বিদেশে যাবার সিদ্ধান্ত নেবার আগে হাজার বার ভাবুন

ছেলেটা এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে; বোধকরি আমার লেখা ফলো করে। সে আমাকে মেসেজ করে লিখেছে

– স্যার, আমি এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছি। খুব ভালো ছাত্র না। রেজাল্ট ভালো হবার সম্ভাবনা নেই। দেশের পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাবো না মনে হয়। তাই ভাবছি বিদেশে পড়তে যাবো। আপনি যদি কিছু ইনফরমেশন দিতেন- কিভাবে বিদেশে পড়তে যাওয়া যায়।

আমি এই ছেলেকে উত্তর না দিয়ে এই লেখা লিখতে বসেছি।

বিদেশে পড়তে যাবার একটা প্রবণতা আমাদের সমাজে আছে। এটা স্বাভাবিক। তবে আমার সব সময়’ই মনে হয়, যারা বিদেশে পড়তে চায়, দেশ থেকে অন্তত ব্যাচেলরটা শেষ করে আসা উচিত।

দীর্ঘ ১৩ বছরের বিদেশ জীবনে পৃথিবীর নানা দেশে পড়াশোনা এবং চাকরির সুবাদে আমি দেখেছি অনেক ছেলেপেলে শেষ পর্যন্ত পড়াশুনা শেষ করতে পারে না। এর মানে হচ্ছে- এরা ইন্টারমিডিয়েট পাশ থেকে যায়।

বিদেশ জীবন’কে দেশ থেকে যতটা রঙিন মনে হয়; বাস্তবে আসলে ঠিক তার উল্টো। বিশেষ করে যেই ছেলেপেলে গুলো টিউশন ফি দিয়ে পড়তে আসে; তাদেরকে যে কি কষ্ট করতে হয়; সেটা বলে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না।

যেহেতু টিউশন ফি দিয়ে পড়তে হয়, দেখা যায় বেশিরভাগ ছেলেপেলেদেরই হোটেল-রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে নানান জায়গায় পার্ট টাইম কাজ করতে হয়। থাকা-খাবার খরচ, টিউশন ফি যোগার করার চিন্তা সব মিলিয়ে দেখা যায়-কাজ’ই বেশি করতে হয় পড়াশোনার চাইতে।

এতে দেখা যায় এরা খুব বেশি একটা ক্লাসে যেতে পারে না, কিংবা পড়াশোনায়ও মনোযোগ দিতে পারে না। এদের দোষ দিয়েও লাভ নেই। আপনাকে যখন একই সঙ্গে নিজের থাকা-খাওয়ার খরচ, টিউশন ফি’র খরচ, কাজে যাওয়া, ক্লাসে যাওয়া, পরীক্ষা দেয়া সব এক সঙ্গে চিন্তা করতে হবে; তখন খুব স্বাভাবিক ভাবেই পড়াশুনা করতে ভালো লাগবে না। বরং যারা শেষ পর্যন্ত পড়তে পারে, তাদের অতি অবশ্যই কৃতিত্ব পাওয়া উচিত।

আর পার্ট-টাইম কাজ শুনতে দেশ থেকে যেমন খুব রোমাঞ্চকর মনে হয়, বাস্তবে আসলে অনেক বেশি’ই কঠিন। আর সত্যি বলতে কি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যারা টিউশন ফি দিয়ে পড়তে আসে, তারা হয় পড়াশুনা শেষ করতে পারে না; কিংবা শেষ করলেও পড়াশুনা হয়ত তারা কোন ভাবে শেষ করেছে। অর্থাৎ খুব একটা মনোযোগ দিয়ে হয়ত পড়াশুনা’টা শেষ করতে পারেনি। যার কারনে হয়ত যা শেখার দরকার ছিল, সেটা আর শেখা হয়নি।

তাই পড়াশোনা শেষে চাকরির বাজারেও শেষ পর্যন্ত হয়ত আর পেরে উঠে না। দেখা যায় শেষ পর্যন্ত হোটেল-রেস্টুরেন্ট এর কাজ’ই করতে হয়। বলছি না সবার ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনেকটা এমন।

