বেলজিয়ান ফুটবলের বিস্ময়কর এক গল্প

রাশিয়া বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ফেবারিট কারা? বিশ্বকাপের আগে যেসব ফুটবল পণ্ডিত এই প্রশ্নের জবার দিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের ভবিষ্যৎদ্বানীতে একটি দেশের নাম কমন ছিল। দেশটি হল বেলজিয়াম। আর গ্রুপ পর্ব শেষে বেলজিয়ানরা বাকিদের চেয়ে নিজেদের এগিয়েই রাখলো। কারণ, তারাই তো গ্রুপ পর্বের একমাত্র ফেবারিট দল, যারা তিনটি ম্যাচের সবগুলোতেই জয় পেয়েছে। ফেবারিটের তালিকায় না থাকা আরো দু’টো দল পেয়েছে তিনটি করে জয়। তারা হল উরুগুয়ে ও ক্রোয়েশিয়া।

এই সাফল্যের সুবাদে নকআউট রাউন্ডেও এই বেলজিয়াম এখন বড় শক্তি। প্রশ্ন হল, এই সাফল্যের রহস্য কি? উত্তর জানতে ফিরে যেতে হবে ১৫ বছর পেছনে।

১৭ জুন, ২০০২। জাপানের কোবে উইং স্টেডিয়াম। গ্রুপ পর্বে অধিনায়ক মার্ক উইলমটের একার দাপটে শেষ ষোলতে উঠে যাওয়া বেলজিয়ামের সামনে প্রতাপশালী ব্রাজিল। এবার আর হল না। ২-০ গোলে হেরে অশ্রু নিয়েই বিশ্বকাপকে বিদায় বলতে বাধ্য হল ইউরোপিয়ান দলটি।

বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ম্যাচে ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হয়েছিল বেলজিয়াম।

বিধ্বস্ত হয়ে দেশে ফিরলো বেলজিয়াম। বার বার দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বাদ পড়ার হতাশার মধ্যে শুরু হল নতুন উদ্যোমে কাজ করা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশি কিছু কিশোর ফুটবলার বেছে নিয়ে ফুটবল ফেডারেশন শুরু করলো এক মহাপরিকল্পনা।

কদিন বাদেই বেলজিয়ামের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকা এই কিশোরদের ভিতর থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ১৫ জন তারকার কথা উল্লেখ করেন। তাদের মধ্যে শুধু বেলজিয়াম নয়, একটা সময় পায়ের ছন্দে পুরো বিশ্বকেই কাঁপিয়ে দেবেন তারা। সেখানে ছিলেন ইডেন হ্যাজার্ড, কেভিন ডি ব্রুইন, ভিনসেন্ট কোম্পানি, রোমেলু লুকাকু, মুসা ডেম্বেলে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা। তখন সেই লেখাটি কেমন আলোড়ন তোলে জানা যায়নি, কিন্তু সেই খেলোয়াড়রা ঠিকই ২০১৪ সালের পর এবারের রাশিয়া বিশ্বকাপেও আলোচনার ঝড় তুলছেন।

পত্রিকায় প্রকাশিত সেই ভবিষ্যদ্বানী

২০০০ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে স্বাগতিক হওয়ার পরও প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় আর ২০০২ বিশ্বকাপ থেকে আশানুরূপ ফল না আসায় নতুন করে ভাবতে বসেন বেলজিয়ামের ফুটবল বোদ্ধারা। ২০০২ সাল পর্যন্তও টানা ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছে বেলজিয়াম। কিন্তু ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে সেমিফাইনালে পৌঁছানো বাদ দিলে বড় কোন সাফল্য নেই দলটির। সাফল্যের খোঁজেই তাই নতুন কিছুর সন্ধান করা হয়!

