এই গল্পটা সাকিবের

এইতো সেদিন আমি খুব কেঁদেছিলাম! আসলে কাঁদতাম না। আমার তো এমন কান্না আসেনা সহজে, এর আগে শেষ কবে কেঁদেছিলাম মনেও নেই! মুশফিক ভাই কাঁদতে কাঁদতে কোত্থেকে এগিয়ে এসে আমায় জড়িয়ে ধরল। নিজেকে আর সামলাতে পারিনি, চোখে পানি এসে গেছে। চোখের পানি ঢাকতে মুখে হাত দিলাম, জার্সিতে মুখ লুকালাম! পাশে দাঁড়িয়ে আছে বন্ধু তামিম, সে নির্বাক। নাসির, বিজয় ওদের চোখেও জল। দূরে দেখলাম মাশরাফী ভাই বসে আছে বিষণ্ণ মনে; তার চলার শক্তি নেই যেন!

তিনি জয়োল্লাস করতে এসে নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছেন সম্ভবত। আমরা সবাই বাকরুদ্ধ। পুরো স্টেডিয়াম খানিকের জন্য আচ্ছন্ন পিনপতন নিরবতায়; অবিশ্বাস্যতায় কারো হাত মাথায়, কারো চোখে জল! পুরো দেশের মানুষও নিশ্চয় হতবাক আমাদের পরাজয়ে। কে জানে হয়তো সেদিন রাতে ভাত খায়নি হাইস্কুলে পড়া অনেক ছেলে, রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি অনেকেই! দুই রানের পরাজয় বলে কথা, প্রথমবার আনন্দে ভাসাতাম আমরা পুরো জাতিকে।

আমার কিছু করার ছিলনা! আসলে তো ছিল করার অনেককিছু। পুরো এশিয়া কাপে ব্যাট হাতে তামিম দুর্দান্ত খেলল, আমি ব্যাটে বলে পারফর্ম করলাম। মুশফিক ভাই ভারতের বিপক্ষে ভালো খেললেন। লংকানদের বিপক্ষে ফিনিশিং দিল নাসির ও রিয়াদ ভাই! আমরা ফাইনালে গেলাম অনেক আশা নিয়ে কিন্তু শেষে সবার আশা ভেঙ্গেছি; নিজেরাও কষ্ট পেয়েছি!

আক্ষেপের গল্প করে লাভ নেই তা শুনতে চায় নাহ কেউ! আক্ষেপের গল্প বলতেও ভাল্লাগেনা! তাই স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে একদম পেছনে ফেরা যাক। ওল্ড ইজ গোল্ড বলে একটা কথা আছে তো! শুরু করা যাক।

মাগুরায় ১৯৮৭ সালের ২৪ মার্চ মধ্যবিত্ত কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তা মাশরুর রেজা আর গৃহিণী শিরিন শারমিনের প্রথম ও একমাত্র ছেলে সন্তান হয়ে জন্মেছি! সেই ফয়সাল যে আজ ক্রিকেটে সময়ের সেরা অলরাউন্ডার; আর পুরো বাংলাদেশের মধ্যমণি সাকিব। মাশরুর রেজা সাহেব মাগুরার ফুটবলার হওয়ায় তিনিও চেয়েছিলেন তার মতো আমিও ফুটবলার হই; অন্তত বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে খেলি।

আমার ছোটবেলা কেটেছে ফুটবলে কিন্তু একটু বড় হওয়ার পরেই তা পরিবর্তন হয়ে যায় ক্রিকেটে। তবে ফুটবল প্রেম এখনো আছে। জাতীয় দলের অনুশীলনে সবসময় ফুটবল নিয়ে নানান কসরত তো এখনো করি। ছোটবেলা সবাই কমবেশি দুষ্টুমিতে মেতে থাকে। কিন্তু আমি ছিলাম একদম শান্তশিষ্ট স্বভাবে। যার ধ্যানজ্ঞান ছিল ক্রিকেট আর পড়ালেখা! আর সবকিছুতে প্রথম হতে চাইতাম। কে জানে? হয়তো সেই অভ্যাসের কারণেই এখনো প্রথম (সেরা পারফর্মার) হতে চাই শুধু।

পাড়ার ক্রিকেটে খুব ভাল খেলতাম পুরাদস্তুর অলরাউন্ডার; পাড়ায় আমি একাধারে সেরা বোলার, সেরা ব্যাটসম্যান! ভাল খেলার কল্যাণে খ্যাপ খেলে বেড়াতাম এ পাড়া থেকে ও পাড়া! বাসের ছাদে চড়ে আলোকদিয়া থেকে এখানে সেখানে যেতাম! একদিন চোখে পড়ে যাই সাদ্দাম হোসেন গোর্কি সাহেবের; গোর্কি একটা ম্যাচে আম্পায়ার ছিলেন! গোর্কি তার ইসলামপুরপাড়া স্পোর্টিং ক্লাবে খেলার প্রস্তাব দেন আমাকে।

