শুটকি: একেক দেশে একেক নাম, একেক ‘ফরম্যাট’

‘শুটকি’ – শব্দটা দেখেই কেউ কেউ নাক সিঁটকে ফেলছেন আর কারো জিভে জল চলে এসেছে। যারা নাক সিঁটকাচ্ছেন, তাদের জন্য বলছি, এই বস্তু সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে। একেক দেশে এর একেক নাম, একেক রকম ফরম্যাটে এই জিনিস রান্না হয়, খাওয়া হয়।

নরডিক স্ন্যাকস এ শুটকি খুবই কমন একটা ব্যাপার। সাদা রঙের মাছ, সাধারনত কড বা হ্যাডক মাছ কাঠের তাকে করে সমুদ্রের খোলা বাতাসে শুকানো হয়। কিভাবে মাছটা কাটা হচ্ছে তার উপর শুটকির স্বাদ, গন্ধ নির্ভর করে। কিছু মাছ একদম পাতলা করে স্লাইস করে শুকানো হয় ক্রিসপি ভাব আনার জন্যে আবার কিছু মাছ তেরচা করে কেটে তাতে মাছের একটা গন্ধ রাখা হয় আবার কিছু সময় এক চাক ধরে শুকিয়ে নেয়া হয়, তাতে মাছের গন্ধ এবং মাংসের মতো আঁশ দুটোই থেকে যায়।

এই শুটকি তে একটু পেলব, তেলতেলে ভাব আনার জন্যে মাখন দিয়ে খাওয়া হয়। ইউরোপের উত্তরাংশে যেমন গ্রীনল্যাণ্ড, আইসল্যান্ড এইসব দেশে চাষ করা খুবই কঠিন, তাই গম বা যব পাওয়া কঠিন। এসব দেশে মাখনে ডোবানো শুটকি মাছ ইউরোপে যেমন রুটি খায় সেরকম করে খাওয়া হয়।

ভাইকিংস রা যে সাগর পাড়ি দিয়ে এসে ব্রিটেন সহ অন্যান্য দেশে লুটতরাজ চালাতো, তাদের নৌবহরে খাবার হিসেবে থাকতো মাখন, পরিজ, স্টকফিস, শুকনো মাংস, জল আর মদ। মোদ্দা কথা যে সব খাবারের শেলফ লাইফ বেশি সেসব খাবার হতো ভাইকিংস দের যাত্রাপথের সঙ্গী। এখানে রসনাবিলাসের কোন জায়গা ছিলোনা।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শুটকি বিবিধ ফরম্যাটে খাওয়া হয়। দিন দুনিয়ার দিকে এইবার চোখ দেন।

কডফিস এর পর্তুগিজ নাম হচ্ছে ‘বাকালহাউ’। লবন ছাড়া কডের শুটকি কে পর্তুগিজ ভাষায় বলে ‘বাকালহাউ ফ্রেসকো’। পর্তুগালে জিনিষটা নাকি ডালভাত স্টাইলে খাওয়া হয়, এর মানে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও খেয়েছেন, খান। পর্তুগালে শুধু এই জিনিষ দিয়েই নাকি ১০০০ এর উপরে পদ রান্না করা হয়!

পর্তুগালের এক গ্রামে মাছ শুকানোর জন্য রাখা হয়েছে।

প্রাচীন কাল থেকে গোয়া তে ‘ম্যাকেরেল’ এর শুটকির ব্যবহার আছে, ঠিকঠাক মতো সংরক্ষন করা গেলে কয়েকবছর রাখা যায় এই জিনিষ। গোয়া তে অবশ্য হাঙর ও শুটকি বানিয়ে ফেলে লোকজন। এলেম আছে বটে লোকজনের।

ইটালিতে ‘বাক্কালা’ নামে কডের শুটকি পাওয়া যায়। এই শুটকি রোদে শুকিয়ে এতৈ শক্ত হয়ে যায় যে রান্নার আগে বেশ কয়েকদিন ভিজিয়ে রাখতে হয়।

স্টার্জিওন বা স্যামন মাছের নরম অংশ কেটে লবন মাখিয়ে বা সোজাসুজি লবন ছাড়াই শুকিয়ে বানানো হয় রাশিয়ান শুটকি ‘বালেক’। স্টার্জিওন আর স্যামনের স্মোকড বা আগুনে সেঁকা ভার্শনকেও ‘বালেক’ বলা হয়।

ফিলিপাইনে রোদে শুকানো মাছকে বলা হয় ‘ডাইং’। মোটামুটি যাবতীয় যা মাছ আছে সবই এরকম করে খাবার অভ্যাস ফিলিপাইনি দের আছে।