কোন কাজই খারাপ না। হোটেল-রেস্টুরেন্ট এর কাজও অবশ্যই ভালো। কিন্তু দেখা যায়, একটা সময় পর এই ছেলেপেলে গুলো ভাবতে শুরু করে- আজীবন কি তাহলে এই কাজ’ই করতে হবে? তখন শুরু হয় আরেক ক্রাইসিস।

পেছনে ফেরার আর সুযোগ নেই। কারণ দেশে ফেরত গেলে ইন্টারমিডিয়েট পাশ! কিংবা হয়ত কোনো ভাবে বিদেশে ব্যাচেলর পাশ করেছে; কিন্তু ততদিনে দেশে ফিরে চাকরির বয়েস শেষ হয়ে গিয়েছে কিংবা দেশে তার বয়েসি বন্ধু-বান্ধবরা বড় বড় পদে চাকরি করছে। তাকে গিয়ে হয়ত একদম প্রথম থেকে শুরু করতে হবে! কোন সমীকরণই তখন আর মেলে না!

তবে আপনি যদি এই ধরনের কাজ উপভোগ করেন, তাহলে সেটা সমস্যা হবার কথা না। এই যেমন সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার সরাসরি শিক্ষক, যিনি পরবর্তীতে সুইডেনে আমি যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করেছি, সেখানেই মাস্টার্স করেছেন। আমার এই স্যার দেশে থাকতেই রান্না করতে খুব পছন্দ করতেন। তো, সুইডেনে মাস্টার্স করার সময় তিনি একটা রেস্টুরেন্টে পার্ট টাইম কাজ করতেন। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল তিনি ওই রেস্টুরেন্টের শেফ হয়ে গিয়েছেন।

তিনি সব সময়ই এই কাজটা উপভোগ করতেন। তাই মাস্টার্স শেষ করার পর তিনি আর পড়াশুনা কিংবা শিক্ষকতা কোনটাই করেননি। তিনি ওই রেস্টুরেন্টের কুক হিসেবেই থেকে গিয়েছেন।

তবে সবার ক্ষেত্রে এমনটা হবার সম্ভাবনা একদম নেই। বরং উল্টোটাই হবার কথা। কারন এই কাজ গুলো এমনিতেই বেশ কঠিন।

বাবা-মা’র যদি সামর্থ্য থাকে, তাহলে বিদেশে টিউশন ফি দিয়ে পড়তে আসা যেতে পারে। এছাড়া টিউশন ফি দিয়ে বিদেশে পড়তে না যাওয়াই ভালো। এর চাইতে দেশে কিছু করার চেষ্টা করাই ভালো বলে অন্তত আমার মনে হয়।

আমার মনে আছে, বছর ছয়েক আগে, দেশের এক প্রতন্ত গ্রাম থেকে এক ছেলে আমাকে একটা মেসেজ করেছিল। ওই ছেলে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে মাত্রই ফেসবুক ব্যাবহার করা শিখেছে। ভালো করে ইন্টারনেটও চালাতে পারে না। কোন ভাবে হয়ত আমার লেখা তার ফেসবুকে চলে গিয়েছিল। সে এরপর আমাকে মেসেজ করে লিখেছে –

– স্যার, আমর রেজাল্ট খুব একটা ভালো হবে না এইচএসসিতে। ঢাকা কিংবা জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাবো না মনে হয়। আমদের গ্রামের পাশে একটা কলেজ আছে। সেখানে পাস কোর্সে ভর্তি হয়ে যাবো ভাবছি। আমার ফ্যামিলিতে আর কোন শিক্ষিত কেউ নেই যে আমাকে গাইড করবে। তাই আপনাকে লিখলাম, আপনার কোন সাজেশন থাকে, যদি জানাতেন।

আমি ওই ছেলেকে লিখেছিলাম –

– তোমার উচিত হবে দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়া। হয়ত একটু কষ্ট হবে কিংবা সামান্য খরচও হবে। কিন্তু দেখবে কোথাও না কোথাও ঠিকই চান্স পেয়ে যাবে।

