নিথিয়া মেনন: রহস্যে ঘেরা এক মুঠো স্নিগ্ধতা

দক্ষিণ ভারতের ফিল্মপাড়ায় নিথিয়া মেনন একটা শান্তির নাম। যেমন অভিনয় তেমন গ্ল্যামার। কোঁকড়াচুলে মন ভোলানো হাসিতে মাতিয়ে রাখেন সকলকে। তবে, সবার থেকে আলাদা তিনি।

ভক্তদের কাছে তারকারা খোলা তরবারির মতো উন্মুক্ত। তাদের ব্যক্তিজীবন, সেলুলয়েড লাইফ সবকিছুর খবরই থাকে ভক্ত, পাপারাজ্জিদের নখদর্পনে। তারকারাও চান মানুষ জানুক। এতে আলোচনায় থাকা সহজ হয়। কিন্তু নিথিয়া এখানে আলাদা। একদম ভিন্ন। পর্দার অন্তরালে থাকতে পছন্দ করেন তিনি।

২০১১ সালে তেলেগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অভিষেক ঘটে নিথিয়ার। প্রভাস বরাবরই তেলেঙ্গানার জনপ্রিয় নায়কদের একজন। সেবার এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকেরা নিথিয়ার কাছে জানতে চান প্রভাসের সঙ্গে অভিনয় প্রসঙ্গে। নিথিয়ার পাল্টা প্রশ্নে ভড়কে যায় উপস্থিত সকলে, ‘হু ইজ প্রভাস?’ যার সঙ্গে অভিনয়ের কথা বলা হচ্ছে, তাকে তিনি চেনেনইনা! ওই ঘটনার পর অভিনেত্রীকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়। হাসির পাত্রে পরিণত হন উঠতি এক হিরোইন। যা তাকে রীতিমতো দুমড়ে মুচড়ে দেয়।

ও কাধাল কানমানি কিংবা সংক্ষেপে ওকে কানমনি। ২০১৫ সালের তামিল রোমান্টিক ক্লাসিক ফিল্ম। পরিচালনায় কিংবদন্তি মনি রত্নম আর হিরো হিসেবে দুলকার সালমান। সেই ছবির নায়িকা ছিলেন নিথিয়া মেনন। তাঁকে তখন জিজ্ঞেস করা হয়, মনি রত্নমের কাছ থেকে কতটুকু শিখতে পারলেন?

তার সোজাসাপ্টা জবাব, ‘আমি এখান থেকে কিছু শিখিনি। আমি মনি স্যারকে পছন্দ করি। সিনেমার সেটে আমি, দুলকার, মনি রত্নম একে অপরের সঙ্গ উপভোগ করেছি। ওকে কানমানিতে আমার চরিত্র অত কঠিন ছিল না, যতটা কাঞ্চনা সিরিজের দ্বিতীয় ছবিতে আমার করা গঙ্গা চরিত্রটিতে ছিল। সেটা আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং একটা চরিত্র। আর প্রতিকূল অবস্থায় আপনি সবচেয়ে ভালোভাবে শিখতে পারবেন। কাঞ্চনা টুতে তার অভিনয় দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন চ্যালেঞ্জ তিনি নিতে পারেন জোরালোভাবে।’

নিথিয়া গান ভালবাসেন। গানের সাথে আত্নার সম্পর্ক যেন। কারো কাছে সেভাবে শেখা না হয়ে উঠলেও চমৎকার গলায় গাইতে পারেন। মেনন বলেন, আমি কারো জন্য বা কোথাও পারফর্ম করতে গান গাই না। গান গাইলে নিজের আত্নার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব। এটা আমি উপভোগ করি। যখন গান করি অন্যরকম শান্তি অনুভূত হয়।

তিনি উপভোগ করেন একা থাকতে। একাকীত্বের ব্যাপারে বত্রিশ বছর বয়সী এই অভিনেত্রীর মতামত, ‘যে মানুষ একা থাকতে পারে না, একাকীত্ব উপভোগ করতে পারে না সেই মানুষের সমস্যা আছে। অবশ্য আজকাল মানুষ নিজের সাথে থাকতেই সবচাইতে বেশি অস্বস্তিতে ভোগে। অথচ আমি আমার একাকীত্ব উভোগ করি।’

নিথিয়া মেনন। রোমান্টিক ড্রামায় পরিচালকদের অন্যতম পছন্দের অভিনেত্রী। ক্যারিয়ারে বড় বাজেটের ছবি নেই বললেই চলে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, নিথিয়া নিজেই চান না বড় বাজেটের ছবিতে অভিনয় করতে। চান না প্রতিশোধ, রাগ, হিংসার ছবি করতে। সিনেমার মাধ্যমে মানুষকে দিতে চান সামাজিকতার বার্তা। নিথিয়ার ভাষায়, বড় বাজেটে তৈরি হওয়া অধিকাংশ ছবিগুলোতে রাগ, প্রতিহিংসার বার্তা ছড়ানো থাকে। এমনকি এসব ছবি নিয়ে মিডিয়াও নেগেটিভিটি ছড়ায়। আমি চাই শান্ত ছবি করতে। হোক স্বল্প বাজেট, সেখানে ভরপুর আন্তরিকতা থাকবে।

যে নিথিয়াকে আমরা চিনি তার অভিনয়গুণে, একটা সময় সেই অভিনয়ই উপভোগ করতেন না তিনি। নাস্তিক পরিবারে বেড়ে ওঠা তার। ভীষণ খিটখিটে আর রগচটা স্বভাবের ছিলেন। ইচ্ছার বিরুদ্ধেই করতেন যাবতীয় কাজ। তবে সেসবের জন্য কখনো অনুতপ্ত হতেন না। ২০০৯ থেকে সিনেমায় নিয়মিত অভিনয় করলেও ভালো লাগত না তার। তবে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে শিখেন। এখন পুরোদমে ভালবাসেন কাজকে।

নিথিয়া বরাবরই খুব অকপট। যা বলেন, সোজা সাপটা বলেন। কোনো লুকোছাপা নেই। ২০১১ সালে প্রভাসের ব্যাপারে যে মন্তব্য করেছিলেন, সেই প্রসঙ্গে উঠতেই কথার ডালা খুলে বসলেন। তিনি ভেবেছিলেন মিডিয়া তার বন্ধু। এই জগতে তিনি নিরাপদ। পরে বুঝেছেন, নিজের ভাবনার বিপরীতে সকলের অবস্থান। এরপর থেকে গুটিয়ে নিয়েছেন নিজেকে। একান্ত কাছের মানুষ ছাড়া শেয়ার করেন না কিছুই। এমনকি নেই সোশ্যাল মিডিয়াতেও।

অনেকে তাঁকে অ্যান্টি-সোশ্যাল বলে। সে বলুক। নিথিয়া মেননের অভিনয়টাই মূখ্য তাঁর কাছে। সিনেমাপ্রেমীদের কাছেও তাই। যে জিনিসকে ভালো না বেসেও উপহার দিয়েছেন চমৎকার একেকটি কাজ, এখন উপভোগের দিনগুলিতে আমাদের ভক্তরা আরো অনবদ্য কাজ চাইতেই পারে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।