তামিম ইকবাল সংক্রান্ত অনুমান

সম্প্রতি তামিম ইকবালের ট্রেনিংয়ের একটি ভিডিও ফেসবুকে খুব ঘুরঘুর করছে; বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর নিজেকে ফিরে পেতে তামিম কতটা মরিয়া তা বোঝানোই লক্ষ্য। একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট যদি রাস্তায় ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করে সেটা কি ছড়িয়ে দেয়ার মতো ঘটনা? সে তো তার দায়িত্ব পালন করেছে মাত্র!

একজন পেশাদার এথলেট, যার উপার্জনের পুরোটাই নির্ভর করে শারীরিকভাবে সে কতটা ফিট সেই নিয়ামকের উপর, সে বাড়তি ফিটনেস কেন নিয়মিত করে না এটাই বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্রিকেটার যেহেতু রুটিন ফিটনেসের বাইরে কিছু করার তাড়নাই পায় না, তামিমের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনই হয়েছে তাজা খবর। আচ্ছা, ভিরাট কোহলির ফিটনেস ট্রেনিং বা ডায়েট চার্টের কোনো ভিডিও নেই? থাকলে লিটন দাস আর সৌম্য সরকারকে র‍্যাবের বা সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে সেগুলো ৩ মাস টানা পালনের মাধ্যমে অভ্যাসে পরিণত করতে বাধ্য করা উচিত বিসিবির পক্ষ থেকে।

তামিম এরকম ফিটনেস ট্রেনিং কেন করছে? কারণ ২০১৯ সালে টেস্টে একটা সেঞ্চুরি বাদে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে মনে রাখার মতো কোনো পারফরম্যান্স নেই, বরং আয়ারল্যান্ড সফর থেকেই তার ডট খেলার প্রবণতা নিয়ে প্রচুর কথা শুরু হয়েছে, যেটা প্রভাব ফেলেছে তার ব্যাটিং এপ্রোচে।

ব্যাটসম্যান তামিম কেমন?

সে রিফ্লেক্সনির্ভর ব্যাটিং করে, ফুটওয়ার্কের উপর নির্ভরতা কম,শট রেঞ্জ সীমিত, রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে দুর্বল। এতো সব সীমাবদ্ধতাকে সে জয় করতে পেরেছিল মূলত সাহস আর ঔদ্ধত্য দিয়ে। সে যে মানের ব্যাটসম্যান তাতে একজন শাহরিয়ার নাফিস হওয়াই ছিল তার সম্ভাব্য নিয়তি, কেবলমাত্র চেষ্টা আর জিদ দিয়ে সেই নিয়তিকে সে বদলে দিতে পেরেছে, সব সংস্করণ মিলিয়ে হয়েছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক।

অবশ্য পাদটীকায় এটাও লিখতে হবে, দল থেকে বাদ পড়ার ভয় সারা ক্যারিয়ারে কখনোই ছিল না (২০১২ এর এশিয়া কাপ একটি ব্যতিক্রম); বাংলাদেশের অন্য ওপেনাররা যেখানে পেস বোলিংয়ে নড়বড়ে থাকতো সেখানে সে ডাউন দ্য উইকেটে এসে চার্জ করতে চাইতো এটাই তাকে অন্যদের চাইতে এডভান্টেজ দিয়েছে। তাছাড়া প্রতি ৪-৫ ইনিংসে সে একটা ৫০ বা তার কাছাকাছি ইনিংস খেলতে পারতো, যেটা সেই সময়ের বাংলাদেশের মানদণ্ডে যথেষ্ট উজ্জ্বল পারফরম্যান্স।

২০১৫ সালটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের ফেইক আর ফলস গ্লোরিফিকেশনের বছর। সে সময় শীর্ষ মিডিয়াগুলো মাশরাফিকে কাল্ট ফিগারে পরিণত করতে শুরু করে ঘরের মাঠে পাকিস্তান, ভারত আর সাউথ আফ্রিকাকে সিরিজ হারিয়ে ১০ বছর পর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সুযোগ পাওয়ার কারণে, সৌম্য আর মুস্তাফিজকে মহাতারকা বানায়, সেই সাথে তামিম ইকবাল হতে থাকে বিশ্বক্রিকেটের জাদরেল ওপেনারদের একজন।

