সৌন্দর্যের চাপ, ব্রেস্ট অগমেন্টেশন ও আমাদের ফ্যাশনেবল প্রজন্ম

দ্য ইলেন শো দেখছিলাম। জেনিফার লোপেজ নো কার্ব ডায়েট নিয়ে কথা বলছিলেন। পিয়ানোর তালে ওকে সরু হিল পায়ে নাচতে দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম।

আমি ওর থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। কী দারুণ কোমর দোলাচ্ছে, কী সুন্দর চকচকে চুল। কে বলবে ওর বয়স এখন ৪৯! অথচ, মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই আমি নিজেকে মাঝবয়সী ভাবতে শুরু করেছি।

ঠিক তখনই একটা খবর চোখে পড়লো।  ভারতের নাসিকে ২৭ বছর বয়সী এক নারী আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার কারণ জানিয়ে তিনি যে সুইসাইড নোট লিখেছেন, তার ভাষাটা হল, ‘কাজল দেওয়ায় আমার চোখ দিয়ে ক্রমাগত পানি ঝরছিল। আমাকে মোটেও সুন্দর দেখাচ্ছিল না। তাই আমি আত্মহত্যার পথ বেছে নিলাম।’

রোচেস্টারের ইউআর মেডিসিনের মতে যেসব নারী ক্ষুধামন্দায় ভুগে থাকেন তার শতকরা নব্বই ভাগের বয়স ১২ থেকে ২৫-এর মধ্যে। আর কারেন্ট সাইকিয়াট্রি রিপোর্টস (২০১২) বলছে, এই ক্ষুধামন্দাই কালক্রমে মানুষকে মানসিক রোগের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে কোনো সন্দেহ ছাড়াই বলা যায় যে, নিজেকে সুন্দর দেখানোর ব্যাপারে যারা অতিরিক্ত বাতিকগ্রস্থ তাঁরা আসলে মানসিক রোগী হওয়ার পথেই আছেন।

এই পথের শেষ ধাপ হল আত্মহত্যা। আমি মনে করি, প্রত্যেক নারী নিজেকে প্রতিনিয়ত আরো বেশি সুন্দর করতে চেয়ে একটু একটু করে মেরে ফেলছে। ‘আমাকে সুন্দর দেখাতেই হবে’ – এই অদৃশ্য চাপ আমাদের প্রতিনিয়ত তাড়া করছে। রং ফর্সা করার ক্রিম কিংবা ওয়াক্স স্ট্রিপস – বিশাল একটা ইন্ডাস্ট্রিতে, বৃহৎ একটা ব্যবসার ফাঁদে আবদ্ধ হয়ে পড়েছি আমরা। এই চাপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন জীবন কি আর কখনোই পাওয়া সম্ভব নয়?

একবার এক নারী ব্রেস্ট অগমেন্টেশন সার্জারির ঘটনা পড়েছিলাম খবরের কাগজে। প্রথমবার সার্জারি করার বছরখানেকের ভেতরেই ভেতরের ইমপ্ল্যান্ট বার্স্ট করে। তাই পুনরায় সার্জারির প্রয়োজন পড়ে। ২০০৬ সালে গ্ল্যামার মাগ্যাজিনে একটা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তখন পর্যন্ত মোট ৩,৬৪,০০০ জন নারী ব্রেস্ট অগমেন্টেশনের সার্জারি করান। এর মধ্যে শেষ পাঁচ বছরে এর প্রবণতা ৪০ শতাংশ বেড়েছে। আর এই ঝুঁকিপূর্ণ সার্জারির মধ্য দিয়ে যাওয়া ৮৫ শতাংশ নারীকেই নিজের জীবনে ভবিষ্যতে শারীরিক নানারকম জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়।

এখন নাকি নর্ম্যাল ডেলিভারির পর নারীদের কেউ কেউ ‘হাজবেন্ড স্টিচ’ও একই সাথে করিয়ে ফেলেন। এই সেলাইয়ের ফলে যোনিপথ নাকি আরো সরু হয়, শারীরিক মিলনে পুরুষের আনন্দ নাকি তাতে বাড়ে। এটা লিখতে গিয়েই আমার কেমন যেন গা গুলাচ্ছে!

আসলে, সৌন্দর্য’র এই মাপকাঠিগুলো কে ঠিক করে দিয়েছে? কে বলে দিয়েছে নারীকে হতে হবে জিরো ফিগারের, তাঁকে পরিপাটি জামা-কাপড় পরতে হবে, শরীরের বাঁকগুলো স্পষ্ট হতে হবে? কাউকে কে বলতে শুনি না যে একজন নারীর সফলতার মধ্যেই তার সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।

‘সেক্স অ্যান্ড দ্য সিটি’ টেলিভিশন সিরিজটার কথা নিশ্চয়েই মনে আছে। সেখানে যদি নারীদের ঢিলেঢালা পোশাক পরিয়ে রাখা হত, যদি উসকো খুসকো চুলে বই পরতে বা কফি খেতে দেখানো হত? কিংবা রোজ রাতে পার্টিতে না যেয়ে যদি তারা নিজেদের পোষা কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হতেন? – হলফ করে বলতে পারি তাহলে এই সিরিজটা এতটা জনপ্রিয় হত না। বিক্রি বাড়ানোর জন্য ডিজাইনার পোশাক, বিকিনি, পারফেক্ট ভ্রু, সরু কোমর কিংবা একালের আইটেম সং খুবই জরুরী।

বলিউডে ক’দিন আগে ‘স্ত্রী’ নামের একটা ছবি বেশ হিট করলো। সেখানে স্ত্রী হল এক নারী ভুতের নাম। তিনি নিজের হারানো প্রেম ও সম্মান খুঁজে পাওয়ার সংগ্রামে এক এক করে একটি অঞ্চলের সব পুরুষকে বশ করতে থাকে। অথচ সেই ছবিতেই আইটেম গানের নামে একজন স্বল্পবসনা নারীকে  ৫০ জন পুরুষের সামনে মাঝরাতে নাচতে দেখা গেল। কি বিদ্রূপাত্মক একটা চিত্রায়ন!

নিজে সুন্দর হয়ে চলার মধ্যে মন্দ কিছু নেই, যতক্ষণ তিনি সেটা মন থেকে করবেন। মন থেকে করা আর জোর করে করা – এই দুয়ের মধ্যে একটা লাইন টেনে দেওয়াটা সামাজিক ভাবেই হওয়া দরকার। একজন নারী কতটা সুন্দর করে মেক-আপ করতে পারেন, কিংবা কতটা ফ্যাশনেবল জামা-কাপড় পরতে পারেন – এর ওপর ভিত্তি করে তাঁর সাফল্য বা ব্যর্থতাকে যাঁচাই করা উচিৎ না!

‘সৌন্দর্য’- এই ব্যাপারটা আসতে হবে ভেতর থেকে। এটা দেখার কিছু নয়, এটা মন ও মগজ থেকে আসা একটা শক্তি। এটা ছুয়ে দেখা যায় না, ‍শুধু অনুভব করতে হয়। টিন্ডার কিংবা ইন্সটাগ্রামের যুগে এসে আমার এই কথার সাথে হয়তো সবাই একমত হবেন না, তাই কেউ চাইলেই ‘স্ক্রল’ বা ‘সুইপ লেফট’ করে এড়িয়ে যেতে পারেন!

ডেইলি ও অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।