ওরা পারে, আমরা পারি না কেন?

নূতন আর অঞ্জনা – বাংলা সিনেমার ইতিহাসে তাঁদের বড় নায়িকা মনে না করার কোনো কারণ নেই। আশি-নব্বইয়ের দশকে তাঁরা জনপ্রিয় তো ছিলেনই, দু’জনই জিতেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

১৯৮৬ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘পরিণীতা’ সিনেমার ললিতা চরিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী ক্যাটাগরীতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছিলেন অঞ্জনা। আর নূতন ১৯৯১ সালে ‘স্ত্রীর পাওনা’ সিনেমার জন্য শ্রেষ্ট পার্শ্ব-অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

এই দু’জনই কি না এক তৃতীয় শ্রেণির বিজ্ঞাপন চিত্রে কাজ করেছেন। কক্সবাজারের একটি শপিং মলের বিজ্ঞাপনচিত্রটি এখন ট্রলের নতুন হাতিয়ার। এমন উদ্ভট বিজ্ঞাপনই আলোচনার ঝড় তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল, এর সাথে যোগ হল, দুই কিংবদন্তির উপস্থিতি।

আচ্ছা, এই দু’জনের কেনই বা এই বিজ্ঞাপনে কাজ করে নিজেদের সাবেক স্টারডম গুড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়লো? আমাদের সাথেই কেন এসব হয়! ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংসে কেন আমাদের কিংবদন্তিরা নিজেদের ঐতিহ্যটা ধরে রাখতে পারেন না।

এটা অবশ্য নতুন কিছু নন। ওপার বাংলার প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় যখন ‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘অটোগ্রাফ’ করে বেড়াচ্ছেন, ‘জাতিস্মর’, ‘জুলফিকার’-এর মত ভিন্নমাত্রার সিনেমা করে নিজেকে ভাঙছেন, কাকাবাবু হয়ে ইতিহাস গড়ছেন, এপারের ইলিয়াস কাঞ্চন তখন ‘বাংলার ফাটাকেষ্ট’ জাতীয় বস্তাপঁচা সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত, ওমর সানি তখন ‘আমি নেতা হবো’র মত অর্থহীন সিনেমা করে যান।

ক্যারিয়ারের সেকেন্ড ইনিংসের জন্য তাঁদের আদৌ কি কোনো যথার্থ পরিকল্পনা আছে? নায়ক রাজ রাজ্জাক ছাড়া এক্ষেত্রে আর কাউকেই খুব একটা বিচক্ষণ আচরণ করতে দেখা যায়নি। হ্যা ইদানিং রিয়াদও বুঝেছেন। অন্তত সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর অভিনীত ‘কলুর বলদ’ সিরিজ সেটাই প্রমাণ করে।

কারো বয়সই চিরস্থায়ী নয়, সিনেমার দুনিয়ায় নিজের বয়স বুঝে মানানসই কিছু করতে পারাটা জরুরী। বলিউডে যেমন একটা সময় খুবই মন্দা নেমে এসেছিল স্বয়ং অমিতাভ বচ্চনের ক্যারিয়ারেও। নব্বইয়ের দশকে বিগ বি’র ক্যারিয়ারে এক রকম তালাই লেগে গিয়েছিল। এমন সময় ‘মোহাব্বাতেঁ’ সিনেমায় রাশভারি এক অধ্যক্ষ্যের ভূমিকায় তাঁর আবির্ভাব ঘটে। প্রায় একই সময়ই শুরু হয় ‘কওন বানেগা ক্রোড়পতি’।

ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় পর্যায়ে গিয়ে কি করতে হবে, সেটা বুঝতে পেরেছিলেন বলিউডের শাহেনশাহ। সেজন্যই অনেকের মত তিনিই বলিউডের ইতিহাসের সেরা তারকা। অথচ, ক্যারিয়ার বিবেচনা করলে কিন্তু, তাঁর থেকে খুব একটা পিছিয়ে থাকবেন না রাজেশ খান্না, দেব আনন্দ কিংবা ধর্মেন্দ্ররা। বরং, কোনো কোনো দিক থেকে তারা অমিতাভের চেয়ে এগিয়েই ছিলেন।

কিন্তু, লম্বা দৌড়ে তাঁরা টিকতে পারেননি। এখন যেমন ঠিক অমিতাভের পথ ধরেই এগোচ্ছেন অনিল কাপুর কিংবা জ্যাকি শ্রফ। আর সেটা করতে পারেননি বলেই রেস থেকে অনেক আগেই ছিটকে গেছেন গোবিন্দ কিংবা সানি দেওল। ঢাকার সিনেমায় এই উদাহরণগুলো কেউ অনুসরণ করে না।

বলিউড কেন, আদর্শ অনুসরণ করার জন্য একটু কলকাতার দিকে তাকালেই চলে। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, লিলি চক্রবর্তীরা আজো দাপটের সাথে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। সুপ্রিয়া দেবীও বুড়ো বয়সে ‘মা’ সিরিয়ার করে নিজের পুরনো জাত চিনিয়েছিলেন। ইন্দ্রানী হালদার, শ্রীলেখা মিত্ররাও নিজেদের বয়স বুঝে মানানসেই চরিত্রটাই করেন।

তবে, এদের সবার থেকে আলাদা করে বলতে হয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা। এক জীবনে তিনি কি না করেছেন। স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের প্রথম পছন্দের নায়ক ছিলেন, হ্যা উত্তম কুমার থাকার পরও। হয়েছেন প্রথম ফেলুদা। অনেকের মতে তিনি এখন অবধি ইতিহাসের সেরা ফেলুদা। নায়ক হয়েছেন, ভিলেন হয়েছেন, রোম্যান্স করেছেন, থ্রিলার করেছেন। এখন এই বুড়ো বয়সেও তিনি অনবদ্য সব চরিত্র করে যাচ্ছেন।

এগুলো আমাদের তারকাদের চোখেই পড়ে না, হয়তো ওতোটা মনোযোগৗ হওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেন না। যার যেটা ভাল, সেটা গ্রহণ করলে সমস্যাটা কোথায়। দয়া করে ক্যারিয়ারটাকে তৃতীয় সারির কিছু কাজ, শিল্পী সমিতির পুনর্মিলনীর মাঝে সীমাবদ্ধ করবেন না!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।