ভাঙা আঙুলের জোর

৪৭ তম ওভারের পঞ্চম বল, রান আউট হলেন মুস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশের রান তখন ২২৯। রানের হিসাবে নিতান্তই কম, আফসোস লাগছিলো, শুরুতে তামিম ইকবাল ইনজুরিতে না পড়লে হয়তো রান টা আরেকটু বাড়তো! টেলিভিশন অফ করে উঠে যাচ্ছিলাম, পরের ইনিংসের মাঝে লম্বা এক বিরতি।

কিন্তু স্ক্রিন থেকে চোখ সরানোর আগেই অবাক হয়ে চেয়ে দেখলাম তামিম ইকবাল নামছেন, একটু আগেই যে শুনেছিলাম ছয় সপ্তাহের জন্য মাঠের বাইরে তামিম, তা হলে কি সব মিথ্যা? আমরা তাহলে পুরো এশিয়া কাপেই এই লোকটাকে পাচ্ছি। কিন্তু অবাক হলাম তামিমের এক হাত পিছনে নেওয়ার দৃশ্যতে। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না!

ওই হাতে ব্যান্ডেজ নিয়েই মাঠে নেমে গেছে? এক হাতেই লাকমালের বল খেললেন, এই লাকমালের বলেই হুক করতে গিয়ে বাম হাতে ইঞ্জুরড হয়ে যার এশিয়া কাপ শেষ এবার সেই লাকমালকেই ঠেকিয়ে দিলেন। এক হাতে, বিনা অস্ত্রে! কলিজা টা কত বড় খান পরিবারের ছোট খানের? আহত বাঘের গল্প শুনতাম, আজ দেখলাম, একেবারে চোখের সামনে!

সঙ্গীর অভাবে ঐদিকে ঝিমিয়ে গেছিলেন সদ্য সেঞ্চুরি করা মুশফিকুর রহিম, তামিমের এই বীরত্ব দেখে নিজের পাঁজরের ব্যাথাও ভুলে গেলেন, পরের ১৫ বলে ৩২ রান নিলেন। নিজের ক্যারিয়ার সেরা ইনিংসটা থামলো ১৪৪ এ, বন্ধুর ব্যান্ডেজ হাতের লড়াই দেখে পাঁজর ভাঙার লড়াই দেখালেন, একটু ঝিমিয়ে পড়া গ্যালারী কে আবারো গর্জনরত সমুদ্রে পরিণত করলেন।

একটু পিছনে ফেরা যাক।

২০০৯ সালের সিডনি টেস্ট, জনসনের বলে ইনজুরি নিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথ। প্রোটিয়াদের নবম উইকেট তুলে নেওয়ার পর জনসন, সিডল রা তখন উল্লাসে মাতোয়ারা। কিন্তু সেদিন তাদের উল্লাস টা এক মুহুর্তের জন্য থেমে গিয়েছিলো ভাঙা কবজি নিয়েও মাঠে নেমে দুর্দান্ত সাহসিকতা দেখানো ঐ গ্রায়েম স্মিথের জন্যই। ধারাভাষ্যকার নিকোলাস বলে উঠলেন, ‘ওয়েট আ মিনিট! কি হচ্ছে? গ্রায়েম স্মিথ নামছেন ব্যাট করতে!’

জনসন-বোলিঞ্জারদের অগ্নিঝরা বলের জবাব দিচ্ছিলেন ওই ভাঙা কবজি নিয়েই। একেরপর এক ডিফেন্স, যদিও শেষ রক্ষা হয় নি, আর ১০ বল খেলে যেতে পারলেই সেই টেস্ট ড্র হতো। তবে সিরিজ আগেই নিশ্চিত করা প্রোটিয়া ক্যাপ্টেন সেই ম্যাচে পরে না নামলেও পারতেন, এমনিতেও তিনিই ছিলেন সেই সিরিজের সেরা ব্যাটসম্যান। তারপরেও সেদিন নেমেছিলেন দলের প্রয়োজনে, দেশের জন্য, সত্যিকারের দলনেতা বলে!

