বিচ্ছিন্ন ক্রিকেটিয় চিন্তা

ভারতের বিপক্ষে গোলাপী বলের চলতি টেস্ট দিয়েই বাংলাদেশের ২০১৯ সালের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যালেন্ডার শেষ হচ্ছে। টেস্টে বাংলাদেশকে ধুকতে দেখে বহুজন বহুভাবে লিখছেন; এগুলো আদতে সাময়িক প্রতিক্রিয়া। আমি বরং নতুন বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে কীভাবে দেখতে চাই সে বিষয়ে কিছু ভাবনা লিখতে চাইছি।

১.

আইসিএলের পর বাংলাদেশের ক্রিকেট একটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে, এখনো সেই সময়ের ক্রিকেটারদের দিয়েই চালিয়ে নিচ্ছে। ১ যুগ পেরিয়ে গেছে, এখন আবার নতুন কিছু প্লেয়ার পুল নিয়ে আসাটা এখন অনিবার্য দাবি হয়ে উঠেছে। যে কোনো সমালোচনার সময় অনেক বেশি ইস্যু চলে আসায় মূল ইস্যু কোনটি সেটিই স্পষ্ট হয় না। কখনো ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের অবকাঠামো, কখনো বিসিবির দুর্নীতি, কখনো অব্যস্থাপনা নিয়ে এতো বেশি কথা হয়, তাতে মূল প্রয়োজনীয়তা আড়ালে থেকে যায়। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রধানতম দাবি হওয়া উচিত জাতীয় দলে ক্যারিয়ার ১০ বছরের বেশি হয়েছে এমন বেশিরভাগ ক্রিকেটারের ফিটনেস, রিফ্লেক্স আর পারফরম্যান্স রিভিউ করে তাদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় জানানো, এবং কোনো পরিস্থিতিতেই তাদের আর জাতীয় দলের জন্য বিবেচনা না করা।

নতুন ক্রিকেটারদের আনলেও তাদের পক্ষে এর চাইতে খারাপ পারফর্ম করা সম্ভব নয়, বরং টি-টোয়েন্টিতে সুযোগ পাওয়া নতুন ক্রিকেটাররা দেখিয়েছে তাদের প্রতি আস্থা রাখা যেতে পারে। বাংলাদেশকে আগামী ২-৩ বছর হয়তোবা ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, তবু এই ক্রাইসিসের শেষে ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও হতে পারে, বর্তমানে যেভাবে চলছে তাতে বরং ভবিষ্যত আরো ঝুঁকির মুখে পড়ে যাচ্ছে। কাজেই যারাই ক্রিকেট নিয়ে লেখালিখি করেন তাদের উচিত অজস্র ইস্যু নিয়ে কথা না বলে কেবলমাত্র নতুন ক্রিকেটারের চাহিদাপত্র নিয়ে বেশি বেশি লেখা উচিত।

২.

বাংলাদেশে ক্রিকেটারের সংখ্যাই সীমিত, তাই ৩ ফরম্যাটের জন্য পৃথক দল গঠন একটি অবাস্তব চিন্তা। বরং লাল বল এবং সাদা বলের জন্য পৃথক খেলোয়াড়ের দল গঠন হতে পারে উপযুক্ত সমাধান। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের যা সামর্থ্য তাতে টি২০ তাদের কাছে কম ওভারের আরেকটি ওয়ানডে ম্যাচ বড়োজোর। সর্বোচ্চ ৩ জন কোর বা কমন খেলোয়াড় থাকতে পারে যারা সব ফরম্যাটেই খেলবে, বাকি সেট পুরোটাই বদলে ফেলা উচিত। অন্য দেশের উদাহরণ টেনে লাভ নেই। তাদের ক্ষেত্রে সব ফরম্যাটে খেলা খেলোয়াড়ের সংখ্যা হয়তোবা ৫-৬ জন। মাঠের ক্রিকেটের সাথে সেই দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতির গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা ভারতের ক্রিকেটারদের অভিযোজন ক্ষমতা দুর্দান্ত, খুব দ্রুতই এক ফরম্যাট থেকে অন্যটায় খাপ খাইয়ে নিতে পারে। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের স্কিলের অবস্থা খুবই খারাপ। স্কিলগত দিক দিয়ে তারা বহু যোজন পিছিয়ে। এরকম কম স্কিলের খেলোয়াড় সব ফরম্যাটে খেললে কোনো ফরম্যাটের সাথেই মানিয়ে নিতে পারে না। এজন্য দরকার ফোকাসড মাইন্ডসেট। যে লাল বলের খেলোয়াড় সে শুধু টেস্ট নিয়েই ভাববে, যে সাদা বলের তার স্কিলের সবটাই থাকবে ওয়ানডে আর টি২০ কেন্দ্রিক। এটা না হওয়া পর্যন্ত তুলনামূলক উন্নতির আশা ভীষণরকম দুরাশার নামান্তর।

৩.

