শ্রমজীবীর ঘর থেকে শহুরের স্মার্টফোনে

মমতাজের গান কৈশোর এবং তারুণ্যের বড় একটা সময় পর্যন্ত আমার ভালো লাগতো না, এখনো খুব ভালো লাগে তা নয়, তবে মমতাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বিশাল বদলে গেছে; তাকে এখন প্রচণ্ড রেসপেক্ট করি। আর এটা তো চিরন্তন, রেসপেক্ট করলে ভালো লাগার পরিমাণ একটু হলেও বাড়ে। গায়িকা মমতাজের প্রতি আমি পুরোমাত্রায় পজিটিভ। একা মমতাজ নয়, কথা বলবো আরও অনেককে নিয়েই। আসিফ, মনির খান, বেবী নাজনীন, রবি চৌধুরী, ডলি সায়ন্তনীসহ আসবেন আরও অনেকেই, তবে মমতাজ তাদের চাইতে বেশি মনোযোগ পাবেন, কারণ এই লেখার প্রেক্ষাপটে সেটাই বেশি প্রাসঙ্গিক।

‘বান্ধিলাম পিরিতের ঘর, ভালোবাসার খুঁটির পর, আদরের দিলাম ঘরে চাল, ও মনো রে সুখে তে রব চিরকাল’- ‘মোল্লাবাড়ির বউ’ সিনেমার এই অসাধারণ গানটি শোনার পর থেকেই প্রথমবারের মতো মমতাজের ব্যাপারে কৌতূহল তৈরি হয় আমার। ‘বুকটা ফাইট্টা যায়’, ‘যৌবন একটা গোল্ডলিফ সিগারেট’, ‘কাটা লাগা’ এর মতো চটুল কথার গান গেয়ে যিনি পরিচিত, তিনি এমন ভাবগম্ভীর গান গাচ্ছেন, ব্যাপারটা প্রথমে বিশ্বাস হয়নি।

মনপুরা সিনেমার ‘আগে যদি জানতাম রে বন্ধু, তুমি হইবা পর’ গানটিও চলনসই লাগে, ততদিনে ৫০০ এর বেশি এলবাম রিলিজ করে গিনিজ বুকে নাম লিখিয়ে ফেলেছেন তিনি (বর্তমানে সংখ্যাটা ৭০০+, উইকিতে দেখলাম)। শুরুর দিকে ব্যাপারটা হুজুগ মনে হয়েছিলো, এবং তথাকথিত ইন্টেলেকচুয়াল এবং পিউরিটান মানুষদের মতো, এটাকে একধরনের বিকৃতি ভেবে বিরক্ত হয়েছিলাম।

রুনা লায়লা বা সাবিনা ইয়াসমিনের ক্লাশ কোথায়, তাদের পাশে মমতাজ একেবারেই চলে না; মানুষের রুচিবোধের ওপর ক্ষোভ ঝেড়ে তৃপ্তি মেটাচ্ছিলাম। কিন্তু দিন গেছে, আর আমি মেজরিটি পপুলেশন সাইকোলজির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি, সিম্পলিসিটি ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করেছি, এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছি মমতাজ রূপকথা বা কল্পকথাকেও হার মানানো এক অধ্যায়, যার দৃষ্টান্ত বিশ্ব মিউজিকেই বিরল বোধহয়।

পৃথিবীতে যারা সফল হয়েছেন তারা প্রত্যেকেই প্রচুর স্ট্রাগল করে উঠে এসেছেন, এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু মমতাজের ব্যাপারটা একেবারে ভিখারী দশা থেকে সম্রাজ্ঞী হওয়ার মতো, মনে হয় যেন রিপ ভ্যান উইংকেল এর মতো দীর্ঘ এক ঘুম দিয়ে ২০ বছর চোখের পলকে কেটে গেছে।

মমতাজকে শুধুমাত্র গায়িকা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি সংগ্রামী মানুষদের আইকন/আইডল। আমাদের কৈশোরেও শুনেছি মানিকগঞ্জ ফেরি ঘাটে বা কোর্টের সামনে মমতাজ নামে একজন শিল্পী গান গায়, পথে পথে গান গাওয়া সেই মানুষটি ইত্যাদি অনুষ্ঠানে গান গাইলেন, ক্রমাগত এলবাম রিলিজ দিলেন, একের পর এক দেশ ঘুরলেন, এবং তার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে তাকে সংসদ সদস্য পর্যন্ত বানানো হলো। তবু রাজনৈতিক সত্তাটি গায়িকা পরিচয়কে অতিক্রমে সমর্থ হলো না, সেটা বোধহয় তিনি নিজেও চাননি। মাত্র ৫ বছর বয়সে প্রথম স্টেজ পারফরম করা একজন মানুষ গানের চাইতে অন্য কিছুকে বেশি ভালোবাসবেন, এটা আশাও করা যায় না।

