প্রিয় মাশরাফি, এই চিঠি আপনার জন্য

প্রিয় মাশরাফি,

এ চিঠি আপনার জন্য লিখলাম। আপনি পাবেন কিনা জানি না।

আপনার মত নড়াইলের ছেলে আমিও। আপনাকে তাই কৌশিক বলেই ডাকি, কেমন? জানেন ‘মাশরাফি’ নামে ডাকতে কেমন যেন লাগে আমার তাই ডাকনামকে বেছে নিয়েছি।

বয়সে ৮-১০ বছরের ছোট আমি। তাই আপনাকে হয়ত জেনেছি একটু দেরিতে। ২০০৩ বিশ্বকাপের আগে ক্রিকেট অতটা বুঝতাম না। তবে এটুকু জানতাম আমার নড়াইলের একটা ছেলে জাতীয় দলে খেলে দুর্দান্ত বোলার, কামানের গোলার মত বল ছোড়ে।

আপনি যখন শুরু করেছিলেন তখনও বাংলাদেশ দলের পেস বোলিং শিবিরটার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন হাসিবুল হোসেন শান্তরা। টেস্ট ক্রিকেটে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া দলের জন্য ওটা যথেষ্ট মনে হলেও আমরা খুজে খুঁজছিলাম এমন কোনো পেসারকে যে প্রতিপক্ষকে কাঁপিয়ে দিবে তার ভয়ঙ্কর গতির বল দিয়ে। আর তখনই লোকজন শুনলো নড়াইলের একটা ছেলে আসছে যে কিনা অনেকটাই ওরকম।

২০০১ সাল। এশিয়া অনুর্ধ্ব ১৭ প্রতিযোগিতায় কুয়েতের বিপক্ষে আপনি নামবেন। দল বেধে লোকজন গিয়েছিল আপনার সেই বিষ্ফোরক গতির বল দেখতে। আপনি বলের ঝড় দেখানোর আগে ব্যাট হাতে ঝড় তুললেন। ১৬ মিনিট ক্রিজে থেকে করলেন ১৭ বলে অপরাজিত ৬০ রান (৪ টা চার ও ৬ টি ছক্কা)।

এর আগে নেপালের বিপক্ষে ৯-২-২৪-৩ ও সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ৭-২-৯-২ নিয়েছিলেন। ওই সিরিজ থেকেই কিন্তু আজকের মাশরাফির অন্যরকম মাশরাফি বনে যাওয়া। ওই সিরিজের ফসল ছিলেন শেখর ধাওয়ান, পার্থিব প্যাটেল, পারভেজ মারুফ, থিসারা পেরেরা, উপুল থারাঙ্গা, সালমান বাট, খালিদ লতিফ, আজহার আলী ও আদনান আকমলরা।

ওই সিরিজে আপনার বল দেখেছিল সবাই। আপনার সেই বল যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যেন পাহাড়ি ঝড়, যেন দানবীয় হিংস্রতা। আজ এত বছর পর পেছন ফিরে তাকালে দেখতে পাই হেলমেটের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা বিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের ভয়ার্ত সব চেহারা। অথচ মাঠের আগুন ঝরানো বোলারটির ভেতরের মানুষটা কী সাদামাটা! ঔদ্ধত্যের জায়গায় বিনীত, দানবীয়তার বদলে সাধারণ মানবীয়।

প্রিয় ম্যাশ, আমরা জানি আপনি যতটানা ক্রিকেটের উপর চেপে বসেছেন তারচে বেশি স্বয়ং ক্রিকেটটাই আপনার উপরে চেপে বসেছে। এরপরও আপনাকে সহ্য করতে হয়েছে একেরপর এক ইনজুরির আঘাত। সার্জারিতে যেতে হয়েছে সাত বার, মেজর ইনজুরিতে ভুগতে হয়েছে ১৪ বার।

আপনার বগলে যতবার ক্রাচ দেখা গেছে, ততবার সম্ভবত কোনো রোগীর বগলেও দেখা যায়নি। আবার ক্রাচ ছেড়ে বল হাতে নেওয়া এবং আবার আগুন ঝরানো, সেটাও পৃথিবীতে একমাত্র আপনারই কীর্তি।

কিন্তু এসবও নয়, আমরা যেখানে আপনাকে আলাদা করে রাখি সেটা হলো, সেই শুরুতে আপনি ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই আমাদের অন্ধকার ঘরের চাঁদের আলো। এখন আমাদের অনেকেই অনেক কিছু করতে পারে। সাকিব, তামিম মুশিরা বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে চিনিয়েছে, কিন্তু যখন আমাদের কেউ বিশ্ব পরিমণ্ডলে কিছু করতে পারত না, তখন শুধু আপনিই পারতেন! আমাদের সেই ঘোর দারিদ্র্যের দিনে আপনি ছিলেন একমাত্র সম্পদ।

২০০১ সালের নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজেই আপনার অভিষেক হলো। অনূর্ধ্ব-১৭ দলের এ কীর্তির পর নির্বাচকরাও এই অমূল্য হীরাকে কাচ ভাবার ভুল করলেন না। তবু কিছু সন্দেহ ছিল। টেস্ট অঙ্গন এত সহজ ব্যাপার তো নয়! আর তখনকার জিম্বাবুয়ে আজকের জিম্বাবুয়ের মতো একঝাঁক দিগ্ভ্রান্তের সমষ্টি নয়।

