ভারতের বিপক্ষে সিরিজ হার শেষে সাময়িক প্রতিক্রিয়াসমূহ

খেলা দেখলে কখনোই উচ্ছ্বাস বা বিষন্নতা কাজ করে না, এটাই খেলা দেখার প্রধান মজা। এত বড়ো মাঠে ১৭৫ চেইজ করে বাংলাদেশ জিতবে এটা কখনোই মনে হয়নি, একটা পর্যায়ে গিয়ে নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ পেতোই। তবু ইনিংসের অর্ধেকের বেশি সময় পর্যন্ত যে ম্যাচের ফলাফল ঘিরে অনিশ্চয়তা ছিল সেটাও কম প্রাপ্তি নয়। যে কোনো বিচারেই ভারত বাংলাদেশের তুলনায় ১০ গুণ শক্তিশালী দল। ম্যাচটি দেখার পর যেসব চিন্তা মাথায় এলো সেগুলোই লিখি।

১.

টি-টোয়েন্টি দলটা পুরোপুরিই ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে তামিম ইকবাল দলে ঢোকার পর; নাঈমের আজকের ইনিংসটা টি-টোয়েন্টিতে আমার দেখা সেরা বাংলাদেশি ইনিংস। নাঈমের ব্যাটিংয়ে প্রধান সমস্যা সে প্রচুর ডট খেলে, যেটা রানরেটে প্রভাব ফেলে। কিন্তু পরে সেই ডট পুষিয়ে দিয়েছে সে। এখানেই মূল ক্রাইসিসটা লুকানো। এই সিরিজে সে লিটন বা সৌম্যের সাথে খেলেছে বলে অন্যপ্রান্তের ব্যাটসম্যান হিটিংয়ের দায়িত্ব পালন করেছে, সে নিজের মতো খেলতে পেরেছে। কিন্তু তামিম এলে লিটন বা সৌম্যের কেউ একজন বাইরে চলে যাবে; সৌম্য বোলিংয়ের কারণে অ্যাডভান্টেজ পাবে।

ফলে লিটন বাইরে থাকবে। নাঈমকে তখন লিটনের রোল প্লে করতে হবে, অর্থাৎ এগ্রেসিভ স্ট্রোক খেলতে হবে। এতে তার ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে খেলবে, ব্যর্থ হলে তৃতীয় ম্যাচে লিটন ঢুকবে। আর যদি দুই ম্যাচেই সে তামিমের চাইতে বেশি রান করে একমাত্র তখনই সে তৃতীয় ম্যাচে সুযোগ পাবে। তামিম অনড় থাকায় অদৃশ্য চাপটা থাকবেই, এবং সেই প্রেসারের ফলাফলস্বরূপ একজন ইয়াং ট্যালেন্টকে হারিয়ে ফেলতে হবে। অথচ লিটন আর নাঈমের ওপেনিং জুটি টি-টোয়েন্টির জন্য আদর্শ হতে পারতো। একটা ভালো স্টার্ট পাওয়া যেত।

তামিম টি-টোয়েন্টিতেও অ্যাঙ্কর রোল প্লে করে ২৫ বলে ২৯ রান করবে, তাতেই খুশি সবাই। তামিমের প্রচুর স্পন্সর আছে, জনপ্রিয় মিডিয়াগুলোর সবকয়টিই তামিমের পক্ষে, যারা তার নামের পূর্বে ‘ড্যাশিং’ বিশেষণ জুড়ে দিয়েছে।সেইসব এনডোর্সমেন্টের প্রভাবে হলেও তামিমই টি-টোয়েন্টি’র ফার্স্ট চয়েজ ওপেনার। নাঈম শেখের বিকশিত হওয়াটা আর হবে না বোধহয়।

২.

একই কথা প্রযোজ্য আফিফের ক্ষেত্রেও। আফিফ মোটেও ৬ বা ৭ এ খেলার ক্যালিবার সম্পন্ন ব্যাটসম্যান নয়। তাকে খেলাতে হবে ৩ অথবা ৪ এ, এর নিচে নামালেই তার পক্ষে ম্যাচের মোমেন্টাম ধরা কঠিন হবে। আজ মিথুন ৪ এ কেন? কারণ, হয় মুশফিক হ্যাটট্রিক বলের সামনে পড়তে চায়নি, অথবা ম্যাচ শেষ ওভারে যাবে ধরে নিয়ে শেষের দিকে শক্তি রিজার্ভ রাখতে চেয়েছিল। দুটো কারণই নেগেটিভ। মিঠুনের ২৯ বলে ২৭ রানই যে ম্যাচের মোমেন্টাম নষ্ট করেছে এটা খেলা একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে।

২৭ এর মধ্যে ৩ বলে ১৪, বাকি ১৩ রান করতে বল নষ্ট করেছে ২৬টি! কিন্তু মিডিয়া আর টিম ম্যানেজমেন্ট দেখবে সে নাঈমের সাথে ৯৮ রানের পার্টনারশিপ গড়েছে, এবং পুরস্কারস্বরূপ সে টেস্টের একাদশেও সুযোগ পেয়ে যাবে।। হ্যাট্রিক বল খেলতে ভয় পাওয়াটা দলের প্রাচীনতম ব্যাটসম্যানের জন্য লজ্জাজনক; আর যদি দ্বিতীয় কারণ হয় তবু লজ্জাজনক, কারণ ওই ২৯ টি বল মুশফিক খেললে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে থাকতো।

তবু মুশফিক যদি রিজার্ভেই থাকে ৪ এ আসবে আফিফ, যেহেতু সে আগের ২ ম্যাচে খেলেছে; মিঠুন কোন যুক্তিতে? আফিফ হয়তো বাদ পড়বে না, যেহেতু তার পার্ট টাইম বোলিং কাজে লাগে, কিন্তু তার কাছ থেকে যে সার্ভিসটা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল তা পাওয়া হবে না নিশ্চিত।

৩.