সেবার টেপ টেনিস ছেড়ে প্রথমবার ক্রিকেট বলে খেলি! পেস বোলিং করতাম নেহাত মন্দ না; তবে স্পিন আরো ভাল করতাম। গোর্কি বললেন ‘তুমি স্পিন বলই করো’! স্পিনই করা শুরু করলাম। এর কিছুদিন পরে মাগুরা লীগে অভিষেক ঘটে; প্রথম বলেই উইকেট পেলাম।

এভাবে চলল কিছুদিন! এরপরে বিকেএসপিতে ডাক পাওয়া। বাবা মায়ের বাধ্য আমি ঢাকায় যাব কিনা তা নিয়েও ছিলাম সন্দিহান! পরে বাবা পাঠালেন বিকেএসপিতে। সেই বাবা যে কিনা আমার ব্যাট ভেঙ্গে ফেলতেন তিনিই কিনে দিলেন নতুন ব্যাট, বল, প্যাড, গ্লাভস, আর দামী জুতা! বাবা আর মা আর নিজের প্রিয় মাগুরা ছেড়ে চলে এলাম ঢাকায়।

বিকেএসপিতে শুরুর দিকে সাকিব খুব কষ্টে থাকতাম। বাবা মায়ের কথা প্রায় মনে পড়ত; একা একা কাঁদতাম! তবে পরে সব সামলে উঠি।

এরপরে বিকেএসপিতে ভাল করে অনূর্ধ্ব ১৩, ১৫, ১৯ দলে ভাল করে সুযোগ পেয়ে যাই জাতীয় দলে। এই গল্পটা কমবেশি সবার জানা। আপনার জানা তো?

_______________

সাকিব আল হাসান এমন সাক্ষাৎকার কোথাও দেয়নি; একজন সাকিবের ছোট্ট গল্পটা লিখলাম আমি।

আমাদের প্রায় সব অর্জনে ছিল তার অবদান; তার অর্জনে আমরা উল্লাসে মেতেছি। কী ব্যাট, কী বল তার থেকে আমাদের প্রত্যাশা ছিল সবচেয়ে বেশি। আমাদের সেই রান, উইকেট আর জয়ের ক্ষুধা মিটিয়ে যাচ্ছেন ২০০৬ সাল থেকে।

সাকিব এসে আমাদের পরিচয় করে দেয় বিশ্বসেরা শব্দের সাথে! সাকিব মানেই বিশ্বসেরা; আর বিশ্বসেরা সাকিবের নামের পাশে থাকে বাংলাদেশ। সে আমাদের বিশ্বাস জোগায় যে আমরা যেকোনো দলকে হারাতে পারি। নিজে একা বহুবছর টেনেছেন দলকে। আমাদের জিতিয়েছেন অনেক ম্যাচ, সিরিজ।

আলোকদিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাগুরা জেলা স্টেডিয়াম থেকে শুরু তার পারফর্ম অব্যাহত ছিল ক্রিকেট খেলুড়ে প্রায় সব দেশেই। প্রায় সকল টি-টোয়েন্টি লিগেও জানান দিয়েছেন নিজের সক্ষমতা।

তবে তার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন তার সকল টান, মায়া, উন্মাদনা সবকিছু বাংলাদেশ দল নিয়ে। বাইরের কোন দল নিয়ে না। সে তার দেশের জয়েই সবচেয়ে খুশি হয়। একবার বলেছিলেন; ‘এসব র‍্যাংকিং কিছুনা তবে যখন দেখি প্রথমে আমার নামের পাশে বিএএন মানে বাংলাদেশ লিখা তখন খুব ভালো লাগে!’ এ কথাই আপনার আভিজাত্য বোঝাতে যথেষ্ট।

কী এক অদ্ভুত অজানা কারণে আমাদের ক্রিকেটের পোস্টার বয়, সবচেয়ে নন্দিত ক্রিকেটার নিন্দিত হয়েছেন কখনো কখনো! যারা প্রতিটি কারণ ছিল অমূলক, ভিত্তিহীন। একজন সাকিব বলেই হয়তো। যার পান থেকে চুন খসলেই আমরা মুদ্রার দু পিঠ দেখা ছাড়া অহেতুক সমালোচনা শুরু করে দেই।

আপনার এক সাক্ষাৎকার আমি ভুলিনি আপনি বলেছিলেন; ‘আমি অবসর নেওয়ার আগে অন্তত দেখি বাংলাদেশ একটা বিশ্বকাপ ট্রফি জিতছে!’ আপনার উপর আমি প্রচণ্ড আস্থা রাখলাম। আমি জানি আর বিশ্বাস করি আপনি আমাদের আমাদের একটা বিশ্বকাপ জিতাবেন। আর আপনাকে আমি ক্যারিয়ার শেষে অলরাউন্ডারের একদম সর্বকালের সেরার ছোট্ট তালিকায় দেখতে চাই। অলরাউন্ডার শব্দটা এলেই যেন পৃথিবীর সকল ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের সমর্থক আপনার নাম নেয়।

প্রিয় সাকিব আল হাসান, আপনাকে প্রচণ্ড সম্মান আর শ্রদ্ধা করি। খুব বেশি ভালো থাকুন আর আমাদের ক্রিকেটে জয়ের গল্প লিখতে থাকুন। এই ক্ষুদে ভক্তের শুভেচ্ছা নিয়েন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।