দ্য পারফেকশনিস্ট, দ্য নাম্বার ওয়ান

সমসাময়িক নায়কদের তুলনায় হয়তো তাঁর শারিরীক উচ্চতা কম, খুব একটা নাচগানও তাঁকে করতে দেখা যায় না। কিন্তু নায়কখ্যাতির উচ্চতা বেশি। অন্যদের তুলনায় হয়তো ছবি করেছেন কম, কিন্তু দর্শকদের কাছ থেকে সাড়া পেয়েছেন তার চেয়েও বেশি। সেই আশির দশকের ‘রাজ’ থেকে নব্বই দশকের ‘মুন্না’ কিংবা পরবর্তীতে ভুবন। ডিজে পেরিয়ে হালের মহাবীর সিং চরিত্র দিয়ে নিজেকে ভেঙেছেন বারংবার, চিরাচরিত ধারা থেকে নিজেকে বেরিয়ে এনে দারুণ সফল হয়েছেন।

একজন বিনোদন জগতের সফল মানুষ হয়েও সমাজের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে টিভি অনুষ্ঠান করেছেন। নিজের জনপ্রিয়তা যেন আরো বাড়িয়ে চলেছেন, সুনির্বচনীয় নায়ক হিসেবে পেয়েছেন ‘মিস্টার পারফেক্টশনিস্ট’ খ্যাতি। হয়েছেন নাম্বার ওয়ান। তিনি বলিউড তথা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সেরা জনপ্রিয় নায়ক ‘আমির খান’।

  • পেটের দায়ে সিনেমায়

১৯৬৫ সালের ১৪ মার্চ। মুম্বাইয়ের বান্দ্রার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে একটি রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আমির। পুরো নাম আমির হুসেইন খান। আফগানিস্তান থেকে এসে তার পূর্বপুরুষরা ভারতে বাস করা শুরু করেছিলেন। আমিরের বাবা তাহির হুসেইন খান ছিলেন চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক। ভারতের খ্যাতনামা প্রযোজক, পরিচালক ও চিত্রনাট্য লেখক নাসির হুসেইনও একই পরিবারের সন্তান।

বাবা তাহির খান ও ভাই ফয়সাল খানের সাথে আমির।

মায়ের দিক থেকে অগ্রগামী রাজনীতিবিদ আবুল কালাম আজাদ আমির খানের পূর্বপুরুষদের একজন। মা জিনাত হুসেইন খান ছিলেন গৃহিণী। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে আমির খান ছিলেন সবার চেয়ে বড়। তিনি হলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উত্তরসূরি এবং ভারতের এক সময়ের রাষ্ট্রপতি ড. জাকির হুসেইনের বংশধর।

ছোট বেলা থেকেই সাংস্কৃতিক বলয়ে ছিলেন আমির। তবে, তাঁর বাবার ছবিগুলো ভাল চলতো না। ফলে, পরিবারে ছিল আর্থিক টানাপোড়েন। এমনকি মাধ্যমিকে থাকতেই আমিরকে স্কুল ছেড়ে দিতে হয়। মোটে আট বছর বয়সে সিনেমার জগতে আমিরের যাত্রা শুরু হয়।

শিশু শিল্পী হিসেবে প্রথম ছবি ‘ইঁয়াদো কি বারাত’। সেটা ১৯৭৩ সালের কথা। কিশোর বয়সে এসে ১৯৮৪ সালে অভিনয় করেন ‘হোলি’ ছবিতে। এই সময় তিনি থিয়েটারেও কাজ করতেন।

  • শুরু হল পথচলা

নায়ক হিসেবে প্রথম ছবি ‘ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক’। ১৯৮৮ সালে চাচা নাসির হুসেন পরিচালিত প্রথম ছবিতেই বাজিমাৎ, রোমান্টিক ধারার এই ছবিতে দারুণ সাফল্য পেয়েছিলেন। ছবিটি জাতীয় পুরস্কার ও পেয়েছিল। এর ঠিক পরের বছরেই করেছিলেন পুরো ভিন্নধর্মী ছবি ‘রাখ’। আর তাতেই আসে বিশেষ জুরি জাতীয় পুরস্কার।

এরপর শুরু হল নব্বই দশক। একে একে করলেন দিল, দিল হ্যায় কি মানতা নেহি, জো জিতা ওহি সিকান্দার, হাম হ্যাঁয় রাহি প্যায়ার কেঁ, গুলাম, আকেলে হাম আকেলে তুম, ঈশক, আর্থ, মন, সারফোরশ-এর মত ছবি। তবে আলাদা করে বলতে হয় তিনটি ছবি, একটি ভারতীয় কমেডি ছবির ইতিহাসে অন্যতম সেরা ছবি ‘আন্দাজ আপনা আপনা’। অন্য দুইটি আমির খানের ক্যারিয়ারে অন্যতম সেরা ছবি ‘রঙ্গিলা’, যেটা স্থান করে নিয়েছে চিরসবুজ ছবির তালিকায়। অন্যটি নব্বই দশকে তাঁর সবচেয়ে ব্যবসা করা ছবি ‘রাজা হিন্দুস্তানি’, এই ছবির গান আজো সমান জনপ্রিয়।