ম্যাকারেল মাছের ‘শুটকি’ রান্না

গেঁজিয়ে লবন মাখিয়ে রাখা এবং রোদে শুকানো দুই কিসিমে ‘গ্রে মুলে’মাছ মিশিয়ে ‘ফেসিখ’নামে ঈজিপশিয়ান লোকজন একপদ খাবার খান। এই মাছ মূলত নোনা জলের। ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগরে পাওয়া যায়। এই মাছ আগে রোদে শুকিয়ে লবন মাখানো হচ্ছে প্রাচীন নিয়ম।

‘গুয়ামেগি’ হচ্ছে কোরিয়াতে ‘প্যাসিফিক হেরিং’ এবং ‘প্যাসিফিক সাউরি’ মাছের আধা শুকনা ,শীতকালে বানানো এক খাবার। সোজা হিসেবে আদ্ধেক শুটকি আরকি।

আইসল্যান্ডে ‘স্লিপার শার্ক’ কে চার/পাঁচ মাস ধরে গেঁজিয়ে শুকানো হয়, নাম হচ্ছে ‘হাআলগাটে’।

‘ইকান আসিন’ হচ্ছে শুকানো এবং লবন মাখানো ইন্দোনেশিয়ান ডিশ। ভাতের সাথে ‘সাম্বাল’ নামের মরিচ পেষ্টের সাথে এই বস্তু দেয়া হয়।

কোরিয়ার সিওলের বাজারে বিক্রির জন্য রাখা গিপো মাছ।

‘গিপো’ হচ্ছে কোরিয়ান ফাইলফিস এর গোস্ত আলাদা করে শুকিয়ে, চাপ দিয়ে ‘সিজন’ করা মাছ। কোরিয়ান শুটকি বলতে পারেন।

‘কাতসুয়োবুশি’ হচ্ছে শুকানোর পর গেঁজানো এবং এরপর আগুনে সেঁকা ‘স্কিপজ্যাক টুনা’।

আরো আছে। তার লিষ্ট দিতে গেলে একটা রিসার্চ পেপার হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। ইন্টারেষ্টিং ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশে কক্সবাজার এবং মহেশখালী এলাকায় শুটকি নিয়ে রীতিমতো ফান্ডেড এবং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা হচ্ছে, দুর্ভাগ্য হচ্ছে এই গবেষকদের প্রায় সবাই সাদা চামড়ার মানুষ, শ্বেতাঙ্গ।

আমাদের বাংলাদেশে খুব প্রচলিত শুটকি গুলো হচ্ছে, লইট্টা, ছুরি, লাক্ষ্যা, চাপিলা, রূপচাঁদা, চিংড়ি এবং ইলিশ।

তবে কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, সিলেট, কুমিল্লা এবং নারায়নগঞ্জ এলাকায় ‘চ্যাঁপাশুটকি’র বিশেষ প্রচলন আছে। এর উৎপাদন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর, লালপুর এবং নরসিংদীর মাধবদীতে সবচেয়ে বেশি হয়।এই বস্তু মূলত তৈরী করা হয় ছোট পুঁটি মাছ গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

এই পদ্ধতিতে প্রথমে মাছের আঁইশ ফেলে, মাছের নাড়িভূড়ি ও তেল বের করে রেখে দিয়ে মাছগুলি ধুয়ে নিতে হয়। তারপর এই মাছ রোদে শুকাতে হয় ১২-১৪ দিন। ভাল করে শুকানো মাছ বস্তা বা প্যাকেটের ভিতর এক মাস রেখে দিতে হয়। ইতোমধ্যে রেখে দেওয়া মাছের তেল চুলায় জ্বাল দিয়ে বড় মটকার ভিতরের অংশে মাখিয়ে রোদে শুকানো হয়। এরপর মাছগুলি আবার ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়।

এর ৮-১০ ঘণ্টা পর মাছ নরম হলে মাটির বড় পাত্রে বা মটকায় চেপে চেপে ভরা হয়। এভাবে চেপে ভরার কারণেই এর নাম হয়েছে চ্যাপা শুঁটকি।মাছ রাখার আগে মটকা মাটির নিচে গর্তে বসিয়ে নিতে হয় নাহলে মটকা ভেঙে যাবার সম্ভাবনা থাকে। মাছ ভরা শেষে প্রয়োজনমতো (০.৫-১ কেজি) শুঁটকি গুঁড়া করে ভিতরের মাছের উপর ছিটিয়ে মটকার মুখ চট বা পলিথিন দিয়ে বেঁধে মাটির লেপে দেয়া হয় যাতে বাতাস প্রবেশ করতে না পারে। এর ৩-৪ মাস পর এগুলি চ্যাপা শুঁটকিতে পরিণত হয়। এর আরেক নাম হচ্ছে সিঁদল।

