ভারতকে হারানো শেষে উপলব্ধিনামা

বুয়েটের সিনিয়র এবং আমার বিজনেস পার্টনার বারী ভাইয়ের সাথে বাজি ধরেছিলাম, বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টিতে অন্তত ১টা ম্যাচ হলেও জিতবে। বুয়েটের আরেক সিনিয়র নাবিল ভাই, ক্রিকেটবন্ধু ফুয়াদ ভাই, এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু আরমানের সাথে ম্যাচ চলাকালে বল বাই বল কনভারসেশন চালিয়েছি। আইসিএল এর পরে বাংলাদেশের ক্রিকেট একটা ধাক্কা খেয়েছে ধর্মঘটের কারণে।

সাকিবের নিষিদ্ধ হওয়া নিয়ে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, এবং এটাকে বরং দলের পুনর্গঠন আর পুনির্বিন্যাসের বড়ো সুযোগ হিসেবে দেখে দীর্ঘ নিবন্ধও লিখেছিলাম, এবং এটাও উল্লেখ করেছিলাম ভারতের বিপক্ষে ১টা ম্যাচ জিতলেই সাকিব ইস্যু হারিয়ে যাবে। ক্রিকেটের চাইতে ক্রিকেটারকে যারা বড়ো করে দেখে তাদের বিচার-বিবেচনার প্রতি করুণা বোধ আগেও করতাম, এখনো করি।

১.

বাংলাদেশের রোববারের একাদশে মাত্র ১টি কমতি ছিল, শফিউলের পরিবর্তে সাইফুদ্দিন থাকলেই পূর্ণাঙ্গ এক একাদশ হয়ে উঠতো। লিটন, নাঈম আর মুশফিক বাদে প্রত্যেকেই বোলিং করতে জানে। এটা বিরাট সুযোগ। অধিনায়ক যদি চতুরতার সাথে বোলিং রোটেট করে ব্যাটসম্যানের সেটেল হতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে। ব্যাটসম্যানরা যদি না ডোবায়, এবং পাওয়ার প্লে তে ওপেনাররা একটা ফ্লাইং স্টার্ট এনে দেয়, এই বোলিং দিয়ে বাংলাদেশ বেশ কিছু ম্যাচ জিততে পারবে টি-টোয়েন্টি তে।

২.

নাঈম শেখকে একেবারেই পছন্দ হয়নি। ভীষণ প্রত্যাশা নিয়ে তার ব্যাটিং দেখতে বসেছিলাম। যদিও কিছু রান করেছে, যে কোনো সময়েই আউট হয়ে যেতে পারতো। বিশেষ করে স্পিন বোলিং একেবারেই খেলতে স্বচ্ছন্দ নয়। প্রত্যাশা ছিল নাঈম শেখ সৌম্য আর লিটনকে জায়গা নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানাবে, সেটা করার মতো অবস্থায় সে এখনো নেই, আরো অনেকটা হাঁটতে হবে।

৩.

একটু অদ্ভুত ঠেকতে পারে, তবু ফার্স্ট ইনিংস বিরতিতে আফিফকে ইন্টারভিউ দিতে দেখে ত্রিদেশীয় সিরিজে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের কথা মনে পড়ে যায়। আফিফ ছেলেটা খুবই সম্ভাবনাময়, ওকে ৩ এ উঠিয়ে এনে ভবিষ্যত সিরিজগুলোতে ৬ এ নতুন কাউকে এক্সপেরিমেন্ট করা উচিত। ওর বোলিংও যথেষ্ট ইফেক্টিভ। ওর ৩ ওভার ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ভাইটাল রোল প্লে করেছে।

৪.

টি-টোয়েন্টি সিরিজের যে প্রিভিউ লিখেছিলাম সেখানে ৫ জন ক্রিকেটারের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করেছি। তার মধ্যে দুজন আমিনুল এবং আল আমিন। আমিনুলের বোলিংয়ের উপর এখনো নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট কম, তবু ছেলেটা সম্ভাবনাময়। আগামী বছর বিশ্বকাপের আগে যে ১৭/২০টা টি-টোয়েন্টি আছে, ইনজুরিতে না পড়লে প্রতিটি ম্যাচে ওকে খেলানো উচিত। এই ছেলের ম্যাচ উইনার বোলার হওয়ার সম্ভাবনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কয়েকটা ম্যাচ খারাপ করলেই যেন ড্রপ করার চিন্তা মাথায় না আসে। আল আমিন ৩ ওভার যথেষ্ট নিয়ন্ত্রিত বোলিং করেছে; উচ্ছৃঙখল না হলে সে এতোদিনে দলের অন্যতম ভরসার জায়গায় পরিণত হত। ৩ বছর বাইরে থেকে নিজেকে সে শুধরে নিয়েছে আশা করছি।

৫.

