ঠাগস অব হিন্দুস্তান: ইতিহাস নয়, তামাশা!

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামল আরব্য রজনীর গল্প না যে এটা দিয়ে রূপকথা বানিয়ে ফেলা যাবে! অন্তত আমাদের উপমহাদেশের মানুষের জন্য তো এই ইতিহাস গুলো খুবই আবেগ ও স্পর্শকাতর জায়গা। এই ঘটনাগুলো আমরা ছোটবেলা থেকে পড়ে আসছি গল্পে বা সত্য ইতিহাসে!

চাইলেই আবেগটাকে ব্যবহার করে ৩০০ কোটির বাজেট দিয়ে ভারতবর্ষের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ আমল সংক্রান্ত মুভি বানাতে পারতো যশরাজ ফিল্মস। তা না করে তাঁরা বানিয়ে ফেলেছে প্রিন্স অফ পার্সিয়া, অ্যসাসিন্স ক্রিড, পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান, এবং কিছুটা ভারতীয় ৭০-৮০ দশকের পিরিওডিক্যাল এপিক রাজা-রানী-রাজ্য ফর্মুলা ইউজ করে একটা অখাদ্য জগাখিচুড়ি।

আমির খান লোকটাকে আসলে টিপিক্যাল হিন্দি সিনেমার মাসালা রোলে কখনোই ভালো লাগেনাই আমার। লগনের ভুবন, রাঙ দে বাসান্তীর ডিজে, মঙ্গল পান্ডে, থ্রি ইডিয়টসের র‍্যাঞ্চো বা পিকের এলিয়েন -আমির মানেই নতুন কিছু, ভিন্ন কিছু, ‘মেসেজিং’ কিছু!

কিন্তু এই সিনেমায় এতোই জেনেরিক একটা ক্যারেক্টার প্লে করেছেন আমির যে আসলে খুব বেশিক্ষণ তাঁকে সহ্যই করতে পারা কষ্ট হচ্ছিল। একজন ঠগীর স্বভাবসুলভ লোক ঠকানো, ব্যাকস্ট্যাবিং নেচার ছাড়া এই ক্যারেক্টারে পজিটিভ কিছুই ছিল না।

কিন্তু সেটাকেও এতো বেশি ‘বলিউডি’ করে দেখানো হয়েছে যে বিরক্ত লেগেছে ভাঁড়ের মত কৌতুক করা, অহেতুক ফালতু ডায়লগস কিছু কিছু জায়গায় বাজে অভিনয়। শাহরুখ খানকে নিয়ে ইদানিং বলা হয় যে ‘কি ভেবে এই মুভি সাইন করলেন?’ ‘ঠাগস অব হিন্দুস্তান’ দেখে আমিরকেও একই প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করছে।

আমিরের বিরক্তিকর ক্যারেক্টারটাকে বেশি স্পেস দিতে অমিতাভের মত শক্তিমান অভিনেতার স্ক্রিননটাইম আড়াল করতে করতে কে ধীরে ধীরে একেবারেই সাইডলাইনে ফেলে দেওয়াটা একজন সিনেমাপ্রেমী হিসেবে সহজভাবে নিতে পারছি না। পুতুলের মত পাশে দাঁড়ায় থাকা ছাড়া ক্লাইম্যাক্স জুড়ে অমিতাভ কিছুই করেননি! ইভেন একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রধান চরিত্র হিসেবে অমিতাভের ডায়লগ ও মুভিজুড়ে খুবই কম আর অনুল্লেখযোগ্য ছিল।

ক্যাটরিনা কাইফ কি ধীরে ধীরে আরেকজন দেহসর্বস্ব অভিনেত্রীতে পরিণত হচ্ছেন, নাকি তিনি তাই ছিলেন? আড়াই ঘন্টার তিনটা মাত্র তিনটা অভিনয়ের সিকোয়েন্স – দুটো নাচ আর সেসব জুড়েই শুধু ছিল শুধু সুনিপুনভাবে নিজের কোমরের ঝটকা, তেল চিপচিপে দেহের বাঁক আর কামাতুর চোখ দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা!

সিনেমার মূল ঘটনাপ্রবাহের সাথে এসবরে কোনো সংযোগই নেই! সিরিয়াসলি বলছি, এই মুভিতে আসলে ক্যাটরিনার জায়গায় সানি লিওন, পুনম পান্ডে বা নোরা ফাতেহির মত কাউকে নিলে পরিচালকের বাজেট আরো কমতো।

একমাত্র ইতিবাচক দিক হচ্ছে ‘দঙ্গল কন্যা’ ফাতিমা সানা শেখ এর অভিনয়! আমির-অমিতাভের মত দু’জন ফাদার ফিগারের সাথে যেভাবে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে গেলেন, যেভাবে পুরো সময়টা ক্যারেক্টারে ঢুকে থাকলেন, অ্যাকশন সিকোয়েন্স গুলো করলেন, তাতে বলতেই হয় আসলে ফাতিমাই এই সিনেমার প্রধান নারী চরিত্র।

আরো কিছু তামাশা ছিল এই সিনেমায়। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় তামাশা হচ্ছে ব্রিটিশ অভিনেতাদের মুখ দিয়ে হিন্দি বলিয়ে নেওয়া!

পরিশেষে, একদম নিখাদ মাসালা অ্যাকশন এন্টারটেইনার মনে করে দেখতে বসলে ‘ঠাগস অফ হিন্দুস্তান’ আসলে খারাপ না, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইউনিক। কিন্তু ব্রিটিশ ইতিহাস, ঠগীদের চরিত্র, আমির-অমিতাভের মত অভিনেতা, বাজেট- সব চিন্তা করে আসলে এই মুভিটাকে আবর্জনা ছাড়া কিছু বলা যায় না!

এই যোধা আকবর, বাজিরাও-মাস্তানি, পদ্মাবতের মতো হিস্টরিক্যাল ইম্পরটেন্স আর সাবস্টেন্স-ওয়ালা পিরিওডিকের আমলে থাগসের মত একটা মাসালা এন্টারটেইনার মানুষকে খাওয়ানোর চেষ্টা করাটা কী যশরাজের মত প্রোডাকশন কোম্পানির ঠিক হল? যদিও, ব্যবসার এই যুগে ঠিক-বেঠিকের কথা কেই বা ভাবে।

শুনলাম, ভারতীয় বক্স অফিসের ইতিহাসে নাকি এই ঠাগস অব হিন্দুস্তানই সবচেয়ে বেশি আয় করা সিনেমা। ‍শুধু, নির্মাতা-অভিনেতাদের দোষ দিয়েই বা লাভ কি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।