এই প্রক্রিয়ায় মাছকে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা কেন পরলো সেটা আগে জেনে নিই। সিলেটসহ উত্তরপূর্ব ভারতের পাহাড় ঘেরা অঞ্চলগুলো ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় মিঠা পানির নদী, খালবিল, জলা, হাওরে পুর্ণ। এইসব জলাধার নানা রকম মাছে পরিপূর্ণ সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে। এই অঞ্চলের মানুষ মাছের উপর সব সময়েই নির্ভরশীল ছিলো। বছরের একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত হাওর বাওরে পানি যখন থাকতো এই অঞ্চলের মানুষেরা মাছ ধরে তা বিক্রি করে জীবন চালাতো। যেহেতু এই হাওর বাওর বা জলাশয়ে পানি সারা বছর থাকতো না, তাই বছরের অন্য সময়ের জন্য মাছ সংরক্ষণের সবচেয়ে সুবিধাজনক পন্থা ছিলো শুটকি বা রোদে শুকানো মাছ।

ইতালিয়ান রান্না ‘বাক্কালা’

সমস্যা হলো, পৃথিবীর সবচাইতে বৃষ্টিবহুল এলাকা হওয়ায় মাছ শুকিয়ে সংরক্ষণ করার জন্য পর্যাপ্ত সুর্যালোক এবং আর্দ্রতা বছরের একটা সময়ে পাওয়া দুস্কর হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ছোট পুঁটি, মলা ঢ্যালা বা দারকানা জাতীয় মাছ, যা প্রচুর পরিমাণে ধরা পরতো, তা সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন পন্থার দরকার হয়ে পড়ে। এ কারণেই ইতিহাসের কোন এক সময় উদ্ভাবন হয় এই ‘ফার্মেন্টেড ফিশ’ পদ্ধতি, যা দিয়ে পুঁটি, পাবদা, মলা, দারকানার মত ছোট ও দ্রুত পচনশীল মাছকে চ্যাপায় রূপান্তর করা যায় খুব সহজে। ভৌগলিক ও আবহাওয়াগত কারন ছাড়াও নৃতাত্বিক কারণ ও রয়েছে আমাদের এখানকার শুটকি মাছ খাবার পেছনে। সে বড় তাত্বিক আলোচনা। আমার পছন্দের আলোচনা, তাও অন্য কোনদিন করা যাবে। নৃতত্ব আমার পছন্দের বিষয়।

সে যাকগে। আমাদের বাসায় শুটকি রান্না হয়। চ্যাপা বা সিদল কম, লইট্টা শুটকিই বেশী। পেঁয়াজ দিয়ে আচ্ছা করে ভূনা করা হয়। তাতে আদা বাটা, রসূন বাটা থাকে। এবং জিনিষটা অবশ্যই হতে হবে ঝাল।

শুরুতেই শুটকি ভিজিয়ে মোটামুটি একটা গ্রহনযোগ্য পর্যায়ের নরম করে ফেলতে হয়। এর মধ্যে ম্যালা পেঁয়াজ কুঁচি করে নিয়ে হয়। যদি চান কয়েকপিস টমেটো দিতে, খারাপ হয়না। বেশ ‘থিক গ্রেভি’ হয় তখন। মসলা থাকে এন্তার। রান্না শুরু হতেই সুগন্ধে ভরে যায় এলাকা। পেঁয়াজ, ধনেপাতা, মরিচ, মশলা আর শুটকি মিলে একটা দুর্দান্ত ব্যাপার হয়। রান্না শেষে গরম গরম নামে কড়াই থেকে বাটিতে, সাথে একথালা সাদা ভাত। পান্তার সাথেও এই শুটকি চলে নির্দ্বিধায়।

বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ভ্যানগগ ‘ফিস ড্রায়িং বার্ন’ এঁকেছেন ১৮৮২ সালে।

গরম ভাত নিয়ে শুটকি ভুনা মুখে নিয়ে ঝালের যে অসাধারণ একটা কিক ( কিছু কিক মধুর অনুভূতির জন্ম দেয় , যেমন রবার্তো কার্লোস এর ফ্রান্সের বিপক্ষের সেই ফিজিক্স ডিফাইং কিক কিংবা রোনালদিনহোর সেই মিডফিল্ড থেকে বিলিতি কিপারের মাথার উপর দিয়ে বল ভাসিয়ে পোষ্টে ঢোকানো কিক!)। এরপর মাঝে মাঝে দাঁতের মাঝে আসবে শুটকি। কচকচ করে খাবেন, পেঁয়াজ-মশলা আর ধনেপাতা মিলে সাদা ভাতের স্বাদ অমৃতের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। এর মাঝে আবার অদ্ভুত এক টক টক স্বাদের সাথে সাইট্রিক সুগন্ধ! খুবই তোহফা খানা।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।