দ্য পারফেক্ট ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান?

দুই দশকের পথচলায় একজন দীর্ঘস্থায়ী ও নিয়মিত পারফরম করাওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যানের জন্য কতই না হাহাকার করেছি আমরা। পন্টিং, দ্রাবিড় থেকে রুট, কোহলিরা আমাদের আফসোস কেবল বাড়িয়েছেন। স্বপ্ন দেখতাম যে কবে একজন ম্যাচ উইনার, ম্যাচ গাইডিং, অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টরসুলভ ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান আমাদেরও থাকবে।

আশার ভেলা ভিড়িয়েছি অনেক ঘাটেই। কিন্তু হতাশ হয়েছি বারংবার। বাশার, আফতাব, আশরাফুলরা চেষ্টা করেছেন, পারেননি। মমিনুল হয়ত পারতেন যথেষ্ট সুযোগ পেলে। অন্তত তিনি সঠিক পথে ছিলেন বলেই আমার মনে হয়। কিন্তু কোন এক ভুতুড়ে কারণে চুড়ান্ত ফ্ল্যাশি সাব্বির রহমানকে ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান হিসেবে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন তৎকালীন কোচ চান্দিকা হাতুরুসিংহে, কিন্তু মমিনুলকে তার চোখে পড়েনি।

যেমন পড়েনি এই পদে আরও দু’জন প্রতিদ্বন্দ্বী মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বা মুশফিকুর রহিমকেও। এতো হতাশার পর যখন আমরা প্রায় নিশ্চিত যে অন্তত নিকট ভবিষ্যতে একজন ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান আমরা পাচ্ছি না। ঠিক তখনই, এই বছরের শুরুতে ত্রিদেশীয় সিরিজের আগে ঘোষণা এল সাকিব আল হাসানকে ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলাতে চায় টিম ম্যানেজমেন্ট!

বিষয়টা অবশ্যই শুনতে বিস্ময়করই লেগেছিল। সাকিব বাংলাদেশের সর্বকাল সেরা দুই ব্যাটসম্যানের একজন। লিভিং লেজেন্ড। ব্যাট হাতে তার স্ট্যাটস, ফিগারস এবং দলের জন্য প্রত্যক্ষ অবদানসমুহ সবই তার প্রমাণ। সাকিব একজন এক্সিলেন্ট ক্রিকেট মাইন্ড, একজন প্রলিফিক ‘রান মেকার’। কিন্তু এতকিছুর পরেও সাকিব কি ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান এর মত গুরুত্বপূর্ণ এবং টেকনিক্যাল পদের জন্য আদর্শ? সন্দেহ ছিল।

কারণ ব্যাটিং টেকনিক, খেলার ধরন বিবেচনায় সাকিব ওয়ান ডাউনের জন্য কাট আউট নয় এটাই আমার সরল ধারণা ছিল। সাকিব সারাজীবনই আমার কাছে ছিল একজন পারফেক্ট ‘পাঁচ নম্বর ব্যাটসম্যান’। পাঁচ নম্বরে তিনি খেলেছেন প্রায় নিজের পুরো ক্যারিয়ারই। তার সমস্ত বড়বড় কীর্তিও পাঁচ-এ।

অনেকেই হয়ত একটা কথা জানেননা যে স্টিভ ওয়াহ এবং অর্জুনা রানাতুঙ্গার পরে পাঁচ নং পজিশনে ওয়ানডে ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান (৩৭৫৭) সাকিব আল হাসানের। পাঁচ-এ নেমেই তার পাঁচটি সেঞ্চুরি, যার দুটি আবার ৬৪ ও ৬৮ বলের করা বাংলাদেশি রেকর্ড। সাকিব একজন পারফেক্ট নাম্বার ফাইভ হিসেবে বিশ্বের যেকোনো একাদশেই খেলার যোগ্যতা রাখে এটাই আমি মনে করি। কিন্তু, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও আধুনিক আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আদর্শ ‘ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান’ হিসেবে সাকিব আদৌ যোগ্য কি না সে নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে।