তবে মমতাজের প্রতি গানের বাইরেও আমার অন্য কারণে আগ্রহ আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করি, আমার নারীভাবনা যথেষ্ট একপেশে এবং অনুদার, যা আরও প্রগতিশীল হওয়া উচিত ছিলো। মমতাজ নারী ক্ষমতায়নের পারফেক্ট প্রতিফলন। ১৬ বছর বয়স হওয়ার আগেই তিনি গ্রাম-গ্রামান্তরে পালাগান করে বেড়ানো শুরু করেছেন, এসএসসি পরীক্ষাটাও দিয়ে উঠতে পারেননি, আজ থেকে আরও ২৫-৩০ বছর আগের রক্ষণশীল সমাজে পুরুষ শিল্পীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিচারগানে অংশ নেয়া এবং দর্শকের বাহবা পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তিনি সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট এ ইনভেস্ট করেছেন, হাসপাতাল, স্কুল গড়ে দিয়েছেন, কোথাও তার নারী পরিচয়টি প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারেনি। তাই তাঁর গানকে ক্ষ্যাত, হাস্যকর বলে নাক সিটকানো আধুনিক রুচিশীল তরুণীরাও তার লাইফস্টোরি থেকে ইনস্পাইরেশন নিতে পারে; গান ভালো না-ই লাগতে পারে, কিন্তু লাইফের স্ট্রাগল, এচিভমেন্টকে হালকা ভাবার সামান্যতম অবকাশটুকুও নেই। ৭০০+ অ্যালবাম ইজ নট আ ম্যাটার অব জোক।

তারপরও কিছু মানুষ তাঁর তিন বিয়ে নিয়ে কথা তোলেন, নিন্দা করেন। পরিস্থিতি, স্থান-কাল-পাত্র যারা বোঝেন না, তাদের সাথে যুক্তি-তর্ক দিয়ে আলোচনা করা মানে সময়হত্যা, তাদের বরং তালগাছ বুঝিয়ে দিয়ে সযত্নে ইগনোর করা উচিত; সেটাই ইন্টেলেকচুয়াল ডেভেলপমেন্টে বেশি এফেকটিভ হবে।

আমি ফোক গানের বিশেষ অনুরাগী। সময় পেলেই গুনগুনিয়ে ফোক গান গাই। কবিগান, বিচারগান, জারি, সারি, পালাগানের আসরে সুযোগ পেলেই ছুটে যাই। সেই অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, মমতাজের মারফতি বা দেহতত্ত্বের গানগুলো শুনলে আসরের বয়স্ক মানুষেরা কেমন হাউমাউ করে কাঁদে, মফঃস্বল শহরে তার কোনো গানের প্রোগ্রাম থাকলে সেখানে তিলধারণের জায়গাটা পর্যন্ত থাকে না, সেদিন শহরে রিক্সা পাওয়া যায় না, লেবাররা কাজ করে না, ছুটা বুয়া কাজে আসে না, অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণী নিজেরা ছুটি নিয়ে নেয়। এই মানুষগুলোর বেশিরভাগই জীবনে কোনোদিন রবীন্দ্রসংগীত শুনেনি, ক্লাসিকাল গান শুনেনি, ওয়েস্টার্ন মিউজিক শোনার তো প্রশ্নই আসে না। এই মানুষগুলোর মিউজিক রুচি কি সেজন্য প্রশ্নবিদ্ধ হবে? কিংবা প্রবাসী শ্রমিকরা তাদের যে কোনো অনুষ্ঠানে মমতাজকে পছন্দের শীর্ষে রাখেন, এজন্য তারাও কি মিউজিকের টেস্ট বোঝে না, হুজুগে বাঙালি অভিধা পেয়ে যাবে?

