মুয়াম্মার গাদ্দাফি: নায়কোচিত এক খলনায়ক

অন্য সকল আরব শিশুর মতই ছিলেন তিন। তাঁর শিক্ষাজীবনও লিবিয়াতে ধর্মীয় শিক্ষা দিয়েই শুরু হয়। তখন অবশ্য, দেশটিতে পড়াশোনা বিনামূল্যে পাওয়া যেত না। তবে, দরিদ্র বাবা শিক্ষার আলোটা ঠিকই আনতে পেরেছিলেন ঘরে। সিরত শহরের এক স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয় বালকের।

তবে, স্কুল ছিল বাড়ি থেকে অনেক দূরে। আর বাবারও হোস্টেলে রাখার সামর্থ্য ছিল না। বালকের তাই ঠাঁই হয়েছিল মসজিদে। ছুটির দিনগুলোতে তিনি ২০ মাইল হেঁটে বাড়ি ফিরতেন। জীবনের পথেও তিনি পরবর্তী সময়ে অনেক দূরে হাঁটেন। এই বালকই হলেন মুয়াম্মার আবু মিনিয়ার আল গাদ্দাফি। তাঁকে নায়ক কিংবা খলনায়ক, আলোচিত কিংবা সমালোচিত – অনেক ভাবেই দেখা যায়, তবে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা যায় না।

বাবা আবু মিনিয়ার। তিনি এক গোত্র প্রধানের অধীনে কাজ পাওয়ার তাঁর পরিবার সিরত থেকে ফেজান এলাকার সাবাহ নগরীতে চলে আসে। সেখানে এসে নতুন স্কুলে ভর্তি হয় সে! লেখাপড়া, নেতৃত্বের গুণাবলীতে সে স্কুলে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।  এই স্কুলের অনেকেই পরবর্তী সময়ে লিবিয়ার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন।  বিশেষ করে তাঁর স্কুলের কাছের বন্ধু আব্দুস সালাম জালৌদ লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

১৯৪২ সালে লিবিয়ার উপকূলীয় এলাকা সিরতে জন্ম হয় গাদ্দাফির। পিতা-মাতার একমাত্র জীবিত সন্তান গাদ্দাফি। আগে জন্ম নেওয়া তিন বোন শৈশবেই মারা যান। বেদুইন সংস্কৃতিতে বড় হন গাদ্দাফি। এমনকি, রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও তিনি অধিকাংশ সময় তাবুতে কাটাতেন, শহরের চেয়ে মরুভূমিকে বেশি পছন্দ করতেন।

গাদ্দাফির সাত ছেলে এবং এক মেয়ে।  বলা হয়, তার আরেক মেয়ে ১৯৮৬ সালে তার বাড়িতে মার্কিন বিমান হামলায় মৃত্যুবরণ করে।  যদিও পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালের এক ভিডিওতে দেখা যায় সেই মেয়েটির সাথে গাদ্দাফি খেলা করছেন!

এক ছেলে সাদ গাদ্দাফি নিজে একজন বেশ ভালো ফুটবলার ছিলেন এবং তিনি লিবিয়ার জাতীয় দলে খেলেছিলেন। তার একমাত্র কন্যা আয়েশা গাদ্দাফি একজন আইনজীবী এবং তিনি ইরাকের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেইনের পক্ষে আইনি লড়াই করে বেশ আলোচিত হয়েছিলেন।

গাদ্দাফি বরাবরই স্বাধীনচেতা ছিলেন। উপনিবেশিক সময় থেকেই তিনি দেশকে ইউরোপিয়ানমুক্ত করতে চাইতেন। সাবাহ নগরীর যে স্কুলে পড়তেন, সে স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষক ছিল মিশরের। তাঁদের সহায়তায় গাদ্দাফি মিশরের খবরের কাগজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক আর্টিকেল, রেডিও অনুষ্ঠান পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

মিশরের বিপ্লবী নেতা কর্নেল জামাল আব্দুল নাসের এর লেখা বই ‘বিপ্লবের দর্শন’ পড়ে গাদ্দাফি নাসেরের ভক্ত হয়ে যান। তাঁর মাঝে গড়ে উঠতে থাকে রাজনৈতিক চেতনা। নাসেরের উপনেবিশবাদ ও ইসরায়েল বিরোধী মতবাদের বিরুদ্ধে আরব জাতীয়তাবাদের ধারনা দ্বারা ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত হন গাদ্দাফি।

নাসেরের জীবন থেকেও প্রভাবিত হন গাদ্দাফি। তাঁর মতই নিজের নামের সাথে কর্নেল পদবী যোগ করেন। লিবিয়াতে কারো মূর্তি তৈরি না হলেও বেনগাজিতে কর্নেল নাসেরর একটা মূর্তি তৈরি করা হয়।

