রুপের রানী, ট্র্যাজেডির রানী

সেই আমলে বলিউডে লোকে মিনা কুমারীকে যেমন বন্দনা করতো, ততটা আর কোনো যুগেই কাউকে ঘিরে করা হয়নি। যেকোনো সময়ে, হোক সেটা যখন তাঁর বৃহস্পতি তুঙ্গে ছিল, কিংবা মৃত্যুর পর, অথবা যখন প্রথম সিনেমা ‘বাইজু বাওরা’ মুক্তি পায় – সব সময়ই সমান ভাবে আলোচিত ছিলেন তিনি।

তিনি অতুলনীয়, অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর যোগ্যতার কাছাকাছি কাউকে রাখে না বলিউড। তিনি হলে সেলুলয়েডের কবি, তিনি সকল প্রশংসার যোগ্য। একজন নায়িকাই নন, একাধারে তিনি এখন গায়িকা ও কবি। তিনি বলিউডের আইকন, তিনি ফেমের দুনিয়ায় দাঁপিয়ে বেড়ানো এক ট্র্যাজেডির নাম।

  • বেবি মিনা থেকে মিনা কুমারী

মিনা কুমারীর আসল নাম  মাহজাবিন বানু। মাত্র চার বছর বয়সে শিশু শিল্পী হিসেবে অভিনয়ের ক্যারিয়ার ‍শুরু করেন তিনি। প্রথমদিককার সিনেমার অধিকাংশগুলোতে তাঁর সাথে ছিলেন বিজয় ভাট। ১৯৪০ সালের ‘এক হি ভুল’ সিনেমায় তাঁর নাম দেওয়া হয় ‘বেবি মিনা’। যে কোনো শিশু শিল্পীর নাম করণের ক্ষেত্রেই তখন ‘বেবি’ শব্দটি যোগ করার চল ছিল। যৌবনে সেই নাম হয় মিনা কুমারী।

বেবি মিনা

মিনা কুমারীর জন্ম ১৯৩৩ সালের এক আগস্ট, মুম্বাইয়ে। কোনো অভিজাত পরিবারে হয়নি তাঁর জন্ম। বাবা-মায়ের অর্থকড়ি ছিল না বললেই চলে। এমনকি যখন মিনা কুমারীর জন্ম হয় তখন ডাক্তারকে ডেলিভারির পারিশ্রমিক দেওয়ার মত কোনো অর্থও ছিল না বাবার কাছে।

বাধ্য হয়ে মেয়েকে তিনি একটা অনাথ আশ্রমে রেখে এসেছিলেন। কয়েক ঘন্টার মধ্যে নিজের ‍ভুল বুঝতে পেরে মেয়েকে ফিরিয়েও আনেন। কে জানে, বাবা সেদিন ফিরিয়ে না আনলে হয়তো কোনো দিনই রুপালি জগতের বড় তারকা হতে পারতেন না মিনা।

মিনার শৈশবটা মোটেও স্মরণীয় ছিল না। খুব বেশি স্কুলে যেতে পারেননি। অনেকবার স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু, সিনেমার শিডিউল থাকায় স্কুলে নিয়মিত ছিলেন না। অতটুকু বয়সে তাঁর অভিনয় থেকে প্রাপ্ত পারিশ্রমিকেই যে সংসার চলতো।

যদিও, পড়াশোনার প্রতি খুব ঝোঁক ছিল মিনার। বই পড়তে কিংবা কারো বই পড়া শুনতে খুব পছন্দ করতেন মিনা। তাই এক সময় তাঁর নামও হয়ে যায় ‘পড়ুয়া মাহজাবিন’।

  • জীবনের চেয়েও বড় বন্ধু

কবি, সঙ্গীতজ্ঞ ও চলচ্চিত্র পরিচালক গুলজারের সাথে দারুণ একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছিল মিনার। গুলজার পরিচালক হিসেবে নিজের প্রথম সিনেমা ‘মেরে আপনে’-তে নিয়েছিলেন মিনা কুমারীকে। পত্র-পত্রিকায় ‍দু’জনকে নিয়ে নানারকম গালগল্প ছাপা হতে থাকে। কিন্তু, দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব্যের চেয়ে বেশি কিছু কখনো আবিস্কার করা যায়নি।