আচ্ছা বলুন তো, বাংলাদেশ মানে কি শুধু ঢাকা? অথবা সিলেট, চট্টগ্রাম? বাংলাদেশের কত শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে, শ্রমজীবী সংখ্যাটা কত বড়? শুধু ঢাকা যদি বাংলাদেশ না হয় মেনে নেন, তাহলে এতো বিপুলসংখ্যক মানুষের ভালো লাগা, ইমোশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে কোন্ যুক্তিতে? কারণ, আপনি লিখতে পারেন, আপনার শব্দভাণ্ডার বেশি, বা আপনি একটু ঘুরিয়ে কথা বলতে পারেন, এটাই আপনার স্মার্টনেস? Raw এবং ক্লাসিকাল, এই দুটো বিভাজন আছে বিচারবোধের ক্ষেত্রে। একজন মজুর হয়তো বলবে, বিয়ে করার মূল উদ্দেশ্য সেক্স করা, আর আপনি বলবেন প্রজাতি সংরক্ষণ, আন্ডারস্ট্যান্ডিং বিল্ড আপ, শেয়ারিং প্রভৃতি গালগল্প। কিন্তু খেয়াল করে দেখুন, আপনি আর মজুর আসলে একই কথা বলছেন। তার কথাটা Raw, আপনারটা ক্লাসিকাল। চিন্তা করতে না জানা যদি তার সীমাবদ্ধতা হয়, আপনি যে তার মতো কায়িক শ্রম পারেন না, একেও নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিন।

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, অনেক শিক্ষিত মানুষই মমতাজের গান পছন্দ করেন, তন্ময় হয়ে শোনেন, কিন্তু জনসম্মুখে বলতে লজ্জা বোধ করেন, কারণ সেই একই; যেহেতু তার গান শোনে গ্রামের মানুষ, গার্মেন্টস কর্মী, ট্রাক ড্রাইভার, মুদি দোকানী টাইপ মানুষ, একজন ডাক্তার, প্রফেসর বা ব্যারিস্টারও সেটা শোনা মানে রুচির দিক থেকে উভয়ে একই শ্রেণীতে অবস্থান করেন, যা শিক্ষিত শ্রেণীর জন্য স্খলনের নামান্তর। মমতাজ তাই স্রেফ শিল্পী নন, তিনি শ্রেণীবিভাজনেরও প্রতিভূ।

মমতাজকে নিয়ে আরও কথা বলবো। শ্রেণীবিভাজন প্রসঙ্গটা একটু দীর্ঘ করি। মফঃস্বল বা গ্রামের দিকে খুব হিট কিন্তু শহুরে গোষ্ঠীর কাছে অপাঙক্তেয় এরকম আরও কয়েকজন শিল্পী আছেন। প্রথমেই নাম আসবে আসিফের। মমতাজের মতো ব্যাপক পরিসরে না হলেও বাস, লঞ্চ বা দোকানগুলোতে আসিফের গানগুলো ভালোই চলে। ২০০১ সালে রিলিজ হওয়া ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ গানটা আমার ধারণা অদ্যাবধি বাংলাদেশের জন্য রেকর্ড। এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই একটা গান চলেনি। মফঃস্বল বা গ্রামের দিকে আর কোনো গান এতো বিরাট জনগোষ্ঠীকে আবিষ্ট করে রাখতে পারেনি। এখনকার যুগ হলে এই গান নিয়ে আরও মাতামাতি হতো নিশ্চয়ই। আসিফ আরও বেশ কিছু গান গেয়েছেন যেগুলো জনপ্রিয় হয়েছে। যেমন, ‘ও পাষাণী বলে যাও কেন ভালোবাসোনি’, ‘আমার দুঃখ সারি সারি’, ক্রিকেট নিয়ে একটা গান ‘দেশ দেশ সাবাশ বাংলাদেশ’ যেটা বাংলাদেশ খেলায় জিতলেই শোনানো হয়, কিন্তু শহুরে শ্রেণীতে তিনি কখনোই আলোচনায় আসেননি সেভাবে, যদিও মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার জিতেছেন, বরং কুমার বিশ্বজিতের সাথে দ্বৈরথ, দলীয় রাজনীতি প্রভৃতি কারণেই সমালোচিত হয়েছেন বেশি।

