বিয়ের দৃশ্যের চেয়ে দু’দিন মার খাওয়া ভাল: টম হ্যাঙ্কস

কোনো কাজ করা কঠিন নয়, সবাই পারে। কিন্তু কোনো ভাল কাজ করা কঠিন’ – কথাটা হলিউডের শক্তিমান অভিনেতা টম হ্যাঙ্কসের। আক্ষরিক অর্থেই তিনি হলিউডে গোটা ক্যারিয়ারে অসংখ্য ভাল কাজ করেছেন। কতটা কঠিন ছিল এই যাত্রা? – প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন দ্যটকস.কমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে।

  • মিস্টার হ্যাঙ্কস, ফিল্মে কোন ধরণের শুট আপনি সবচেয়ে অপছন্দ করেন?

সৃষ্টিকর্তার নামে শপথ করে বলতে পারি, সিনেমা করতে গিয়ে আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিকর বিষয় হবে যদি আপনাকে দু সপ্তাহ ধরে একটি বিয়ের দৃশ্যে অভিনয় করতে হয়। বিয়ের দৃশ্যে অভিনয় সত্যি একটা দু:স্বপ্ন। আপনাকে প্রতিদিনই বিয়ের পোষাক পরতে হবে, সেটা দেখতে খুব আকর্ষণীয় হতে হবে এবং তারা সর্বক্ষণ আপনার চুল আচড়াতে থাকবে! এই দীর্ঘ সময়ে আপনাকে একটানা মিথ্যে অভিনয় করে যেতে হবে। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য ভূয়া দম্পতি হওয়াটা আমার কাছে বরং দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার মত মনে হয়, এ এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। বিয়ের দৃশ্যের চেয়ে দু’দিন মার খাওয়া ভাল!

  • ‘কাস্ট অ্যাওয়ে’ ‘অ্যাপোলো ১৩’ ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ ‘ক্যাপ্টেন ফিলিপস’— সিনেমাগুলো সব কি এই ক্যাটাগরিতেই পড়ে?

এই সিনেমাগুলোতে কমন যে বিষয়টা রয়েছে তা হলো, সবগুলো সিনেমাই নন-ফিকশন বা বাস্তবধর্মী। কিন্তু এগুলোতে মূল গল্পটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ এর মধ্যে আচরিত বিষয়গুলো। নির্মাণ শুরু করার পূর্বে প্রত্যেকটি মুভিই আমাকে একারণে মুগ্ধ করেছে যে, এর মধ্যে মানুষের বাহ্যিক আচরণের এমন কিছু দিকের সন্নিবেশ ঘটেছে যার মুখোমুখী আপনাকে হতে হবে।  আর এমন পরিস্থিতিতে আপনার ভূমিকা বা করণীয় কী হবে, প্রতিটা মুভিই সে সম্পর্কিত। আপনি যদি সেটা যথার্থরূপে করতে পারেন, তবে আপনিও একটি চমৎকার মুভি তৈরি করতে পারবেন। মুভিগুলো আমি করেছি যাতে এমন কিছু আমি দেখতে পারি যা আগে কখনো দেখি নি এবং দেখে অবাক হয়ে বলতে পারি— ‘ও আচ্ছা, আগে আমি এটা জানতাম না!’ —হ্যাঁ, আমি এটাই চেয়েছি।

  • এরকম পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিলেন?

আমার বিশ্বাস, সঠিক পন্থায় চিন্তা করলে মানুষ সবকিছুই পারে।

  • আপনি সবসময় ভালো ও চমৎকার  চরিত্রে অভিনয় করেন। ভিলেনের চরিত্রে  কখনো অভিনয় করেন না, এটা কেন?

নেতিবাচক চরিত্রের লজিকের সঙ্গে একমত হতে আমার সমস্যা হয়। আমি বাহ্যত মন্দ চরিত্রে অভিনয় করতে চাই না। সাধারণত একটি মানসম্মত মুভির ফরম্যাট এরকম যে— আপনার একজন অসম্ভব ভালো প্রধান অভিনেতা থাকতে হবে, এবং তার বিপরীতে একজন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী থাকতে হবে। তাদের মধ্যে লড়াই হবে, এবং লড়াইয়ে সবসময় নায়কই জিতবে। কিন্তু আমি আসলে এরকম মুভিতে আগ্রহী নই। আমি কেবল ছবির মোটিভেশন বা প্রণোদনাটাকে হৃদয়ঙ্গম করতে চাই, এবং এর যাবতীয় দিক উপলব্ধি করতে চাই। ‘ক্লাউড অ্যাটলাস’ সিনেমাতে আমার সে সুযোগটা এসেছিলো।

  • কখনো মনে হয়েছে যে, কাজের রুটিনে আপনি আটকে পড়েছেন?

