একটি নেগেটিভ প্রজন্মের উপাখ্যান

’৯০ দশক আর ’২০০০ এর দশক বাংলা গানের এক স্বর্ণালী সময় ছিল। ’৯০ দশকের সালমান শাহের গানগুলো এখনও মানুষের মুখে মুখে ফিরে। সালমান শাহ মারা যাবার পরেও রিয়াজ, ফেরদৌস, শাবনূর, মৌসুমীদের গানগুলো নিয়মিতই হিট ছিল। ‘অনেক সাধনার পর’, ‘প্রেমের তাজমহল’, ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’, ‘একদিন স্বপ্নের দিন’, ‘সেই মেয়েটি’, ‘মৌসুমী’- এই গানগুলোর এখনও রিমেক বের হয়।

সেসময় হিন্দির জোয়ার থাকলেও বাংলা গানগুলো প্রায় সমান তালেই সাথে ছিল। আর ব্যান্ডের গান তো ছিলই। আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, হাসান, পার্থ, সঞ্জয়- কে বাদ থাকবেন? সবার গান মানুষের মুখস্থ! ‘২০০০ এর দশকে বাংলা সিনেমার গান অনেকটা পড়ে গেলেও ভালো গানের কমতি ছিল না। অর্ণব, শাহানারা আসলেন। বাপ্পা ছিলেন। হাবিব, বালাম, এমনকি হৃদয় খানের গানও হিট।

অভিনেতা নয় ব্ল্যাকের গায়ক তাহসান, জন; এদের সোলো গান, অ্যালবাম প্রত্যেকটা হিট। ফুয়াদ আসলেন একেবারেই নতুন ধাঁচ নিয়ে। শিরোনামহীন, আর্টসেলরা তরুণদের ক্রেজ হয়ে গেলো! ২০০৫-০৬ এ ক্লোজআপ১ ছিল ক্রেজ। একেকটা পর্ব শেষ হতো আর পাড়ার সব সিডি দোকানে হিন্দী গানের বদলে নোলক, মাহাদী, রাজীব, মুহিন, সালমাদের গান বাজতো! সাথে সেরা কণ্ঠ থেকেও ইমরান, কোনাল বা ক্ষুদে গানরাজের পড়শীরা এলো! এমনকি আরেফিন রুমিও তাঁর বহুবিবাহ পর্ব শুরু করবার আগে কিছু হিট গান দিয়েছেন!

যাই হোক, এতো কথা বলার একটা কারণ হলো, আমরা যারা গানের বোদ্ধা না; গান গাইতে পারি না, তাদের জন্য হাঁটতে হাঁটতে গুনগুন করাটাই গানের বিনোদন, কিংবা ‘বাথরুম সিঙ্গিং’ আমাদের জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ! বিভিন্ন আড্ডায় যখন আড্ডার গায়কেরা গান গায় আর আমরা কোরাসে গলা মেলাই তখনও দেখি তাদের সর্বশেষ আপডেটেড গান ‘হাসিমুখ’ অথবা ‘সে যে বসে আছে’ অথবা ‘প্রেমাতাল’!

সময়ের বেড়াজালে গত ৮-১০ বছরে নতুন কোন গান আপডেট হয়নি আমাদের স্মৃতিতে! ‘সেই তুমি’-র এক যুগ পরে ‘হাসিমুখ’ এসেছে। কিন্তু হাসিমুখের এক যুগ পরে কিছু আসেনি!

