এই মানুষটা হার মানতে জানেন না

২৫ এপ্রিল ২০১২!

সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে বায়ার্ন মিউনিখের মুখোমুখি রিয়াল মাদ্রিদ। প্রথম লেগে এলিয়েঞ্জ এরিনায় ২-১ এ গোলে হেরে নিজেদের মাঠে বাভারিয়ানদের হারাতে বদ্ধ পরিকর রিয়াল ‘রয়্যাল’ মাদ্রিদ। ম্যাচের ৬ মিনিটেই রোনালদোর গোল, আট মিনিট পর সেই রোনালদোর কল্যানেই রিয়াল ২-০ তে এগিয়ে। সেমিফাইনালে যাওয়া তখন কেবল মাত্র সময়ের ব্যাপার। কিন্তু ২৭ মিনিটেই পেনাল্টি থেকে রোবেনের গোলে সমতায় ফিরে বায়ার্ন মিউনিখ, দুই লেগ মিলিয়ে ৩-৩ এগ্রিগেটে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।

পুরো বার্নাব্যু তখন উত্তেজনায় কাঁপছে, শট নিতে আসছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, কিন্তু এ কি! নির্ধারিত সময়ে জোড়া গোল করে রিয়ালের ম্যাচ বাঁচিয়ে রাখার ত্রাণকর্তাই ট্রাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস!! পরের শট দিতে আসা কাকাও নয়্যারকে ফাঁকি দিতে পারলেন না, পেনাল্টি তে জাল খুজে পেলেন না সার্জিও রামোসও! ক্রুস আর লামের শট ফিরিয়েও তাই দলকে ফাইনালে নিয়ে যেতে পারলেন না ইকার ক্যাসিয়াস, দুমড়ে মুচড়ে মাঠের কোনায় বসে থাকা রোনালদোও তাই শপথ নিয়ে ফেললেন রিয়াল মাদ্রিদকে অন্তত একটা চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা তিনি উপহার দিবেনই।

২৯ এপ্রিল ২০১৪!

অ্যালিয়েঞ্জ অ্যারিনায় সেমিফাইনালে মুখোমুখি রিয়াল মাদ্রিদ ও স্বাগতিক বায়ার্ন মিউনিখ। প্রথম লেগে মাত্র ১-০ হেরেছিলো বাভারিয়ান রা, ফাইনালের তীব্র আশা নিয়েই তাই চেনা আঙিনায় নেমেছিলো রিবেরি, রোবেন, নয়্যার রা। ম্যাচের শুরুতেই রামোসে গোল, একটুপরেই ব্যবধান দ্বিগুন করে বসেন এই ডিফেন্ডার। বায়ার্ন আশা ছাড়ে নি তখনো, কিন্তু আরেকজনের স্মৃতিতে হয়তো তখন ২০১২’র সেই প্রতিজ্ঞার কথা ঘুরপাক খাচ্ছে ৩৪ মিনিটেই নয়্যার কে ফাকি দিয়ে বল জালে জড়িয়ে ফেললেন, প্রথম ফুটবলার হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগের এক মৌসুমে করে বসলেন ১৫ খানা গোল, ম্যাচের শেষ বাশি বাজার আগে আরো একখানা, ১৬ গোল করে চোখজুড়ানো সেলিব্রেশন।

এরপরে ফাইনালে অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষের বহু নাটকীয়তার ম্যাচে শেষ মুহুর্তে রামোসের হেড, অতিরিক্ত সময়ে বেল, মার্সেলোর পর ক্রিশ্চিয়ানোর গোলের পর জার্সি খুলে উদযাপন, প্রথম ফুটবলার হিসেবে এক মৌসুমে ১৭ টা গোলই শুধু করেন নি, হয়েছিলেন দায়মুক্তও! কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো কি আদতে সেখানেই থেমেছিলেন?

১২ এপ্রিল ২০১৬!

সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে শেষ আটের দ্বিতীয় লেগে অখ্যাত উলফসবার্গের মুখোমুখি রিয়াল মাদ্রিদ। প্রথম লেগে ২-০ গোলে হেরে বসে তখন চাপে রামোস, রোনালদোরা। কিন্তু সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর ৯০ মিনিট নাকি খুব দীর্ঘ, ত্রাণকর্তা আবারো সেই রোনালদো, প্রায় বিদায় নিতে বসা দলটাকে সাথে নিয়ে করে ফেললেন দুর্দান্ত এক হ্যাট্ট্রিক, খাদের কিনারায় থাকা রিয়াল মাদ্রিদ তখন সেমিফাইনালের পথে উড়াল দিচ্ছে। ফাইনালে আবারো রামোসের হেডে নির্ধারিত সময়ে শেষে ম্যাচ হয় ড্র, টাইব্রেকারের শিরোপা নিশ্চিত করতে আসা শটে গোল করে দলকে আবারো চ্যাম্পিয়ন লিগে চুমু খাওয়ার সুযোগ করে দিলেন সেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, পুরো টুর্নামেন্টে ১৬ গোলের পাশাপাশি ৪ খানা এসিস্ট, রিয়ালের ১১ তম চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জেতার পিছনেও সবচেয়ে বড় অবদান মাদেইরায় জন্ম নেওয়া এই জাদুকরের।

ক্রিষ্টিয়ানো রোনালদোর যাত্রাটা কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেননি। ২০১৬/১৭ মৌসুমে শুরুর দিকে নিষ্প্রভ থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ঠিকই জ্বলে উঠলেন, কোয়ার্টারে বায়ার্নের বিপক্ষে দুই লেগ মিলিয়ে করে ফেললেন ৫ গোল, সেমিফাইনালে অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে আবারো হ্যাট্ট্রিক, আর ফাইনালে কিংবদন্তি বুফনকে ফাকি দিয়ে জোড়া গোল, চ্যাম্পিয়নস লিগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাঁচ ম্যাচে করে ফেললেন ১০ গোল, যথারীতি এবারো টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোল-স্কোরার এই জাদুকরের।

এবারের মৌসুমেও চ্যাম্পিয়নস লিগে সেই পুরোনো রোনালদো, গ্রুপেই প্রতি ম্যাচেই গোল করে ভেঙ্গে ফেললেন নিজের রেকর্ড, শুরুর স্টেজেই নয় খানা গোলের মালিক। শেষ ১৬ তে প্যারিস সেন্ট জার্মেইর বিপক্ষে দুই লেগ মিলিয়ে তিনটা গোল, দলকে নিয়ে গেলেন কোয়ার্টারে।

শেষ আটের প্রথম লেগে তো করে ফেললেন অতিমানবীয় এক গোল, অবিশ্বাস্য বাইসাইকেক কিকে করা গোলটা চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলও, দুই লেগ মিলিয়ে এখানেও ৩ টা গোল করে রিয়াল মাদ্রিদকে সেমিফাইনালের টিকিট ধরিয়ে দিলেন, শেষ পর্যন্ত টানা তৃতীয়বার মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পড়ে ফেললো রিয়াল মাদ্রিদও। পুরো টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ১৫ গোলের পাশাপাশি তিনটা অ্যাসিস্ট, হুস্কোর্ডের রেটিংয়ে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রেটিংও ৩৩ বছর বয়সী এই ফুটবলারের।

চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে পাঁচবার এই ট্রফিতে চুমু খেয়েছেন, সর্বোচ্চ গোল, এসিস্ট, হ্যাট্ট্রিক, ফাইনালে গোল, অ্যাওয়ে, হোম, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল সবকিছুতেই নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে।

গোটা ক্যারিয়ারে কম উত্থানপতন দেখেননি, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসিকে টানা চারবার বর্ষসেরা হতে দেখেছেন, এরপরেও দমে না গিয়ে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে লড়ে গেছেন, ব্যবধান কমিয়েছেন, সমতায় ফিরেছেন, এর ফাঁকে দেশকে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক শিরোপার স্বাদও!

এই মানুষটা হার মানতে জানেন না, দলকে একটা ফাইনাল উপহার দেওয়ার কথা বলে চার চারটা ট্রফির স্বাদ দিয়েছেন। ২০০৯ থেকে ২০১৮! মাঝের এই নয় বছরে রিয়ালের হয়ে ৪৩৮ টা ম্যাচ খেলে করেছেন ৪৫০ গোল, শিরোপা উঁচু করে বুনো উল্লাস করেছেন ১৬ বার! একজন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ডস সান্তোস আভেইরো তাই বল পায়েই তীব্র সুন্দর।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।