আরেকজন হিট শিল্পী মনির খান। ‘তুমি যে নাটের গুরু’ গান দিয়ে প্রথম পরিচিতি পাওয়া শিল্পী ‘অঞ্জনা’ নামে একটি সিরিজই তৈরি করেন যা ঢাকার বাইরে বা শ্রমজীবী মানুষের কাছে সমাদৃত হয়। ‘আট আনার জীবন’ গান দিয়ে বয়স্ক মানুষের পছন্দের তালিকায় ঢুকেন, ‘বান্ধব আমার চোখের মনি’ গান দিয়ে গ্রামীণ স্মার্ট তরুণের মোবাইলে ঢুকে পড়েন, প্লেব্যাক করেন, কিন্তু শহুরে সমাজ এখনো তার ব্যাপারে স্কেপটিকালই রয়ে গেছে।

মফঃস্বলের তরুণীদের চোখে সাময়িক ক্রেজ হয়েছিলেন এসডি রুবেল। গানের চাইতে ফেসভ্যালুই তার জনপ্রিয়তা তৈরিতে বেশি ভূমিকা রেখেছিল। সেইসব তরুণী বয়স বেড়ে মা-চাচী হয়ে যাওয়ায়, সেই ক্রেজে ভাঁটা পড়েছে।

‘প্রেমের আগুন জ্বালাইয়া, দিলি অন্তর পুড়াইয়া’ এই একটা গান দিয়েই মফঃস্বলে দারুণ সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন নাসির। ‘নদীর দুকূল ভাঙলো তবু ভাঙলো না তার ভুল’ গানটিও জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক নাসির সংগীতাঙ্গনে সুবিধা করতে পারেননি। রিজিয়া পারভীনের সাথে হিন্দি গানের বাংলা সংস্করণ গাইতেন পলাশ; সেটাও এককালে জনপ্রিয় হয়েছিল গ্রামের দিকে। কিন্তু শহুরে জনগোষ্ঠীর কাছে প্রিয় হতে গিয়ে পলাশ আর টিকে থাকতে পারেননি।

শহর এবং মফঃস্বল দু’জায়গাতেই কিছু কিছু জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন রবি চৌধুরী এবং শুভ্রদেব। ৯০ এর গোড়ার দিকে বের হওয়া রবি চৌধুরীর ‘প্রেম দাও’ অ্যালবামটি বাম্পার হিট করেছিলো। এরপর ‘আকাশ হারায় নীল, হারায় আলোর ঝিল’ গানটি বাদে আর কোনো গানই তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। শুভ্রদেবের যাত্রাটা তুলনায় আরও ইন্টারেস্টিং। ‘আমি হ্যামিলনের সেই বাঁশিওয়ালা’, ‘এই মন আমার পাথর তো নয়’, ‘নীল চাঁদোয়া’ গানগুলো শহুরে মধ্যবিত্তের ঘরেও শোভা পেয়েছিলো, শ্রমজীবী শ্রেণীও গ্রহণ করেছিলো। কিন্তু শুভ্রদেব শহরে শ্রেণীকেই প্রাধান্য দিতে গিয়ে কম্পিটিশনে কুলিয়ে উঠতে পারেননি।

শুধু পুরুষ শিল্পী নয়, বেবি নাজনীন আর ডলি সায়ন্তনীর কথাও উল্লেখ করতে চাই, যারা মফঃস্বলে ক্রেজ তৈরি করেছিলেন। বেবি নাজনীন তো একসময় ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’ খেতাবই জুটিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি অবশ্য শহুরে সমাজেও যথেষ্ট জনপ্রিয়। এলোমেলো বাতাসে উড়িয়েছি শাড়ির আঁচল, কাল সারারাত ছিলো স্বপ্নের রাত, বন্ধু তুমি কই- গানগুলো সময়ের বিচারে এগিয়েই ছিলো।

ডলি সায়ন্তনী শুরু করেছিলেন সম্ভাবনা নিয়ে। ‘বিসম পিরিতি পিরিত এ পিরিতি সই, বন্ধ মনের তালা চাবি আছে কই’- এই একটা গান যে নব্বইয়ের দশকে কত বাসযাত্রীর কান জুড়িয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ‘কোন বা পথে নিতাইগঞ্জে যাই’ গানটিও তুমুল আলোচিত হয়েছিল।