হ্যাঁ, অনেক সময়ই এমন মনে হয়েছে যে, কাজ আমার জন্য অভিশাপ বয়ে এনেছে। কখনো কখনো এটা জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা রূপে এসেছে। আমি ভয়াবহ অন্তর্জ্বালায় দগ্ধ হয়েছি, কিন্তু কারো সাপোর্ট, আনুকূল্য বা কোনো অবলম্বন খুঁজে পাইনি। কিন্তু ফিল্মে আসলে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক কিছুই ঘটে। একটা সময় পর্যন্ত আপনাকে কেবল কাজ করে যেতে হবে, অথচ আপনি জানবেন না এটা ভালো কি মন্দ কিংবা ক্যামেরা আপনাকে নাটকীয় কোন সাফল্য এনে দেবে কিনা। তবে এডিটররা আপনাকে যথার্থ স্থানেই কাজে লাগাবে এবং ডিরেক্টররা বুঝবে যে, কোথায় কোন ধরণের গল্পের প্রয়োজন হবে। কিন্তু সিনেমা নির্মাণ প্রকৃত অর্থেই এক দীর্ঘ ম্যারাথনের নাম, এবং এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এতে আমার শারীরিক ও মানসিকভাবে যথেষ্ট ক্লান্তি ও অবসাদবোধ হয়।

  • সম্প্রতি প্রথমবারের মত আপনি ব্রডওয়েতে অভিনয়ে যোগ দিয়েছেন। আমার তো মনে হয় সপ্তাহে আটবার সম্পূর্ণ অভিনয় করাটা একটি ফিল্মশুটের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন!

জীবনের সঙ্গে আপনাকে এটা মানিয়ে নিতে হবে। এটা ছয়মাসের একটি অঙ্গীকার এবং দায়িত্ব, যা এড়ানো যায় না। সপ্তাহে আটবার আপনাকে পুরো দিন জুড়ে একাগ্রতার একটা ধীর তাল ও লয় বজায় রাখতে হবে। আমার আসলে এই বিষয়টা খুবই ভালো লেগেছে। আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম কেবল এ নিয়ে যে, আমি কাজটা ঠিকমত করতে পারছি কিনা। ছবি তৈরি করতে গিয়ে আপনাকে কুঁড়েমিতে পেয়ে বসবে, তখন আপনাকে প্রত্যাশিত কাজটাই করতে হবে। যেমন ধরুণ, একটি ভবনে অবিশ্বাস্য কোন পন্থায় ঢুকে পড়ার অথবা কোন মেয়েকে চুমু খাওয়ার দৃশ্য করা, যা প্রকৃত মনে হয়! সুতরাং চ্যালেঞ্জটা খুব কঠিন ছিলো এটা ঠিক, কিন্তু এর ফলটাও ছিলো ভাবনার চেয়েও অবিশ্বাস্য ইতিবাচক। এটাই আসলে উপভোগ্য জীবন, আমি এরকমটা আবারও করতে চাই।

  • শেষ কবে কাজ করতে গিয়ে ক্লান্তি অনুভব করেছেন?

আমার পরিচালিত সর্বশেষ ছবিতে আমাকে একাই তিনটি কাজ করতে হয়েছে। আমি এটা লিখেছি, তাতে অভিনয় করেছি, এবং পরিচালনা করেছি। আমার উচিত ছিলো এগুলোর একটিকে ছেড়ে দেয়া। কারণ, সত্যি আমি কাজের মধ্যে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম। পরিচালনাটা আমার সহজাত নয়, বরং অন্যদেরকে দেখে কিছু শিখে নিয়েছিলাম। ফলে পরিচালনার সবকিছু আমাকে শিখে শিখে করতে হচ্ছিলো। আসলে একটা ছবির পুরোটাতে পরিচালককে একটা মূর্ছনা সঞ্চারিত করতে হয়। আমি এটা আবারও করতে চাই। কিন্তু জীবনে সে সময়টা তো থাকতে হবে। একটা ছবি পরিচালনার মানে হলো প্রায় ১৮ মাসের একটা কমিটমেন্টে যাওয়া, যে সময়টাতে অন্য কোন কাজ করা মোটেই সম্ভব নয়।

  • সে ক্লান্তি কি আপনার অভিনয়ে কোন প্রভাব ফেলেছিলো?

