সর্বৈব সংকটাপন্ন লাতিন ফুটবল

টানা চারটা বিশ্বকাপ ইউরোপিয়ানরা নিয়ে যাচ্ছে! লাতিন সৌন্দর্য কোথায়? কারও দুশ্চিন্তাই নেই; অথচ, সবাই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ‘হাতুড়িপেটা’ মারামারিতে ব্যস্ত!

ছোট ছোট পাসে কুড়ি থেকে ফুলের পাঁপড়ি হয়ে ওঠার সৌন্দর্য, অপলক একেকটা ড্রিবলিং, চিতার মতো ক্ষীপ্র গতিতে আচমকা বলহীন ‘মুভ’ করে প্রতিপক্ষকে হকচকিয়ে দেওয়া– এসব আজ কোথায়!

২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে রোনালদো-রিভালদোর এমন একটা মুভ-ই তো অলিভার কানের মতো বিশ্বসেরা গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে দিয়েছিল। এবার লাতিনদের দুটো মাত্র মুভ দেখা গেল, যেগুলো স্মরণযোগ্য। একটা নাইজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির গোলটা, আরেকটা পর্তুগালের বিপক্ষে সুয়ারেজকে লং পাস দিয়ে কাভানির গোলমুখে ঢুকে দেওয়া গোলটা।

‘কম্প্রিহেনসিভ ফুটবল’ ব্রাজিলের কাছে এবার দেখাই গেল না। কোয়ার্টারে বেলজিয়ানরা শুধু জোনাল মার্কিং করেই ব্রাজিলকে ঠেকিয়ে দিল, ম্যান মার্কিংয়ে গেলই না! ফাইনাল থার্ডে গিয়ে এমন হ-য-ব-র-ল পাকিয়ে ফেলা ব্রাজিলকে কোনদিন দেখিনি। তবুও, ব্রাজিল যতগুলো সুযোগ পেয়েছে, তা ম্যাচ জেতার জন্য যথেষ্ট ছিল। অথচ, কাউন্টার অ্যাটাকের ট্যাকটিক্সে খেলে বেলজিয়ামই ম্যাচটা জিতে বের হয়ে গেল।

আর্জেন্টিনা তো ছিল যাচ্ছেতাই। এমন বাজে ডিফেন্স নিয়ে বিশ্বকাপে খেলাটাই একটা চাঞ্চল্যকর ব্যাপার! লাতিন তিন পরাশক্তির মধ্যে উরুগুয়েই ভালো খেলেছে। যদিও, ফ্রান্সের বিপক্ষে উরুগুয়ে মোটেও ভালো খেলেনি। উরুগুয়ের বিপক্ষে ফ্রান্সও যে খুব আহামরি গতিশীল ফুটবল খেলেছে তাও না, যেটা ওরা খেলেছিল আর্জেন্টিনার বিপক্ষে।

কোয়ার্টারে দুর্দান্ত না খেললেও, ফ্রান্স-বেলজিয়াম সেমি নিয়ে আগাম কিছু বলা যাচ্ছে না। বেলজিয়াম যদি জিততে পারে, তাহলে বিশ্বকাপটা ওদের ‘সোনালী প্রজন্মে’রই প্রাপ্য। ফ্রান্স বা বেলজিয়াম নাকি বিশ্বফুটবলে ‘রুশ বিপ্লবে’র চোখ রাঙানি দমিয়ে দেওয়া ক্রোয়েশিয়া? ইংল্যান্ড কি তবে অবধারিত চতুর্থ? বটে! যতটুকু ইংলিশদের প্রচার, তা তো ওই ব্রিটিশ মিডিয়ারই লম্ফঝম্ফ। সহজ-পথে সেমিতে আসা ইংরেজদের দর্পচূর্ণ করবে ক্রোয়েটরাই!

বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল, অথচ লাতিনরা কেউ নেই। জার্মানি নেই; কিন্তু ইউরোপিয়ান ‘পাওয়ার ফুটবলে’র গুরু জার্মানদের দাপট এতো সহজে মরবে না। ওরা আবার চিতার মতো ঘুরে দাঁড়াবে। স্পেনের ‘টিকিটাকা’ লাতিন ঘরানাই। কিন্তু, ওরা ওটাকে গত দু’বারে এমন ক্লিশে-ক্লান্ত বানিয়ে দিয়েছে যে, ছেড়ে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা! স্প্যানিশদের পায়ে লাতিন ঘরানা আর মানাচ্ছে না।

লাতিন ফুটবল আসলে সর্বৈব সংকটাপন্ন। পৃথিবীতে সর্বাধিক ফুটবলার সরবরাহ করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। কিন্তু, পুঁজির আধিপত্যের যুগে সারা বছর ইউরোপে থেকে আর যাই হোক, মাত্র এক মাসের ঝলকে-পলকে লাতিন ফুটবলে ফিরে আসা খুব মুশকিল! ক্লাব আর কর্পোরেট পুঁজিই যখন রুটি-রুজির জোগানদাতা, তখন লাতিন ক্লাসিকাল ফুটবল ঘরানায় ফিরলে লাভ তেমন একটা নেই। ইউরোপ বরাবরই ক্লাব-ফুটবলের স্বর্গ, আর ওদের ঘরানাটাই এখন সপ্তমস্বর্গে ওঠার ব্রহ্মাস্ত্র!

বিশ্বকাপ অনেকের ক্লাব-ভাগ্য মানে অর্থ-ভাগ্য খুলে দেয়। গতবার যেমন দিয়েছিল কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেজের। তাঁকে কিনেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। চার বছর বাদে সেই রদ্রিগেজ কোথায়! মেসি-নেইমারদের মতো জিনিয়াসদের কথা আলাদা; কিন্তু খুব কমজনই আছেন, যারা ইউরোপে গিয়ে লাতিন ঘরানায় থাকতে পারছেন। এটারই প্রভাব পড়েছে বিশ্বকাপে। আপনাকে ওরা কাড়ি কাড়ি টাকা দেবে, কিন্তু বিশ্বকাপে খেলার মাল-মশলা খেয়ে দেবে!

সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদ, ফুটবলটাকেই ছাড়ল না, সে আবার ‘হাতুড়িপেটা’দের রাজনীতিকে ছাড়ে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।