হাই প্রোফাইল বাবা-মা, আপনাদের বলছি!

ইয়াবা-কে যে ‘বাবা’ বলা হয় এটা আমি প্রথম জেনেছি একটা ইন্টারন্যাশনাল বোর্ডিং ইনস্টিটিউশনে রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসার হিসেবে কাজ করতে যেয়ে। প্রথম একমাস ওই স্কুলে আমার পুরুষ সহকর্মী চিকিৎসক এবং মেইল-ফিমেল নার্সসহ হেলথ স্টার্ফরা খুবই পেইন দিচ্ছিল আমাকে ।

একেবারেই সহযোগীতা করতো না কাজে। বারবারই বলতো, ‘ম্যাম আপনি তো এখানে বেশিদিন টিকতে পারবেন না। যেই বজ্জাত পোলাপাইন সব। বড়লোকের বদ , বেয়াদব পোলাপাইন। টাকার উপরে শুয়ে থাকে। কথা শোনে না।’

ইত্যাদি। রোজ শুনছিলাম তখন।

‘বাবা’ খেয়ে বাচ্চারা ইনফারমারিতে (হেলথ সেন্টারে) এসে ঘুমাচ্ছে, ক্লাস বাঙ্ক করছে , ডর্মে ঘুমিয়ে থাকছে, স্পোর্টসে যাচ্ছে না, সিক লিভ চাচ্ছে ইত্যাদি শুনতে শুনতে অস্থির হচ্ছিলাম। ‘বাবা কি?’ – জিজ্ঞেস করলে আমার সহকর্মী হাসতো। কয়েকদিনের মধ্যে জানলাম এটা ইয়াবা।

পরবর্তীতে আমার চাকরীকালীন পিরিয়ডে ঐ ইন্সটিটিউটে প্রায় জিরো পার্সেন্ট ছিল বাচ্চাদের ক্লাশ বাঙ্ক করার প্রবণতা । সত্যিকার অসুস্থ নাহলে কাউকেই অ্যালাউ করতাম না ইনফারমারিতে। অথরিটি খুব প্রশংসা করেছিল সেজন্য। আমি কখনোই বাচ্চাদের বকতাম না।

আবার অকারণ প্রশ্রয়ও দিতাম না যাতে সিক লিভ চাইতে পারে। ওদের সাথে সহজ একটা সম্পর্ক ছিল আমার। আমি ওদের শিক্ষক ছিলাম না বলে আমাকে ভয় করত না। ভালোবাসত, সম্মান করত। সহজেই শারীরিক মানসিক সমস্যা শেয়ার করে ফেলতো।

যাই হোক, আমার একটা নিজস্ব থিওরি আছে জব নিয়ে। যেহেতু আমি সরকারি ডাক্তার না। এবং আমাকে শুধুমাত্র টাকার জন্যই চাকরি করতে হবে এরকমও না। আমি আসলে খুব ভালোবাসার জায়গা থেকেই ডাক্তারী পেশাতে এসেছি। তাই আমি আমার পেশাগত জীবনটাকে পুরোপুরি উপভোগ করতে চাই।

গত আট দশ বছরে মেডিকেল কলেজের লেকচারার থেকে শুরু করে দেশের প্রথম সারির দুটো এনজিও, কর্পোরেট সেক্টর, হাসপাতাল কোথায় কাজ করিনি আমি? একমাত্র রোহিঙ্গা ক্যাম্পটাই মনে হয় বাকি আছে। সব অফিসেই প্রথম এক থেকে দেড় মাস আমি ‘বলি কম শুনি বেশি, লক্ষ্য করি তার থেকেও অনেক বেশি’ এই থিওরিতে চলি। তৃতীয় মাস থেকে আমি আমার যা যা দেবার অফিসকে তা দিতে শুরু করি।

আমি সাধারণত কর্পোরেট জবে কন্ট্রাকচুয়ালি জয়েন করি। কারণ কর্পোরেট সেক্টর ঠিক হাসপাতালের মতো কাজ করে না। আমি হাঁপিয়ে উঠি ডেস্ক ওয়ার্ক বেশি করলে। এই ইনস্টিটিউটের কাজের ধরনও মূলত ডেস্কওয়ার্ক টাইপ ছিল। এমপিএইচ করা ছিল বলে এখানে ঢোকা আমার । এই ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে আমার চুক্তি ছিল এক বছরের। এই এক বছরে আমি লাইফ টাইম কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আপনাদের শুনতে কষ্ট হলেও সত্যটা হচ্ছে গ্রেড সেভেন থেকে টুয়েলভ এর বাচ্চাদেরকে ইয়াবা নিতে শুনেছি। পর্ণ অ্যাডিক্টেড বাচ্চা দেখেছি।