একজন অভিনেতা হিসেবে তো আমি কখনো ক্লান্তি অনুভব করিনি। কারণ, ছবি হলো ধৈর্যধারণের নাম। সুতরাং ক্যামেরার সামনে থাকা ও অন্যদের সঙ্গে করা অভিনয়ের প্রতিটা মুহূর্তকে আমি ভালোবাসি। লেখাটাও উপভোগ্য, কিন্তু পরিচালনার জায়গাটাতে নিজেকে সবসময়ই অপ্রস্তুত অনুভব করেছি। এ কাজে সবসময় চাপ অনুভূত হয়েছে, এবং মনে হয়েছে— যতবেশি এ কাজে থাকবো ততটাই ক্লান্ত হয়ে পড়বো। তবে এটা অমূলক চিন্তা যে, ছবির পরিচালকদের চারপাশে এক্টররা সর্বক্ষণ ঘুরে বেড়ায়। তারা এটাকে বরং সহজভাবে নেয় এবং মনে হয় যে তারা ছুটিতে আছে। আমার হাঁটু যদি ঠিক থাকে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস যদি নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে পরিচালনার কাজ আবারও করার ইচ্ছা আছে।

  • ডায়াবেটিসের জন্য কি স্বাস্থ্যের প্রতি বাড়তি মনোযোগ দিতে হচ্ছে?

হ্যাঁ, ৩৮ বছর বয়সেই নিজের প্রতি মনোযোগী হওয়া দরকার ছিলো। তাহলে আজকের এই দুর্দশায় পড়তে হতো না। আপনি কি জানেন, আপনার ব্লাডসুগার কত?

  • না, আমি জানি না তো…

আপনার উচিৎ চেক করে নেয়া। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় এটা যে, আপনি জানেন না আপনার ডায়াবেটিস আছে কিনা, আর থাকলে চিকিৎসার প্রয়োজন আছে কিনা। ডায়াবেটিসের একমাত্র চিকিৎসা হলো স্বাস্থ্যের প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল হওয়া, খাবারে নিয়ম মেনে চলা, এবং চলাফেরায় প্রয়োজনীয় কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসা। কখনো মনে করবেন না আমি জীবিকার জন্য বা আমার নাতি-নাতনিদেরকে ভবিষ্যতে দেখানোর জন্য সিনেমা করি। আমার বরং নিজের প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। বিশেষত, যেহেতু ন্যাশনাল টেলিভিশনে আমি আমার স্টোরি প্রকাশ করেছি এবং আমি সারাবিশ্বে এটা করবো!

  • এটা কি আপনাকে একজন কর্মঠ মানুষে পরিণত করছে?

আমি প্র্যাকটিস করছি, যেটা কর্মঠ হওয়া নয়। ডায়াবেটিস বিষয়ে তথ্যের সমুদ্র রয়েছে। অথচ আমি এ বিষয়ে বিশেষ কিছু জানি না। আর এটা সত্যি যে আমেরিকায় এই রোগ মহামারির রূপ ধারণ করেছে আমাদের লাইফস্টাইল ও খাদ্যাভ্যাসের কারণে। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষেরর সংখ্যা বর্তমানে অনেক বেশি। আক্ষরিক অর্থেই আমার মনে একটা আনন্দ দোলা দিয়ে যায় যে, আমি ১৯৮৫ সালে জ্যাকি গ্লিসনের সঙ্গে ‘নাথিং ইন কমন’ নামে একটি সিনেমা করেছিলাম, যাতে ডায়াবেটিসের ভয়াবহতা সম্পর্কে ইভা মারি সেন্টের সঙ্গে আমার একটা সংলাপ আছে। আমার পিতার চরিত্রে অভিনয় করা ব্যক্তি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলো বলে সংলাপে তুলে ধরা হয়েছে।

  • কিন্তু আপনাকে বেশ সুস্থ মনে হয়। আপনার কি মনে হয় অভিনয়ে আপনার শিল্প-নৈপুণ্যের সবটুকু দিতে পেরেছেন?

ধন্যবাদ আপনাকে। আমি আমার ডায়াবেটিসের সঙ্গে সর্বোচ্চ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। আমি কাপড় পরিধানে সৌখিনতা ধরে রাখছি, কিন্তু প্রতিনিয়ত বয়স তো বাড়ছে! আর কেবল এটাই নয় যে আমি বুড়ো হওয়ার ফলে সংলাপ ঠিকমত করতে পারছি না, বরং শ্রোতাদেরও এটা জানা আছে যে, আমি কত বছর ধরে অভিনয়জগতে আছি। সুতরাং যুবকের মিথ্যা চরিত্রে অভিনয় করে আমি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলতে পারি না। যদি বয়স ৪৪ বা তার কিছু বেশি হতো, সেটা ছিলো ভিন্নকথা। আমি মনে করি, আমি এখনো সবকিছু হ্যান্ডেল করতে পারবো। কিন্তু এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে সময় এসে যাবে আর আমিও চলে যাবো। আর চলে যাওয়াটাকে আমি স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করবো।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।