এবার আরেকটা গল্প শোনানো যাক, না গল্প না চরম বাস্তবতা। আর ভাগ্যের পরিহাসে গ্রায়েম স্মিথ কিংবা আমাদের তামিম ইকবালের বীরত্ব টা সরাসরি চোখে দেখার সৌভাগ্য হলেও অনিল কুম্বলের লড়াই টা দেখেছি কি না মনে নেই, ছোট ছিলাম, মাথায়ও নাই। ভাঙ্গা চোয়াল নিয়ে সেদিন দেশে না ফিরে লড়াই করেছিলেন তিনি, ব্রায়ান লারার উইকেটটাও লুফে নিয়েছিলেন, দেশকে দিয়েছিলেন ড্রয়ের স্বাদ!

এক বীরত্বে আরো হাজার টা লড়াকু যোদ্ধার নাম মনে পড়ে। ক্রিকেট বাদ দিয়ে একটু অন্য খেলায় গেলেও নজীরের অভাব নাই। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো রক্ত মাখা চোখ নিয়ে খেলেছেন, ভাঙা পা নিয়েও যতক্ষণ পেরেছেন লড়াই করেছেন। জার্মানির কিংবদন্তি বেকেনবাওয়ার ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ খেলেছিলেন ডিসলোকেটেড শোল্ডার নিয়ে। হালের আরেক জার্মান রক্তাক্ত চোখ নিয়ে ফাইনাল খেললেন, দলকে বিশ্বকাপটাও উপহারও দিলেন, নামটাও হয়তো তাই বাস্তিয়ানো শোয়ানেস্টাইগার! ইনজুরি নিয়েও লড়ে যাওয়া তালিকায় নাম আছে সার্জিও রামোস, নেইমার কিংবা লিওনেল মেসিরও। নাম আছে আরো অজানা অনেক খেলোয়াড়ের!

আবার ক্রিকেটে ফিরে আসা যাক, এই দলটার বাজে সময়ে আমাদের মধ্যে কিছু কিট গালি দেয়, তাদের পরিবারকেও ছাড় দেয় না। তারা টাকার জন্য খেলে এই বুলি তো মুখস্থই হয়ে গেছে!

অথচ আমরা একবারও ভাবি না এই দলেরই অধিনায়ক এতবার পা টাকে ছুরির নিচে ফেলে দেওয়ারও পরেও লড়ে যাচ্ছেন আপন মহিমায়। এই দলেরই সেরা অলরাউন্ডার ইনজেকশন নিয়ে খেলছে সিরিজের পর সিরিজ। তামিম ইকবাল তো ব্যান্ডেজ হাতেই নেমে গেলেন, গ্লাভস কেটে আবার ব্যান্ডেজ পরিয়ে দেওয়ার কাজটা সহজ করে দিলেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা!

এক গ্রেটের চাপায় আরেক লড়াকু যোদ্ধা চাপা পড়ে যাচ্ছে, এবার আমাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম মিতুর দিকে নজর দেওয়া যাক। তার মতো এমন প্রস্তুত হয়েই ক্রিজে নামা ব্যাটসম্যান বাংলাদেশের ইতিহাসে আর ছিলো কি না জানা নেই, একেবারে শুরু থেকেই নির্ভার!

ম্যাচ শুরুর আগে জানা গেলো এই লোকটার পাঁজরের হাড়ে চিড় ধরেছে, প্রচণ্ড ব্যাথা। না খেলার সম্ভাবনাই বেশী। সেই তিনিই বললেন, এত কষ্ট করে এশিয়া কাপের জন্য প্রস্তুত হলেন, এখন ইঞ্জুরির জন্য এভাবে চুপ মেরে যাবেন এভাবে ত হয় না! দেশের জন্য টেপ পেঁচিয়ে মাঠে নামলেন, স্মৃতি হাতড়ে মনে পড়লো বিখ্যাত অ্যানিমেশন ‘ক্যাপ্টেন টিসুবাসার’ নায়ক সুবাসার কথা।