১৯৬৩ সালে বেনগাজীর সামরিক পরিষদে যোগদান করার পর গাদ্দাফী উচ্চ প্রশিক্ষণের জন্যে ব্রিটেন গমন করেন! ১৯৬৬ সালে কমিশন প্রাপ্ত অফিসার পদে উন্নীত হয়ে লিবিয়ায় ফিরে আসেন এবং তাঁর অনুগত কতিপয় সামরিক কর্মকর্তা সহ লিবিয়ার
পশ্চিমমুখী রাজতন্ত্রকে (সেনুসী রাজতন্ত্র- রাজা ছিলেন মুহাম্মাদ ইদ্রিস আল সেনুসী ) উৎখাত করার জন্যে একটি গুপ্ত সংঘ গঠন করেন।

১৯৬৯ সালের পহেলা সেপ্টেম্বরে ২৭ বছরের যুবক কর্নেল মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি এক কাণ্ড করে বসেন! তাঁর অনুগত অল্প কতক সামরিক অফিসারের সহায়তায় রাজধানী ত্রিপলীতে এক প্রতিরোধ ও রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আফ্রিকার বৃহত্তম তেলভান্ডার ও বিশ্বের শীর্ষ তেলসমৃদ্ধ লিবিয়ার শাসন ক্ষমতা দখল করে বসেন।

তৎকালীন লিবিয়ার বিলাসপ্রিয়,সাম্রাজ্যবাদের পুতুল রাজা মুহাম্মাদ ইদ্রিস আল সেনুসী তাঁর শারীরিক অসুস্থতার জন্য তখন তুরস্ক সফরে ছিলেন। পশ্চিমাদের পুতুল রাজার উচ্ছেদকারী গাদ্দাফিকে মানুষ বিপুলভাবে সেদিন স্বাগত জানায়,যা লিবিয়ার ইতিহাসে ‘সেপ্টেম্বর বিপ্লব’ নামে পরিচিত। 

গাদ্দাফিকে পূর্ণ সহযোগিতা করেছিলেন গাদ্দাফির মানস গুরু ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু তৎকালীন মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুল নাসের। যার ফলে আজও জামালের আব্দুল নাসেরের মৃত্যুদিবস লিবিয়াতে সরকারি ছুটির দিন হিসাবে পালিত হয়।
পরবর্তীতে, সাবেক রাজা আমীর ইদ্রিস আল সেনুসীকে তুরস্ক থেকে মিশরে নির্বাসন দেয়া হয় এবং তিনি আমৃত্যু সেখানেই অবস্থান করেন।

এদিকে গাদ্দাফি তাঁর বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ও দেশের প্রভাবশালীদের মধ্যকার ক্ষমতাকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব ও বিবাদ নিরসন করে নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করেন এবং ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে একজন সফল শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। কি প্রকাণ্ড এক উত্থান!

১৯৭৫ সালে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে রচিত কিতাব আখজার তথা ‘দ্য গ্রিন বুক’ প্রকাশিত হয়। ইসলামের শরিয়াহ ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শের নীতিমালাকে ভিত্তি করে লেখা এই বইটিই ছিল লিবিয়ার সংবিধান। স্কুলে এই বই পড়া ছিল বাধ্যতামূলক।

সবুজ রঙের প্রতি গাদ্দাফি দুর্বলতা ছিল। তাই, তার সময়ে লিবিয়ার জাতীয় পতাকাও ছিল সম্পূর্ন সবুজ রঙের। আসলে একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাসী একজন স্বৈরশাসকের যা যা ‘গুন’ থাকা দরকার তাঁর সবই বিদ্যমান ছিল গাদ্দাফির মধ্যে।

একশত নারী দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতে পছন্দ করতেন রহস্যময় এই রাজা! বেশিরভাগ সময় কাটাতেন তাঁবুতে। ঈদের নামাজে করতেন ইমামতি! অধিকাংশ সময়ই তিনি স্থানীয় ঐতিহ্যময় পোশাক আরবি আলখেল্লা, মাথায় ফেজহীন লাল টার্কিশ টুপি ও গায়ে সাদা কম্বল জড়িয়ে রাখতেন।

তবে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সামরিক পোশাক, ব্যাজ পড়তেন। লিবিয়ার পুনর্গঠনে তাঁর যে অবদান সেটা অস্বীকার করবার কোনও উপায় নেই। দেশের সকল নাগরিকের বাসস্থানের ব্যবস্থা না হওয়ায় তাঁর বাবা-মাকেও তাঁবুতে জীবন কাটিয়ে যেতে হয়েছিল বলে তিনি সকল নাগরিকের জন্য সরকারিভাবে বাসভবন করে দিতেন।