এই ছেলে আমার কথা শুনে সত্যি সত্যিই অনেক গুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল এবং মজার বিষয় হচ্ছে সে দেশের বেশ নামকরা একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে চান্স পেয়ে গিয়েছিলো। আপনাদের জানিয়ে রাখি এই ছেলে এখন বিসিএস ক্যাডার।

আমার কেন যেন মনে হয় বিদেশে পড়তে যদি যেতেই হয় ব্যাচেলরটা শেষ করেই যাওয়া উচিত।

এরপরও যদি বিদেশে পড়তে যেতে হয়, তাহলে অন্য কারো কাছ থেকে তথ্য চাইবার তো কোন দরকার নেই। কিংবা কোন এজেন্ট বা অন্য কারো কাছে যাবারই দরকার নেই।

আমি তো সেই ১৩ বছর আগেই বিদেশে পড়তে এসছি নিজে নিজেই চেষ্টা করে। আর এখন তো দেশে প্রায় সবাই ইন্টারনেট ব্যাবহার করতে জানে। নেট স্পিডও খারাপ না।

গুগল সার্চ ইঞ্জিন তো আছেই। গুগল করলেই তো সব তথ্য জানা যাচ্ছে। অন্য কারো সাহায্যের প্রয়োজন পড়ছে কেন? আপনি যাদের সাহায্য চাইছেন- তারা সেই তথ্য কই থেকে পেয়েছে? তারা কিন্তু ইন্টারনেট থেকেই তথ্য পেয়েছে।

তাই নিজে চেষ্টা করাই ভালো। সিস্টেমটা আসলে খুব সহজ। প্রথমেই চিন্তা করতে হবে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যাওয়া যায় কিনা। এরপর যেই দেশ বা দেশ গুলোতে পড়তে চাইছেন, সেই সব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়তে সার্চ করতে হবে। জগতের সমুদয় সকল ইউনিভার্সিটি তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি তথ্য, স্কলারশিপের তথ্য তাদের ওয়েব সাইটে দিয়ে থাকে। আপনার কাজ হচ্ছে সেই তথ্য গুলো পড়ে বুঝে নেয়া।

এরপর যদি দেখেন স্কলারশিপ পাওয়া সম্ভব হবে না; তখন চেষ্টা করবেন ফ্রি’তে পড়া যায় কিনা। অর্থাৎ স্কলারশিপ পাওয়া যাবে না, কিন্তু টিউশন ফি হয়ত দিতে হবে না। এমন অনেক দেশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু আছে টিউশন ফি ছাড়া পড়ায়। আপনার কাজ কেবল গুগল সার্চ করে সে গুলো খুঁজে বের করা।

টিউশন ফি ছাড়াও যদি পড়া সম্ভব না হয়, কেবল তখনই চিন্তা করা যেতে পারে- ফি দিয়ে পড়বেন কি পড়বেন না।

আর কিভাবে এডমিশন পাওয়া যাবে, কি কি যোগ্যতা থাকা লাগবে, ইংলিশ টেস্ট স্কোর কতো থাকতে হবে, কোন উপায়ে আবেদন করতে হবে- এর সব তথ্যই কিন্তু প্রতেক ইউনিভার্সিটির ওয়েব সাইটে দেয়া থাকে। সেই অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করে নিয়ে আবেদন করে দিলেই তো হলো।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে জানাবে আপনি এডমিশন পাচ্ছেন কি পাচ্ছেন না। এডমিশন পাবার পর আপনাকে ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। এর জন্যও কারো কাছে যাবার দরকার নেই।

আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ই আপনাকে জানিয়ে দিবে- কোন লিঙ্ক বা সাইট থেকে ভিসার আবেদন জন্য তথ্য পাওয়া যাবে। এছাড়া আপনি যেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছেন, সেই দেশের দূতাবাসের ওয়েবসাইটে ভিসা বিষয়ক সকল তথ্য এমনিতেই দেয়া থাকে। সেখানে থেকে সব তথ্য নিয়ে আবেদন করে দিলেই হয়।