দলের প্র‍য়োজনে টেপ পেঁচিয়ে ম্যাচের পর ম্যাচ খেলেছেন। কিন্তু সেটা ত নিতান্তই কার্টুনছবি, এবার ত বাস্তবেও তা দেখা হয়ে গেলো। পাঁজরের হাড়ে ব্যাথা, তা নিয়েও চার-ছক্কা হাকিয়েছেন, প্রতিবার মারার পর একটু জিরিয়েছেন, যতই মুখ চেপে লড়ুক, ব্যাথা ত হবেই! দেশের জন্য চিড় ধরা হাড় নিয়েও লড়লেন, ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস খেললেন।

আমাদের পরের প্রজন্মের জন্য আফসোস হচ্ছে, ওরা এই লড়াই টা সরাসরি দেখতে পারলো না। আবার ওরা গর্বিতও হবে, ওরা যে বড়ই হবে এই বীরেদের যুদ্ধের গল্প শুনে। আমাদের জন্য বিদেশি কাউকে অনুপ্রেরণা হিসেবে তুলে ধরা হতো, ওদের অনুপ্রেরণার জন্য দেশের মাটিতেই রত্ন খুঁজে পাওয়া যাবে। কত ভাগ্যবান ওরা!

আরেকবার মুশির লড়াইয়ের গল্পে ফিরি, ‘খুব অবাক হয়েছিলাম যখন তামিমকে ব্যাট করতে নামতে দেখি। এটা দারুণ একটা ব্যাপার ছিল। ওকে দেখে আমি উজ্জীবিত হই, বুঝতে পারি এখন দেশের জন্য কিছু একটা করতে হবে।’

তামিমের এই বীরত্বেই মুশি শক্তি পেয়েছিলেন, পাঁজরের ব্যাথা ভুলে গিয়ে শেষবেলায় আরো একবার আহত বাঘের মতোই গর্জে উঠলেন। যে গর্জনে লড়াইয়ের শক্তি পুঁজি পেলো বাংলাদেশ, বিজয়ের মালা গলায় দিয়েই মাঠও ছাড়লো।

অথচ আমরা কিছু হলেই হার মেনে নেই, ডিপ্রেশনে ভুগি কিংবা আত্মহত্যার পথ বেচে নেই। অথচ জীবন টা সুন্দর, শুধু সৌন্দর্যটা বাড়িয়ে নিতে হয় আর কি!

তামিম চাইলেই ডেসিংরুমে বসে থাকতে পারতেন, ফ্র্যাকচারের কারণে কেউ জোরও করেনি। সাহস যুগিয়েছিলেন অধিনায়ক, মাশরাফি নিজেই আগে থেকে গ্লাভস কেটে রেখেছিলেন। বাঘা বাঘা বোলারদের সামনে যার বুক কখনো কাঁপেনি সেই তামিম এবার সাহসটা দেখালেন ফ্র‍্যাকচার নিয়ে। টিম ম্যানেজমেন্ট যখন দোটানায় ভুগছিল, তামিমই এগিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি গিয়ে এক বল খেলবো।’

হঠাৎ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা স্যার জুয়েলের কথা মনে পড়লো, পাকিস্তানি দের ব্রাশফায়ারে তিনটা আঙ্গুলই পচে যায়। ডাক্তারদের বলেছিলেন, ‘আঙুল তিনটা রাইখেন স্যার, দেশ স্বাধীন হলে ন্যাশনাল টিমের ক্যাপ্টেন হমু, ওপেনিংয়ে নামুম। প্লিজ স্যার।’

ওপারে বসে জুয়েল স্যার দেখেছেন কি’না জানিনা, তবে দেখলে তার বুকটা গর্বে ফুলে যেতো। তার দেশেরই ওপেনার ব্যান্ডেজ নিয়ে মাঠে নেমে যায়। এক হাতে লড়াই করে!

শেষ টা করছি এই দলেরই নেতা মাশরাফি বিন মুর্তজার কথা দিয়ে, ‘ওর হয়তো বাঁ-হাতের আঙুল ভেঙেছে, কিন্তু ডান হাত দিয়ে ও কোটি কোটি হৃদয় জিতে নিয়েছে। ক্রিকেট হয়তো স্রেফ একটা খেলা, কিন্তু সব সময় যে শুধুই খেলা নয়, সেটা তো তামিমই দেখালো।’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।