হৃৎপিণ্ড ঠিকঠাক কাজ না করলে পেসমেকার বসাতে হয়। পেসমেকার বসানো হয়ে গেলে তারপর আর দোষারোপ করে ফায়দা নেই কেন পেসমেকার বসানো হলো। যে কোনো দেশের জনপ্রিয় খেলার ধারাক্রম পর্যবেক্ষণ করলে সেই দেশের গড়মানুষের চিন্তাধারা অনেকটাই আঁচ করা যায়। এদেশের হৃৎপিণ্ডে পেসমেকার বসানো, প্রতিটি ক্ষেত্রে অসঙ্গতি। ক্রিকেট খেলা এবং প্রশাসনের সাথে যারা জড়িত তারা কি এলিয়েন কেউ, তারা কি পেসমেকারের বাইরে? পেসমেকার বসানো মানুষের জীবনপ্রণালি পরিপূর্ণ সুস্থ্য কারো জীবনের সাথে মিলবে না, তাদের দেখে হাহুতাশ করাও অনুচিত। এইচপি টিম, ইমার্জিং টিম, ‘এ’ দল, অনুর্ধ্ব-১৯ প্রভৃতির পেছনে বিনিয়োগ সেই পেসমেকার নীতিরই বাস্তবায়ন।

বাংলাদেশে ক্রিকেট দুটি সুস্পষ্ট ধারায় বিভক্ত- ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঘরোয়া থেকেই কোয়ালিটি ক্রিকেটার প্রস্তুত করার কথা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য। কিন্তু ঘরোয়া যেহেতু আন্তর্জাতিক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন, ঘরোয়া ক্রিকেট আয়োজন হয়, আমার ধারণা, মূলত বিভিন্ন কালো টাকা সাদাকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের উদ্দেশ্য রেভিনিউ জেনারেট। দুটোর উদ্দেশ্যগত ভিন্নতা যেহেতু প্রচুর, আগামী ২০ বছরেও ঘরোয়া ক্রিকেটে মাত্রাগত পরিবর্তন আসবে না এটা নিশ্চিত, বাংলাদেশী বাস্তবতায় তার প্রয়োজনও কম। বিসিবির বিনিয়োগকৃত দলগুলোই যেহেতু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম, এই দলগুলোর পেছনে আরো বেশি ম্যাচ বরাদ্দ দেয়ার জন্য আমরা লিখতে পারি, এবং এই দলগুলোতে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের পারতপক্ষে না খেলানোই মঙ্গলজনক হবে।

জাতীয় দলের কাউকে খেলানো মানে সেখানে একজন অপরীক্ষিত ক্রিকেটারের পরীক্ষার সুযোগ কেড়ে নেয়া। ইমার্জিং দলে ২৩+ বয়সী ৪জন ক্রিকেটার রাখার নিয়ম ছিল, সে হিসেবে সৌম্যকে খেলানোতে টেকিনিকাল বাধা নেই কোনো, কিন্তু দুটো বিশ্বকাপ খেলা একজন ক্রিকেটারের বয়স যা-ই হোক তাকে ইমার্জিং বলা যায় না কোনোভাবেই। এসব দলের বিপক্ষে পারফর্ম করে সৌম্যের মধ্যে ফলস কনফিডেন্স তৈরি হবে যা তার আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে। জাতীয় দলে অফফর্মে থাকা ক্রিকেটারকে বড়োজোর ‘এ’ দলে খেলানো যেতে পারে, কিন্তু তাকে যদি এইচপি বা ইমার্জিং দলে খেলানো হয় সেটা এক ধরনের ডিমোশন।

৪.