আমিনুলের ক্যাচ মিসটাই ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। বাংলাদেশ বাদে অধিকাংশ টেস্ট প্লেয়িং দলের ব্যাটসম্যানই লাইফ পেলে দুর্দান্তভাবে কাজে লাগায়। বাংলাদেশ ক্যাচ ড্রপ করলে সারা ইনিংসে তার দুঃস্বপ্ন বয়ে বেড়ায়, যেটা তাদের ফিল্ডিংয়ে প্রভাব ফেলে। ক্যাচ মিস ক্রিকেটেরই অংশ, এটা নিয়ে কিছু বলতে চাই না।

৪.

মুস্তাফিজ এখনো অপরিহার্য সদস্য দলের ভাবতেই অবাক হই। এই পারফরম্যান্স অন্য যে কোনো বোলারকে দল থেকে বাদ দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠতো৷ আল আমিন যথেষ্ট ভালো করেছে, শফিউলকে যদি প্রথম ১২-১৩ ওভারের মধ্যে শেষ করে দিলে সেও মন্দ নয়। তবু সাইফউদ্দিন ইনজুরি থেকে ফিরলে এদের ২ জনের কেউ একজন বাদ পড়বে। মুস্তাফিজেরও মিডিয়া এনডোর্সমেন্ট যথেষ্ট; নইলে আরো দুই সিরিজ আগেই সে বাদ পড়তো। ২-৩টা সিরিজ তার বাইরে থাকা উচিত।

৫.

লিটন দাসকে আমি একজন গড়পড়তা বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে মেনে নিয়েছি, তার কাছ থেকে আর বিশেষ প্রত্যাশা করি না। পাওয়ার প্লে তে একজন মাত্র ফিল্ডার ডিপ মিড উইকেটে, পুরো লেগ ফাঁকা, তবু সেই একজন ফিল্ডারের হাতেই ক্যাচ তুলে দেয়া মানে ব্যাটসম্যানের বেসিকেই সমস্যা আছে। কিন্তু সমস্যা হলো, টি-টোয়েন্টিতে তাঁর চাইতে বেটার ওপেনার এখনো পর্যন্ত কাউকে চোখে পড়ছে না।

তবে, নাঈম শেখ যদি তামিমের শখের বলি না হয় তাহলে অন্তত ওয়ানডেতে লিটন দাসের ক্যারিয়ার দীর্ঘদিনের জন্য থেমে যাচ্ছে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। সাকিব না থাকায় ৩ আর ৫ নম্বরে দুটো স্লট ফাঁকা আছে, এটাই যা তাকে কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে৷ আর মুশফিক কিপিং টেস্ট থেকে ছেড়ে দেয়ায় সোহান আর মিঠুন ছাড়া চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কিপার নেই আপাতত।

৬.

পরের সিরিজেও কি মাহমুদউল্লাহই টি-টোয়েন্টির ক্যাপ্টেন থাকবে? তার ক্যাপ্টেন্সির যে ভূয়সী প্রশংসা তাতে বিশ্বকাপেও হয়তোবা তাকেই ক্যাপ্টেন করা হবে। কিন্তু ব্যাটসম্যান হিসেবে তার পারফরম্যান্স কী? বাংলাদেশ যদি যথেষ্ট সাহসী চিন্তা করতো তবে সৌম্য অথবা লিটনের মধ্যে কোনো একজনকে, অথবা দক্ষিণ আফ্রিকা যেভাবে গ্রায়েম স্মিথকে দায়িত্ব দিয়েছিল, সেভাবে আফিফকে ক্যাপ্টেন মনোনীত করতো।

কিন্তু মাহমুদউল্লাহ’র নেতৃত্বে যেহেতু ধোনির ছায়া দেখেছে কেউ কেউ, সে খবর মিডিয়াতেও এসেছে, মাহমুদউল্লাহ ছাড়া গতিই বা কী! তবে এই সিদ্ধান্ত দূরবর্তী চিন্তার জায়গা থেকে দেখলে প্রশ্নবিদ্ধ মনে হবে। সৌম্য আর লিটনের পারফরম্যান্স খুব খারাপ তাই না? ঠিক আছে, সিরিজে তাদের রান আর মাহমুদউল্লাহ’র রান, স্ট্রাইকরেট একটু হিসাব করে দেখুন।

৭.

টি-টোয়েন্টির ৬ আর ৭ নম্বর পজিশন অত্যন্ত ক্রুশিয়াল। আফিফ, মোসাদ্দেককে দিয়ে হবে না এটা নিশ্চিত। বরং মাহমুদুল্লাহ এর একধাপ নেমে ৬ এ চলে যাওয়া উচিত, আর ৭ এ জাকির হাসান বা ইয়াসির আলি রাব্বি জাতীয় কাউকে ট্রাই করা উচিত। এমনকি সাব্বিরকে ফিরিয়ে আনলেও আপত্তি নেই।

৫ নং ফাঁকা জায়গায় আফিফ বা মোসাদ্দেককে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। কিন্তু সিনিয়র ক্রিকেটারের তকমা পেয়ে মাহমুদুল্লাহ নিজের পজিশন ছাড়বে না। এজন্যই বাংলাদেশে হাথুরুসিংহ টাইপ কড়া কোচ দরকার। রাসেল ডমিঙ্গো সম্ভবত কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে তথাকথিত সিনিয়রদের চটাতে চায় না। কিন্তু ব্যাটিং অর্ডারই বারবার ভোগাচ্ছে, সামনে আরো ভোগাবে তা খেয়াল করাটা দরকার বোধহয়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।