গ্লোরিফিকেশন কখনো শূন্যের উপরে নির্মিত হয় না, তার একটা ন্যূনতম ভিত্তি থাকতে হয়, সেই ভিত্তিতে বাকিটা ক্যামেরার লেন্সের কারুকাজ।তখন ঘোড়া শাবককেও ক্যামেরার লেন্সের বদৌলতে অতিকায় ডাইনোসর মনে হয়। ২০১৫ সাল হলো সেই সময় যখন লেন্সের ক্যারিশমায় ঘোড়া, মহিষ, জেব্রা নির্বিশেষে ডাইনোসর হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে। যেহেতু ভিত্তি দুর্বল আরোপিত গ্লোরিফিকেশনগুলো একটা নির্দিষ্ট সময় পরে হাস্যরসের খোরাক হয়েছে। মাশরাফি, সৌম্য, মুস্তাফিজ প্রত্যেকেই মূল্য চুকিয়েছে, সিরিয়ালে এখন তামিম ইকবাল।

অবশ্য মিডিয়াকে দোষ দেয়াটা নির্বুদ্ধিতা হবে। মিডিয়া কনটেন্টের বিজনেস করে, যার কনটেন্টের ডিমান্ড এবং ভ্যালু বেশি তার বিজ্ঞাপন বেশি, যার সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠতা বেশি তার রেভিনিউও বেশি। কনটেন্টের ডিমান্ড নির্ধারণ করি আমরা অমিডিয়াজীবীরাই। ধরা যাক, একজন ফেসবুকার মাশরাফিকে নিয়ে লিখলো, সেগুলো অনুমাননির্ভর, কিন্তু একজন রিপোর্টার মাশরাফিকে নিয়ে লেখার সময় সরাসরি তার সাথে কথা বলতে পারবে মিডিয়ার পরিচয়ে, যেটা কনটেন্টের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে।

মিডিয়া টিকে আছে তথ্যের প্রাইমারি সোর্স হিসেবেই। সোস্যাল মিডিয়া এখন অনেকগুলো বাইপাস তৈরি করায় মিডিয়া কিছুটা নাজুক অবস্থানে আছে। যে কারণে কনটেন্টের উপর আরো বেশি জোর দিতে হচ্ছে, মহিষের ডাইনোসর সাইজ ধারণ সেই মরিয়ানেসেরই বহিঃপ্রকাশ।

তামিম ইকবাল নিজের সীমার চাইতে বেশি পারফর্ম করে ফেলেছে ইতোমধ্যে। এলাস্টিক লিমিট হলো সেই সীমা যার পরে কোনোকিছু ছিঁড়ে যায়। তামিম সেই এলাস্টিক লিমিটে পৌঁছে গেছে, এখন ছিঁড়ে যাবার পালা। আগে সে হয়তো ৫০% ম্যাচে ৪০+ রান করতো, এখন সেটা নেমে আসার কথা ২০% এ, বা ১০% এ হলেও অবাক হবো না। মধ্যবর্তী ৩০% বা ৪০% এর যে ব্যবধান সেটা ঘুচানোর জন্য তার প্রয়োজন পড়বে মিডিয়া কভারেজের।

আপনারা খেয়াল করেছেন কিনা, আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট আর টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের পরে প্রথম আলো অনলাইনে একটি রিপোর্ট এসেছিল ‘তামিমের অভাব তারা কতটা পূরণ করতে পারলেন?’ – সেখানে সাদমান, সৌম্য, লিটন আর শান্তর পারফরম্যান্স তুলে ধরে বলা হয়েছিল, তামিমকে কি চাইলেই সরানো যায়! জনতা নিশ্চয়ই সেই সংবাদ পড়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছেন। অথচ সেখানে উল্লেখ করা হয়নি শ্রীলংকা সফরে ৩ ম্যাচে তামিমের রান ০, ১৯ আর ২; কারণ তাহলে যে রিপোর্টের জারিজুরি ফাঁস হয়ে যাবে।