মুশফিকুর রহিম কেন ৫ এ ব্যাট করে এটা খুব ভ্যালিড কোনো প্রশ্ন মনে হয় না, টেস্টে ৪ আর ৫ খুব বড়ো স্কেলে ম্যাটার করে না। ওপেন আর ৩ যেমন অনেকটা কাছাকাছি, ৪ আর ৫ও তাই। মুশফিক ৬ থেকে উপরে উঠে এসেছে এটাই যথেষ্ট। আসলে প্রশ্নটা হওয়া উচিত ছিল মিঠুন কেন ৪ নম্বরে। মিঠুনকে দেখে আমার যা ধারণা জন্মেছে, সে মাঠের বাইরে প্রচণ্ড সিরিয়াস এবং নেটে হয়তো অসম্ভব ভালো ব্যাটিং করে যেটা তার ব্যাপারে কোচদের মধ্যে পজিটিভ ইমপ্রেসন তৈরি করে।

পরপর ২ জন কোচ একই প্লেয়ারকে নিয়ে একই ভুল জাজমেন্ট করার কোনোই কারণ থাকতে পারে না। মাঠের বাইরে এরকম সিরিয়াস এবং নেটে দুর্দান্ত ব্যাট করা একজন মূল ম্যাচে কেন খাবি খায় সেটা বোঝার জন্য হলেও সম্ভবত কোচরা তাকে আরো সুযোগ দিতে চায়। কিন্তু মিঠুনের ফার্স্ট ক্লাস এভারেজ, লিস্ট এ এভারেজও সন্তোষজনক নয় কেন এই ব্যাপারটি নিয়ে কোচরা ইনভেস্টিগেট করলেই হয়তোবা নিশ্চিত হতে পারতো, সমস্যাটা সক্ষমতার। যেমন নাজমুল হোসেন শান্ত জাতীয় দলের বাইরে যেখানেই সুযোগ পায় পারফর্ম করে, মোসাদ্দেকের ফার্স্ট ক্লাস এভারেজও প্রশংসনীয়। মূল দলে তাদের পারফরম্যান্স নেই সেভাবে।

তার মানে এই ব্যাটসম্যানদের ক্যালিবার আছে, কোনো কারণে মূল মঞ্চে পারছে না। সময় দিলে এদের পেছনে সময় দেয়া উচিত। মিঠুনদের পেছনে সময় দিয়ে রেজাল্ট আসবে না, যে ব্যাটসম্যান কোনো পর্যায়েই চোখে পড়ার মতো পারফর্ম করে না,বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পারফরম্যান্স দেখায় তার কাছ থেকে কতটুকুই বা প্রাপ্তি আসতে পারে। বাংলাদেশের দরকার একজন সলিড নাম্বার ৪, এর আগে এক ইন্টারভিউতে পড়েছিলাম মুশফিকের পছন্দের ব্যাটিং পজিশন ৫; মানুষ যতই বলুক মুশফিক টেকনিকালি সলিড, পেস আর সুইংয়ের বিপক্ষে তাকে আমার নড়বড়েই লাগে, সেক্ষেত্রে সে যদি ৫ এ খেলে খেলুক, ৪ নম্বরে মিঠুনদের মেনে নেয়াটা কঠিন।

ধরা যাক, এই মিঠুনই যদি টানা ২ ইনিংসে ফিফফি করে মুশফিক কেন ৫ নম্বরে এ নিয়ে কারো কোনো প্রশ্নই থাকবে না। মিঠুনের সেই সামর্থ্য নেই বিধায়ই ভুলক্রমে রাগ গিয়ে পড়ে মুশফিকের উপর৷ বাংলাদেশেফ উচিত পজিশন অনুসারে খেলোয়াড় বাছাই করা। যেমন ৩ এ খেলার মতো ৩ জন, ৪-৫ এ খেলার মতো ৪ জন, নতুন বলে বোলিংয়ের জন্য ৪-৫ জন। তাহলেই কেবল সমস্যার বাস্তবভিত্তিক সমাধান এপ্রোচ সম্ভব।

৫.

