জ্যাক ম্যা, আলিবাবা: স্বপ্ন আর বিশ্বাসের গল্প

হার্ভার্ড থেকে দশবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। কেএফসিতে চাকরির জন্য ২৪ জন আবেদন করার পর ২৩ জন চাকরিটা পায়। যে একজন পায়নি সে একজন ছিলেন তিনি। পুলিশের চাকরিতে পাঁচ জনের মধ্যে চার জন চাকরি পেয়েছে। যে একজন পায়নি, সেখানে তিনি ছিলেন।

প্রথম উদ্যেক্তা হয়ে যখন বিনিয়োগকারী খুঁজেছেন, তখন প্রথম ৩০ জন বিনিয়োগকারীই ফিরিয়ে দিয়েছেন তাকে। এতো কিছুর পরও আজ বিশ্বের সেরা ২০ ধনীর তালিকায় রয়েছেন সে মানুষটি আছেন। তিনি হলেন জ্যাক মা।

জন্ম চীনে, ১৯৬৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বরে। তিনি বিশ্বের ই-কমার্সের আইকন ট্রেডিং সাইট আলিবাবা.কমের কর্ণধার।তিনি চীনের শীর্ষ ধনীদের একজন। আলিবাবাতে তার ৭.৮% স্টেক রয়েছে, পেমেন্ট প্রক্রিয়াকরন প্রতিষ্ঠান আলি পে-তে তাঁর স্টেক রয়েছে ৫০%। তার সফলতাগুলো সহজে বলে ফেলা গেলেও সেই সফলতাকে জয় করেছেন জ্যাক মা বহু প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে।

পারিবারিক অবস্থা ভালো ছিলো না তার ,বাবা মা গান গেয়ে বেড়াতেন। তাঁর দাদা ছিলেন চীনের জাতীয়তাবাদী দলের একজর স্থানীয় অফিসার, চেয়ারম্যান মাও জাতীয়তাবাদী দলকে হারানোর পর জ্যাক মা এর দাদাকে কম্যুনিস্ট পার্টির শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়।

ছাত্র হিসেবে কখনোই ভালো ছিলেন না। জাতীয় কলেজে ভর্তি পরিক্ষায় তিন বার ফেল করেন। চার নম্বর বার পাশ করার পর হুয়াংঝু টিচার্স ইনাস্টিটিউটে ভর্তি হোন। শেখেননি অ্যাকাউন্টিং, ম্যানেজমেন্ট কিংবা কম্পিউটার।

প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করে মাসে বারো ডলার পেতেন। ৩৩ বছর বয়সে প্রথম কম্পিউটার চালান। অবাক হোন ইন্টারনেটে চীনের পিছিয়ে থাকা দেখে। তিনি এমন একটা সময়ে ই-কমার্স নিয়ে কাজ করেছেন যে সময়ে চীন ইন্টারনেট সম্পর্কে কিছুই জানতো না।

তিনি সে অবস্থায় থেকে এমন একটা স্বপ্ন নিয়ে কাজ করেছেন, যে স্বপ্ন আজকের ৪২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের ‘আলিবাবা’-তে পরিনত হয়েছে। ১৯৯৪ এ যখন ব্যাবসা শুরু করেন তখন চীনে কেউ ভাবেনি ই-কমার্স সেখানে সম্ভব।

জ্যাক মা বলেন, ‘আলিবাবা বাবা কোনো কল্পনা ছিল না, আলিবাবা ছিল বিশ্বাস।’ আর তাঁর মতো সাধারণ, বারবার ব্যার্থ হওয়া, প্রতিটি জায়গায় প্রত্যাখ্যাত হওয়া মানুষের বিশ্বাসটাই সব।

তিনি জানতেন না পরের মাসে কর্মচারীদের বেতন কোথা থেকে দেবেন। কিন্তু বলেছিলেন পৃথিবীর সেরা ১০ টা ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতিষ্টানের মধ্যে অন্যতম হবেন।বলেছিলেন প্রতিষ্ঠানটি অন্তত ১০২ বছর টিকবে।

আজ যখন ‘আলিবাবা’ পুরো পৃথিবীর ইন্টারনেট ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেরার কাতারে রয়েছে, যখন আদর্শ হয়ে দাড়িঁয়েছে সবার জন্য, তখন তিনি বলেন, ‘চোখে স্বপ্ন থাকলে নিজেকে কখনো দরিদ্র মনে হয় না। আমরা বলিনি, কাল আমরা জিতবো, বলিনি আগামী বছরের মধ্যে সফল হবো। বলেছি ২০ বছরের মধ্যে কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছাবো। আজ আলিবাবা ১৯ বছর পেরিয়েছে। তার মানে কি আমরা সফল? কখনোই না। মাত্র ১৯ বছর হলো আরো ৮৩ বছর বাকি!’

২০০৭ সালে হংকংয়ে আলিবাবা যখন প্রথম আইপিওতে গেল, তখন তাঁর অনেক মিলিওনিয়ার বন্ধু প্রশ্ন করেছিলেন,তারা কলেজ টপার নন,তারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন বারবার, তাঁরা চলার পথে বাধা পেয়েছেন বারবার, তারপরও তারা অাজ এখানে কিভাবে? তিনি বলেছেন – ‘স্রেফ নিজের উপর বিশ্বাস।’

আর সত্যিই নিজের উপর বিশ্বাস ছিলো বলেই হয়তো আজ জ্যাক মা এতদূরে আসতে পেরেছেন। আজ তার এগিয়ে আসার গল্পটা লাখো তরুনের অনুপ্রেরণা। তিনি এগিয়ে নিতে চান তরুণদের।স্বপ্ন দেখেন পিছিয়ে পড়া দেশগুলো একদিন এগোবে।

নিজের দেশের তরুনদের উদ্যেক্তা হবার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি হার্ভার্ডে পড়তে পারেননি, পড়েছেন নিজের দেশের চতুর্থ শ্রেনীর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিন্তু আজকে সে বিশ্ববিদ্যালয়ই তার স্বপ্ন আর ভালোবাসার জায়গা।তিনি বলেন তিনি গর্বিত তিনি হুয়াংঝু তে পড়েছেন। বলেন, প্রতিষ্ঠানের চেয়ে চেষ্টা বড়।

এই কথাটি সত্য করেছেন জ্যাক মা নিজে। আজ হার্ভার্ডে পড়া লাখো তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা তিনি। চীনকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। আর এ উচ্চতাকে স্পর্শ করার যাত্রায় তার সঙ্গী ছিলো শুধু দুটি জিনিস – স্বপ্ন আর বিশ্বাস।

জ্যাক মা বলেছেন একটা সময় অবসরে যেতে চান তিনি। তারপর নানা দাতব্য কাজে নিয়োজিত করতে চান নিজেকে। তবে বেশি সময় ব্যয় করতে চান শিক্ষার পেছনে।

‘জ্যাক মা’ একটি চূড়ান্ত ব্যার্থতা থেকে সফল হওয়া মানুষের নাম। আর এই নামের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো চেষ্টা আর বিশ্বাসের চমৎকার গল্প।

‘জ্যা মা’ শব্দটি অনুপ্রেরনার, লাখো ব্যার্থ মানুষের। ‘জ্যাক মা’ মাসে ১২ ডলার করে বেতন পাওয়া, নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখা এক শিক্ষকের দিনশেষে হাজার কোটি ডলারের মালিক হওয়ার গল্প। ব্যর্থতার সিঁড়ি বেয়েই যে সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে ‍উঠতে হয় – সেটা এই ভদ্রলোক পৃথিবীর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।