রাশিয়ার ঋণ শোধ করতে পারবেন তো থিয়াগো?

সময়ের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে আবির্ভাবের অনেক আগেই প্রাণ হারাতে বসেছিলেন থিয়াগো সিলভা। বিশ্বকাপ চলাকালে নিশ্চয়ই সেই স্মৃতিটা ঘুরেফিরে মনে পড়ছে তাঁর। কারণ, থিয়াগোর সেই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ার যুদ্ধক্ষেত্রটা যে স্বয়ং রাশিয়াই!

১৩ বছর আগের কথা। যক্ষায় আক্রান্ত হলে মস্কো হাসপাতালে কাঁতড়াচ্ছিলেন থিয়াগো সিলভা। বাঁচার আশা ছিল না বললেই চলে। ত্রাণকর্তা হিসেবে হাজির হয়েছিলেন রাশিয়ান চিকিৎসকরা। হাসপাতালের বিছানায় টানা ছয় মাস কাটাতে হয়, তখন ভাবতেও পারেননি যে আর কখনো ফুটবল খেলতে পারবেন। দিনগুলো থিয়াগোর জন্য ছিল নির্যাতনের মত।

  • থিয়াগোর রুশ জীবন

প্রশ্ন হল, ২০০৫ সালে থিয়াগো সিলভা কেন রাশিয়ায় ছিলেন? উত্তরটা সহজ, সেবছরই জানুয়ারিতে পোর্তো থেকে তাঁকে কিনে আনে ডায়নামো মস্কো। যদিও পর্তুগিজ দলটার হয়ে এক মিনিটও মাঠে নামা হয়নি সিলভার, তারপর ডায়নামো তাঁর প্রতি আগ্রহী হয় শুধু তাঁর এজেন্টে হোর্হে মেন্ডেজের আশ্বাসে। তিনি বলেছিলেন, থিয়াগো হবেন আগামী দিনের তারকা। তাই, রাশিয়ান ক্লাবটি থিয়াগোর জন্য চার মিলিয়ন ইউরো খরচ করতে রাজি হয়।

বলা ভাল, ব্রাজিলিয়ান এই তরুণ তখন ছিলেন ডায়নামোর বিশাল এক প্রোজেক্টের ক্ষুদ্র একটা অংশ। নতুন সভাপতি অ্যালেক্সেই ফেদোরিশেভ লিগ শিরোপা জিততে মরিয়া ছিলেন। মেন্ডেজও তাঁর কাছে খেলোয়াড় বিক্রি করতে মরিয়া ছিলেন। সেবার জানুয়ারিতে পর্তুগাল থেকে মস্কোভাইটসে এসেছিলেন সাতজন খেলোয়াড়, গ্রীষ্মে এসেছিলেন আরো পাঁচ জন।

এর মধ্যে ছিলেন মিডফিল্ডার কস্টিনহা ও ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার ডেরলেই, এই দু’জন পোর্তোর ২০০৪ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। আরো ছিলেন ২০০৪ সালে গ্রিসকে অনেকটা রূপকথার মত ইউরো চ্যাম্পিয়ন করা জর্জিয়াস সেইটারিডিস।  আর অল্প পরিচিতদের মধ্যে ছিলেন গোলরক্ষক নুনো, যিনি এখন উলভসের কোচ।

রাশিয়া এসে একমাত্র পর্তুগালের ড্যানিই সাফল্য পান। তিনি বনে যান জেনিথের কিংবদন্তি। বাকি সবাই কম বেশি বাজে ভাবে ব্যর্থ হন। ডায়নামোর উচ্চাকাঙ্খী প্রোজেক্টও যাচ্ছেতাই ভাবে ব্যর্থ হয়। আর থিয়াগো সিলভার নাম তো তখন ডায়নামো সমর্থকরা শুনতেই পাননি, কারণ কখনোই যে ক্লাবটির হয়ে মাঠে নামা হয়নি তাঁর।

  • থিয়াগোর ব্যাধী

সাবেক স্পার্টাক ও রাশিয়ান কোচ ওলেগ রোমানৎমেভকে মনে করা হয় রাশিয়ার বড় ফুটবল বিশেষেজ্ঞদের একজন। তাঁকে কোচ করে আনেন ফেদোরিশেভ। থিয়াগোকে থেকে মুগ্ধ হন ওলেগ, ‘আরে! এই ছেলেটা তো দারুণ!’ কিন্তু, দলের ডাক্তাররা খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না থিয়াগোর প্রতি, কারণ অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যেতেন এই ব্রাজিলিয়ান।

উয়েফা ও ফিফার নিয়মানুসারে কোনো খেলোয়াড়কে দলে নেওয়ার আগে তাঁর সম্পূর্ণ মেডিকেল চেক-আপ করে নিতে হয়। থিয়াগো সিলভার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তখন তাঁর শরীরের তাপমাত্র, কাশি ও অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করেছিলেন ডাক্তাররা। তবে, সেটাকে ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা ধরে নিয়ে ছাড়পত্রও দিয়ে দেওয়া হয়।

তবে, এর কিছুদিন বাদে সেই চিকিৎসকদের কপালেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ জমে যখন থিয়াগোকে ক্লিনিকে পাঠাতে হয়। তখন হাসপাতালের এক ডাক্তার থিয়াগোকে বলেছিলেন, ‘রোগটা আর কয়েক সপ্তাহ পর ধরা পড়লেই তোমাকে আর বাঁচানো যেত না।’