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রধানতম সংকট মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। টেস্ট থেকে সে হয়তো এই ম্যাচের পরই বাদ পড়ে যাবে, সেটা নিয়ে ভাবছি না৷ কিন্তু সে সাদা বলের ক্রিকেটে এখনো রাজত্ব করার মোডে আছে, যেটা দলের ভারসাম্য নষ্ট করার পাশাপাশি নতুন ক্রিকেটারদের জায়গা পাওয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বা করবে। মাহমুদউল্লাহ’র বয়স হয়ে গেছে; ফিটনেস এবং রিফ্লেক্সের অবস্থা যাচ্ছেতাই৷ রানিং বিটুইন দ্য উইকেট আগে থেকেই বাজে। স্পোর্টস কখনো অতীত ইতিহাস দিয়ে চলে না।

একজন ক্রিকেটারের রিফ্লেক্স আর ফিটনেস সমস্যা দেখা দিয়েছে লক্ষ্য করলেই বুঝতে হবে বয়স তাকে পেয়ে বসেছে, এবার তাকে ছেড়ে দিতে হবে। পক্ষান্তরে ক্রিকেট খেলাটা একজন ক্রিকেটারের একমাত্র জীবিকা, আরেকটু ভালো থাকার জন্য নিজের অবস্থানকে সুসংহত করতে চাইবে যে কোনো চাকরিজীবীই, কর্তৃপক্ষের বুঝতে হবে কাকে দিয়ে তার চাহিদা সবচাইতে ভালোভাবে পূরণ সম্ভব। প্রশাসক যদি আমজনতার কাঠামোতে চিন্তা করে, সেটা সমস্যা। মাহমুদউল্লা’র যা ক্যালিবার তাতে সে ওয়ানডেতে একজন কাজ চালানোর মতো, বা কিছুক্ষেত্রে ইফেক্টিভ ক্রিকেটার ছিল ২০১৭ পর্যন্ত। মুশফিক যদি একটানা ৫ বছর টেস্টের অধিনায়কত্বে না থাকতো, তার টেস্ট ক্যারিয়ার আরো ৫-৭ বছর আগেই শেষ হয়ে যেত।

কিন্তু অনেকটাই মিডিয়ার কল্যাণে সে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সত্যিকারের বিগ ফোর ( সাকিব, মাশরাফি, তামিম, মুশফিক) এর কাতারে চলে এসে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। সে নিজেও হয়তো বুঝতে পারছে শরীর আর আগের মতো চলছে না এবং এই পর্যায়ে দলের বাইরে গেলে সে আর ফিরতে পারবে না। টেস্ট ক্যারিয়ার শেষ এটা হয়তো সে মেনেই নিয়েছে। কিন্তু সাদা বলের ক্রিকেটে যতটা সম্ভব ক্যারিয়ার লম্বা করতে হবে তাকে। একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দলে তার রোল ছিল ইউটিলিটি ক্রিকেটার যে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিং দিয়েও সাপোর্ট দিবে। মাঝে কিছুদিন সে মেকশিফট ফিনিশারের দায়িত্ব নিয়েছিল। কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সে নিজের মূল পরিচয়েই প্রত্যাবর্তন করতে চাইছে, কোনো ইউটিলিটি ক্রিকেটার পারফর্ম করলেই তাকে রিপ্লেস করে ফেলবে এই আশংকা বা আতংকের কারণে ওই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সকল ক্রিকেটারই তার জন্য থ্রেট। সাদা বল এ ইউটিলিটি ক্রিকেটার হওয়ার মতো আছে আপাতত ৩ জন- সৌম্য, আফিফ, মোসাদ্দেক।

এর মধ্যে সৌম্য টপ অর্ডারে খেলে আর পেস বোলিং করে বলে সে থ্রেট নয়। মূল থ্রেট মোসাদ্দেক আর আফিফ, বিশেষত জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে ৮ এ নেমে আফিফের ফিফটি করার পর এবং তার ফিল্ডিং, ফিটনেস যথেষ্ট ইম্প্রেসিভ হওয়াতে সে-ই মূল থ্রেট। যে কারণে মাহমুদুল্লাহ এর অধিনায়কত্বকালে আফিফ কখনোই ৬ এর উপরে ব্যাট করতে পারবে না। একমাত্র তখনই সম্ভব হতে পারে যদি ৬ বা ৭ এ সে কয়েকটা ম্যাচ উইনিং ইনিংস খেলতে পারে। সাকিব না থাকায় আফিফ হয়তো বাদ পড়বে না, কিন্তু তাকে আন্ডার পারফর্ম করানোর পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে।