গতকাল বোর্ড সভাপতি বলেছে ‘ভারত সিরিজে সৌম্য-লিটনের পারফরম্যান্স হতাশাজনক’; কথা সত্যি, কিন্তু অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ কত রান করেছে সিরিজে, সেই প্রশ্ন কারো মাথাতেই আসেনি। পক্ষান্তরে সৌম্য ৩ ম্যাচের দুটোতে কার্যকরী ইনিংস খেলেছে, একটাতে বোলিংয়ে সাফল্য দেখিয়েছে; বলা যায় ৩ ম্যাচেই কন্ট্রিবিউট করা একমাত্র প্লেয়ার।

তবু সৌম্যের দিকে আঙুল তোলা মানে তার আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা দেয়া। মাহমুদউল্লাহ’র পারফরম্যান্স কী, ভাগ্যের সহায়তায় খেলা প্রথম ম্যাচের ইনিংসটা বাদ দিলে মুশফিকের পারফরম্যান্স কী? সেসব আলোচনায় আসবে না কারণ মিডিয়া পঞ্চপাণ্ডব নামে এমন এক সর্বরোগের মহৌষধ উদ্ভাবন করেছে যার বদৌলতে ৫ জন ক্রিকেটার ক্রিকেটের চাইতেও বড়ো কিছু হয়ে উঠেছে; মানুষ মুড়ি-মুড়কির মতো সেই ঔষধ সেবন করেছে।

আপনি চাইলেও এখন তামিম বা মাহমুদুল্লাহকে বাদ দিতে পারবেন না। তারা দলে থাকলে স্পন্সরের যা পরিমাণ হবে, তারা বাদ পড়লে স্পন্সরের পরিমাণ নেমে আসবে এক-তৃতীয়াংশে। এমনিতেই সাকিব নিষিদ্ধ একবছর তার প্রভাবে স্পন্সরের পরিমাণ কমে যাবে অনেকটা। মোশাররফ করিমের নাটক নিয়ে যতোই সমালোচনা হোক, সে থাকলে নাটক যেমন বেশি দামে বিক্রি হয়, তামিম-মাহমুদুল্লাহ এর ব্যাপারটাও তেমন; কোনো কোচের পক্ষেই তাদের আর বাদ দেয়ার সাহস হবে না। বিশ্বকাপের পর তামিম বা মাহমুদউল্লাহ’র এখনো টিকে যাওয়ার ক্রিকেটিয় কারণ শূন্য, কমার্শিয়াল কারণ ১০০%!

গতকাল হাবিবুল বাশার কালের কণ্ঠ বা প্রথম আলো অনলাইন ভারসনে বলেছে আফিফের জন্য উপযুক্ত জায়গা ৪ বা৫, এটা ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট যে কেউই বুঝবে, কিন্তু তা এক্সিকিউট করা হবে না, টানা দুটো টি-টোয়েন্টি সিরিজে আফিফকে ৪ এ খেলানো হবে না, তাতে মুশফিক আর মাহমুদুল্লাহ এর ব্যাটিং পজিশন পিছিয়ে যায়। আফিফ কোনো কারণে পারফর্ম করে ফেললে পঞ্চপাণ্ডব মিথ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

তার চাইতে ৬ এ খেলিয়ে আফিফকে আন্ডারপারফরমার হিসেবে জনরোষের মুখে ফেলাটা বেশি সহজ। অথচ বর্তমান স্কোয়াডে সৌম্যের পরে সিক্স হিটিং এবিলিটি যদি কারো থাকে সেটা মাহমুদুল্লাহ, সে-ই হতে পারে ৬ নং এর আদর্শ বিকল্প। কিন্তু বয়স বাড়ায় তার রিফ্লেক্স নষ্ট হয়ে গেছে, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সিক্স হিটিং এবিলিটিতে মরচে ধরেছে, তার ৬ এ খেলা মানে গান-পয়েন্টে চলে যাওয়া; সেটা এতো সহজে হয়তো হবে না।