পর্ণ অ্যাডিক্টেড বাচ্চার গল্পটা আজ বলি। এটাকে একটা কেস স্টাডি হিসেবে নেবার জন্য অনুরোধ রইলো সবার প্রতি। কেউ বাচ্চার বা স্কুলের পরিচয় জানতে চেয়ে বিব্রত করবেন না আমাকে। যতদিন আমার জব কন্ট্রাক্ট ছিল ততদিন কন্ট্রাক্ট মোতাবেক এসব কেইস নিয়ে পাবলিকলি বলার উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ছিল আমার উপর।

এখন যেহেতু সেখানে আর নেই আমি তাই লিখতে বাঁধা নেই আর। কিন্তু একজন চিকিৎসক হিসেবে সারাজীবন পেসেন্টের প্রাইভেসি মেইনটেইন করাই আমার পবিত্র দায়িত্ব।হয়তো কখনোই এসব কেইস হিস্ট্রি নিয়ে আমি লিখতাম না। আজকে লেখার কারণ আমাদের বর্তমান সামাজিক দুর্দশা। এসব দেখে তাগিদ দিল মন লেখার জন্য।

একটা বাচ্চা ছিল আমাদের কেইস। ওর ফাইল ঘেঁটে দেখলাম সে গ্রেড সিক্স থেকে পর্ণের নেশায় বুঁদ। একজন সিনিয়র মহিলার সাথে ওর অ্যাডাল্ট চ্যাট সার্চ ইঞ্জিনে পাওয়া যেত নিয়মিত। আইটি ডিপার্টমেন্ট থেকে বারবার অ্যালার্ট করার হলেও লাভ হতো না। ওর ল্যাপটপ সিজ করা হলেও কিছু হতো না। ক্লাশ টাইমে ওদের ল্যাপটপ লাগতোই।

ওই বাচ্চা ক্লাশে বসেই টিচারের সামনেই পর্ণ সার্চ করতো। কি সব প্রক্সি সাইট দিয়ে সে এসবে ঢুকত। স্কুলে তো পর্ণ সাইট ক্লোজ থাকতো। কিন্তু আজকালকার বাচ্চারা এত ভয়াবহ স্মার্ট! পরবর্তীতে প্রায় দু’বছর চেষ্টা করেও যখন স্কুল থেকে টিচাররা, ডম মাস্টাররা, হিলথ টিম ব্যর্থ হলো ওকে কারেকশন করতে তখন ছেলেটাকে টিসি দেয়া হলো স্কুল থেকে। কারণ স্কুলে অন্য বাচ্চাদের ইস্যুটাও ভাবতে হয়।

ছেলেটার চেহারা চোখে ভাসে এখনো। এত মায়া ভরা মুখটা। এত ভদ্র তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। দেখে কিছুতেই বোঝা সম্ভব না যে সে কি ভয়ংকর নেশার ফাঁদে আটকে গেছে। ওর ফ্যামিলি হিস্ট্রি পড়ে জেনেছি মা বাবা দুজনই হাই প্রোফাইলধারী। ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত।

মাসের অর্ধেক দিন দেশে থাকলে বাকী অর্ধেক থাকেন দেশের বাইরে কাজের জন্য। বাচ্চাটা ছোট থেকেই গর্ভনেসের কাছে মানুষ। এমনকি স্কুলে যখন প্যারেন্টস ডে হয় তখন এই বাচ্চার বাবা মা আসতে পারেন না। সময়ের অভাবে । ম্যানেজার বা ড্রাইভারকে পাঠান তাঁরা।

বাচ্চাটার বাবা মা বিদেশ থেকে প্রতিবারই নতুন নতুন গ্যাজেটসহ দামি দামি গিফট আনে ওর জন্য। তিন বছর বয়স থেকেই ও নেট সার্ভ করে। ওর মা প্রথম নোটিশ করে ছেলের পর্ণ অ্যাডিকশন। তখন ওর বয়স ১১! মাথায় আকাশ ভেঙে পরে তাঁর।

