আজকের তালি যেন আগামীর গালি না হয়

ভারতকে প্রথম হারানো জয়টিকে তুলনা করেছিলাম ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানো জয়ের সঙ্গে। এবার কি করি? আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফাইনাল তো আগে জিতিনি! এই জয় অতুলনীয়। আমার মতে, আমাদের ক্রিকেটের সেরা সাফল্য।

সবকিছুর আগে অবশ্য, আরেকদফা কনফেস করার পালা। এবার ভারতকে প্রথমবার হারানোর পর লিখেছিলাম, আমার সুদূরতম কল্পনাতেও ছিল না এই জয়। এখন আবারও স্বীকার করছি, বাংলাদেশ এক টুর্নামেন্টে দুইবার ভারতকে হারাবে, গত ম্যাচের পরও এটা ভাবতে পারিনি। মনের কোনে আশা ছিল, বিশ্বাস ছিল না…

র‌্যাংকিং বলছে, ভারত চারে আর আমরা নয়ে। সত্যিকার ব্যবধান আরও বেশি। ফিজিক্যাল-মেন্টাল অ্যাবিলিটি, স্কিল, অভিজ্ঞতা, বড় ম্যাচের চাপ, এসব বাস্তবতায় বাংলাদেশের পাত্তাই পাওয়ার কথা নয় ভারতের কাছে। ফাইনালের আগে বাংলাদেশ ৪০ টি টি-টোয়েন্টি খেলেছে। ভারত অধিনায়ক হারমানপ্রিত একাই খেলেছেন ৮০ টি। বিশ্ব ক্রিকেটে সময়ের সবচেয়ে পাওয়ারফুল ও আগ্রাসী ব্যাটারদের একজন তিনি। গত বছর বিশ্বকাপের সেমিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০ চার ও ৭ ছক্কায় ১১৫ বলে ১৭১ রানের যে ইনিংস খেলেছিলেন, মেয়েদের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইনিংস মনে করা হয় সেটিকে।

মিতালি রাজ, এশিয়ার সফলতম ব্যাটার। ঝুলন গোস্বামি, এশিয়ার সফলতম বোলার। মেয়েদের ক্রিকেটের বড় বড় সব তারকা। একবার হয়ত জিতে যাওয়া যায়, তাই বলে পাঁচদিনের মধ্যে দুইবার! অভাবনীয় এই জয়।

নাহিদার বাঁহাতি স্পিন দিয়ে শুরুর স্ট্র্যাটেজির কথা বলেছিলাম আগের লেখায়। কৌশলে এই বদলটায় হয়ত চমকে গিয়েছিল ভারত। সেই চমক তাদের রূপ নিয়েছে চাপে। পাওয়ার প্লেতে নাহিদার ৩ ওভারে এসেছে ৬ রান। শুরুতে রান ওঠেনি। সেটিই শেষ পর্যন্ত কাল হয়েছে তাদের।

রান তাড়ায় সবচেয়ে জরুরী ছিল শুরুটা ভালো হওয়া। আয়েশা আর শামিমার সৌজন্যে সেটি হয়েছে। ভারতের বিপক্ষে আগের ম্যাচটায় শেষ ৬ ওভারে দরকার ছিল ৫৪। আজকে ৬ ওভারে ৪৭। আগে এসব ম্যাচ আমরা সহজেই হেরে যেতাম। এবার দুটিই জিতলাম। ঝুলন গোস্বামির ওভারে নিগার সুলতানার বাউন্ডারি তিনটি দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর শেষ ওভারে রুমানার চার। ইনসাইড আউট! আহ, মন আর চোখ জুড়িয়ে দিয়েছে।

ভেবেছিলাম, রুমানাই ম্যাচ শেষ করে আসবেন। সেটি হয়নি। তবে ভারতকে শেষ করেছেন আসলে রুমানাই। দুটি জয়েই তিনি প্লেয়ার অব দা ম্যাচ। কদিন আগে লিখেছিলাম, আবারও লিখছি। গত কয়েক বছরে মেয়েদের ক্রিকেটে সবচেয়ে উন্নতি করা ক্রিকেটার রুমানা। ক্রিকেট নিয়ে তার ভাবনা, অ্যাপ্রোচ, সাধনা, চেষ্টা, সবকিছুই মুগ্ধতা জাগানিয়া। আমার বিশ্বাস, সাকিব যেমন ছেলেদের ক্রিকেটে, তেমনি মেয়েদের ক্রিকেটে বিশ্বমঞ্চে আমাদের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হবেন রুমানা। হয়ত হবেন মেয়েদের ক্রিকেটের পালা বদলের নায়িকা। কিংবা, হয়ত হয়ত হয়েই গেছেন!

