একজন ‘বিপ্লবী’ ফেরদৌস

১৯৯৮ সাল। ঈদের দিন বিকেলবেলা। বিটিভির পর্দায় ভেসে উঠল এক অন্যরকম এক অচেনা ভালোলাগা প্রেমের গল্প। বিমোহিত দর্শক ‘একদিন স্বপ্নের দিন’ কিংবা ‘সোনালী প্রান্তরে’র গানে গানে সিনেমার প্রধান চরিত্র ‘অজিত’ আর দীপার মাঝে যেন নিজেদের খুঁজে পেলেন।

নব্বই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অন্যতম সেরা ভালোবাসার সিনেমা হিসেবে ঠাই করে নিল এই ছবিটি। বাংলা চলচ্চিত্রে এক পশলা মুগ্ধতা এনে দিয়েছিল এই ‘হঠাৎ বৃষ্টি’। আর ‘অজিত’ চরিত্রে নায়কটি এতটাই মুগ্ধতা ছড়ালেন যে দর্শকদের মনে আলাদা করে জায়গা করে নেন যা আজো ধরে আছে, অর্জন করেন জাতীয় পুরস্কার। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক ফেরদৌস।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী তিনি। ছাত্রবস্থায়ই যুক্ত হন র‍্যাম্প মডেলিংয়ে। বিবি রাসেলের হাত ধরে এই জগতে বেশ সুপরিচিতিও ঘটে। সেখানেই নজর পড়েন নৃত্য পরিচালক আমির হোসেন বাবুর। তাঁর নির্মিত ‘নাচ ময়ুরী নাচ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রস্তাব দেন, কিন্তু ছবিটি তিনি আর শুরু করতে পারেননি।

পরবর্তীতে অকালপ্রয়াত নায়ক সালমান শাহর অসমাপ্ত ছবি ‘বুকের ভিতর আগুন’ ছবি দিয়ে অভিষেক। এরপরই দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ দিয়ে দর্শক,পরিচালকদের নজর কাড়েন। একে একে হাতে আসতে থাকে নতুন ছবি। চুপি চুপি, সন্তান যখন শত্রু, মধু পূর্ণিমা, চুড়িওয়ালা, এই মন চায় যে, প্রেমের জ্বালা থেকে সবার উপরে প্রেম, বউ শ্বাশুড়ির যুদ্ধ, ফুলের মত বউ, ব্যাচেলর, আমার স্বপ্ন তুমি, দুই নয়নের আলো‘র মত বাণিজ্যিক সফল ছবির নায়ক তিনি। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাণিজ্যিক সফল ছবি ‘খায়রুন সুন্দরী’তে ভিন্নভাবে উপস্থিতি ছড়িয়ে প্রশংসিত হয়েছিলেন।

সমসাময়িকদের মত তিনি অতটা জনপ্রিয়তা পাননি। কিন্তু সিনেমা নির্বাচনে, ফ্যাশন সচেতনতা কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতায় তাদের চেয়ে বেশ এগিয়ে। সমসাময়িকদের মত তাকে দেখার জন্য দর্শকরা প্রেক্ষাগৃহে ছুটে যাননি। কিন্তু এর মাঝেও তিনি কালের স্রোতে নিজেকে ভাসাননি। কথিত আছে, নায়িকাদের উপর ভর করে তিনি বাণিজ্যিক সফল নায়ক হয়েছেন, আবার এটাও শোনা যায় নায়িকারাও তাকে পেয়ে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলতেন।