বাবা-মা দু’জনে মিলে সিদ্ধান্ত নেয় ওকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হবে। অনেকের মাঝে থাকলে নেশা কেটে যাবে। কিন্তু না তা হয় নি। ১৪ বছর বয়সে ওর চ্যাট পার্টনার ছিল একজন বিবাহিত মহিলা। ভিডিও চ্যাট পর্যন্ত হতো তাদের।

চিকিৎসক হবার সব থেকে বড় সমস্যা কি জানেন? আমরা পারি না রোগীকে ঘৃনা করতে। আমাদের মন থেকে কিছু কিছু কেস কখনোই মুছে যায় না। ফারজাদকে ( অবশ্যই ছদ্ম নাম) একদিন হেলথ সেন্টারে আমার চেম্বারে সামনে বসিয়ে ঘাড়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলাম, ‘আব্বু, খুব কি দরকার নেটে এই সাইটগুলোতে ঢোকা ? তুমি এত ব্রেইনি। একটু পড়লেই সব পার । আরো একটু লেখাপড়া করলে তুমি কনফার্ম বাইরের ভালো কোন ভার্সিটিতে স্কলারশিপ পাবে। খেলাধুলো কর। শরীর ভাল লাগবে। এত ঘুম পাবে না। জীবনটা কত সুন্দর হবে। তাছাড়া ভালবাসতে হলে এমন কারো সাথে করা কি ভালো না যার সাথে দীর্ঘদিন করা যাবে। এই যে আন্টির বয়সী যাকে তুমি ভালবাসছে, ওনার সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক কি হবে বল?’

আমাকে চমকে দিয়া ফারজাদ বললো, ‘আমি তো ওনাকে লাভ করি না। অ্যাকচুয়ালি আমি কাউকেই লাভ করি না। ভাল লাগে তাই ওনার সাথে চ্যাট করি। দ্যাটস ইট। ট্রাষ্ট মি, নাথিং মোর!’

– ওকে বাবা। দেখ স্কুলে তো এসব অ্যালাও করবে না। আর তাছাড়া বাবা মায়ের কথাও ভাব। রোজ রোজ কমপ্লেইন যাচ্ছে। ওনাদের কি ভাল লাগে এসব বল? তাঁদের তো কষ্ট হয়। সন্তানের জন্য ছোট হতে হচ্ছে ওনাদেরকে। তোমার জন্য কত কষ্ট করেন ওনারা।

– না ডক্টর মিস ওনাদের জন্য কোনো ফিলিংস নেই আমার জন্য। দে ওয়ার্ক ফর দেম, নট ফর মি। দে আর বিজি অন দেয়ার লাইফ। দে হ্যাভ নো টাইম ফর মি। দে আর সেলফিস। দে অনলি নিড মাই রেজাল্ট।

নিতে কষ্ট হচ্ছিল বাচ্চাটার এই কঠিন কথাগুলো। তবুও শুনতে হলো। একবার ইচ্ছে হচ্ছিল বাচ্চাটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর সমস্ত শূণ্যতা দূর করে দেই। আমার ছেলের মুখটা চোখের সামনে চলে এসেছিল। এখন লিখতে যেয়েও চোখ ঝাঁপসা হচ্ছে আমার।

আমরা যারা বাবা মা তাদেরকে একটা কথা বলতে চাই – শুধু জন্ম দিলেই হবে না, সন্তানের সাথে জড়িয়ে রাখুন নিজেকে, ওদের ছোট বুকটার ভেতরে কান পেতে শুনুন ওদের হার্টের ধুঁকপুঁকানি,ছোট্ট হাতটা ধরে বসে থাকুন মিনিটখানেক, সন্তানের গায়ের গন্ধ বুকে টেনে নিন, কত কথা ওদের চোখে বোঝার চেষ্টা করুন প্লিজ।

মা বাবাদের বোঝা দরকার সন্তান শুধু দামি দামি পোশাক, খেলনা, খাবার, গ্যাজেট চায় না। ওরা মা বাবার কাছে খানিকটা সময়ও চায়। এটাই ওদের জীবনের সব থেকে দামি গিফট।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।