সিনেমার গল্পের কি ‘বাস্তবতা’ মানা জরুরী?

প্রথমেই বলি ছবিটা নিয়ে অনেক খারাপ কথা শোনা যাচ্ছে। আমি নিজেও বলেছিলাম ট্রেলার দেখে, পুরো ‘পাইরেটস অব ক্যারিবিয়ান’ এর নকল বলে। কিন্তু সত্যি বলতে সিনেমাটা দেখে আমার বিশেষ খারাপ লাগেনি। বিশেষ ভালও লাগেনি যদিও। একটু বিশ্লেষণে আসি।

প্রথমেই বলি গল্পটা। ফাতিমার বাবা, মা ও ভাইকে ইংরেজ্ ক্লাইভ ছল করে মেরে দেয় তাদের রাজ্যপাঠ দখল নেবে বলে। ফাতিমাকেও মারতে যায়। কিন্তু সেই রাজ্যের বিশ্বস্ত সেনা বুড়ো অমিতাভ বাচ্ছা ফাতিমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে সমর্থ হয় এবং নিজের মেয়ের মতো মানুষ করে। গল্পটা ফাতিমার বড় হয়ে ক্লাইভকে মারার একটা প্রতিশোধের গল্প। অমিতাভ ঠগীদের দলের নেতা এবং ফাতিমাও বড় হয়ে ঠগীই হয়ে ওঠে এবং ইংরেজদের জাহাজ লুট করে।

ইংরেজ যখন অমিতাভদের ধরতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা একজন ভাড়াটে জালিয়াতের আশ্রয় নেয় যে হচ্ছে আমির। কন্ট্রাক্ট হয় আমির অমিতাভদের ধরিয়ে দেবে। বদলে অনেক টাকা পয়সা পাবে। আমির কি সত্যি ধরিয়ে দেবে অমিতাভদের নাকি নিজেই ঠগীদের সাথে হাত মিলিয়ে ইংরেজদের মোকাবিলা করবে, এই হচ্ছে গল্প। গল্পে সাসপেন্সের জায়গাটা আমি বজায় রাখলেও আপনারা আশা করি বুঝতেই পারছেন শেষে কি ঘটবে!

আমিরের ধুম সিনেমা আপনার কেমন লেগেছিলো? অবাস্তব? মাসালা মুভি? লজিক খোঁজার বালাই নেই? শুধু পপকর্ণ সহযোগে টিপিকাল এন্টারটেনমেন্ট? এও তাই। দুটো ছবিরই পরিচালক একই। বিজয় কৃষ্ণ আচার্য। উনি সুন্দর ভাবে লজিককে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দশ জনের সাথে বুড়ো অমিতাভকে লড়িয়ে দিয়েছেন। হাতের কাছে শিকারকে পেয়েও ইংরেজদের দিয়ে আমিরকে না মারিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন।

ইংরেজদের মনে হুট করে বলা নেই কওয়া নেই, ভারত এর প্রতি দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলেছেন এবং আরো অনেক কিছুই করেছেন যা কিনা রোহিত শেঠির মারদাঙ্গার সিনেমায় এমনকি ডেভিড ধাওয়ান এর ফ্যামিলি এন্টারটেনমেন্টে আমরা আকছার দেখি। এবং বলাই বাহুল্য বেশ মজাও পাই। অথচ মুশকিল হচ্ছে এই ছবিটা নিয়ে এমন একটা হাইপ উঠেছে যেন আমির কে সবসময় সিরিয়াস ছবি করতে হবে।

ফিল্ম ক্রিটিকরা ওঁত পেতে বসে আছেন পান থেকে চুন খসলেই তুলো ধোনা শুরু করবেন। একটা বাজে ব্যাপার আমাদের মধ্যে আছে যেটা আগেও লিখেছি। তুল্যমূল্য বিচার। ফিল্মের পরিচালক একবারো কোথাও দাবি করেননি যে তারা ‘পাইরেটস অব ক্যারিবিয়ান’ এর হিন্দি রিমেক বানাচ্ছেন। কিন্তু অনেকেই বলতে শুরু করে দিয়েছেন সিনেমাটা পুরো টোকা। সাজপোশাক থেকে কথাবার্তা সবই। অনেকে এও বলছেন ছবিটায় বাস্তবের কনামাত্র নেই।