সমসাময়িকদের মত পাননি সুপারস্টারের খেতাব, কিন্তু শিল্পমান সমৃদ্ধ ছবিতে তিনি নিজেকে করেছেন পরীক্ষিত, নন্দিত। কখনো হঠাৎ বৃষ্টির অপেক্ষারত প্রেমিক ‘অজিত’, কখনো গঙ্গাযাত্রার ডোমরুপী ‘প্রকাশ’ যা তাকে করেছে এক কথায় অনবদ্য, কিংবা ব্যাচেলরের আধুনিক ছেলে ‘ফাহিম’। সব চরিত্রেই তিনি অনবদ্য। ক্যারিয়ারে রয়েছে চুপি চুপি, চন্দ্রকথা, কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি, কাল সকালে, ঘর জামাই, রাক্ষুসী, আয়না, রানী কুঠির বাকী ইতিহাস, আহা!, জাগো, আমার আছে জল, গেরিলা, বৃহন্নলার মত সব প্রশংসিত চলচ্চিত্র।

এই ধারার ছবি করেই আজ তিনি ভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত। শুধু এই বাংলায় নয়, ওপার বাংলায়ও এক সময় তিনি প্রসেনজিৎদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন একটা সময়, যেটা আর কেউ পারেনি। প্রথম বাংলাদেশি নায়ক হিসেবে নাম লিখিছিয়েন বলিউডের পাতায়ও। ক্রাইম থ্রিলার ভিত্তিক সিনেমা ‘মিট্টি’ মুক্তি পায় ২০০১ সালে।

বাংলা চলচ্চিত্রের সেই দু:সময়ে তাঁর প্রতিভার আলো ঠিকমতো ছড়িয়ে দিতে পারেননি। পরবর্তীতে আবার কিছু কাজ করেছেন দূর্বল ছবিতে। নব্বই পরবর্তী মহাতারকা শাবনূর এখনো নায়ক হিসেবে পেতে চান তাঁর সবচেয়ে প্রিয় এই বন্ধুকে। প্রিয়দর্শিনী মৌসুমী তাঁর পরিচালিত ছবিতে নায়ক হিসেবে বেছে নেন এই কাছের মানুষকেই।

গ্ল্যামারাস পপি কিংবা অপ্সরী পূর্ণিমা সবার কাছেই একান্ত আপন তিনি । সমসাময়িক রিয়াজ কিংবা শাকিব সবাই তাকে পরম বন্ধু ভাবেন। সিনিয়র কিংবা জুনিয়র সবাই তাকে আপন ভাবেন। উপস্থাপক, মডেলিং কিংবা নাটক সেখানেও রয়েছে সুপরিচিতি। ক্যারিয়ারে পেয়েছেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সাহচর্য। কাজ করেছেন আমজাদ হোসেন, চাষী নজরুল ইসলাম, রাজ্জাক, কবরী, মতিন রহমানদের মত কিংবদন্তিদের সাথে।

চারটি জাতীয় পুরস্কার সহ পেয়েছেন বিভিন্ন বেসরকারী পুরস্কার। মুক্তির অপেক্ষায় আছে গন্তব্য, পোস্টমাস্টার ৭১-এর মত চলচ্চিত্র, যা তাঁকে আরো নন্দিত করবে নি:সন্দেহে। তবে এই সময়ে এসে সিনেমা নির্বাচনে আরো সচেতন হবেন আশা রাখি।

২০০৪ সালে বিয়ে করেছেন পাইলট তানিয়া ফেরদৌসকে। দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার জীবন বেশ ভালোই পার করছেন। ১৯৭২ সালের সাত জুন জন্ম নেওয়া এই তারকা সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হলেও প্রচলিত ঘরানার সাংবাদিকতা কখনো করেননি। তবে, দৈনিক প্রথম আলো একবার তারকাদের লেখা দিয়ে বিনোদন ভিত্তিক সাময়িকি ‘আনন্দ’ বের করেছিল। সেটার সম্পাদনা করেছিলেন ফেরদৌস।

ফেরদৌস কিন্তু, একই সাথে ছোট পর্দারও একজন কাহিনীকার। আসছে ঈদে তাঁর লেখা চিত্রনাট্যে নির্মিত হয়েছে টেলিফিল্ম ‘কুইন’। এর আগে ‘দ্বিধা দন্য ভালবাসা’, ‘দ্য লাস্ট ট্রেন’ ও ‘মেডিকুইন’ও তাঁরই লেখা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।