ওই অবস্থা থেকেও থিয়াগোকে বাঁচিয়ে তোলা শক্ত ছিল। আর কোনোক্রমে বেঁচে গেলেও, সেখান থেকে ফিরে আর যে কখনো মাঠে নামতে পারবেন না, সেটা নিশ্চিতও হয়ে গিয়েছিল। কারণ, মেডিকেল স্টাফরা বলেছিলেন ফুসফুসের বড় একটা অংশ কেটে ফেলতে হতে পারে। থিয়াগো সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। তবে, হাসপাতালে লম্বা সময়ের জন্য তাঁকে থাকতে হয়েছিল। মন ভাল করার জন্য তাঁর প্রেমিকা ও বাবা-মাও চলে এসেছিলেন মস্কোতে।

ডায়নামো ক্লাব তাঁদের দায়িত্বে কোনো কমতি করেননি। তাঁরাই চিকিৎসার সব ব্যয়ভার বহন করেছিল। বরং, তাঁরা খুশি ছিল এই ভেবে যে, থিয়াগোর কাছ থেকে যক্ষা অন্য কোনো খেলোয়াড়ে সংক্রমিত হয়নি। তবে, হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফেরার পর তাঁর সাথে চুক্তি বাতিল করে ডায়নামো, পাঠিয়ে দেওয়া হয় নিজের দেশ ব্রাজিলে।

  • আলোকিত প্রত্যাবর্তন

ওই অবস্থায় দাঁড়িয়ে ফুটবল থেকেও মন উঠে যায় থিয়াগো। ফুটবল ছেড়ে দিয়ে মায়ের সাথে থাকারও সিদ্ধান্ত তিনি নিয়ে ফেলেছিলেন। যদিও, ক’দিন বাদেই ব্রাজিলের ঘরোয়া লিগে ফ্লুমিনেন্স থেকে তাঁর ডাক আসে। তখন বোঝা যায় ওলেগ রোমানৎসেভ তাঁর ব্যাপারে যা বলেছিলেন, তা এক বিন্দুও অতিরঞ্জন নয়।

২০০৯ সালে তিনি উড়াল দেন ইতালিতে। চুক্তিবদ্ধ হন এসি মিলানের সাথে। তখন তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার বরে মনে করা হত। নিজেকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে যান থিয়াগো, যাতে তাঁর সাথে ফ্রাঙ্কো বারেসিরও তুলনা শুরও হয়ে যায়।

এসি মিলান যখন ২০১১ সালে সিরি ‘এ’ শিরোপা জয় করে, তখন মুখ্য ভূমিকা রাখেন থিয়াগো। তবে, সমর্থকদের কাঁদিয়ে তাঁকে এক বছর বাদেই ৪২ মিলিয়ন ইউরোতে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেইনের (পিএসজির) কাছে বিক্রি করে দেয় এসি মিলান। ক্যারিয়ারের এই মুভটা তাঁর জন্য সৌভাগ্যের চেয়ে দুর্ভাগ্যই বয়ে এনেছে বেশি।

ফ্রান্সে এমনিতে সাফল্যের অভাব হয়নি থিয়াগোর। তবে, আগে তাঁকে যাদের সাথে তুলনা করা হত, সেসব আর হয়না। এক মৌসুম আগেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ৬-১ গোলে প্রথম লেগে পিছিয়ে থাকার পরও পিএসজির বিপক্ষে বার্সেলোনা যেভাবে রক্ষণ ভেঙে প্রত্যাবর্তন করেছিল, তাতে থিয়াগো ফুরিয়ে গেছেন বলেও রব উঠেছিল।

  • জাতীয় দলের পারফরম্যান্স

জাতীয় দলটাও থিয়াগোর জন্য কন্টকসজ্জাই।  ২০১০ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনি লুসিও ও হুয়ানের আড়ালে বদলী হিসেবে খেলেছেন। ২০১৪ বিশ্বকাপটা পারলে তিনি ভুলে যেতে পারলে বাঁচেন, বিশেষ করে অধিনায়ক হিসেবে। চিলির বিপক্ষে শেষ ষোল’র ম্যাচে অধিনায়ক হওয়ার পরও তিনি পেনাল্টি কিক নেননি, বিষয়টা দৃষ্টিকটু, যথেষ্ট সমালোচনার মুখেও পড়তে হয় তাঁকে।

কলম্বিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে অর্থহীন এক ফাউল করে সেমিফাইনালের জন্য নিষিদ্ধ হন। সাথে যোগ হয় নেইমারের ইনজুরি। সেলেসাওরা জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হেরে নিজেদের মাঠ থেকে কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নেয় বিশ্বকাপ থেকে।

বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর কোচ লুই ফিলিপ স্কোলারির জায়গায় আসেন দুঙ্গা। তাঁর অধীনে ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা দলে জায়গাই হয়নি থিয়াগো সিলভার। এরপর বিশ্বকাপের বাঁছাইপর্বেও তাঁকে মোটে পাঁচটা ম্যাচ খেলার সুযোগ দিয়েছিলেন কোচ তিতে।

এবারের বিশ্বকাপে অবশ্য সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে একাদশে ছিলেন থিয়াগো। সব ঠিকঠাক থাকলে আসছে ম্যাচগুলোতেও থাকবেন ৩৩ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার। এই রাশিয়ার কাছে তাঁর ঋণের শেষ নেই। মরতে মরতে এই মস্কো শহরেই নতুন জীবন পেয়েছিলেন থিয়াগো। নি:সন্দেহে মস্কো শহরটা তাঁর মনে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ১৩ বছরের কষ্টদায়ক দিনগুলোকে এবার পারফরম্যান্সের ঝলকে বদলে ফেলার পালা। থিয়াগো কি পারবেন রাশিয়ার ঋণ শোধ করতে? পারবেন নিজের শেষ বিশ্বকাপা রাঙিয়ে তুলতে?

– ফোরফোরটু অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।