স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল জাগে, এই সমস্ত শিল্পী যারা ঢাকার বাইরে বা গ্রামের দিকে এতো জনপ্রিয়, কিন্তু শহরে উপেক্ষিত এর কারণ কী? এর প্রধান কারণ সম্ভবত, গানের লিরিক এবং মিউজিক কম্পোজিশনে চমৎকারিত্বের অভাব। চটকদার কথা-বার্তাই সেখানে প্রাধান্য পায়। কিন্তু এটাই যদি মূখ্য হয় লালনগীতি, রবীন্দ্র সংগীতে কি চটুল কথা নেই? আছে তো, হয়তোবা রিপ্রেজেন্টেশনটা একটু স্মার্ট। মূল কারণটা আসলে শ্রেণীবিভাজন। প্রত্যেক সোসাইটিতেই এলিট এবং লেম্যান দুটো শ্রেণী থাকে, যারা অবচেতনভাবেই একে অপরের প্রভাব এড়িয়ে চলতে চান, একের চোখে অন্যরা হেয়প্রতিপন্ন হয়ে থাকে। শ্রেণীসংঘাতটা তাই লাইফস্টাইলেই শুধু নয়, কগনিটিভ বিহেভিয়ার পর্যায়েও চলে যায়। এলিটের তুলনায় লেম্যানরা সংখ্যায় বরাবরই ভারি, কিন্তু সোশ্যাল স্ট্রাকচারে তারা নিম্ন ক্লাস্টারে অবস্থান করে, তারা আন্ডার প্রিভিলেজড, যে কারণে তাদের শিল্পরুচি, জীবনভাবনাকেও আমরা আপাত এলিট মনে হওয়া শ্রেণীরা নির্বাচারে খারিজ করে দিই।

কিন্তু এটা কতটুকু যৌক্তিক সেটা নিয়ে প্রায়ই ভাবি। মিউজিক, লিটারেচার, ফিল্ম- আর্টসের এই ফরমগুলো কি কেবলই মধ্যবিত্তের ইন্দ্রিয় তৃপ্তির জন্য আবির্ভূত হয়েছে? গ্রামীণ জীবন নিয়ে বানানো ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ দেখে আপ্লুত হই, ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমা সত্যজিত রায়কে ইন্টারন্যাশনাল রিকগনিশন এনে দেয়, অথচ সেই গ্রামের মানুষ যদি ‘বন্ধু আমার পানের দোকানদার’ বা ‘তোরে লইয়া হানিমুনে যামু রে ভাতিজার মামু’, ‘আমি করতে যদি পারি তোমার মন চুরি, হবে আমার প্রেমের ডাবল সেঞ্চুরি’ গান শুনে আনন্দ পায়, তার সেই শিল্প অনুভূতিকে স্থুল, সুড়সুড়িমূলক বলে উপহাস করি। খুবই রিডিকিউলাস; একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে নাটিকা দেখেছিলাম এরকম- বাড়িতে একটা কাজ করে না, কাজের বুয়ার সাথে দুর্ব্যবহার করে, অথচ টিভিতে নিজে বুয়ার চরিত্রে এক্টিং করে পয়সা কামায়। এই যে দ্বিমুখীতা এটা বোধহয় এলিটনেস থেকেই আসে।

আবারো মমতাজ প্রসঙ্গে ফিরি। কেউ কেউ বলেন মমতাজের ভোকাল কর্কশ, কানে লাগে, গানে কোনো সুর তাল লয় নেই। সুর, তাল এগুলো তো ওস্তাদজী ছাড়া অধিকাংশ মানুষই জানে না। আর্মি স্টেডিয়ামে রাত জেগে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শুনে যারা সবাই কি সুর তাল বিশেষজ্ঞ? তবু তারা যায়, কারণ ওখানে যাওয়া মানেই নিখাদ মিউজিকপ্রেমী এরকম একটা গল্প রটে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা একজন মানুষকে জাতে উঠতে সহায়তা করবে, বা গল্পের এলিমেন্ট বাড়াবে।

বন্ধুদের কাছে বড়াই করে বলতে পারবে, ‘কৌশিকী যে রাগটা তুলেছে বাংলাদেশের সিঙ্গাররা তো সেটা পারবেই না। কী সব ন্যান্সি ম্যান্সির গান শুনিস তোরা’! অর্থাৎ এলিটের মধ্যেও বিভাজন আছে। সেই উচ্চাঙ্গ সঙগীতে গিয়ে জাতে উঠতে চাওয়া বন্ধুকেই হয়তো আরেকজন বলবে, ‘বিটলস, পিংক ফ্লয়েড, ব্লুজ শুনোস না, তুই মিউজিকের কী বুঝোস?’ এলিটের বিভাজনের শেষ নেই। কিন্তু একজন রিকশাওয়ালা কখনো আরেকজন ভ্যানওয়ালাকে বলবে না, ‘মমতাজ নটকা গায়, শাহনাজ বেলি হইলো আসল শিল্পী’। কারণ, তার জীবনে বেঁচে থাকার সংগ্রামে আকীর্ণ, মিউজিকটা তার বেঁচে থাকার আনন্দ বাড়ায়, অবসর কাটানোর মাধ্যমে পরিণত হয় না।

