পিংক ট্যাক্স: ‘মেয়েদের জিনিস’-এর দাম বেশি হয় যে কারণে

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে নারীদের স্বাধীনতায় কমবেশি সকল আধুনিক মানসিকতার মানুষই বিশ্বাস করে। আমরা চাই নারীরা স্বাধীন ভাবে তাদের জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাক, সফলতার সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাক উন্নতির শিখরে।

নারীদের জন্য সাধারণ পরিবহনে ‘মহিলা সিট’, নারী দিবসে ফেসবুকীয় শুভেচ্ছা সবকিছুর পিছনেই থাকে সমগ্র নারী জাতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়।

এত সব ভালো ভালো কথা শুনে অনেকেই হয়ত ভাবছেন আমি একজন নারীবাদী। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থায় নারীবাদী হওয়াটা আসলেই একটু কেমন কেমন, তাই না। কিন্তু এই কেমন কেমন ব্যপারটার জন্যই আমরা নারী স্বাধীনতা, নারী অধিকার এই সব নিয়ে কথা বলতে ভয় কিংবা লজ্জা পাই। আর এই ভয়, লজ্জার সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর এক শ্রেণির পুরুষ এই নারী জাতিকে শোষণ করে আসছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক সব দিকেই তারা শোষিত হচ্ছে যাচ্ছেতাই ভাবে।

খবরের পাতার নারীদের সামাজিক কিংবা পারিবারিক হেনস্তার বিভিন্ন চিত্র এখন আমাদের সকালের চায়ের কাপের দৈনন্দিন অনুষঙ্গ। খবরের পাতায় নারী নির্যাতনের খবর না পেলে আমাদের প্রাতরাশটা কেনো জানি ঠিক জমে না। অবাক করা বিষয়, নারী জাতিকে শোষণ করাটা আগে পারিবারিক এবং সামাজিক ভাবে সীমাবদ্ধ থাকলেও, অর্থনৈতিক ভাবেও নারী জাতি ব্যাপক হারে শোষিত হচ্ছে। আপনারা হয়ত ভাবছেন, আমি চাকরি, বেতন, বোনাস এই সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্যের কথা বলব।

 

চাহিদা এবং বৈশিষ্ট্যগত কিছু পার্থক্য থাকায়, নারী-পুরুষের নানান সামগ্রীতে ভিন্নতা দেখা যায়। প্রসাধনী, জামা-কাপড়, দৈনন্দিন নানান ব্যবহার্য জিনিস – এই ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মত। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, নারী পুরুষের জন্য তৈরিকৃত এই ধরনের পৃথক সামগ্রীগুলোতে তুলনামূলক ভাবে পুরুষদের চেয়ে নারীরা বেশি টাকা খরচ করে।

পিংক ট্যাক্সের মূল ভাবনাটা হল এই জায়গায়। অর্থাৎ নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক পৃথক যে সকল সামগ্রী রয়েছে সেই সব ক্ষেত্রে নারীদের সামগ্রীর দাম ইচ্ছাকৃত ভাবে বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে। আর এই ভাবনাটা কে বলা হচ্ছে পিংক ট্যাক্স।

ছোট্ট একটি উদাহরণ দেই, নারী দেহের অন্যতম একটি সাধারণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া রজঃচক্র বা মাসিক। মহাবিশ্বে মানবজাতির উৎপত্তির অন্যতম শক্তিশালী অনুঘটক এটি। এই সময়টিতে নারীর দেহের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কমানোর জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল, বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহারটাকে ‘বিলাসিতা’ হিসেবে ধরা হয়। আমি আবারো বলি, শব্দটা ‘বিলাসিতা’। যেই ব্যাপারটার সাথে একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ঝুঁকি জড়িয়ে আছে, মাতৃত্বের মত মূল্যবান কথাটি জড়িয়ে আছে তার নাম কিনা বিলাসিতা।