২০০০ এর দশকে শুরুতেই ‘মেলা’র মত ফ্লপ ছবি দিয়ে একটা ধাক্কা খেয়েছিলেন। তবে সেটা দারুণ ভাবে কাটিয়ে উঠেছিলেন ঠিক পরের বছরেই। উপহার দিয়েছিলেন নিজের প্রথম প্রযোজিত সিনেমা ‘লগন’। ভারতের হয়ে অস্কার যাত্রা করা এই ছবিতে তিনি তাক লাগানো অভিনয় করেছিলেন, ছবিগুলোর গান ও জনপ্রিয়, বাণিজ্যিক সফল এই ছবিটি বিভিন্ন শাখায় জাতীয় পুরস্কার ও পেয়েছিল।

ক্রিকেট নির্ভর এই ছবিটি ভারতীয় ক্রিকেট দল কে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল,অন্যটি বলিউডে প্রথা ভাঙা তারুণ্য ও বন্ধুত্বের গল্প ‘দিল চ্যাহতা হ্যায়’, সিনেমাপ্রেমীদের অন্যতম পছন্দের এই ছবিটি। এই ছবিটিও একাধিক শাখায় জাতীয় পুরস্কার জিতে নিয়েছিল। একই বছর সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই ধারার ছবিতে অভিনয় করে দারুণ সময় কাটিয়েছিলেন।

কিন্তু, এরপর টানা চার বছর বিরতি, ২০০৫ সালে ফিরে এলেন ‘মঙ্গল পান্ডে’ ছবি দিয়ে। অবশ্য ছবিটি খুব সাড়া ফেলতে পারেনি। এর পরের বছরেই নিয়ে আসলেন দু’টি ছবি, ‘ফানাহ’র পর দেশপ্রেম ও তারুন্যের গল্প নির্ভর হৃদয়স্পর্শী ছবি ‘রঙ দে বাসন্তী’। দর্শক থেকে সমালোচক সর্বমহলে পছন্দের ছবি এটি। ২০০৭ সালে শিক্ষাব্যবস্থার উপর মুক্তি পায় ‘তারে জামিন পার’। নিজের নামের পাশে যোগ করলেন পরিচালক বিশেষণ, পাশাপাশি একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করলেন।

এটিও দারুণ সাড়া জাগানো ছবি। বলিউডের ইতিহাসে প্রথম ১০০ কোটি রুপি আয় ছবি ‘গজিনি’র নায়ক ও তিনি। তামিল সিনেমার এই রিমেকে আমির খানের দুর্দান্ত অভিনয় ছিল সিনেমাটির অন্যতম প্রাণ। এর ঠিক পরের ছবি যেন একটি ইতিহাস, এই ছবি দর্শক থেকে সমালোচকদের কাছে চিরসবুজ ছবির তালিকায় সর্বাগ্রে থাকবে। বক্স অফিসের দিকেও মাইলফলক ছবি এটি, প্রথম ৩০০ কোটি আয় করা ছবি। বলিউডের ইতিহাসে সেই বিখ্যাত ছবিটির নাম ‘থ্রি ইডিয়টস’।

চলতি দশকের শুরুর দিকে ‘ধোবি ঘাট’ এর পর অভিনয় করেছিলেন ‘তালাশ’ ছবিতে। কিন্তু সেভাবে সাড়া জাগাতে পারেনি সিনেমাগুলো। তারপর অভিনয় করলেন জনপ্রিয় ধুম সিরিজের তৃতীয় কিস্তিতে। বক্স অফিসে দারুন বাজিমাৎ করলেও আমির খানের সিনেমা হিসেবে দর্শকদের সেভাবে মনে ধরেনি।

এর ঠিক পরের বছরেই আবার ফিরে এলেন সদর্পে, যেই ছবি সর্বমহলে স্থান করে নিয়েছিল,নিজেও করেছিল দারুণ অভিনয়। বক্স অফিস বাজিমাৎ করা ছবিটির নাম ‘পিকে’। ২০১৬ সালে মুক্তি পায় সত্য কাহিনী থেকে অনুপ্রানিত ছবি ‘দঙ্গল’। বরাবরের মত এটিও বক্স অফিস বাজিমাৎ করে, সমালোচক গ্রহনযোগ্যতা তো আছেই। গত বছর সঙ্গীত নির্ভর ছবি ‘সিক্রেট সুপারস্টার’-এ একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সিনেমাপ্রতি আমির এখন ৬০ কোটি রুপি নেন।