পুরো ব্যাপারটা বাস্তবে ঠিক এতোটাই সোজা। আর আপনি নিজে নিজে যদি এই কাজ করতে না পারেন; সত্যি বলতে কি, তাহলে আপনি বিদেশে পড়ার যোগ্যতাই সেই অর্থে রাখেন না। তাই পড়তে যাওয়ার আগে নিজে নিজে এই কাজ গুলো করে ফেলার যোগ্যতা অর্জন করা বোধকরি খুব জরুরী।

আর বিদেশে গেলেই জগতের সমুদয় সকল সমস্যার সমাধান- ব্যাপারটা আসলে ঠিক তেমন না। আমি আমার এই এতটুকু জীবনে যতটুকু গবেষণাই করেছি, সেটা প্রবাসী এবং শরণার্থীদের নিয়েই করেছি। আপনাদের একটা উদাহরণ দেই-

এইতো কিছুদিন আগে উইন্টার অলিম্পিক শেষ হয়ে গেল। ফিগার স্কেটিং এ আমেরিকার হয়ে স্বর্ণ পদক পেয়েছে এক চাইনিজ আমেরিকান। অর্থাৎ এই মেয়েটার বাবা-মা চায়না থেকে আমেরিকায় গিয়েছিলো। কিন্তু মেয়েটর জন্ম এবং বেড়ে উঠা সব কিছুই আমেরিকায়। সে আমিরিকার হয়ে স্বর্ণ পদক পর্যন্ত পেয়েছে অলিম্পিকে। অথচ আমেরিকার নামকরা এক পত্রিকা তার স্বর্ণ পদক পাবার পর শিরোনাম করেছে- ‘চাইনিজ ইমিগ্রেন্ট পরিবারের এক মেয়ের আমেরিকার হয়ে স্বর্ণ পদক জয়!’

ওই খবর দেখে পদক জয়ী এই মেয়ে দুঃখ করে বলেছে

– আমার চাইতে সত্যিকারের আমেরিকান আর কয়জন আছে আমার জানা নেই। আমি নিজেকে একজন দেশপ্রেমিক আমেরিকান মনে করি। দেশের হয়ে স্বর্ণ পদক পর্যন্ত জয় করলাম। এরপরও কিনা শুনতে হলো আমি একজন ইমিগ্রেন্ট!

এই রকম হাজারটা উদাহরণ আমি আমার নিজের গবেষণায় দেখেছি। না তারা হতে পেরেছে এই সমাজের মানুষ; না তারা হতে পেরেছে তাদের নিজদের দেশের মানুষ! আইডেন্টিটি ক্রাইসিস যে কতো ভাবে, কতো রুপে দেখা দিতে পারে সেটা আসলে এক লেখায় তুলে ধরা খুব কঠিনই।

দূর থেকে ইউরোপ-আমেরিকার জীবন অনেক আলো-ঝলমলে রঙিন মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা আসলে ঠিক ততটাই ধুসর এবং বিবর্ণ। যেখানে জীবনের সমীকরণ আর কোন ভাবেই মেলে না; কিন্তু পেছনে ফেরারও আর সুযোগ নেই। বাদ বাকী জীবন কেটে যায় স্রেফ এটা ভাবতে ভাবতে- আহা, জীবনের সমীকরণটা হয়ত অন্য রকমও হতে পারত।

তাই বিদেশে যাবার সিদ্ধান্ত নেবার আগে হাজার বার চিন্তা করুন, আপনি আসলে কি চাইছেন। আপনি কি স্রেফ পড়াশোনার জন্য আসছেন? কয়েক বছর পড়াশোনা করে ফেরত যাবেন? নাকি বিদেশে থেকে যাবার জন্য আসছেন! যদি সেটাই হয়ে থাকে, তাহলে বোধকরি সকল সমীকরণ আগে থেকেই মেলানো ভালো। নইলে হাজার রকম সুত্রে ফেলেও হয়ত একটা সময় জীবন নামক সমীকরণের অংক আর মেলান সম্ভব হবে না!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।