কিন্তু এই সমস্যার পিছনের অন্যতম মূল কারণ, পিংক ট্যাক্স। যেহেতু এর সাথে জড়িয়ে আছে ‘মেয়েদের জিনিস’ নামক ট্যাগলাইন, তাই এই সামগ্রীর দাম তো বেশি হতেই হবে।

আমাদের বাংলাদেশের কথায় ধরা যাক। স্যানিটারি ন্যাপকিনের একটি প্যাকেটের মূল্য ৭০-১২০ টাকা। সেই হিসেবে একটি প্যাড বা ন্যাপকিনের দাম পরে প্রায় ১০-১৫ টাকা। যেই দেশের মানুষের গড়পড়তা মাসিক আয় মোটে ১০ হাজার টাকার মত, সেই দেশে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার বিলাসিতা নয় কি?

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, একজন মেয়ে তার জীবদ্দশায় একটি ছেলের থেকে ৪২% বেশি টাকা প্রদান করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। যা প্রায় ১৩৫১ মার্কিন ডলারের সমতুল্য। আপনারা হয়ত জানেন না, ছেলেদের সামগ্রীর তুলনায় মেয়েদের সামগ্রীর মূল্য প্রায় ৭% বেশি।

কোন কোন ক্ষেত্রে নারীরা বেশি ব্যয় করছে তার তালিকা:

– খেলনা এবং আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রে ৭% বেশি।

– বাচ্চাদের কাপড়চোপড়ে ৪% বেশি

– ব্যক্তিগত যত্নকারী সামগ্রীতে ১৩% বেশি।

– স্বাস্থ্য গত যত্নে ৮% বেশি।

এইবার আসা যাক কাপড়চোপড়ে। আমেরিকায় মেয়েদের রেগুলার আর প্লাস সাইজের জিন্স প্যান্টের দামের পার্থক্য কত জানেন? খুব বেশি না মাত্র ১২-১৫ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ১০০০-১৩০০ টাকা। অপরদিকে ছেলেদের ক্ষেত্রে সাইজের জন্য দামের তেমন কোন পার্থক্য থাকে না বললেই চলে।

৬-৭ ধরনের কাপড়চোপড়ে মেয়েরা ছেলেদের থেকে বেশি টাকা ব্যয় করে। সব থেকে বেশি পার্থক্য দেখা যায় মেয়েদের টি-শার্টে। টি-শার্টের জন্য গড়ে একজন মেয়ে, একজন ছেলের চেয়ে প্রায় ১৫% বেশি টাকা ব্যয় করে।

তবে শুধুমাত্র অন্তর্বাসের ক্ষেত্রে এই হিসাবটা একটু অন্যরকম। অন্তর্বাসের ক্ষেত্রে গড়ে একজন ছেলে একজন মেয়ে অপেক্ষা প্রায় ২৯% বেশি ব্যয় করে থাকে।

প্রসাধনী দ্রব্যের ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য একই ভাবে বজায় রয়েছে। দেখা গেছে, প্রসাধনীর ক্ষেত্রে একজন মেয়ে, একজন ছেলে অপেক্ষা প্রায় ৪% বেশি ব্যয় করে। বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রীর দোকানে গেলেই ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে যায়। শ্যাম্পু, সাবান সবকিছুতেই বিজ্ঞাপনী ছলছাতুরী ব্যবহার করে মেয়েদের কাছে বিক্রি করা হয় বেশি দামে।

সামান্য একটি রেজর, ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে যার কাজ শরীরের অবাঞ্ছিত লোম অপসারণ করা। এই রেজরের মেয়েদের ভার্সনের দাম শুনলে আকাশ থেকে পড়তে হয়। ‘মাল্টিপল ব্লেড’, ‘ময়শ্চার স্ট্রিপ’ – এসব ব্যবহার করে আকাশচুম্বি দাম দেওয়া হয় মেয়েদের রেজর গুলোর। কিন্তু গুণগতভাবে পার্থক্য একটাই – ছেলেদের রেজরখানা নীল/কালো আর মেয়েদেরটা গোলাপি। কিন্তু শরীরের অবাঞ্চিত লোম অপসারণে আমার মনে হয় না রঙের কোন গুরুত্ব আছে।