একা আফিফ নয়, মাহমুদুল্লাহ অধিনায়ক থাকলে ইউটিলিটি ক্রিকেটার হওয়ার মতো স্পিনিং অলরাউন্ডার প্রায় প্রত্যেকেই মিসইউজ হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে৷ মাহমুদুল্লাহকে আমি ভিলেন বলবো না, তার যা ক্যালিবার তাতে এ+ ক্যাটেগরিতে বিপিএল খেলার প্রশ্নই উঠে না, সেটা যেহেতু হচ্ছে, নিজের পথ চলাকে মসৃণ করতে রাজনীতি সে করবেই, তার জায়গায় যে কোনো মানুষই করতো। কিন্তু প্রশাসকদের বুঝতে হবে বুড়ো ঘোড়া দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে আর ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়। একজন ক্রিকেটার অস্ত্র জমা দেয়, ট্রেনিং কখনোই নয়। একযুগ আগে খেলা ছাড়া আকরাম খানও ৩ মাস প্র‍্যাকটিস করলে আবারো আবারো প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে খেলতে পারবে, ১০ ম্যাচের ১-২ টাতে রান করতে পারবে, যেহেতু তার কোয়ালিটি ছিল, কিন্তু তাতেই কি প্রমাণিত হবে সে ইন্টারন্যাশনালে খেলার উপযুক্ত?

মাহমুদউল্লাহ অত বয়স্ক হয়নি, তাই সে হয়তো আকরামের চাইতে সামান্য বেটার পারফর্ম করবে, তাতেই তার এপ্রোচ, এবং ক্ষিপ্রতা হারানোর প্রসঙ্গটা বাতিল হয়ে যায় না। বিশ্বকাপের পরপরই যেখানে তাক্র বাদ দেয়া উচিত ছিল, সেখানে টি২০ দলের অধিনায়ক বানানো, পরবর্তীতে ওডিআইয়ের অধিনায়কত্বের জন্য বিবেচনায় আনা মানে ক্রিকেটের পশ্চাদমুখীতা নিশ্চিত করা। আমি খুব করে চাইবো ২০২০ এর প্রথম সিরিজ থেকেই একজন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদমুক্ত বাংলাদেশ দল।

৬.

বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের স্কিল এত কম কেন এটা খুবই জরুরী এক আলোচনা হতে পারে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের যেতে হবে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা, ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে, এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে। কীভাবে ব্যালেন্সড এবং ডেডিকেটেড কর্মী তৈরি করা যায় পৃথিবীর প্রতিটি দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা ডিজাইনই করা হয় সেই লক্ষ্য নিয়ে। শিক্ষা ব্যবস্থা আদতে ম্যান ম্যানেজমেন্ট কৌশলের অতিরিক্ত কিছু নয়। কিন্তু কোন পদ্ধতিতে মানুষকে উৎকৃষ্টভাবে ম্যানেজ করা যায় সে ব্যাপারে বিজ্ঞান এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইন তৈরি করতে পারেনি, অদূর ভবিষ্যতেও পারবে না।

যে কারণে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের কালচারের সাথে সাথে শিক্ষা ব্যবস্থাও পুরোপুরি আলাদা। বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত মনে করছে তথ্যভিত্তিক পড়াশোনাই হিউম্যান ম্যানেজমেন্টের জন্য যথেষ্ট, স্কিল বলতে তারা বুঝছে কেবলমাত্র টেকনিকাল স্কিল যা হাতে-কলমে কিছদিন প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই রপ্ত করানো সম্ভব। স্কিল সংক্রান্ত অমার্জনীয় ভুল কনসেপ্টের কারণে এদেশের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলো ভয়ানকভাবে ফেইল করছে, কোয়ালিটি আউটকাম প্রায় নেই বললেই চলে।

স্কিলের ৩টি ধাপ রয়েছে- প্রথমত গ্রেটার আন্ডারস্ট্যান্ডিং যার মাধ্যমে স্কিলটা কেন জরুরী যা আমার জীবনযাপনে এবং ধ্যান ধারণায় মাত্রাগত কী বা কতটুকু পরিবর্তন আনবে সে সংক্রান্ত কংক্রিট উপলব্ধি তৈরি করা এবং নিজে সে ব্যাপারে কনভিন্সড হওয়া। দ্বিতীয়ত, মোল্ডিং যার মাধ্যমে ব্যক্তিসত্তার অভ্যন্তরীণ কাঁচামালগুলোর মেরামত হবে। একে এক কথায় সফটস্কিল বলা যায়। তৃতীয়ত ইমপ্লিকেশন যা এপ্লাইড ভারসন, যেখানে স্কিলটির দৃশ্যমান প্রদর্শনী থাকে। এটাই টেকনিকাল স্কিল।