মুক্তির অপেক্ষায় আছে বহুল অপেক্ষমান সিনেমা ‘থাগস অব হিন্দুস্তান’, বহু দিনের মান অভিমান ভুলে প্রথম বারের মতন এই ছবিতে অভিনয় করছেন অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে। নিজের অভিনীত সিনেমার বাইরেও একাধিক ছবি প্রযোজনা করেছেন তার মধ্যে ‘জানে তু ইয়া জানে না’, ‘পিপলি লাইভ’, ‘দিল্লি বেলি’। তাঁর প্রযোজনা সংস্থার নাম ‘আমির খান প্রোডাকশন’।

এছাড়া চিত্রনাট্যকার ও গায়ক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি আছে, টেলিভিশনে ‘সত্যমেব জয়তে’ উপস্থাপনা করে দারুণ সাড়া ফেলেছিলেন ২০১২ সালে। কাজ করেছেন সামাজিক নানা সমস্যা নিয়ে।

  • অর্জনের জীবন

বর্নিল ক্যারিয়ারে পেয়েছেন পদ্মশ্রী, চারটি জাতীয় পুরস্কার, তবে সেরা অভিনেতা বিভাগে পুরস্কার পাওয়াটা আজো অধরা থেকে গেছে, আশা করি সেটা অতি শীঘ্রই পূর্ণতা পাবে। এছাড়া সেরা অভিনেতা বিভাগে ফিল্মফেয়ার পেয়েছেন তিনবার। এছাড়া পরিচালক বিভাগ ছাড়াও সমালোচক। নবাগত সব ক্যাটাগরিতেই পুরস্কার পেয়েছেন।

তবে, ১৯৯০ সাল থেকে তিনি কোনো অ্যাওয়ার্ড নাইটে যান না। কারণ, তিনি বিশ্বাস করেন না জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বাদে কোনো পুরস্কারই নাকি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেওয়া হয় না।

২০১৩ সালে বিশ্বখ্যাত ‘দ্য টাইমস’ ম্যাগাজিন তাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায়। আমির পেয়েছেন ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিনের স্বীকৃতিও। এশিয়ায় তাঁর আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখে ম্যাগাজিনটি তাঁকে ‘তর্কসাপেক্ষে বিশ্বের সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র তারকা’-র স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০১১ সালে ইউনিসেফ শিশু অপুষ্টিরোধে প্রচারণায় তাকে নিযুক্ত করে।

  • আমিরের অন্দরমহল

বলিউডে জুটি প্রথা বেশ লক্ষ্যনীয়,তবে তিনি একমাত্র জুহি চাওলা ছাড়া আর কারো সাথেই সেভাবে জুটি বাঁধেননি। ব্যক্তিগত জীবনে আমির তিন সন্তানের জনক। তিনি ১৯৮৬ সালের ১৮ এপ্রিল রিনা দত্তকে বিয়ে করেন। আমিরের ক্যারিয়ারে রিনার অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। যদিও, ২০০২ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। দুই সন্তান জুনায়েদ ও ইরা মায়ের সাথেই থাকেন।

২০০৫ সালে আমির খান কিরণ রাওকে বিয়ে করেন। তাঁদের একমাত্র ‍ছেলের নাম আজাদ রাও খান।  স্ত্রীর প্রভাবে সম্প্রতি নন-ভেজ খাওয়া একেবারেই ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। মুম্বাইয়ের পশ্চিম বান্দ্রাতে হিল ভিউ অ্যাপার্টমেন্টসে থাকেন তাঁরা।

আমিরের প্রিয় বন্ধু সালমান খান। ১৯৯৪ সালের ছবি ‘আন্দাজ আপনা আপনা’ থেকেই দু’জনের সখ্যতা গড়ে উঠেছে। আমির ক্রিকেট পোকা। বন্ধুতালিকায় তাই শচিন টেন্ডুলকারের নামও আছে। অবসর সময়ে গান শুনতে পছন্দ করেন।

আমিরের ভাই ফয়সাল খানও অভিনেতা। ১৯৯৪ সালে বাবার সিনেমা ‘মাধোস’ ও ২০০০ সালে আমিরের সাথে ‘মেলা’ সিনেমায় কাজ করেননি। কোনোটাই বাজারে সাফল্য না পাওয়ায় তিনি আর বড় অভিনেতা হতে পারেননি। এরপর দ্বিতীয় সারির সিনেমাগুলোতে টুকটাক কাজ করেছেন। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। ভাইয়ের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল বলেও গুঞ্জন উঠেছিল। তবে, ২০১০ সালে বাবার মৃত্যুর পর আবারো দুই ভাই দুরত্বটা কমিয়ে ফেলেছেন!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।