জনপ্রিয় নায়িকা শাবনূরের উত্তরসূরি বলে ফেলেছেন অনেকেই!

  • মাটির প্রজার দেশে

একটি ছবি যখন পাঁচ বছর ধরে নির্মাণ করা হয় তখন নিশ্চিতভাবে বলা চলে এর পেছনে কত ভালোবাসা কাজ করেছে। বিজন ইমতিয়াজ এবং তাঁর বন্ধু আরিফুর রহমান মিলে বানান ‘মাটির প্রজার দেশে’। কিন্তু ছবিটি বানানোর পর দেখা গেল পরিবেশন করার মতো অর্থনৈতিক সঙ্গতি তাঁদের নেই। ছবিটি ভিন্ন ঘরানার, তাই কেউ নিতে রাজি হচ্ছিল না। অনেক কষ্টের পর স্টার সিনেপ্লেক্সে ছবিটি মুক্তি দেয়া হয়।

শুরুতে দর্শক সাড়া না পেলেও দ্বিতীয় সপ্তাহ হতে দর্শকের কাছে পৌঁছুতে শুরু করলো ছবিটি। এ ছবির অন্যতম বিশেষত্ব হলো এর সিনেমাটোগ্রাফি এবং ব্যকগ্রাউন্ড মিউজিক। অধিকাংশ শব্দই ছিল প্রাকৃতিক, ঠিক যেমনটা আমরা শুনি। গুপী – বাঘা প্রডাকশন প্রযোজিত ছবিটিতে অভিনয় করেছেন রোকেয়া প্রাচী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের মতো গুণী শিল্পীরা। এ বছরের আলোচিত ছবির তালিকায় এটিকে রাখতেই হবে।

উপরোক্ত ছবিগুলোর বাইরেও কিছু ছবি আছে যা আলোচিত হয়েছিল। এরমধ্যে উল্লেখ করতে হয় নারী সুপারহিরো ছবি ‘বিজলী’র কথা। চিত্রনায়িকা ববি নতুন ধারার ছবি উপহার দিয়েছেন এ ছবির মাধ্যমে। জাকিয়া বারী মম’র ‘আলতা বানু’, বছরের শেষ সময়ে মুক্তি পাওয়া হরর জনরার ‘স্বপ্নের ঘর’, পুরোপুরি বাণিজ্যিক ছবি ইস্পাহানি আরিফ জাহান পরিচালিত ‘নায়ক’, আশিকুর রহমানের ‘সুপার হিরো’ ইত্যাদি ছবিও ছিল আলোচিত।

দর্শকের আগ্রহ ছিল এসব ছবির প্রতি। এখানে আরেকটি সিনেমার কথা না বললেই নয়। সেটা হল শিশুতোষ ঘরানার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘পাঠশালা’। পরিচালনা করেছেন নির্মাতাজুটি ফয়সাল রদ্দি এবং আসিফ ইসলাম। অন্যরকম এই সিনেমাটি পেয়েছে ভূয়সী প্রশংসা। নতুন বছর ঢালিউডে নতুন চমক নিয়ে আসবে, বাংলা চলচ্চিত্রের নতুন দর্শক সৃষ্টি হবে এ প্রত্যাশা সকলের।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।