বাংলাদেশের স্কিলভিত্তিক প্রশিক্ষণের মূল সমস্যা এখানে স্কিলের প্রথম দুটি ধাপকে ন্যূনতম বা একেবারেই গুরুত্ব না দিয়ে সরাসরি ৩য় ধাপে সময়, এনার্জি, রিসোর্স বিনিয়োগ করে। যে কারণে স্কিলমনস্কতাও আদতে কেরানিগিরি হয়ে উঠে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে গড়ে আমাদের স্কিল নিম্নমানের হওয়ার মূল কারণও কেরানিগিরি। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা কেবল সেই মুখস্থ ফরমুলাতেই নিপুণভাবে ফিট করে গেছে মাত্র। যতদিন পর্যন্ত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তথ্যভিত্তিক পারঙ্গমতাকে কম গুরুত্ব দেয়া না হচ্ছে, স্কিলের প্রথম দুই ধাপকে আত্মস্থ করা জরুরী মনে করা হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত শুধু ক্রিকেট কেন যে কোনো সেক্টরই কালেক্টিভ বা সমন্বিত হতাশার প্রতিরূপ হয়ে থাকবে।

৭.

দৃষ্টিনান্দিকতা আর ক্যালিবার সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার৷ কারো দৃষ্টিনান্দিকতা দুর্দান্ত হতেই পারে, তাতেই সে প্রতিভাবান হয়ে যায় না, আবার কারো ক্যালিবার দুর্দান্ত হলেই সে দৃষ্টিনান্দনিকতার শর্ত পূরণ করবে তেমনটা নাও হতে পারে। ক্যালিবার মৌলিক চাহিদার মতো, দৃষ্টিনান্দনিকতা শখ। এই প্রসঙ্গটা আনলাম লিটন দাসকে বোঝানোর প্রয়োজনে।

৯৬ সাল থেকে আমি বহু ব্যাটসম্যান দেখেছি, ক্যালিবার সম্পন্ন অনেকের ব্যাটিং দেখেছি নাওয়া-খাওয়া ভুলে, তবু লিটন দাসের মতো দৃষ্টিনান্দনিক ব্যাটসম্যান একজনও দেখিনি। লারা, শচীন, ডিসিলভা, পন্টিং, কোহলি, রোহিত শর্মা— নাহ, কেউই লিটন দাস পর্যায়ের দৃষ্টিনন্দন নয়। একটা সময় পর্যন্ত মার্ক ওয়াহকে রাখতাম লিস্টে, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যখন বুঝতে পেরেছি লিটনের ক্যালিবার সীমিত, সেই অর্থে সে কখনোই গ্রো করবে না বা কনভারশন বাড়বে না, তার ক্যালিবার গড়ে ৩০-৩৫ রান পর্যন্তই, তখনই উপলব্ধি করলাম সে এমনকি মার্ক ওয়াহ এর চাইতেও দৃষ্টিনন্দন। ব্যাটসম্যানদের মধ্যে মুশফিক, লিটন আর বোলারদের মধ্যে আমিনুল, আল আমিন – কেবলমাত্র এই ৪ জন ক্রিকেটারকেই লাল-সাদা দুই ফরম্যাটে খেলানো যেতে পারে।

লিটনের সামর্থ্য যেহেতু বুঝেই গিয়েছি, এবং তার প্রতি প্রত্যাশাও প্রত্যাহার করে নিয়েছি, তবু তাকে দলে দেখতে চাওয়াটা কি হিপোক্রেসি? আমার জন্য গুরুতর প্রশ্ন হলো- মৌলিক চাহিদা পূরণ করবো, নাকি শখ পূরণ করবো? তখন গাণিতিকভাবে হিসাব করলাম। লিটন যদি ৩ ম্যাচের টি২০ তে যথাক্রমে ১৯, ৭, ৩৭ করে গড় হয় ২১, এবং বল খেলে ৪৫টি, স্ট্রাইকরেট হবে ১৪০; এটা টি২০ এর জন্য বেশ ভালোমতোই চলে। ২য় আর ৩য় সিরিজ মিলিয়ে ২টা ফিফটি করলে সেসব ২ ম্যাচে বাংলাদেশ জিতবে।