লিবিয়ার প্রত্যেক নবদম্পতিকে ৫০ হাজার ডলার দেয়া হতো যাতে তারা বাড়ি কিনে নতুন জীবন শুরু করতে পারে। বিনা মূল্যে চিকিৎসা এবং কৃষি খামারিদের সরকারের তরফ থেকে ভূমি ও বীজ সহ যাবতীয় উপকরণ দেয়া হতোভ চিকিৎসা বা শিক্ষা সেবা নিতে দেশের কোনও নাগরিককে বিদেশে যেতে হলে তার সমস্ত ব্যয়ভার সরকার বহন করতো! লিবিয়ার তেল বিক্রির একটা অংশ প্রত্যেক নাগরিকের একটা ব্যাংক নাম্বারে সরাসরি জমা হতো।

সন্তান জন্ম দিলে প্রত্যেক মাকে পাঁচ হাজার ডলার দেয়া হতো।  তাঁর সময়ে লিবিয়ার কোনও বৈদেশিক ঋণ ছিল না!
কিন্তু তাঁর স্বৈরশাসন,একনায়কতন্ত্র,এবং দেশের ক্ষমতা শুধু একটি পরিবারকে ঘিরে আবর্তিত হওয়া ও বিরোধী মতকে নিষ্ঠুর উপায়ে দমন, হত্যা এবং পরস্পর বিভক্ত গোত্রভিত্তিক জনগোষ্ঠীর অসমতা,অসন্তোষ ও বিভেদই তাঁর ইতিহাসের দীর্ঘ একনায়কতন্ত্রের বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী শত্রুদের সুযোগ এনে দিয়েছিল তাঁকে তারই জন্মভূমি সিরতে জনতার হাতে নির্মম পরিণতি বরণ করে নিতে।

লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতন হয়েছে ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই, যদিও তিনি দেশটির জন্যে সবই করেছিলেন। তবে গণতন্ত্রের চর্চার সুযোগ না দেয়ায় তিনি তাঁর জাতিকে রাজনীতি সচেতন করতে পারেননি। শুধু তাই নয়; বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদেরও তিনি ব্যাপক সাহায্য- সহযোগিতা ও সমর্থন দান করেন।

লিবিয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তোলার ব্যাপারে তাদের কয়েকজনকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দেন।  এমনকি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মাফ করে দেয়ার জন্য তিনি ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটি চিঠিও দেন।  মুজিব হত্যার অব্যবহিত পরে ফারুক ও রশিদ উভয়ই কর্নেল গাদ্দাফির মহাসম্মানীয় (ভিআইপি) অতিথি হিসেবে লিবিয়ায় বসবাস করতে থাকেন।

তার একগুয়েমি, বিরোধীদের কঠোর দমন, তার মতের বিরোধীদের নিধন, পাশ্চাত্য- সমর্থিত ন্যাটো বাহিনী এবং লিবিয়ার বিদ্রোহী ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল- এনটিসি গেরিলাদের আট মাসব্যাপী যৌথ আক্রমণে তছনছ হয়ে যায় ‘লৌহমানব’ গাদ্দাফির ৪২ বছরের একচ্ছত্র শাসন।  ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর নিজ জন্মশহর সিরত-এ দু’মাস ধরে পাইপের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় তিনি বিদ্রোহী সেনাদের হাতে ধরা পড়েন এবং রোষোন্মত্ত বিদ্রোহীদের গুলিতে মারা যান।

গাদ্দাফির পতনের পর একে-একে বেরিয়ে আসতে থাকে তার শাসনামলের নানা লোমহর্ষক ঘটনা।

সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার-জুলুমের কাহিনি। প্রকাশ হতে থাকে দেহরুক্ষী সহ বেশ কিছু নারীর ধর্ষিত হওয়ার কথা। বিদ্রোহকালীন মাত্র আট মাসে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ গাদ্দাফি-সমর্থকদের হাতে হন নিহত, আহত ও গৃহহারা।  ৬০ লাখ জন-অধ্যুষিত দেশটির পুনর্গঠনে গাদ্দাফি দৃশ্যত যতই অবদান রাখুন না কেন, দুনিয়ার সব স্বৈরশাসকের মতো তিনিও নিজ দেশের মানুষদের ঘৃণা ও রোষের টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন!

চোখের সামনে ইরাক-আফগানিস্তানকে দেখেও শিক্ষা নিতে পারেননি রাজাদের রাজা, আফ্রিকার একচ্ছত্র একনায়ক, মরু ঈগল কর্নেল গাদ্দাফী! তাই তো ২০১১ সালে শুরু হওয়া আরব বসন্তের ছোঁয়া সাড়ে ১৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের লিবিয়াতে লাগার পরে গাদ্দাফির নিজের কিছু ভুল ও অদূরদর্শিতার কারণে, আরব রাষ্ট্রগুলোর বিশ্বাসঘাতকতায় এবং পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ষড়যন্ত্রে লিবিয়ার বিপ্লব রূপ নেয় সহিংস গৃহযুদ্ধে।

দীর্ঘ আট মাসের এ গৃহযুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন কর্নেল। ইতিহাসের আলোচিত ও বিতর্কিত এক অধ্যায়ের অবসান হয়।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।