২০১০ সালের পরে ফেসবুক, ইউটিউব আসার পরে বাংলা গানের জগতে একটা বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। আমরা গান এখন ইউটিউবে দেখি। যেসব গান হিট হয় সেগুলো গানের সুন্দর মিউজিক ভিডিওর কারণে হিট হয়। বছর দুয়েক আগে ‘বেঁচে থাকার প্রার্থনাতে’ গানটা খুব হিট, শেয়ার হলো মূলত ভিডিওতে নায়ক-নায়িকার রসায়নের কারণে।

কয়েকদিন চলার পরে আবার ভুলে গেলো মানুষ গানটা! শুধুই চোখ বন্ধ করে গুনগুনানোর মতো গান শুনিই না, খুব রেয়ার! ইমরান, কনা, সালমা, কোনালরা কিছু চেষ্টা করছেন। পড়শী প্রথমদিকে ভালো করে এখন সস্তার দিকে ঝুঁকে পড়েছে! আর একেবারেই শেষ দেড় বছরে প্রীতম হাসান ‘লোকাল বাস’-সহ কিছু গান নিয়ে এসেছে। মিডিয়া বলার চেষ্টা করে যে এখন নাকি গান আর আগের মতো শোনার বিষয় না ভিডিওতে দেখারও বিষয়।

অথচ কলকাতার গান কিন্তু একটার পর একটা আমরা শুনছিই। আরিজিৎ সিংয়ের সব গানই আমরা গুনগুনাই। অনুপম রয়ের ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’, ‘বোবা টানেল’, ‘বাড়িয়ে দেও’- একটানে কত গান মনে পড়ে গেলো! সব গানই হিট, আমাদের মুখস্থ! একটাও কিন্তু মিউজিক ভিডিও দেখে হিট না, প্রত্যেকটাই গানের কথা আর সুরের জন্য আমাদের কানে বাজে!

গত কয়েক বছরে প্রত্যেক হলুদের অনুষ্ঠানে দেখি বাংলা গান বলে ‘রাজা রাণী’, ‘আসো না’, ‘রিমিক্স কাওয়ালী’- সব কলকাতার গানই বাজে! গত কয়েক বছরে ‘ঢাকার পোলা’, ‘ডানাকাটা পরী’, আর ‘বিয়াইন সাব’ ছাড়া বাংলাদেশের নাচের গানও নেই!

আমরা কী করেছি? আমরা ফেসবুক, ইউটিউব ব্যবহার করে হিরো আলমকে নিয়ে মাতামাতি করেছি। পাশের দেশ আমাদের এই মাতামাতি নিয়ে হাসাহাসি করে। আমরা ড. মাহফুজুর রহমানের গান নিয়ে মজা নেই। আমরা ‘পটাকা’, ‘রাস্তা’ তে মিলিয়ন ভিউ আর ডিজলাইক দিয়ে আসি। আমরা ‘দুই দুবার করে’ শেয়ার দেই! এসব নেগেটিভ মার্কেটিংকে আমরাই প্রমোট করি, মজা নেই। ভিউ বাড়ার কারণে তাদের উপার্জন ঠিকই হচ্ছে। তারা এগুলোই আবার বানায়!

অন্য কারও ফেসবুক হোমপেজে কী আসে জানিনা, তবে বিশ্বাস করেন, গত ১০ বছরে আমি এই প্রথম আমার ফেসবুকে ১ মাসের মধ্যে বাংলাদেশের বাংলা গান নিয়ে অনেকগুলো ভালো আলোচনা, শেয়ার এগুলো হতে দেখছি। কোনাল মাত্রই তিন সপ্তাহ আগে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ হিসেবে ‘একলা চলোরে’ গানের কভার করলেন। এটা হচ্ছে ভিডিও দেখার গান।

অথচ এই গানে ‘১৯ হাজার’ ভিউও হয় নাই! জ্বি ১৯ হাজার মাত্র। সিলন মিউজিক লাইঞ্জে পুরনো কয়েকটা গানের রেন্ডিশন হচ্ছে। সিয়াম তাঁর ‘পোড়ামন ২’ ছবিতে ‘সালমান শাহ’ ট্রিবিউট দিয়ে একটা মিউজিক ভিডিও ছেড়েছে! মাহতিম শাকিব বাংলাদেশের রোমান্টিক গানের ভবিষ্যত সম্ভাবনা নিয়ে আসছে। আর ‘অপরাধী রে’ গানটা এই মুহূর্তে সাড়ে ৪ কোটি ভিউতে আছে!