সৌম্য আজ রিভার্স শটে যেভাবে ছক্কা মারলো এটা তার সারা ক্যারিয়ারেই সম্ভবত প্রথমবার। স্পিন খেলার ক্ষেত্রে সে আগের তুলনায় ইমপ্রুভ করেছে মনে হলো। প্রথম ম্যাচটাতে যেহেতু ছন্দে ছিল, আশা করা যায় বাকি ২ ম্যাচের কোনো একটাতেও সে রান পাবে।

৬.

মুশফিকের টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং কখনোই কনভিন্সিং লাগেনি। সে যে পরিমাণ টি-টোয়েন্টি খেলেছে সে তুলনায় তার কন্ট্রিবিউশন খুবই কম। টি-টোয়েন্টিতে সে কেন স্ট্রাগল করে, এটা ভাবতে গিয়ে বারেবারে এটাই মনে হয়েছে ডট বল প্রেসারটা সে নিতে পারে না। আজ ভাগ্য সবদিক দিয়ে তার পক্ষে ছিল। যে কারণে ক্লোজ কলে আম্পায়ার অনড় থাকে, সহজতম ক্যাচ ছাড়ে ফিল্ডার। ক্রিকেট খেলাটা অনেক বেশি সিনেমাটিক; ৩ বছর আগে ঠিক ওই কাউ কর্নারেই ধরা পড়েছিল মুশফিক। তার উচিত স্টিভ স্মিথের টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং দেখা, তাহলে হয়তোবা টি২০ তে সে আরো বেটার ব্যাটসম্যান হয়ে উঠবে। টেস্ট আর ওয়ানডেতে যে দলের প্রধান ব্যাটসম্যান টি-টোয়েন্টিতে তাঁর স্ট্রাগল করাটা বেমানান ঠেকে।

৭.

লিটন দাসকে নিয়ে কিছু লেখা উচিত। অবশ্য দ্য ‘লিটন দাস ডিলেমা’ শিরোনামে দীর্ঘ এক নিবন্ধ লিখে তার সম্বন্ধে যা বলার বলেছি। সফট ডিসমিসাল দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়।একজন ব্যাটসম্যান রান না-ই পেতে পারে, রোহিত শর্মাও মাত্র ৯ রান করেছে আজ, কিন্তু তার উইকেটটা বোলারকে অর্জন করে নিতে হয়েছে। ম্যাচের পর ম্যাচ একজন ব্যাটসম্যান সফট ডিসমিসাল হলে শাস্তিস্বরূপ হলেও তাকে কিছু ম্যাচে ড্রপ দেয়া উচিত, নইলে উইকেটের মূল্য বুঝবে না।

লিটন খেলেছে মাত্র ৪ বল, মনে হচ্ছিল ফ্লাইং স্টার্ট পাবে, কিন্তু সেই পুরনো রোগ। আগামী ২ ম্যাচের কোনো একটাতে ৩৭-৩৮ করে চাকরি বাঁচানো টাইপ ব্যাটিং খুবই বিরক্তিকর। নাবিল ভাই সুন্দর একটা ফ্রেজ ব্যবহার করে- লিটন হলো নিম্নমানের আশরাফুল। তামিম ফেরত এলে আর সৌম্য কিছু রান করলেই সে যে ব্যাক আপ ওপেনার হয়ে যাবে সেটাই তার জন্য আদর্শ ট্রিটমেন্ট।৩ ম্যাচের মধ্যে ২টাতে যে ওপেনার রান করতে ব্যর্থ হয় সে দলের ওপর চাপ বাড়ায় আরো।

৮.

ভারতের ব্যাটিং যথেষ্ট শার্প হলেও বোলিংয়ে ঘাটতি স্পষ্ট। চাহাল ছাড়া বাকি বোলিং অপশনগুলো অনায়াসেই মোকাবেলা করা যাচ্ছে। রোহিত শর্মা অথবা আইয়ার যদি পরের ২ ম্যাচে উইলোবাজি করতে ব্যর্থ হয়, বাংলাদেশের সিরিজ জিতে নেয়ার সুযোগ যথেষ্ট। ৩ ম্যাচেই বাংলাদেশের উচিত একই একাদশ খেলানো।

৯.

মাহমুদউল্লাহর বোলিং রোটেশন অত্যন্ত বাজে ছিল। যখন যাকে ইচ্ছা বোলিং করিয়েছে। আমিনুল এবং আফিফ দুজনেরই বোলিং কোটা পূর্ণ করা উচিত ছিল। কিন্তু সে মাশরাফির প্যাটার্নে রেন্ডম স্টাইলে বোলার রোটেট করেছে। ম্যাচ জিতেছে বলে হয়তো ব্যাপারটা এড়িয়ে যাবে অনেকেই, কিন্তু এরকম সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলোই ডিসাইডার হয়ে উঠে। বাংলাদেশ দলে বোলিং অপশন অনেক বেশি, অধিনায়কের আরো বুদ্ধিদীপ্ত হওয়া উচিত।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।