এই টুর্নামেন্টের আগে মেয়েদের ক্রিকেটে ভারতীয় কোচ এনেছে বিসিবি। সাবেক কিপার-ব্যাটসম্যান আঞ্জু জৈন। মিতালি-ঝুলনদের সঙ্গে খেলেছেন। ভারতীয় দল সম্পর্কে তার নলেজ নিশ্চয়ই দলকে সাহায্য করেছে। সহকারী কোচ দেবিকা পালশিকারও ভারতীয়। তবে আজকের সাফল্যে একজন ইংলিশকেও মনে রাখতে হবে। অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও প্রায় দেড় বছর মেয়েদের মেন্টাল ও টেকনিক্যাল স্কিল নিয়ে কাজ করেছেন ডেভিড ক্যাপেল। ক্রিকেটাররাও হয়ত তার অবদানের কথা বলবেন।

নাজমুল আবেদীন ফাহিম ভাইয়ের কথা না বললেই নয়। উনার ক্রিকেট জ্ঞান নিয়ে বলার যোগ্যতা আমার নেই। এটা বলতে পারি, উনি সম্পৃক্ত হওয়ার পর মেয়েদের ক্রিকেট নতুন গতি পেয়েছে। ক্রিকেটের প্রতি তার ভালোবাসা নিখাদ। যে দায়িত্ব পান, করেন হৃদয় দিয়ে। জ্ঞান আর মন, একসঙ্গে হলে ভালো কিছু আসবেই।

কোচিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ধন্যবাদ প্রাপ্য অবশ্য স্থানীয় কোচদের। তারা ক্রিকেটার খুঁজে বের করেছেন। বাড়ী বাড়ী গিয়ে বাবা-মাকে রাজী করিয়েছেন। লোকের কটু কথা কানে তোলেননি। ক্রিকেটারদের মৌলিকত্বের পাঠ থেকে শুরু করে সবকিছু হাতে-কলমে শিখিয়েছেন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। বিশেষ করে খুলনা ও বগুড়ায় মেয়দের ক্রিকেটের একটি কালচার গড়ে তুলতে পেরেছেন স্থানীয় কোচরা। আজকের সাফল্যের ভিত তাদেরই হাতে গড়া। তাদেরকে স্যালুট!

যে বাবা-মায়েরা মেয়েদের ক্রিকেটে দিয়েছেন, যারা শুরুতে রাজী না হয়েও পরে হয়েছেন, প্রতিবেশীর কথার বান, সামাজিকতার চোখ রাঙানি সয়ে মেয়েদের নিয়ে লড়াই করেছেন, আজ তারাও জিতেছেন। খাদিজা তুল কুবরার বাবা, তাকে নিয়মিত ঢাকা নিয়ে আসতেন, নিয়ে যেতেন। অনেকেরই অনেক আত্মত্যাগের গল্প আছে। আজ তারা তৃপ্তি পাবেন। বাবা-মাকে এই উপহারটুকু দিতে পারাও এই মেয়েদের বড় অর্জন।

মেয়েদের বেতন, টাকা, বোনাস, ম্যাচ ফি, পুরস্কার… চারপাশে এই নিয়ে তোলপাড়। কয়েকদিন আগের লেখায় দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছিলাম। আজকে টাকা-পয়সা নিয়ে এত বেশি তোলপাড়ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ। ঝকমারি কিছুর প্রতি আমাদের আগ্রহ বেশি। এই কারণে বলছি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবীটি নিউজফিডের একজনের লেখায়ও দেখলাম না। ম্যাচ! আরও বেশি ম্যাচ! আরও বেশি ট্রেনিং ও ক্যাম্প!

ফেসবুক আর কাজের জায়গা মিলিয়ে কয়েকবার লিখলাম। আবারও লিখছি। গত মাসের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের আগে ১৪ মাস ওয়ানডে খেলেনি মেয়েরা। টি-টোয়েন্টি খেলেনি আগের প্রায় দেড় বছর। ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে সময় কাটাবে? এই মৌসুমে ঢাকা লিগ হয়নি। হবেও না। কারণ, মাঠের অভাব। মেয়েদের ক্রিকেটের বেলায় বিসিবির মাঠের অভাব বরাবরই তীব্র। এটাই তাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ।

ঘরোয়া ক্রিকেট নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নেই। দীর্ঘ মেয়াদি ট্রেনিং-ক্যাম্প নেই। সূচি নেই। পরিকল্পনা নেই। মেয়েদের ক্রিকেটে টাকার চেয়েও বড় সমস্যা এসব। এই জায়গাগুলোয় উন্নতি হলে ভালো ফল নিয়মিত আসবে। তখন টাকাও বাড়বে। সবচেয়ে বড় কথা, নতুন নতুন ক্রিকেটার উঠে আসবে। নতুন ক্রিকেটার উঠে আসার হার আশঙ্কাজনক কম।

আমি নিশ্চিত, বিসিবি কর্তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলবে, ‘আমরা অনেক কিছু করছি। বিদেশি-কোচ ট্রেনার এনেছি। হাবিজাবি…’, আসলে এসব একদমই মৌলিক দায়িত্ব, প্রয়োজন আরও অনেক কিছু করা, সেসব বলবেন না!

