হুমায়ূন আহমেদের সেরা ১০ নাটক

বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে অনন্য এক নাম হুমায়ূন আহমেদ। সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে সবচেয়ে আস্থাভাজন এই কিংবদন্তি সাহিত্যিক শুধু সাহিত্যর জন্যই তিনি বাঙালিদের কাছে স্মরনীয় হয়ে থাকবেন না, পাশাপাশি বাংলা নাটক ও সিনেমা জগতে সমৃদ্ধ করার জন্যও তিনি উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন।

বিশেষ করে নাট্যাঙ্গনে উনি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিলেন। তাঁর নাটক থাকতো দর্শকদের আগ্রহের শীর্ষে, সময় বেঁধে সবাই বসে যেতেন টেলিভিশনের সামনে। তাঁর লেখা চরিত্রগুলো দর্শকদের কাছে হয়ে উঠেছিল জীবন্ত। এক সময় তিনি নিজেও যুক্ত হন নির্মানের সঙ্গে। একক নাটক ও টেলিফিল্মের পাশাপাশি উনার লেখায় বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক নাটক নির্মিত হয়, যেগুলো পায় প্রচুর জনপ্রিয়তা। এই খ্যাতিমানের লেখায় নির্মিত অন্যতম সেরা দশটি ধারাবাহিক নাটক নিয়ে এই আয়োজন।

  • এইসব দিনরাত্রি (১৯৮৫)

হুমায়ূন আহমমেদের লেখায় প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’। মধ্যবিত্ত একান্নবর্তী পরিবারের জীবনকাহিনী নিয়ে নির্মিত এই ধারাবাহিকটি তৎকালীন সময়ে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। প্রধান নারী চরিত্র অর্থাৎ পরিবারের বড় বউ ‘নীলু’ চরিত্রটি হয়ে উঠে মধ্যবিত্ত সমাজের আদর্শ বউ। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন হতো সংসারে নীলুর মত বউ চাই। ধারাবাহিকটির শিশুশিল্পী টুনি চরিত্রটিকেও দর্শকরা আপন করে নিয়েছিল।

বিটিভিতে প্রচারিত মো: মুস্তাফিজুর রহমানের প্রযোজনায় এই নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ডলি জহুর, আসাদুজ্জামান নূর, বুলবুল আহমেদ, আবুল খায়ের, খালেদ খান, শিল্পী সরকার অপু, রাইসুল ইসলাম আসাদ, ইনাম আহমেদ, লুৎফন্নাহার লতা, আব্দুল কাদেরসহ আরো অনেকে। প্রত্যেক অভিনয়শিল্পীদের জন্য এই ধারাবাহিক নাটকটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • বহুব্রীহি (১৯৮৮)

হুমায়ূন আহমেদকে নাট্যজগতের সাথে পরিচয় করে দিয়েছিলেন প্রযোজক নওয়াজেশ আলী খান। তাঁরই প্রযোজনায় বিটিভিতে প্রচারিত ধারাবাহিক নাটক ‘বহুব্রীহি’। সাধারণত তাঁর উপন্যাস থেকে নাটক নির্মাণ করা হতো তবে এটা ছিল ব্যতিক্রম। নাটকের জনপ্রিয়তার পর উনি এটার উপব্যাস প্রকাশ করেন। এই ধারাবাহিকের মাধ্যমে তিনি রাজাকারদের ঘৃণ্য করার জন্য সর্বপ্রথম টিভি নাটকে তুলে ধরেন ‘তুই রাজাকার’ সংলাপটি। তাঁর অন্যান্য ধারাবাহিক থেকে এটি বেশ আলাদা।

দেশের নানা সমস্যা থেকে মুক্তিযুদ্ধ কে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে এই ধারাবাহিক নাটকটি নির্মিত হয়। প্রধান ভূমিকায় সোবহান সাহেব চরিত্রে অভিনয় করা আবুল হায়াতের এটি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা নাটক। এছাড়া অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন আলী যাকের, আবুল খায়ের, আসাদুজ্জামান নূর, আলেয়া ফেরদৌসী, লুৎফন্নাহার লতা, আফজাল হোসেন, লাকী ইনাম, মাহমুদা খাতুন, আফজাল শরীফসহ আরো অনেকে। মাহমুদা খাতুন এই নাটকে অভিনয় করেই রহিমার মা নামে পরিচিত হন।

  • অয়োময় (১৯৯১)

ব্রিটিশ ভারতে ক্ষয়িঞ্চু জমিদারের আভিজাত্য, অহংকার সহ আরো নানা বিষয় নিয়ে নির্মিত হয় টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ধারাবাহিক নাটক ‘অয়োময়’। মির্জা সাহেব চরিত্রে আসাদুজ্জামান নূরের অনবদ্য অভিনয় সঙ্গে বিপাশা হায়াত, লাকী ইনাম, সারা যাকের, তারানা হালিম, আবুল হায়াত, দিলারা জামান, আবুল খায়ের, ড.ইনামুল হকদের মতত অভিজ্ঞ অভিনয়শিল্পীরা এই ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছেন। এছাড়া পাখাল চরিত্রে আফজাল শরীফের অভিনয় ও দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। বিটিভিতে প্রচারিত এই নাটকটি প্রযোজনা করেছিলেন নওয়াজেশ আলী খান।

  • কোথাও কেউ নেই (১৯৯৩)

টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’। এই নাটকের জনপ্রিয় চরিত্র সর্বোপরি নাট্যঙ্গনের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র বাকের ভাইকে নিয়ে পুরো দর্শকমহলে হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। বাকের ভাইকে এতটাই আপন করে নিয়েছিলেন যে নাটকে যেন ফাঁসি না হয় সেজন্য মিছিল বের করেছিল দর্শকরা, মৃত্যুর পর গায়েবানা জানাযা পড়ার কথাও শোনা যায়। বাকের ভাই চরিত্রে আসাদুজ্জামান নূরের অভিনয় দর্শকদের কাছে সারাজীবন স্মরনীয় হয়ে থাকবে।