কমার্স সবসময় সাকসেস এর সাথে থাকে। নাঈম শেখ আর একটা সিরিজে রান পেলেই স্পন্সর পেয়ে যাবে কয়েকটা, জানুয়ারিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজেই যদি হয়, ‘পাকিস্তান’ নামটাই অনেক বড়ো নিয়ামক হয়ে উঠবে।

২০২০ সালের সূচিটা যেভাবে করা তাতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগেই তামিমের টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরে যাওয়ার কথা; এর মধ্যে ঘাপলা বাঁধাতে পারে চলতি বিপিএল আসর আর মার্চে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে ৫ ম্যাচের সিরিজ। এবারের বিপিএল অনেকটাই প্র‍্যাক্টিস ম্যাচের আদলে অনুষ্ঠিত হবে হয়তো, তারকা বিদেশী সেরকম পাওয়ার সম্ভাবনা কম, জৌলুসহীন বিপিএল এ কয়েকটা ৫০+ ইনিংস আর জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে ৫ টি২০ তামিমকে পুনর্জ্জীবিত করতে পারে। আর যদি বিপিএল বিমর্ষ কাটে, এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩-০ তে হারতে হয়, সেটা তাকে আবারো হতাশা উপহার দিবে।

সোস্যাল মিডিয়ার প্রেসারে সবচাইতে ভালনারেবল ক্রিকেটার তামিম। বিশ্বকাপের পরে একটা ব্যর্থ সিরিজ কাটানোমাত্রই সে নিজের ফেসবুক পেজ ডিএক্টিভেট করেছে, বিশ্রামে গিয়েছে। সেই ক্রিকেটার যদি পাকিস্তানের বিপক্ষে ১ টা ৩০ বলে ৩২, ১টা ১৬বলে ১৮ আর একটা ৯ বলে ৭ টাইপ ইনিংস খেলে এবং অপরপ্রান্ত থেকে স্ট্রোক না খেলে কেউ, একই ধারা অব্যাহত থাকে জিম্বাবুয়ে সিরিজেও, আয়ারল্যান্ড সিরিজে সেই প্রভাবেই তার রানখরা যাবে৷ দল থেকে বাদ পড়লে একসময় কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকেও বাদ পড়বে, তার চাইতে বিশ্রাম নেয়া বা ইনজুরিতে পড়া সুবিধাজনক সমাধান।

তামিম সম্ভবত এবারের বিপিএল এ কিছু করে দেখাতে চাইবে। এর মাধ্যমে নিজের উপর ইতোমধ্যেই চাপ তৈরি করে ফেলা হয়। তামিমের যে ব্যক্তিত্বের গঠন, তাতে চাপে ভেঙ্গে পড়াই তার জন্য তুলনামূলক সহজ অনুমান। তবু পাকিস্তান সফরের দলে সে থাকবেই; যদি টি২০ সিরিজ আগে অনুষ্ঠিত হয়, তামিমের গালগপ্পো ধরা পড়ে যাওয়ার কথা। দলের বাইরে থাকা তামিম দলে থাকা তামিমের চাইতে অনেক বেশি ভয়ংকর ক্যারেক্টার। ভারতের বিপক্ষে তামিমকে ছাড়াই যখন জিতেছে, তখন আমরা বলেছি তামিম, সাকিবকে ছাড়াই হারিয়ে দিতে পারি, আবার পরের ২ ম্যাচে যখন হারলো তখন অনেকেই বলেছি তামিম, সাকিব ছাড়া জেতাটা কি এতোই সহজ? তো সেই গপ্পের কাঁঠাল তামিম যখন খেলবে এবং দল পাওয়ার প্লে তে ধুকবে, তখন কোন তামিমের গল্প বলবো আমরা?