‘ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান’ টার্মটা শোনার পরেই কল্পনায় আসে ধ্রুপদী ছোঁয়ার নিখুঁত টেকনিক ও টেম্পারমেন্টের একজন ঠাণ্ডা মাথার কমপ্লিট ব্যাটসম্যান। সাকিবের ব্যাটিং বিশ্লেষণ আসলে এই প্রোফাইলের সাথে তা এতদিন যেত না। সাকিবের টেকনিক অনেক ফ্র্যাজাইল, শটের এরিয়া বেশ ন্যারো – সবই চর্বিত চর্বণ। লেট অর্ডারে বেশিরভাগ সময়েই ‘রান বাড়ানো’ বা ‘ফিনিশিং’এর কাজে নামতে হয় বলে সাকিবের ব্যাটিং অ্যাপ্রোচটাও আগ্রাসী। অনেক মারমুখী, এবং এট টাইমস হি ইজ আ টিকিং টাইম বম্ব! দলের খুব প্রয়োজন, সেসময় মাত্রাতিরিক্ত শট খেলে আউট হয়ে যাবার বদনাম সাকিবের ভাগ্যে অনেকবারই জুটেছে। কাজেই সব বিবেচনায় আমি ধরে নিয়েছিলাম সাকিব ওয়ান ডাউনে আসলে খুব একটা সফল হতে পারবে না।

কিন্তু অত্যন্ত আনন্দের সাথেই বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, সাকিব আমাকে শুধু ভুল প্রমাণ ই করেনি, একেবারে অবাক করে দিয়েছে! সীমিত সামর্থ্যের এতো কার্যকরী প্রয়োগ করে ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজের জাত চেনাতে এখনও পর্যন্ত এই বছরের সাত ইনিংসে লেটার মার্ক নিয়ে সফল বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার! আর এই সিরিজের পর তো মিনিমাম ১ বছরের জন্য এই পজিশনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিতই করে ফেলেছেন বলা যায়! আমি জানিনা নিকট অতীতে বা আদৌ এতো কনসিসটেন্ট কোন ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান বাংলাদেশে এসেছিল কিনা!

ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান হিসেবে যে কয়েকটি ক্রাইটেরিয়া আছে যেমন-

  • দ্রুত প্রথম উইকেট পতন হলে নেমে আশু উইকেট পতন ঠ্যাকান। ওপেনারকে সাথে নিয়ে লম্বা লম্বা জুটি গড়ে দলকে ভিত্তি দেওয়া।
  • কোন অবস্থাতেই রানের চাকা থামতে না দেওয়া
  • অতীব প্রয়োজন না হলে কখনোই মারমুখী না হওয়া। শট না খেলা। নিজের উইকেটের মূল্য বুঝা, টিকে থাকা!
  • নিজে বড় ইনিংস খেলা

এই চার ক্রাইটেরিয়াই সাফল্যের সাথে পুরণ করেছেন সাকিব! স্ট্যাটস, ফিগারস আর প্রত্যক্ষ্যদর্শন তার বড় প্রমাণ!

প্রথম ক্রাইটেরিয়ায় আসি। সাকিব এই কাজ কতটা দক্ষতার সাথে করেছেন তা বুঝতে সাকিবের এই বছর খেলা সাতটি ম্যাচের প্রথম উইকেট ও দ্বিতীয় উইকেট পতনের ব্যবধান এবং এর মাঝখানে দ্বিতীয় উইকেট জুটির একটি তালিকা দেওয়া হল –

  • ৩০-১ থেকে ১০৮-২ (৭৮ রানের জুটি)
  • ৭১-১ থেকে ১৭০-২ (৯৯ রানের জুটি)
  • ৬-১ থেকে ১১২-২ (১০৬ রানের জুটি)
  • ৫-১ থেকে ১৫-২ (১০ রানের জুটি)
  • ১-১ থেকে ২০৮-২ (২০৭ রানের জুটি)
  • ৩২-১ থেকে ১২৯-২ (৯৭ রানের জুটি)

আমি হলফ করে বলতে পারি যে, বাংলাদেশ ক্রিকেটে এই জিনিস, এই প্রতিরোধের কাব্য অভূতপূর্ব। আমাদের ব্যাটিং লাইন আপ যেরকম ডোমিনো ইফেক্টে আক্রান্ত, এক উইকেট পড়ার পর এতদুর টেনে নিয়ে যাওয়া এতো ধারাবাহিকভাবে কখনো ই সম্ভব হয়নি আমাদের ক্রিকেটে। এখন হচ্ছে, যার মূল অবদান সাকিবের।

দ্বিতীয় ক্রাইটেরিয়া, স্ট্রাইক পাল্টে স্কোরবোর্ড চলমান রাখা। এখানেও আছে সাকিবের প্রধান ভুমিকা। এই সাত ইনিংস এই সাকিবের সঙ্গী ছিলেন প্রিয়বন্ধু তামিম ইকবাল, যিনি এমনিতেই তার আগের খোলস ছেড়ে এখন অনেক ধীরস্থির ব্যাটিং করেন, তার উপর দ্রুত সঙ্গী ওপেনারের পতন তাঁকে আরও সাবধানী হয়ে খেলতে প্রলুব্ধ করে।

