গোল হোক আর না হোক, আজ বিশ্বকাপ

বাঙালি সত্যিকারের প্রেম হল ফুটবল। সেই প্রেমকে সে পরিনতি দিতে পারেনি। বিয়ে হয়েছে ক্রিকেটের সাথে। কিন্তু, প্রথম প্রেমকে কি আর ভোলা যায়। তাই, বিশ্বকাপ ফুটবল আসলেই বাঙালি ফিরে পায় তাঁর পুরনো ভালবাসাকে, পুরনো আবেগকে।

সমর্থন কাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি – এগুলা বিশ্বকাপ আসলে সমর্থকরাই বুঝিয়ে দেন সমর্থকরা। এখন ক্লাব ফুটবলের ওইসব গুরুগম্ভির আলোচনা আর বিশ্লেষণের সময় নাই, এটাক আর কাউন্টার অ্যাটাকে খেলা হবে।  টিকিটাকা এখানে চলবেনা। দল যতই হ্যাংলা পাতলা হোক – ফাটিয়ে দিব।

কিন্তু দুঃখের বিষয় বিশ্বকাপ জিতে একদল,  কোনদিন নক আউট স্টেজ থেকে বিদায় নেয় নিজের দল। পরদিন সকালে বাসা থেকে বের হতে লজ্জা অনুভব হয়,  যদি প্রতিপক্ষের কেউ দেখে ফেলে তাহলে কথা বলার মুখ থাকবেনা। এরপর আবার চার বছরের অপেক্ষা।

চাচা মামা দের সাথে তো ক্লাব ফুটবল নিয়ে কথা বলে মজা পাওয়া যায়না। প্রতিবছর একই জিনিস দেখতে দেখতে  তর্ক করারও তেমন কিছু থাকেনা। এদিকে দুই বিশ্বকাপের ব্যবধানে একটা দলের অনেক কিছুই  পাল্টে যায়। কিন্তু বিশ্বকাপ সময়ে খেলা দেখা দর্শকরা এত কিছু জানেনা। এই এক মাসে যার খেলা ভাল লাগবে তাকে নিয়েই গলা ফাটানো হবে পরের চার বছর।

কিন্তু, দেখা গেল পরের বিশ্বকাপে ওই খেলোয়াড়ের কোনো খবরই নাই। ফুটবল বিষয়ে নিজের জ্ঞানের স্বল্পতাটা মাথাতেই থাকেনা। আমি যে দল সমর্থন করি খেলা শুধু সে দলের সমর্থকরাই বুঝে। সুন্দর খেলা শুধু সেই দলই খেলে। বাকিরা কুস্তি খেলতে আসে।

চায়ের কাপে সত্যিকার ঝড় যেটাকে বলে সেটা দেখা যায় ফুটবল বিশ্বকাপের সময়।  টং দোকান বলেন আর বড় নামীদামী রেস্তোরাঁ বলেন – বিশ্বকাপ জ্বরে আক্রান্ত সবাই। দেশ বলেন আর বিদেশ – কোন পার্থক্য নাই। এসময় অফিসের বসও একটু ছাড় দেন অধিনস্তকে। ক্লাসের শিক্ষকরাও পড়ানোর ফাঁকে একটু সময় বরাদ্দ রাখেন গতকালকের ম্যাচ নিয়ে আলোচনার জন্য। বাসায় খেলার জন্য পড়ার বিরতি দেয়া হয়। আসলে চার বছর বলে কথা।

কেউ বিশ্বকাপ আসলে ম্যারাডোনাকে খোঁজে বেড়ায়, কেউ রোনালদোকে, জিদানকে, বাতিস্তুতাকে, ম্যাথিউজকে, রোমারিওকে, বাজ্জিওকে, ক্লিন্সম্যানকে । বিশ্বকাপ মানে স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে পুরনো দিনের কথাগুলো রোমন্থন করা। শৈশবে দেখা বিশ্বকাপের আক্ষেপটা যেন এবার পূরণ হয়।

বিশ্বকাপের স্মৃতিগুলো আসলেই অনেক রঙিন। ঠিক যেমন বিশ্বকাপের জার্সিগুলোর মতো।  খেলোয়াড়দের নানান রঙয়ের পোশাকে দেখে আলাদা আকর্ষণ তৈরি হয়। শুধু ফুটবল বিশ্বকাপ দেখেই জানা হয়ে যায় অনেক দেশের নাম, পরিচয় – তাদের পতাকার নকশা। সত্যিকারের বিশ্বকাপ এটাই। সারা বিশ্বের মানুষ যেখানে যুক্ত এই সমারোহে। পত্রিকার বিশেষ ফিচারগুলোর প্রতি থাকে বাড়তি আকর্ষণ।

কখন আসবে রঙিন বিশ্বকাপ সূচীর পোস্টার।  সকাল থেকে অপেক্ষা ম্যাচের জন্য। ঘড়ির কাটা টিকটিক বাজতে থাকে,  যেননা প্রতিটা মুহূর্ত অসীমের সমান। একটা ভিনদেশী দলের প্রতি এতটা আবেগ ঠিক কিভাবে আসে আসলেই গবেষণার বিষয়। বিশ্বকাপেই হয়ত প্রমাণ করে সীমান্তের কাঁটাতারে একটা জমিকে অনেক ভাগে ভাগ করে গেলেও দিনশেষে আমরা সবাই একই গ্রহের মানুষ।

আজ শুভ বিশ্বকাপ। গোল হোক আর না হোক, আজ বিশ্বকাপ। স্বাগতম আরেকটি মহাযজ্ঞে।  স্বাগতম ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এ। ফুটবল কেন গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ?

৩২টা দলকে নিয়ে এই আয়োজন পৃথিবী নামের গ্রহের সেরা আয়োজন কেন হবে! কারণ, এটা কেবল ৩২ দলের এক টুর্নামেন্ট নয়। এটা ২১১টি দেশের এক টুর্নামেন্ট।

হ্যাঁ, এটাই সত্যি। ফিফার সদস্য সংখ্যা    জাতিসংঘের চেয়েও অনেক বেশি। জাতিসংঘের এখন সদস্য ১৯৩টি দেশ। সেখানে ফিফার সদস্য ২১১টি দল। আর এই ২১১টি দল নিয়েই কয়েক বছর আগে শুরু হয় প্রকৃত বিশ্বকাপ। বাছাইপর্ব নামে খেলা চলতে থাকে। আর যে বিশ্বকাপ আজ থেকে রাশিয়ায় হবে, ফিফার ভাষায় সেটা ‘ফাইনালস’। মানে, বিশ্বকাপ কেবলই এই একমাসের একটা আয়োজন নয়। এটা কয়েক বছর ধরে চলতে থাকা এক উৎসব। এই উৎসবের ভাগীদার আমাদের দেশও, এই উৎসবের ভাগীদার আমি-আপনি সকলে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।