ওয়ানডেতে ৩ ম্যাচের ১টাতে ৪১, ১৭, ৯ করে গড় হয় ২২.৩৩, পরের ২ সিরিজে ১টা সেঞ্চুরি করলে ম্যাচটা উপভোগ্য হবে। তবু ওয়ানডেতে এই পারফরম্যান্স দিয়ে টপ অর্ডারে চলবে না, সেক্ষেত্রে বিশ্বকাপের মতো ৫ নম্বরে নামিয়ে দেয়া যেতে পারে। টেস্টে যদি ব্যাটিং পজিশন ৭ এর বদলে ৬ করা হয় আটসাঁট ফিল্ডিং আর পুরনো বলের সুযোগ নিয়ে রান করার সম্ভাবনা বাড়বে। ভারতের বিপক্ষে যে ৩টা ইনিংস খেলেছে চলতি সিরিজে, রান বেশি না করলেও সে-ই একমাত্র চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছিল। ফলে মৌলিক চাহিদাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেও শখ পূরণ করা যায় আসলে।

৮.

নাঈম হাসান ছেলেটাকে বেশ ভালো লাগে৷ মিডিয়াম্যান মিরাজের কারণে সে ঠিকমতো সুযোগ পাচ্ছে না। গতকালের টেস্ট দেখে আশাবাদী হলাম। মিরাজ এদেশের হাজারো অযোগ্য মানুষের প্রতিভূ যারা নিজেদের সামর্থ্য বুঝতে পেরে টিকে থাকবার প্রয়োজনে ক্ষমতাবানদের মোসাহেবগিরি করে। মিডিয়া মিরাজকে ভবিষ্যত অধিনায়ক পর্যন্ত বানিয়ে দিয়েছে, ১৯ বছরে বাংলাদেশের সেরা টেস্ট একাদশেও তাকে অনেক প্রাক্তন অধিনায়ক জায়গা দিয়েছে, অথচ তার ক্যারিয়ার এখনো প্রায় পুরোটাই বাকি। তার জায়গা পাওয়াই বুঝিয়ে দেয় ক্রিকেটপ্রজ্ঞা আর সামর্থ্যে আমাদের অবস্থান কতটা তলানীতে। আগামী বছরের সবগুলো টেস্টে নাঈমকে মূল স্পিনার হিসেবে সুযোগ দেয়া হোক।

৯.

মুস্তাফিজ একজন আদ্যন্ত খ্যাপ খেলোয়াড়। যে পেসারের স্টক ডেলিভারি কাটার, সে যে ইন্টারন্যাশনাল সার্কিটে ৩ বছরের বেশি সারভাইভ করতে পারবে না এটা একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়। ২০১৭ এর বইমেলাতে ‘কাটারমাস্টার মুস্তাফিজ’ নামের বই চোখে পড়ার পরই নিশ্চিত হই মুস্তাফিজের মেয়াদ শেষ। ইত্যাদিতে আকবর নামে এক রিক্সাচালক শিল্পী কিশোর কুমারের গান গেয়ে পরিচিতি পায়, একক এলবাম প্রকাশিত হয়, নায়িকা পূর্ণিমার সাথে মিউজিক ভিডিও করে। শুনেছি বিদেশে প্রোগ্রাম করতে গিয়ে সে পালিয়ে যায়, সত্যমিথ্যা জানি না। সে রিকশা চালানো থেকে মুক্তি পেয়েছে।
মুস্তাফিজের ঘটনাটাও আকবরে মতোই। ক্রিকেট খেলে সে দারিদ্র ঘুচিয়েছে, হয়তোবা এলাকায় প্রচুর জমি কিনেছে, কিংবা চিংড়ি ঘেড়ের ব্যবসা করে, বা ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনেছে; তার আর জীবনে বড়ো কোনো স্বপ্ন থাকার কথা নয়। ক্রিকেট খেলাটা আমাদের কাছে বিনোদন, তার কাছে দারিদ্রবিমোচনের মিডিয়াম বা মিশন। সুতরাং আমাদের আর তার ক্রিকেট দর্শন আলাদা। সে ইতিমধ্যেই ৪ বছর সার্ভিস দিয়ে ফেলেছে; পুরো কাঠামো না বদলালে তার থেকে আর পাওয়ার কিছু নেই। এবং সে যে ধরনের ব্যক্তিত্ব বিলং করে কাঠামোর আমূল পরিবর্তন অসম্ভব।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।