সাইফউদ্দিন কী আদৌ রুবেলের ‘ভাত মেরে’ দিচ্ছেন!

চার ম্যাচে নয় উইকেট – চলতি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সফলতম পেসার হবার পরেও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনকে মানুষ পছন্দ করছে না কেন? কারণ খুঁজে বের করার বহু চেষ্টা করেছি! প্রথমে ভেবেছি ওর স্পিড কম, সাদাচোখে বোলিং অত ডেডলি মনে হয়না বা গ্ল্যামার-মিডিয়া হাইপ নেই – এজন্য হয়তো।

এখন বুঝলাম ওকে নিয়ে মানুষের আসল সমস্যা হচ্ছে সবাই মনে করছে ওকে ‘রুবেলের জায়গায়’ একাদশে রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ রুবেলের ‘স্ট্রাইক বোলার’ রোলটা ওকে দেওয়া হচ্ছে – এটা ভেবেই মানুষের ওর উপর এতো ক্ষোভ!

প্রশ্ন হচ্ছে, সাইফউদ্দিন কী আদৌ রুবেল হোসেনের ‘ভাত’ মেরে দিচ্ছেন?

আমার মনে হচ্ছে বেশিরভাগ মানুষ প্রথম চার ম্যাচে টিমের স্ট্র্যাটেজি আর সাইফ-রুবেল দু’জনের সামগ্রিক ‘রোল’-এর পার্থক্যটা ধরতে পারছেন না বলেই তারা এই ভুল ধারণায় আছে যে সাইফউদ্দিন রুবেলের ‘রিপ্লেসমেন্ট’। আসলে কিন্তু তা নয়।

হ্যা, যদিও সাইফকে রোডসের ‘বিশেষ পছন্দ’, রুবেলকে নয়। তারপরও বলছি – সাইফ আর রুবেলের দু’জনেরই একাদশে থাকার কথা! ভিন্ন রোলে! রুবেল মূলত স্ট্রাইক বোলার যার কাজ ১০-৪০ ওভারে উইকেট নেওয়া আর সাইফের মূল কাজ ডেথ বোলিং। দু’টোই দলের জন্য খুব জরুরী।

এখন প্রশ্ন করবেন, ‘তাহলে রুবেল একাদশে নেই কেন?’ সহজ উত্তর হল – টিম স্ট্র্যাটেজি!

ব্যাখ্যাটাও সহজ। আমাদের প্রথম চারটা ম্যাচই স্পিনে দুর্বল দলের বিপক্ষে হয়েছে। আমাদের শক্তির জায়গাও স্পিনাররাই। সেজন্যই রুবেলকে বাদ দিয়ে মেহেদী হাসান মিরাজ ও মোসাদ্দেক হোসেনকে খেলানো হচ্ছে।

এখন সব ম্যাচেই এই স্পিনাররা কার্যকর হয়েছেন কি না – সেটা বিতর্কিত ব্যাপার। মনে রাখতে হবে যে সব ম্যাচে স্ট্র্যাটেজি কাজে নাও দিতে পারে। কিন্তু, কোনো একটা কৌশল ধরে তো এগোতে হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ -কোয়ালিটি স্পিনে সবাই তো দুর্বল। এখন সেখানে যদি তিন স্পিনারও খেলানো হয় – তাতে দোষের কি আছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়া বোলিংটা কিন্তু সাকিব-মিরাজই করেছেন। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচেও প্রথম চারটা ‍উইকেট এই দু’জনই নিয়েছেন। পরে মোসাদ্দেক পেয়েছেন আরো দুই উইকেট।

গত ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও সাকিব দু’টো পেলেন। ফলে, স্পিন নির্ভর আক্রমণ একেবারেই বিফলে গেছে – এটা হলফ করে বলার কোনো উপায় নেই। বরং, ব্যর্থতার চেয়ে তাঁদের সাফল্যই বেশি।

রুবেলকে অবশ্যই খেলানো দরকার। কিন্তু, সেটা কৌশলের বিরুদ্ধে গিয়ে নয়। যখন যেখানে দরকার সেখানে কাজে লাগানো দরকার। যেমন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচেই তাঁর খেলার কথা ছিল। কিন্তু, বৃষ্টির কারণে তো ম্যাচটাই হল না। ফলে, টিম ম্যানেজমেন্ট ক্রমাগত রুবেলকে বঞ্চিত করছে – সেটা বলা যায় না।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, ‘বুঝলাম, বেশি বেশি স্পিনার খেলাবেন, তাহলে সাইফ কেন? রুবেল কেন নয়? সহজ উত্তর – ডেথ বোলিং। রুবেলের যে কাজ সেটা করার জন্য মাশরাফি বিন মুর্তজা আর মুস্তাফিজুর রহমান তো আছেনই। গতির কথা বলবেন? মিশেল স্টার্করা থাকার পরও তো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারত রানের পাহাড় করলো। সেখানে রুবেল গতি দিয়ে কিই বা করবেন! কিন্তু, রুবেলকে দিয়ে ডেথ বোলিংটা হবে না। সেজন্য মুস্তাফিজের সঙ্গী হিসেবে সাইফউদ্দিনকেই লাগবে।

বলতে পারেন সাইফ তো হালের প্রোডাক্ট, তার আগ পর্যন্ত পর্যন্ত আমরা ডেথে তো ফিজ-রুবেল জুটির ওপরেই বিশ্বাস রাখতাম। ভরসা রাখতাম, কারণ আমাদের হাতে ‘অপশন’ ছিল না। এখন আছে, তাই রাখছি না। রুবেলের ডেথ বোলিং নিকট অতিতে যাচ্ছেতাই। নিদাহাহ ট্রফির ফাইনাল হারছি, তার আগে আফগানিস্তানের সাথে টি-টোয়েন্টি সিরিজ কিংবা এশিয়া কাপ – ইত্যাদি দেখলেই বুঝবেন। ডেথ বোলিংটা এক সময় বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজটা এতটাই তীব্র করে তুলেছিল যে নিদাহাস ট্রফির শেষ ওভারটা সৌম্য সরকারকে দিয়ে, এশিয়া কাপের শেষ ওভারটা মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে দিয়েও করানো হয়েছিল।

এখন এমন পরিস্থিতি আসলে সাইফউদ্দিনকে আনা হবে। এজন্যই তাকে কোচের পছন্দ। হ্যা, এখানে সাইফ চাপের মুখে ব্যর্থও হতে পারে। ক্রমাগত ব্যর্থ হলে বিকল্প খুঁজতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তো তাই হয়।

এখন দলের যা অবস্থা তাতে রুবেলকে আনতে হলে মিরাজ বা মোসাদ্দেক – কাউকে বাদ দিয়েই আনতে হবে। মাশরাফিও শেষ ম্যাচে মিঠুনকে বসিয়ে রুবেলকে নেওয়ার পক্ষে ছিলেন।

শেষ কথা হল সাইফ স্ট্রাইক বোলার হোক না হোক ও এই বিশ্বকাপে আমাদের সফলতম পেসার। তিনি এত গাদা গাদা নিন্দা কোনো ভাবেই ডিজার্ভ করেন না!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।