ইবনে বতুতা: বিশ্ব ভ্রমণের মহাপুরুষ

আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ, ৩০ বছরে ৭৫ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে যিনি অমরত্ব কুঁড়িয়েছেন, ভ্রমণপিপাসা শব্দযুগলকে নিয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। কখনো নদীপথ, কখনো উট কাফেলায়, কখনো পায়ে হেঁটে! কুঁড়ি বছর বয়সে ঘর ছাড়া সম্ভ্রান্ত বালকের মাথায় একটিই চিন্তা, জানতে হবে বিশ্বকে।

আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ থেকে ইবনে বতুতা হবার রাস্তাটা সুপ্রশস্থ, এক লক্ষ বিশ হাজার কিলোমিটার প্রায়! নিষ্কন্টক মোটেই নয়, কাঁটা সরিয়েই উন্মুক্ত করেছেন জগত সংসারের রূপ, গরিমা, প্রাচুর্য, ধনভাণ্ডার, সংস্কৃতি, সত্ত্বা! কাজীর দায়িত্ব পালন করে আসা পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রেখে বের করেছেন নিজেকে, নিজস্বতাকে।

কখনো আড়ালে, কখনো প্রকাশ্যে, ধীরে ধীরে গড়েছেন পর্যটন জীবনের প্রতিটি স্তম্ভ। ১৩০৪ খ্রিস্টাব্দের ২৪ ফেব্রুয়ারি মরক্কোর তাঞ্জিয়েরে জন্ম নেওয়া বতুতা প্রথম যেদিন ঘর ছাড়েন কালের ক্যালেন্ডারে তখন ১৪ জুন, ১৩২৫। ২১ বছর তিন মাস ২০ দিনে পরিবার পরিজন ছেড়ে রওনা হন পৃথিবী দেখার নেশায়।

ইবনে বতুতা। যার মনের ক্যানভাসে ভাসত গোটা দুনিয়া। ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র’ – হতে তিনি চেয়েছেন কৈশোর থেকেই। ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় তীব্র আকাঙ্খায়, ঘর ছেড়ে একা পাখি মুক্ত হবার বুনিত বীজও বাড়তে থাকে সময়ের তালে তালে। ১৪ জুন তাঞ্জিয়ের থেকে হজ পালনের উদ্দেশ্যে সবার আগে রওনা দেন মক্কার দিকে।

আফ্রিকার সমুদ্রবর্তী তীর ঘেঁষে হাফসিদ সাম্রাজ্য, আব্দাল ওয়াদিদ, তিমসান, তিউনিস, বিজাইরা, কায়রো হয়ে মক্কায় পৌঁছান। গোটা ভ্রমণে বাহন ছিল পা জোড়া। এ পথে আরব বেদুইনদের দৌরাত্ম্য ছিল। তিউনিসে প্রায় দুই মাসের যাত্রাবিরতির পর সুফি সাধক শেখ আবুল হাসান সাদিদির সঙ্গে মোলাকাত হয় তাঁর। মদিনাগামী এক কাফেলায় যোগ দিয়ে মোহাম্মদ (স) এর রওজা জিয়ারত শেষে মক্কায় ধুলোমাটি গায়ে মাখেন। হজ পালন শেষে যাত্রা শুরু করেন মধ্য এশিয়ার পানে। ১৯২৬ সালের ১৭ নভেম্বর এক কাফেলার সঙ্গে আরব সাগর হয়ে ইরাকের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সেই মহাযাত্রা।

শিক্ষা সর্বত্র গ্রহণযোগ্য। সত্যতা মেলে দেশে দেশে ইবনে বতুতাকে করা আদর আপ্যায়নে। যখন যেখানে গেছেন, রাষ্ট্রীয় অতিথির সম্মানে অধিষ্ঠ হয়েছেন। পেশায় কাজী, জীবনের লম্বা সময় সেই দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নানান সময় নানান দায়িত্ব পেয়েছেন। কখনো রাষ্ট্রদূত, কখনো আবার সেনা কমান্ডার। কাজের প্রয়োজনে বদলেছেন পরিচয়ও, ছদ্মবেশেই ছিলেন বহুদেশে।

চীন দেশে লোকে তাঁকে শামসুদ্দিন নামে চিনত, ভারত জানত তিনি মাওলানা বদর উদ্দিন। গোটা মুসলিম বিশ্ব ঘুরে ঘুরে দেখেছেন শাসন, শোষণ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মানুষের যেমন গুণ গেয়েছেন, ‘রেহলা’ নামে রচিত তাঁর ভ্রমণ গ্রন্থে তেমনি উল্লেখ অত্যাচারী শাসকের বর্বরতার নির্মম ইতিহাস।

তিন দশকে চল্লিশেরও বেশি দেশ ভ্রমণ করা ইবনে বতুতা তাঁর এই ঐতিহাসিক উপাখ্যানে লিখে গেছেন আফ্রিকা থেকে শুরু হওয়া যাত্রার বাকী পথের কাহানি। মিশর, সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, সিরিয়া, আফগানিস্তান, কাজাখস্তান, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, চীন পরিভ্রমণের বর্ণনায় উঠে আসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস।

ইবনে বতুতা ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। মেনে চলতেন ইসলামের বিধিনিষেধ। জানা যায়, তিনি যদি কোন বিপদের সম্মুখীন হতেন পবিত্র আল কুরআনের যেকোন একটি পাতা খুলে পড়তেন। সেখানে যে আয়াত তাঁর চোখে পড়ত সেটির অর্থ বুঝে সেই মোতাবেক সিদ্ধান্ত নিতেন তিনি। ভ্রমণ জীবনে অসংখ্য উপহার পেয়েছেন ইবনে বতুতা।