এবারের বিপিএল কমার্শিয়ালি ফেইলার হলেও আমার কাছে এই আসরটি ২০১২ এর টার মতোই তাৎপর্যপূর্ণ; যদি কোনো বাংলাদেশী টপ অর্ডার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখাতে পারে, জাতীয় দলের জন্য বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনা এবং সুযোগ দুটোই বৃদ্ধি পাবে। অন্যান্য আসরে বিদেশীদের প্রতি অতিনির্ভরতার কারণে আনকোড়া বা দেশি প্লেয়াদের উপর ফোকাস কম থাকে। এই যে নাঈম শেখকে নিয়ে এতো কথা হচ্ছে সে কিন্তু গতবার ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে বেশ কিছু ম্যাচে খেলেছে, ৭-৮ নম্বরে নামায় বেশিরভাগ দর্শকই তাকে খেয়াল করেনি। এবার যে দলেই খেলুক নিশ্চিতভাবেই ওপেন করার সুযোগ পাবে। এরকম নাঈম শেখ হয়তোবা আরো বেশ কয়েকজনই ছিল বা আছে, টিম কম্বিনেশনের কারণে চোখে পড়েনি।

মাহমুদুল্লাহকে এখন আরেকটি কাল্ট ফিগার বানানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। ‘সাইলেন্ট কিলার’ ট্যাগটা ইতোমধ্যেই ক্লিশে হয়ে উঠেছে, এখন তাকে উপস্থাপন করা হবে ক্যারিশম্যাটিক অধিনায়ক হিসেবে। খুলনা টাইটান্স রেফারেন্স হিসেবে আসবে, ভারত সফরের দলের পূর্বে বিশৃঙখল, হতাশাগ্রস্ত প্রভৃতি বিশেষণ জুড়ে দিয়ে তাকে আরেকজন ফাদার ফিগার হিসেবে দাঁড় করিয়ে টেস্ট দলের দায়িত্বেও তাকে বসানো যায় কিনা সেই চেষ্টা চলবে। মুমিনুল টেস্টের অধিনায়ক, অথচ তাকে ঘিরে তেমন কোনো রিপোর্ট নেই, গুটিকয় যা এসেছে সেগুলো রুটিনওয়ার্কের মতো। ফলে পারফরমার মাহমুদুল্লাহ দীর্ঘদিন ‘অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ’ হিসেবে খেলতেই থাকবে, নো পারফরম্যান্স রিভিউ।

তাছাড়া আরেক বিগ ব্রাদার ফিগার মুশফিক যতদিন খেলার মধ্যে আছে মাহমুদউল্লাহ’র ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তায় না ভুগলেও চলবে। যদি কখনো মুশফিক দীর্ঘ ব্যাডপ্যাচে পড়ে তাহলেই কেবল মাহমুদুল্লাহ এর আসন টালমাটাল হতে পারে। নইলে ২০২৩ বিশ্বকাপেও মাহমুদুল্লাহকে দলে দেখতে পাওয়াটা খুবই বাস্তব সম্ভাবনা। সোস্যাল মিডিয়া প্রেসার তাকে খুব একটা প্রভাবিত করে মনে হয়নি, ফলে তামিমের মতো সেনসিটিভ এবং ইমোশনাল হয়ে সে পালানোর চিন্তা করবে না।

শেওয়াগ বা যুবরাজ ক্যারিয়ারের একটা পর্যায়ে যে সমস্যায় ভুগেছে, তামিম মূলত সেই সমস্যায় পড়েছে। প্রতিপক্ষের সামনে সে এক্সপোজড হয়ে গেছে, পুরোমাত্রায় রিফ্লেক্সনির্ভর হওয়াতে এই এক্সপোজার কাটাতে তার ব্যাটিংয়ের ধরনেই আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে সেটা সাধারণত সম্ভব হয় না। ব্যতিক্রম ঘটতেই পারে, তবে তামিমের যা ব্যক্তিত্বের ধরন তাতে সেই সম্ভাবনা আপাতত কম মনে হচ্ছে।