মূল কাজটা করেন বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন টেকনিক্যাল ডিরেক্টর মিশেল স্যাবলন। বেলজিয়ামে তখন বেশ কিছু তরুণ প্রতিভা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এদের মধ্য থেকেই অভাবনীয় কিছু গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করতেন স্যাবলন। ২০০১ সালে তিনি ১০ বছর মেয়াদী একটা ফুটবল সাফল্যের নীল নকশা নির্মাণ করেন। ঢেলে সাজানো হয় ঘরোয়া লিগের কাঠামো। মিশেল স্যাবলন এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘২০০১ সাল থেকে বেলজিয়াম তরুণ প্রতিভা খুঁজে বের করে তাদের মধ্যে আরও উন্নতি আনার জন্য কাজ শুরু করা হয়। এটা ছিল খেলোয়াড়দের দিকে আরও মনোযোগ দেয়ার এক রকম কর্মকৌশল। সেরা মানের কোচিং ফর্মুলার কথা সেখানে বলা হয়।’

গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আছেন চার গোল করা রোমেলু লুকাকু।

স্যাবলন বিশ্বাস করেন সেসময় প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ ক্লাব সেই কর্মকৌশলটি মেনে নিয়েছিল। আর সেই ফলাফলই এখন চোখের সামনে। স্যাবলনের মতে, ‘আগে আমাদের দলে ৪-৫ পাঁচজন খেলোয়াড় থাকতেন যারা প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এখন সেই সংখ্যাটা দ্বিগুণে পরিণত হয়েছে।’

পরিকল্পনা থেকে তাত্ক্ষণিক কোন সাফল্য আসেনি। এক যুগ বড় কোন টুর্নামেন্টে খেলারই সুযোগ আসেনি বেলজিয়ামের সামনে। কিন্তু তার মাঝেও কাজ করে গেছে বেলজিয়াম। এই সময়ের কাজটাও করেন সেই মিশেল স্যাবলন। তার মুখেই শোনা যাক সেই সময়ের কথা, ‘২০০২ সালে আমরা খুব কাছ থেকে ফ্রান্সকে দেখার চেষ্টা করি। বছরে অন্তত দু’বার ওদের বিপক্ষে আমরা খেলতাম। একই কাজটা করি নেদারল্যান্ডসের ক্ষেত্রেও। জার্মানীর সাথেও বছরে দু’-একবার খেলার চেষ্টা করতাম। সেখান থেকেই আস্তে আস্তে আমাদের মধ্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। তখন আমরা কোথাও ছিলাম না। কেউ কোন রকম সমীহ দেখাতো না। আমাদের বয়সভিত্তিক দল যেমন অনূর্ধ্ব ১৭ ও অনূর্ধ্ব ১৯ দলের র‌্যাংকিং তখন ছিল ২৩ ও ২৮। পরিবর্তনটা বুঝতে পারছেন তো। সেই বেলজিয়ামের র‌্যাংকিং এখন দশের মধ্যে।’

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আদনান জানুজাজের গোলের পর

এমনকি ২০০৭ সালেও এই বেলজিয়াম দলেরই র‌্যাংকিং ছিল ৭১। আর সর্বশেষ ফিফা জানিয়েছে, তাদের র‌্যাংকিং এখন তিন। এই উত্থানকে অবিশ্বাস্য বললেও কম বলা হয়।

দশ বছরের সেই কর্মপরিকল্পনার অধীনে খেলার স্টাইল নিয়েও কাজ করেন স্যাবলন, ‘আমি সবাইকে ৪-৩-৩ ফরমেশনে খেলার কথা বলি। সেখানে উইঙ্গার, তিনজন মিডফিল্ডার ও ফ্ল্যাট ব্যাকে চারজন রাখতে বলি। এটা তাদের জন্য ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা।’

এই ধারাবাহীক পরিকল্পনা আর সেই অনুযায়ী কাজ করাই বেলজিয়ামের মূল হাতিয়ার। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে পরিকল্পনা দিয়ে কিছুটা সাফল্য তাঁরা পেয়েছিল। গিয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনাল অবধি। আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হেরে ৩২ দলের মধ্যে ষষ্ঠ অবস্থান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাঁদের।

এবার স্বপ্ন আরো বহুদূর। অধিনায়ক ইডেন হ্যাজার্ড তো বলেই রেখেছেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতেই এসেছে বেলজিয়ানরা। স্বপ্নপূরণের এই যাত্রা শুভ হোক।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।