বিভিন্ন দেশের রাজা রাণীরা জাহাজ ভর্তি উপহার, ঘোড়া, উট, দাস-দাসী উপঢৌকন হিসেবে দিতেন। দীর্ঘ ভ্রমণ জীবনে হেঁটেছেন মরুভূমির তপ্ত বালিতে, সমুদ্রে জাহাজডুবী, জলদস্যুর হামলায় মৃত্যুকে দেখেছেন চোখের সামনে, ভিনদেশী সৈন্যদলের আক্রমণে সফরে বহুবার নেমে এসেছে দৈন্যতা। তবু তিনি থমকে যাননি।

গোটা বিশ্ব ঘুরেছেন, পদচিহ্ন এঁকেছেন বাংলায়ও। ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুন বাংলাদেশে আসেন ইবনে বতুতা। মূলত হযরত শাহজালাল (র) এর সঙ্গে সাক্ষাৎই ছিল এদেশে আসার মূখ্য উদ্দেশ্য। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি আসবেন এই কথা কাউকে না জানালেও হযরত শাহজালাল ঠিকই জানতে পারেন এবং বতুতাকে গ্রহণ করতে দুইজন শিষ্যকে পাঠান।

প্রথমে চট্টগ্রাম, পরে পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে সোনারগাঁও যান তিনি। বাংলাদেশে তখন ছিল সুলতান ফখরউদ্দিনের শাসন। জিনিসপত্র সবকিছুই পাওয়া যেত নামমাত্র মূল্যে। বতুতার ভাষ্যমতে- ‘টানা ৪৩ দিন রাত সাগরে কাটিয়ে আমরা বাংলায় আসি। বিশাল দেশজুড়ে সবুজের সমারোহ, শস্যভান্ডার। এখানে প্রচুর চাল পাওয়া যায়। এত সস্তায় পণ্যসামগ্রী মেলে, যা পৃথিবীর আর কোথাও দেখিনি।’

প্রকৃতির প্রেমে মুগ্ধ হয়ে তিনি আরো বলেন – ‘বাংলা শ্যামল, ছায়া সুনিবিড় গ্রাম, সবুজ মাঠ, নদী, ফলফলাদির প্রাচুর্যে এতটাই মজি আমরা; টানা পনেরো দিন পাল তোলা নৌকায় করে গ্রাম আর সবুজের সুধা পান করতে করতে নদীতে ঘুরেছি।’ হযরত শাহজালাল তাঁকে ছাগলের পশমের কোট উপহার দেন। নদীর দুইধারে বৃক্ষরাজির এহেন সৌন্দর্য এবং ফলের বাগান দেখে বতুতার মনে হয়েছিল তিনি যেন কোন চলমান পণ্যের বাজার ঘুরছেন।

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাঁর ত্রিশ বছর, চল্লিশ দেশ, পঁচাত্তর হাজার মাইল, অজস্র উপহার, অগণিত সুফী, সুলতান, আলেমসহ অসংখ্যা বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য লাভ এসবের ইতি টানেন নিগ্রোল্যান্ড গিয়ে। তৃতীয় দফায় হজ পালন শেষে ১৩৫১ খ্রিস্টাব্দে সাহারা মরুভূমির উত্তরে সিজিলমাসার উদ্দেশ্যে বের হোন।

১৩৫২ সালে লবণের জন্য বিখ্যাত শহর তাঘাজা হয়ে নিগ্রোল্যান্ডে পৌঁছান। সেখান থেকে মহা সফরের বিজয় ঝান্ডা নিয়ে ১৩৫৩ তে স্বদেশের পথে রওনা দিয়ে পরের বছর ১৩৫৪ খ্রিস্টাব্দে জন্মভূমি মরক্কোয় ফের পদার্পণ করেন। দেশে ফিরলে এই পর্যটককে সুলতান আবু ইনান ফারিস রাজ দরবারে ভ্রমণ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার আহবান জানান। সুলতান তাঁর ব্যক্তিগত সচিব ইবনে জাজাইকে এই মহাকাব্য লিখার দায়িত্ব সমর্পণ করলে তিনি এই ভ্রমণ কাহিনী লিখতে থাকেন।

প্রায় একবছর পর, ১৩৫৫ সালের ডিসেম্বরের ৯ তারিখ মৌখিক বর্ণনা শেষে ‘রেহলা’ গ্রন্থ মুদ্রণের কাজ শুরু হয়। এই গ্রন্থে বৈশ্বিক রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা, পরিবেশ, আচার সবকিছু খুব সুন্দর ও সাবলীলভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়। রেহলা শব্দের তর্জমা করলে বাংলাটা প্রায় এমন দাঁড়ায় – ‘মুসলিম সাম্রাজ্যের সৌর্য, শহরের গৌরব গরিমা ও পরিভ্রমণে উৎসুকদের পথের পাথেয়। রেহলা গ্রন্থটি ইবনে বতুতার দূরদর্শী ভাবনার সঙ্গে যেমন পরিচয় করিয়ে দেয়, ব্যক্তি ইবনে বতুতার সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় তেমনি এটি মানবসভ্যতার এক সম্পদ, দলিল হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছে সুউচ্চে।’ ১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দে ৬৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন বিশ্ব ভ্রমণের এই মহাপুরুষ।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।