এমনও সময় রানের চাকা সচল রাখার মূল দায়িত্বটির জন্য আসলে তিনি ভরসা করেন তার বন্ধুবরের উপরেই! সাকিব ওইপাশ থেকে নিয়মিত স্ট্রাইক রোটেট করে প্রেশার রিলিজ করে দেন বলেই এতো আরামে নিজের মত ব্যাট করে বড় ইনিংস খেলতে পারেন তামিম। তামিম আর সাকিবের জুটিগুলোতে দুজনের কন্ট্রিবিউশন এবং স্ট্রাইকরেটের ওভারঅল চিত্র দেখলেই আসলে বুঝা যায় যে, রান বাড়ানোর মূল দায়িত্ব সাকিবেরই থাকে।

তৃতীয় ক্রাইটেরিয়া সবচেয়ে অবাক করে আমাকে, সাকিবের মধ্যে এতো বড় চেঞ্জ আসবে আমি এটা কল্পনা করতে পারিনি। আমি মনে করতাম ফ্ল্যাশিনেস সাকিবের রক্তে। সাকিব মেরেকেটেই খেলবে, এভাবেই যেদিন রান করার সেদিন রান করবে, আবার এভাবেই ইররেসপন্সিবলি আউট হবে। কিন্তু ওয়ান ডাউনে আসার পর থেকে সাকিবের টেম্পারমেন্ট যে পরিমাণ বেড়েছে তা আসলেই আশ্চর্য।

এলোপাথাড়ি শট খেলার ধাঁচ এখনও যে পুরোপুরি গিয়েছে তা নয়। কিন্তু নিজের উইকেটের মূল্য আগের চেয়ে অনেক অনেক বেশিই বুঝেন তিনি এটা তার ব্যাটিং দেখলে বুঝা যায়।

৩৭, ৬৭, ৫১, ৮, ৯৭, ৫৬, ৩৭… এইবছর সাকিবের রান। ৭ ইনিংসে ৩৫৩ রান। ৫০ গড়ে ও ৮১ স্ট্রাইকরেটে! ওয়ান ডাউনে এতো কনসিসটেন্ট আমাদের কোন ব্যাটসম্যানই ছিলেন না। মাত্র ৭ ইনিংসেই বাংলাদেশের হয়ে ওয়ান ডাউনে খেলা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সপ্তম সর্বোচ্চ রান হয়ে যাওয়াই এর প্রমাণ। আফতাব আশরাফুল রা ৫০+ তো ইনিংস খেলেছিলেন! গত ৬ বছরে সাকিবও এতো কনসিস্টেন্ট কখনো ছিলেন না। তাঁর সর্বশেষ ৫০+ গড়ের বছর ২০১২!

‘কিন্তু’ আছে কিছু অবশ্যই… যেমন, এখনও তার টেকনিক টেম্পারমেন্ট পুরোপুরি একজন ওয়ান ডাউনের জন্য মানানসই না। এখনও আউট হচ্ছেন হুট করেই। আকাশে তুলে দিয়ে। তার ইনিংসগুলো আরেকটু বড় হতেই পারতো। চারটি ফিফটি করেছেন, সেঞ্চুরি হচ্ছে না! ওয়ান ডাউনে ব্যাটিং এর জন্য তার ব্যাটিং বোলিং এ সাম্য বিরাজ করছে কিনা, এসব সমালোচনা হতে পারে। কারণ আসলে প্রত্যাশার তো শেষ নেই, নামটা যদি সাকিব আল হাসান হয় তাহলে তো শেষের ও শেষ নেই।

তবে সবচেয়ে বড় কথা হল সাকিব এই পজিশনে ব্যাটিংটা উপভোগ করছেন, এখনও পর্যন্ত! আর সাকিবের জন্য আসলে এই উপভোগটাই বড়। যে জিনিস সাকিব উপভোগ করেন না সাকিব সেখানে সফল হননা। আগেও দেখা গেছে। এবং উপরোক্ত বিষয়াদি থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে সাকিব ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান হিসেবে সফল! সর্বাঙ্গে সফল -পারফেক্ট? প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু সাকিব সফল, তাঁর সীমিত সামর্থ্য দিয়েই সফল।

এবং এই বছর এখনও শেষ হয়নি। সাকিবের ওয়ান ডাউনের এই আকস্মিক তাজা সুবাতাস আমরা এশিয়া কাপ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ, জিম্বাবুয়ে নিউজিল্যান্ড সিরিজে ভোগ করবো, আশার গণ্ডিটা আরও বড়। ২০১৯ বিশ্বকাপ পর্যন্ত সাকিবকে ওয়ান ডাউনে থিঁতু করে ফেলা আসলে এখন সবচাইতে ভাল সিদ্ধান্ত হবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।