কণ্ঠের সুমিষ্টতা একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। আমার কানে যে কণ্ঠটা মধুর লাগে, আরেকজনের কাছেই সেটা ফ্ল্যাট বা চিৎকার লাগতে পারে সঙ্গত কারণে। এমনকি ব্রায়ান এডামস, বব ডিলান, জর্জ হ্যারিসন, জন ডেনভার, যাদের গল্প আমরা শহুরে সমাজে প্রতিনিয়ত করি, তাদের সুমিষ্টতা কি আসলেই কোনো ফ্যাক্টর? আমি তো এদের গান কতই শুনলাম, কই মিষ্টতা তো কিছু পাই না কানে।

তাছাড়া ফোক গানগুলোই এরকম। এটাই স্টাইল। লোকজ গানগুলো হলো raw কালেকশনের মতো। কিশোর কুমার, মান্না দে এর গানের সাথে লোকজ গান মেলাতে চাইলে সমস্যাটা গানের নয়, যিনি মেলাতে চাইছেন তার।

অতি সম্প্রতি মমতাজের ‘বন্ধু তুই লোকাল বাস, আদর কইরা ঘরে তুলোস,ঘাড় ধইরা নামাস’ গানটি ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। একমাসের মধ্যে বোধহয় ইউটিউবে গানটির মিউজিক ভিডিও ১৫ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে। ফোকের সঙ্গে র‌্যাপ আর রক মিলে যে ককটেল তৈরি করা হয়েছে তার রেশ কিন্তু শহরে সমাজে ভালোমতোই পড়েছে। কতজন রিকশাওয়ালা বা গার্মেন্টস কর্মী ইউটিউব ভিজিট করে? ওই ১৫ লাখের বেশিরভাগই তো আপনার-আমার মতো শহুরে মানুষ। তারা গানটি দেখছি, আবার সমালোচনাও করছি চটুল বলে। এই হিপোক্রেসির মানে কি ভাইয়া?

বেশ কয়েকবছর আগে ‘হোয়াই দিস কোলাভেরি’ টাইটেলে একটা গান বিশ্বজুড়ে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল। সেই গান দেখে আপনি যদি গর্বিত হতে পারেন, সেই গান নিয়ে ইন্টেলেকচুয়াল পোস্ট লিখতে পারেন, সম্প্রতি কুদ্দুস বয়াতির করা ‘আসো মামা হে’ বা মমতাজের ‘লোকাল বাস’ ওই গানের চাইতে ঠিক কোন্ জায়গাটায় ডিফার করে? দোষটা কি এখানেই যে, রিকশাওয়ালার জন্য গান গাওয়া শিল্পী আপনার ড্রইংরুমে ঢুকে পড়েছে, আপনার রুচিবোধ আহত হচ্ছে? এই ঠুনকো, ভঙ্গুর এবং ভণ্ড রুচি নিয়ে কিসের গৌরব আপনার? মমতাজের ‘নান্টু ঘটক’ গানের সাথে প্রোগ্রামে নাচতে পারেন, বা মিউজিক শুনে উদ্বেলিত হন, অথচ আলোচনার সময় ছ্যা ছ্যা করেন, আপনাদের সাথে জাতপ্রথা নিয়ে আগের দিনে যেসব শুচিবায়ুগ্রস্ত মানুষ ছিলো তাদের মৌলিক তফাৎ আদৌ আছে কিছু?

শ্রমজীবীর ঘর থেকে শহুরের স্মার্টফোনে প্রবেশাধিকার পাওয়ায় মমতাজকে অভিবাদন। যে যাই বলুক, আপনার লাইফ স্টোরি এবং প্রোগ্রেস দুটোর জন্যই আপনাকে রেসপেক্ট করি এবং করবো। মানুষ হিসেবে আমি খুবই লঘু এবং সস্তা, এলিট হওয়ার অভিপ্রায় বুড়িগঙ্গায় বিসর্জন দিলাম।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।