২০২০ সালে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে বাংলাদেশ যত ম্যাচ খেলবে, ইতোঃপূর্বে তেমনটা ঘটেনি। ফ্যানদের প্রত্যাশা এবং প্রতিক্রিয়া দুটোই বেশি থাকবে। তাই সমীকরণ অনুযায়ী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তামিমের খেলার সম্ভাবনা এখনো পর্যন্ত বড়োজোর ২০% মনে হচ্ছে। জিম্বাবুইয়ে আর আয়ারল্যান্ড সিরিজের কারণেই ২০% বলছি, নইলে বলতাম ০%

ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি’র জন্য তামিম না থাকাটা দীর্ঘমেয়াদে দলের জন্য অত্যন্ত উপকারী। ৫ জন খেলোয়াড় একসাথে ১ যুগ খেলে ফেললে দলের ভেতরে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবেই। কনটেন্টবাজ মিডিয়া কেবল সেই আধিপত্যের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে মাত্র। ২০১৯ বিশ্বকাপের পরই বাংলাদেশের উচিত ছিল পরবর্তী দশক নিয়ে পরিকল্পনা করা, সেখানে ১ যুগ সার্ভিস দেয়া খেলোয়াড়দের এক্সিট প্ল্যানটাও থাকা উচিত ছিল।

কিন্তু, বোর্ড, মিডিয়া আর সমর্থকদের ভাবেসাবে মনে হয় তামিম-সাকিব-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ এরা ৫০ বছর বয়সেও দলে থাকবে, এর মধ্যে নাঈম-আফিফরা অবসরে যাবে, তামিমের ছেলে দলে ঢুকে অফ ফর্মের কারণে বাদও পড়বে কয়েকবার, তবু তাদের জায়গাটি সুরক্ষিত এবং সুনিয়ন্ত্রিত। এই নিয়ন্ত্রণকামী মনোভাবের কারণে মধ্যবর্তী একটি প্রজন্ম (বিজয়-সাব্বির-লিটন-সৌম্য) উচ্ছন্নে গেছে, আফিফদের প্রজন্মকেও উচ্ছন্নে পাঠানোর তোড়জোর শুরু হয়েছে, কেবল এক্সিকিউশনটা বাকি।

এই সময়ে তামিম যদি রিটায়ার করে এবং নতুন কেউ উঠে আসে সেটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ভালো। গত বছর বিশ্বকাপের আগে আমার প্রোফাইল থেকে একটি জরিপের আয়োজন করেছিলাম, ‘বাংলাদেশ দলে আপনার প্রিয় ব্যাটসম্যান কে?’ শিরোনামে। নিরঙ্কুশভাবে তামিম বিজয়ী হয়েছে। একই জরিপ এখন করলে নিশ্চিতভাবেই এখন বিজয়ী হবে মুশফিক, এবং নাঈম শেখ এক ইনিংস খেলেই ৫-১০ টা ভোট পেয়ে যাবে, তামিম সম্ভবত ৩ বা ৪ এ চলে যাবে এখন।

তবু মিডিয়ায় ট্রেনিংয়ের ভিডিও দিয়ে, ইন্টারভিউ দিয়ে তামিম নিজের অবস্থান জানান দিতে থাকবে। সেই কৌশলই বুমেরাং হবে যদি বিপিএল আর পাকিস্তান সফরে তামিম ব্যর্থ হয়। তামিম, মাহমুদুল্লাহ দুজনই মেয়াদ উত্তীর্ণ প্রোডাক্ট; দর্শক বনাম মিডিয়ার অদৃশ্য সাইকোলজিকাল লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে বিজয়ী হয় সেটাই দেখার অপেক্ষায় রইলাম। তবে এখনো পর্যন্ত অনুমান বলে যদি ভারত এশিয়া কাপে না খেলে এবং বাংলাদেশ ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয়, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের ওপেনার হিসেবে যে তামিম ইকবাল নামে কোনো ব্যাটসম্যান থাকবে না সেই প্রস্তুতি ভক্তদের নিয়ে রাখা উচিত, এবং শুনতে খারাপ লাগলেও, বাংলাদেশ দলের জন্য সেটাই হবে শ্রেষ্ঠ ব্লেজিং!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।