টাকাও গুরুত্বপূর্ণ । ৬০০ টাকা নিয়ে অনেকের দেখলাম বিভ্রান্তি আছে। অনেকে ঘরোয়া-আন্তর্জাতিক গুলিয়ে ফেলছেন। ৬০০ টাকা ম্যাচ ফি ছিল জাতীয় লিগে। অনেক তোলপাড় হয়েছিল নিউজ হওয়ার পর। লাভ তাতে খুব বেশি হয়নি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ওয়ানডের জন্য ম্যাচ ফি ৮ হাজার টাকা। টি-টোয়েন্টিরটা জানি না, কাছাকাছি হবে। কেন্দ্রীয় চুক্তি আছে। ‘এ’ প্লাস গ্রেডের মাসে বেতন ৩০ হাজার, ‘এ’ গ্রেড ২০ হাজার, ‘বি’ গ্রেড ১০ হাজার!

৬০০ টাকার কথা আলোচনাটা বেশি করেছিলাম মেয়েদের ক্রিকেটের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিটা বোঝাতে। নইলে ম্যাচ ফি বা কেন্দ্রীয় চুক্তির অঙ্কটাও খুব ভদ্রস্থ নয়। তবে আমি নিশ্চিত, আজ মেয়েরা চ্যাম্পিয়ন না হলে, নরম্যালি অন্য সময় শুনলে, অনেকেই বলতেন, ‘মেয়েদের ক্রিকেটে ৩০ হাজার টাকা খারাপ কি?’ এটিই বাস্তবতা। বিসিবিও এভাবেই ভাবে!

সাফল্য এসেছে, এখন হয়ত কিছু স্পন্সরও আসবে মেয়েদের ক্রিকেটে। বিসিবি টাকা-পয়সা বাড়াবে। অথচ এসবের আগেই বিসিবি বিশ্বের অন্যতম ধনী বোর্ড, আইসিসি থেকে পাওয়া অনুদানও অনেক বেড়েছে, ৬০০ কোটি টাকার এফডিআর আছে বলে বিসিবি কর্তারা বুক ফুলিয়ে বলে, কোনো সফরে ক্রিকেট দলের সঙ্গে বোর্ড ডিরেক্টররা যান হাজার হাজার ডলার-পাউন্ড খরচ করে। কিন্তু মেয়েদের ক্রিকেটেই সামান্য কিছু টাকা বাড়াতে গেলে তারা বলতেন টাকা নেই, টাকা নেই।

জাতীয় লিগে ম্যাচ ফি বাড়ানো উচিত। সব পর্যায়েই পারিশ্রমিক বাড়ানো উচিত। তাতে ক্রিকেটারদের পেশাদারীত্ব বাড়বে। আরও অনেক মেয়েরা উৎসাহী হবে ক্রিকেটে আসতে। বাবা-মায়েরা ভরসা পাবেন।

নিউজফিড জুড়ে আনন্দের জোয়ার দেখে ভালো লাগছে। তবে এটাও জানি, আজকের তালি ভবিষ্যতের গালি। এই মাসের শেষে মেয়েরা আয়ারল্যান্ডে যাবে। তার পর সেখান থেকেই নেদারল্যান্ডসে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব। হয়ত আইরিশদের সঙ্গে জেতা উচিত। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাইপর্বও উতরানো উচিত। কিন্তু দুই জায়গাতেই কন্ডিশন খুব চ্যালেঞ্জিং। হারাটাও অসম্ভব নয়। হারলে কন্ডিশনের কথা কারও মাথায় থাকবে না।

অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড-নিউ জিল্যান্ডের সঙ্গে খেলা হবে কখনো, যারা ফিজিক্যাল স্ট্রেংথ, মেন্টালিটি, স্কিলে যোজন যোজন এগিয়ে। আমরা হারব। আজ যারা লাফাচ্ছেন, তাদের অনেকেই তখন বলবেন, ‘একটা জিতেই বেশি সুখ হয়ে গেছিল’, বা ‘জিতে গায়ে চর্বি জমে গেছিল’, কিংবা আরও কুৎসিত সব কথার স্রোত ছুটবে। ঠিক জানি। আজকেই যেমন মেয়েদের সাফল্যের সঙ্গে ছেলেদের টেনে এনে তুমুল গালির বহর ছুটছে!

যাহোক, ভারতকে প্রথম হারানোর পর লিখেছিলাম, শুধু অভিনন্দনই যথেষ্ট নয়। আজকে আরেকটু যোগ করছি। কারণ, জানি এখন কিছু প্রাপ্তি যোগ হবে। কালকে বিসিবির ইফতার আয়োজন, মেয়েরা দেশে ফেরার পর ওদের বরণ করে নেওয়া হবে সেখানেই। হয়ত পুরস্কারের চটকদারি ঘোষণা আসবে। আসুক, সমস্যা নেই। কৃতিত্ব ভাগাভাগি করে নিতে কাড়াকাড়ি পড়বে। পড়ুক, সমস্যা নেই।

কিন্তু তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির বদল। প্রাপ্য সম্মান আর গুরুত্ব। সেই বদল কি আসবে? শুধু অভিনন্দন আর পুরস্কারই যথেষ্ট নয়, সম্মানও প্রাপ্য, টাকায় সম্মান, ভাবনায় সম্মান, দৃষ্টিভঙ্গিতে সম্মান।

– ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।