তবে এই নাটকে মুনা চরিত্রে অভিনয় করে নিজের বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে সেরা অভিনয় করেছিলেন সুবর্ণা মুস্তফা। এছাড়া অভিনয়ে ছিলেন আফসানা মিমি, শহীদুজ্জামান সেলিম, শীলা আহমেদ, মাসুদ আলী খান, আবুল খায়ের, লাকী ইনাম, মোজাম্মেল হক, আব্দুল কাদের, দিবা নার্গিস, লুৎফর রহমান জর্জ, পুতুল, তমালিকা, বিজরী, মাহফুজ আহমেদ, হুমায়ূন ফরিদী সহ আরো অনেকে। বিটিভিতে প্রচারিত এই নাটকটি প্রযোজনা করেছিলেন মো: মুস্তাফিজুর রহমান।

  • নক্ষত্রের রাত (১৯৯৫)

এর আগের ধারাবাহিক নাটকগুলি বিটিভির প্রযোজনায় নির্মিত এবারই প্রথম প্যাকেজ আকারে তিনি নিজেই নির্মাণ করেন ধারাবাহিক নাটক ‘নক্ষত্রের রাত’। মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনবোধ নিয়ে নির্মিত এই নাটকে মনিষা চরিত্রে শমী কায়সারের অভিনয় দর্শকদের কাছে চিরসবুজ হয়ে থাকবে। এছাড়া যারা অভিনয় করেছেন তাদের মধ্যে জাহিদ হাসান, আবুল হায়াত, দিলারা জামান, আফসানা মিমি, আলী যাকের, সারা যাকের, শাওন, শীলা আহমেদ, আজিজুল হাকিম, দিহান, আবুল খায়ের, লাকী ইনাম অন্যতম। তবে এই নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে দর্শকদের বিনোদিত করেছিলেন আব্দুল কাদের।

  • আজ রবিবার (১৯৯৬)

হুমায়ূন আহমেদের তৎকালীন বেশিরভাগ নাটক মধ্যবিত্তদের নিয়ে হলেও এটি ছিল মোটামুটি উচ্চবিত্ত পরিবারের নাটক। প্যাকেজ আকারে এই ধারাবাহিক নাটকটি নির্মান করেন মনির হোসেন জীবন। আনিস ও তিতলী- কঙ্কা চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক সমাদৃত হন জাহিদ হাসান ও শাওন- শীলা আহমেদ। এছাড়া বড়চাচার চরিত্রে আলী যাকের ও মত ‘র চরিত্রে ফারুক আহমেদ বেশ সুপরিচিতি পান। এই জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটকটিতে অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেন আবুল খায়ের, আবুল হায়াত, সুবর্ণা মুস্তফা, আসাদুজ্জামান নূরসহ আরো অনেকে।

  • সবুজ ছায়া (১৯৯৭)

মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনবোধ থেকে বেরিয়ে এসে তিনি বিটিভির জন্য নির্মান করেন গ্রামাঞ্চল ভিত্তিক স্বাস্থ্য সচেতনামূলক ধারাবাহিক নাটক সবুজ ছায়া। এই নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন আসাদুজ্জামান নূর, হুমায়ূন ফরিদী, শান্তা ইসলাম, জাহিদ হাসান, মাহফুজ আহমেদ, শাওন, নাজমা আনোয়ারসহ আরো অনেকে।

  • সবুজ সাথী (১৯৯৮)

প্রথমটির সাফল্যের পর উনি আবারো বিটিভির জন্য নির্মান করেন স্বাস্থ্যসচেতনামূলক ধারাবাহিক নাটক ‘সবুজ সাথী’। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা আফসানা মিমির ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা নাটক ছিল এটি। এছাড়া অভিনয় করেন আসাদুজ্জামান নূর, জাহিদ হাসান, মাহফুজ আহমেদ, নাজমা আনোয়ারসহ আরো অনেকে। তবে তুলনামূলক ভাবে এই ধারাবাহিক নাটকটির জনপ্রিয়তা কম।

  • উড়ে যায় বকপক্ষী (২০০৪)

হুমায়ূন আহমেদের জীবনদর্শন ভিত্তিক অন্যতম সেরা কাজ হল ধারাবাহিক নাটক ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’। প্রথমদিকে এত আলোচনায় না এলেও ধীরে ধীরে এই নাটকটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাওন, রিয়াজ, স্বাধীন খসরু, মাসুম আজিজ, চ্যালেঞ্জার, দিহান, এজাজুল ইসলাম, ড.ইনামুল হকসহ আরো অনেকে। তবে অভিনেতা ফারুক আহমেদের ক্যারিয়ারে এটি সেরা কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে।  এই নাটকটি প্রচার হয় এনটিভিতে।

  • জোছনার ফুল (২০০৪)

শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিতকরণ নিয়ে সচেতনতামূলক ধারাবাহিক নাটক ‘জোছনার ফুল’। বিটিভিতে প্রচারিত এই জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটকটি নির্মাণ করেন আবুল হায়াত। চিত্রতারকা রিয়াজের ক্যারিয়ারে এটি অন্যতম সেরা নাটক হিসেবে সমাদৃত। এছাড়া শ্রাবন্তীও খুব জনপ্রিয়তা পান এই নাটকে অভিনয়ের জন্য। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেন আবুল হায়াত, মনির খান শিমুল, শারমিন শীলা, ফজলুর রহমান বাবুসহ আরো অনেকে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।