আরে কি মুশকিল! সঞ্জয় দত্তর ‘বাস্তব’ ছবিটাও তো আমার অবাস্তব লেগেছিলো অনেক জায়গায়। কিন্তু তাই বলে কি ছবিটা আমার ভালো লাগেনি? আমি শুধু চাই একটা গল্প, যেখানে গরু গাছে উঠলেও আমার অসুবিধা নেই।

হ্যাঁ, এ ব্যাপারে আমার একটা ব্যাক্তিগত বক্তব্য আছে। সেটা হচ্ছে আমার ভালোলাগার ছবি আর ভালো ছবির তফাৎ আমার নিজের কাছে খুব পরিষ্কার। আমিরের এই ছবি দেখে হল থেকে বেরিয়ে নিশ্চয়ই বলবো ছবিটা খারাপ, কিন্তু আমার ভালো লেগেছে। আমার সত্যজিত বা ঋত্বিক এর ছবি অসামান্য লাগে বলে যে জিতের ‘বস’, শাহরুখের ‘ডিডিএলজি’, বা সালমানের ‘হাম আপকে হে কৌন’ খারাপ লাগতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।

এই তিনটে ছবিই আমার ভালো লেগেছে, যদিও কোনটাই আমি ভালো ছবি বলে মনে করিনা। অথচ, এগুলো প্রত্যেকটাই আমি আবার টিভিতে দিলে আবারও দেখবো। এর কারণ এই ছবি গুলোর মেকিং ভালো। নিটোল, ঝরঝরে, তাজা, সুবাসিত। আমার মতো বেশির ভাগ দর্শকই তাই। তারা ভালো ছবি দেখতে পয়সা খরচ করেনা। তারা চায় ছবি যা তাদের ভালো লাগাবে। সেটাই তাদের কাছে ভালো ছবি। এর বেশি কিছু বলতে গেলেই আপনি আঁতেল আখ্যা পাবেন।

যেখানে ‘বিবি নাম্বার ওয়ান’ ফিল্ম ফেয়ারের মনোনয়ন পায়, যেখানে ধুম ৩ প্রায় ৫০০ কোটির ব্যাবসা করে, সেখানে ঠগীরাও যে প্রথম দুদিনেই ৫০ কোটির উপর ব্যাবসা করবে, সেটা না ভাবাটাই অন্যায়। যেখানে অমিতাভের সাড়ে তিন কোটির উপর এবং আমিরের আড়াই কোটির উপর ফলোয়ার টুইটারে, সেখানে এদের সিকিভাগ লোক সিনেমাটা দেখলেও পয়সা উসুল, সেটা বুঝতে হবে।

যশ রাজ প্রোডাকশানের কাছে সিনেমাটা একটা ব্যাবসা যাতে লোককে আনন্দ দেওয়াই প্রাথমিক উদ্দেশ্য। কোনও ভুল নেই তাতে। ভুলটা সেখানেই যখন আমাদের মত আঁতেলচণ্ডীরা ঠগীদের ইতিহাস উইকি পিডিয়া ঘেটে বার করবো আর সিনেমার সাথে তফাৎ করে বলবো ‘ছি! কি ছবি বানালো!’ ‘এটা ১৭০০ সালের ছবি? এত মডার্ন?’, ‘আমির তো জনি ডিপকে পুরো নকল করেছ ‘ কিংবা ‘ফাতিমার থেকে কিরা নাইটলি অনেক বেটার’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আবারও বলি, তুলনায় প্লিজ যাবেন না। মনে রাখবেন ওটা হলিউড। ওর কনাভাগ আমরা আজ পেয়েছি। বাকিটা পেতে আরও ১০/১৫ বছর লাগবে।

‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’ যদি ৩০০ কোটি ডিসার্ভ করে বলে সদর্পে চেঁচামেচি করি, শাহরুখের ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ ছবিটার স্ক্রিপ্ট অস্কার লাইব্রেরীতে স্থান পেয়েছে বলে যদি বীরদর্পে গলা ফাটাই যে হাম ভি কিসিসে কম নেহি, সেই জায়গা থেকে ঠগস অফ হিন্দোস্তান এর খারাপ দিক যদি বলতেই হয়, তাহলে বলবো ছবিটা বেশ বড়ই লম্বা। প্রায় পৌনে তিন ঘন্টা।

অথচ স্টোরি লাইন বড়ই প্রেডিক্টেবল। এইখানেই দর্শকের কিছুটা ক্লান্তি ও একঘেয়েমি আসে। গান বড়ই বিরক্তিকর। ধড়কের পর অজয় অতুল বলতে গেলে ছড়িয়েছেন। গানের সাথে নাচ। ক্যাথরিনা ছবিটার সবচেয়ে বড় বাজে দিক। সে না পারে কোমড় দোলাতে, না পারে হাত পা ছুড়তে। বরং সুরাইয়া নাচটায় মল্লিকা সেরাওাতকে নিলে জমিয়ে দিতো।

মাস্টার ফিল্মমেকার মনি রত্নম কিন্তু ‘গুরু’তে ‘মাইয়া মাইয়া’ নাচটার জন্য ওই জন্যেই মল্লিকাকেই বেছেছিলেন। যে যেই কাজটা ভালো করে, তাকে সেইটাই দেওয়া উচিত, সেটা বোধ হয় এই ছবির পরিচালক অতটা বুঝে উঠতে পারেননি। অথবা বুঝেও এড়িয়ে গেছেন বাজার মল্লিকার থেকে আজকাল ক্যাটরিনা বেশি খাবে বলে। আমার যদিও পোষায়নি। ফাতিমার অভিনয় বেশ খারাপ। ওই চোয়াল শক্ত করা ব্যাপারটা ‘দঙ্গল’-এ মানিয়ে গিয়েছিলো। এখানে বাপের মৃত্যুর প্রতিশোধের আগুনে পোড়া মেয়ের মুখের যে অভিব্যাক্তি সেটা ফুটিয়ে তোলার মতো দক্ষতা বোধ হয় এখনও ফাতিমার হয়নি।

ভালো বলতে পুরো আদা লঙ্কা ঝাল মেশানো মশলা। বোকা বোকা কমেডি আছে। দুঃখ দুঃখ ভাব আছে। ন্যাকা ন্যাকা প্রেম আছে। ঢিসুম ঢিসুম মারপিট আছে। সত্যি বলতে মারপিটের সিনগুলো হেব্বি। ‘ভিএফএক্স’ বা ‘সিজিআই’ আমি বুঝিনা। বিদেশে এর থেকে কত ভালো মানের ছবি হয় বা হয়েছে আমার জানার দরকার নেই। আমার দিল খুশ হলেই হলো।

সালমানের ‘এক থা টাইগার’ এর জবাব দিতে যেন আমির নিয়ে এসেছেন ‘এক থা ঠগী!’ বা ‘ঠাগস অব হিন্দুস্তান’ আমিরকে মাঝে মধ্যে একটু বোরিং লেগেছে যদিও। এমনিতে ভালোই। অভিনয় অমিতাভের বেশ ভালো লেগেছে ওই নাচগানের সিন গুলো ছাড়া। ক্যামেরার কাজও আমার বেশ ভালো লেগেছে। গোধুলির আলোয় অমিতাভের ঘোড়ায় চড়ে যাওয়া বা প্রাসাদের মধ্যে আলো আধারির খেলা বেশ মন টানে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।