অবাক করার মত বিষয় হল, নারী পুরুষের এই বৈষম্য শুরু সেই শৈশব থেকে। ৬ ধরনের শিশুদের খেলার সামগ্রীর প্রায় সবগুলোতেই মেয়েদের সামগ্রীর মূল্য ছেলেদের তুলনায় প্রায় ১৩% বেশি। এক্ষেত্রে মূল্যের পার্থক্য সবচেয়ে বেশি দেখা যায় হেলমেট এবং হাঁটু এবং কনুইয়ের প্যাডে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, খেলনা সামগ্রীতে যে সব খেলনার রঙ পিংক বা গোলাপি তাদের দাম তুলনামূলক ভাবে বেশি। এর পিছনের সবচাইতে স্পষ্ট যুক্তি হল, এই রঙের জিনিস মেয়েরাই বেশি ব্যবহার করে থাকে। আমাজন, ওয়ালমার্ট, টারগেট ইত্যাদি অনলাইন শপিং-এর উপর চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গোলাপি রঙের যেকোন খেলনা সামগ্রীর দাম অন্যান্য খেলনা সামগ্রীর চেয়ে প্রায় ২ থেকে ১৫% পর্যন্ত বেশি।

এইবার আসা যাক, এই অবস্থা থেকে পরিত্রানের উপায় কী?

পরিত্রাণের প্রথম উপায় নারীদের সচেতনতা। অনেকের কাছে খারাপ লাগলেও, সত্য হচ্ছে বেশির ভাগ নারীই কোন সামগ্রীর গুণগত এবং বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যকে বিবেচনায় না এনে সামগ্রীর বাহ্যিক সৌন্দর্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আর এই সুযোগের উপযুক্ত ব্যবহার ঘটাচ্ছে ব্যবসায়ী সমাজ। বাহ্যিক সৌন্দর্য নারী জীবনে অন্যতম অংশ কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে তা যেন অপরিহার্য না হয়ে যায়।

এরপর আসা যাক, আমাদের পলিসি মেকারদের কথায়। অপরিহার্য এবং প্রয়োজনীয় এই শব্দ দু’টির পার্থক্য তাদের বুঝতে হবে। ট্যাক্স বা শুল্ক বসানোর আগে তাদের ভাবা উচিত কোনটি ‘বিলাসদ্রব্য’ কোনটি ‘অপরিহার্য’ দ্রব্য। আমি মনে করি গোলাপি রঙের পারফিউমের বোতলে শুল্ক বসানো যুক্তিসংগত কিন্তু স্যানিটারি ন্যাপকিনের মত অপরিহার্য সামগ্রীতে সরকারের উচিত ভর্তুকি দেওয়া।

তবে আশার কথা হচ্ছে, পৃথিবীতে এই পিংক ট্যাক্স নিয়ে মানুষ সোচ্চার হচ্ছে। গ্যাপ, হ্যারি, বক্সড এই সব বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠান গুলো পিংক ট্যাক্সের বিপক্ষে কথা বলছে। নিজেদের সামগ্রীকে এবং ব্যবসায়িক কর্মপন্থাকে লিঙ্গ-বৈষম্যে মুক্ত করে গড়ে তুলছে।

জানিয়ে রাখা ভাল, ক্যালিফোর্নিয়ায় ১৯৯৬ সালে লিঙ্গ-বৈষম্য মুক্ত মুদ্রানীতি পাশ হয়। যার ফলে এই অঞ্চলে নারীদের থেকে অতিরিক্ত মূল্য আদায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই ধরনের নীতি পাশ হোক সকল দেশে, গড়ে উঠুক নারী-পুরুষের বৈষম্যহীন এক সুন্দর পৃথিবী।

– ডিয়ার অ্যালাইন, সিডনি হেরাল্ড মর্নিং ও লিসেন মানি ম্যাটার্স অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।