স্ট্রিক-ফ্লাওয়ার ভ্রাতৃদ্বয় আর ক্যাম্পবেল-স্ট্র্যাং মিলে যথেষ্ট সম্মান করার মতো প্রতিপক্ষ। তাঁদের বিপক্ষে সেই সিরিজ আমরা জিতব, এমন আশা ছিল না। আমরা আসলে সেবার ভাবছিলাম শুধু আপনাকে নিয়ে। আপনার আগমনী ধ্বনি ঠিকঠাক বিশ্বকে শোনানো যাবে তো! ঢাকা টেস্টে দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় সম্ভবত আপনার হাতে প্রথম বল গেল। আর বলে বলে দুলে উঠল স্টেডিয়াম। সাবেক অধিনায়ক ফারুক আহমেদের সঙ্গে কী এক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন একজন সাংবাদিক। তিনি থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এখন না। এই ছেলেটার বোলিংটা উপভোগ করি।’

কী উপভোগ্য ছিল সেটা!

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বকালের সেরা পেসার আপনিই। আপনার কীর্তি নিয়ে ভাবতে গেলে দেখি, আমরা যা মনে করি, আপনি তার চেয়েও বেশি কীর্তিমান!

২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সে একটা দৃশ্যের কথা বলি। মোস্তফা মামুন ভাইয়ের থেকে শোনা, আপনি হয়তো জানেন না। এক ভারতীয় সাংবাদিক চিৎকার করে প্রস্তাব দিচ্ছিলেন, ‘কী গো, তোমরা এক্সচেঞ্জ করবে নাকি?’

কী এক্সচেঞ্জ?

‘মাশরাফিকে দিয়ে দাও। আমাদের দীনেশ মঙ্গিয়া বা মোহাম্মদ কাইফকে নিয়ে নাও।’

মঙ্গিয়া বা কাইফকে তখন ভারতের আগামী দিনের ব্যাটিংয়ের স্তম্ভ ভাবা হচ্ছে, এই বিশাল মূল্যেও তোমাকে পেতে চায় ১০০ কোটির দেশ ভারত।

মনে পড়ছে, ২০০৩ সালের অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনের এক বিকেলের কথা। বাংলাদেশ যথারীতি গো-হারা হেরেছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিকরা তবু বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশ থেকে উড়ে যাওয়া সংবাদকর্মীরা অবাক, কী চায় ওরা! কাটা ঘায়ে আরো নুনের ছিটা! না, নুনের ছিটা নয়, মধুবর্ষণ।

ওরা ম্যাশের সঙ্গে কথা বলতে চায়। বললও। বলার পর, স্পষ্ট মনে আছে, একে একে সবাই এগিয়ে এসে আপনার সঙ্গে হাত মেলাল। একজন সবার হয়ে বলল, ‘গো অ্যাহেড ইয়াংম্যান। ইউ আর এ জিনিয়াস।’ তিন দিনে হেরে যাওয়া সেই ম্যাচে আমরা যেন টেস্ট জেতার গৌরব পেলাম!’

বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা অধিনায়কের খেতাবটা আপনার কাঁধে। না, এটা আপনার দেওয়া নয় বরং কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্তের দেওয়া। আপনি এটা ডিজার্ভ করেন!

ম্যাশ, আপনি তো জানেনই আমরা অতীত ভূলে যাই। তাই দু’দিন আগেও আপনার গড়া কীর্তি ভুলে গিয়ে বর্তমানের খারাপ সময়কে উদ্দেশ্য করে কাঁদা ছুড়ে মারি। আপনি চাইলেও আগের মত গতিতে বল ছুড়তে পারেননা। কখন জানি লিগামেন্টটা আবার ছিঁড়ে যায়। ভয়ে থাকি আমরাও। আপনি দলের সঙ্গে থাকলে কিছু একটা হবেই বলে বিশ্বাস করি।

আপনাকে আমরা এভাবেই চাই, আপনি এভাবেই পারফর্ম করতে থাকেন। ওরা হয়ত জানেনা যে গত দুবছরে দ্বিতীয়য় সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক (৩৫) আপনি (মুস্তাফিজ এক নব্মরে)। আমরা হয়ত এগুলো ভূলে যাই। নিন্দুকেরা যাই বলুক না কেন সবকিছু ভুলে আপনি আপনার মত খেলুন, লড়ে যান, দৌড়ান! বলের গতিটা মূখ্য নয়!

আমরা বাঙালি, তাই আমাদের চিরাচরিত রিতিতেই আমরা চলি। আপনার দিকে তাক করে আজ যারা কথা বলছেন তারা দেখবেন দু’দিন বাদেই আপনার গুণকীর্তন করবে। আমরা আসলে মানুষ হয়ে উঠতে পারিনি। তাইতো বলা হয় – রেখেছো বাঙালি করে, মানুষ করোনি।

ইতি

– আপনার একনিষ্ঠ সমর্থক

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।