যদিও, এই বন্ধুত্বের জের ধরেই কুমারীর উর্দুর প্রতি ভালবাসা তীব্র হয়। তিনি গুলজারের আরো ঘনিষ্ট হন। মারা যাওয়ার আগে প্রিয় বন্ধুকে নিজের লেখা কবিতার ডায়রিটা দিয়ে গিয়েছিলেন। গুলজার পরবর্তীতে বই আকারে সেই ডায়রিটা প্রকাশ করেন।

  • বলিউডের মেরিলিন মনরো

মিনা কুমারীকে বলা ভারতের মেরিলিন মনরো। হঠাৎ হলিউডের সেক্স সিম্বলের সাথে মিনার তুলনা কেন? না, পেশাদার ক্যারিয়ার দিয়ে আসলে তাদের মেলানো যায় না। তবে, ব্যক্তিগত জীবনে দু’জনার মধ্যে ‘চমৎকার’ মিল আছে।

দু’জনেই শক্ত একটা ইন্ডাস্ট্রির নাম্বার ওয়ান ছিলেন। কিন্তু, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে রীতিমত ঝড় তুলে ফেলেছিলেন। শেষের দিকে তাই জীবনটা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। মনরো ছিলেন মাদকাসক্ত। আর মিনা কুমারী ছিলেন অ্যালকোহলিক।

দু’জনের বিয়ে করে সংসারি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু, তাদের সেই স্বপ্ন দু:স্বপ্নে পরিণত হয়। কুমারির স্বামী ছিলেন কামাল আরোহি। ১২ বছর সংসার করে তাঁরা আলাদা হন। অন্যদিকে মনরো আর্থার মিলারের সাথে পাঁচ বছর সংসার করেন।

দু’জনের জীবনাবসান হয় ত্রিশের কোঠায়। দু’জনের অপর নামই তাই ট্র্যাজেডি কুইন। ৯০ টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করা মিনা কুমারীর মৃত্যু হয় মাত্র ৩৮ বছর বয়সে। লম্বা সময় পরিবারের ঘানি টানতে টানতে বড্ড ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি। ১৯৭২ সালের ৩১ মার্চ লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে তিনি জীবন নদীর ওপারে চলে যান।

  • প্রাপ্তির শিখরে

যতটুকু সময় তিনি বলিউডে ছিলেন প্রাপ্তি আর পুরস্কারের খাতাটা ভরপুরই ছিল।  কেবল তাঁর অনেকগুলো সিনেমা কেবল অস্কারেই যায়নি, যতদিন কাজ করেছেন ততদিন রাজত্ব করেছেন ফিল্ম ফেয়ারেও। ফিল্ম ফেয়ারের প্রথম আসরেই ১৯৫৪ সালে অভিষেক সিনেমা ‘বাইজু বাওরা’ তিনি জিতে নেন সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার।

এই সিনেমার শ্যুটিংয়ের সময়ই অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান মিনা। সিনেমার শেষ দৃশ্যে শীর্ষ দু’টি চরিত্র মিনা কুমারী ও ভারত ভূষণ ডুবে মারা যান। সেই দৃশ্যের শ্যুটিং করতে গিয়ে মিনা প্রায় ডুবে যেতেই বসেছিলেন। ক্রুদের সাহায্যে কোনোক্রমে রক্ষা পান।

পরের বছর একই পুরস্কার পান ‘পরিনীতা’ সিনেমার জন্য। শেষ ফিল্মফেয়ার পান ১৯৬৬ সালে ‘কাঁজল’ সিনেমার জন্য। ১৯৬৩ সালের ফিল্মফেয়ারটা ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা। ‘সাহেব বিবি গোলাম’-এর ‘ছোট’ চরিত্রটির জন্য তিনি তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পান।

  • ভুতুড়ে অভ্যাস

‘মিনা কুমারী – দ্য ক্লাসিক বায়োগ্রাফি’ – মিনা কুমারীর আত্মজীবনীতে অনুলেখক বিনোদ মেহতা লিখেছেন, মিনা ‍কুমারীর প্রিয় রং ছিল সাদা। শুধু পছন্দের রংই না, সাদার প্রতি একরকম আসক্তিও ছিল তাঁর। তাই যেকোনো অনুষ্ঠানে বা পার্টিতে গেলে তিনি সাদা কোনো পোশাক পরতেন।  এমনকি ঘরের প্রায় প্রতিটি সামগ্রীর রংই ছিল সাদা। কে জানে, মিনার কাছে কষ্টের রংটাও হয়তো সাদাই ছিল!

– ডেইলি নিউজ অ্যানালাইসিস অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।