মজার ব্যাপার হচ্ছে ‘অপরাধী রে’ এমন একটা গান যেটার মিউজিক ভিডিও খুব একটা কেউ দেখছে না। এই গানটা সবাই ‘শুনছে’। আপনি ভিডিওর নিচে মন্তব্য ঘরে দেখবেন সবাই গান নিয়ে কথা বলছে, কে কিভাবে নিজের জীবনের সাথে গানটাকে মেলাতে পারছে- এগুলোই তাদের কথা! কেউ ভিডিও নিয়ে কথা বলছে না। ইদানিংকার ‘ইউটিউব গানে’ যে জিনিসটা প্রায় রেয়ার! এবং এমন একটা ক্যাচি, সহজ ভাষার গান যে গুনগুনিয়ে গাইতেও ভালো লাগে! বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এজন্যেই গাইতে পেরেছে।

আমি খেয়াল করলাম, এরিজোনাতে আমার পরিচিতরাও গত ২ দিন ধরে এই গানই গুনগুনাচ্ছে। এটা নিয়ে দুইদিন আগে নিজেদের মধ্যে কথা হচ্ছিলো। এক ভাই বললেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ এতো জনপ্রিয় কেন? উনি কিন্তু কঠিন সাহিত্যে যান নাই। এজন্যে ক্লাসি সমাজ তাঁকে এখনও গালমন্দ করেন। কিন্তু উনি সহজ স্বাভাবিক ভাষায় আমাদের স্বাভাবিক জীবনের কথা লিখেছেন। মানুষ সেগুলো নিজেদের সাথে রিলেট করতে পেরেছে। ব্যাস!’

অপরাধী রে গানটাও কিন্তু একেবারে সহজ ভাষায় বেশিরভাগেরই বাল্য প্রেম বা প্রথম প্রেমের কথা মনে করিয়ে দেয়। কোন ঘুরানো, প্যাঁচানো, ভাবের কথা নেই। সহজ ভাষায় বলা ‘তোর জন্য টিফিনের টাকা জমাতাম’, কিংবা ‘নামের পাশে সবুজ বাতি আর জ্বলে না’! অর্থাৎ ব্লক খেয়েছে!

আবার ‘ঘুম ভেঙে তাঁর হাসিমুখের ছবি দেখি না!’ আমাদের প্রায় সবার মোবাইলেই প্রেমিকা/স্ত্রীর ছবি থাকে! যেঁটা ঘুম ভেঙে মোবাইল খুললেই আমরা দেখি। এগুলো কিন্তু আমাদের বেশিরভাগ মানুষই নিজেদের সাথে রিলেট করতে পারে। এজন্যেই গানটা মানুষ সহজে গাইতে পারে! কিন্তু আমাদের একটা ক্লাসি গানবোদ্ধার দল আছে।

যারা ‘এই গানটা ক্ষ্যাত, ক্যামনে সবাই শুনতেসে, ক্রিকেট দলও ক্ষ্যাত!’ এইসব বলতে বলতে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলছে। মানলাম গানটা হয়তো সঙ্গীতের সব ব্যাকরণের পয়েন্ট ধরলে খুব একটা নাম্বার নাও পেতে পারে। কিন্তু এটি মানুষ গ্রহণ করছে, অনেকদিন পরে সর্বস্তরে একটা বাংলাদেশের বাংলা গান মানুষ গুনগুনাচ্ছে, এইসব পজিটিভ দিক দেখতে পারলে ভালো।

একটা স্ট্যাটাস দেখলাম এমন, ‘যেই জাতির সবচেয়ে বড় রিপ্রেজেন্টেটিভ ক্রিকেট দল এই ক্ষ্যাত গান গায় সেই জাতির রুচির লেভেল আসলেই কত ক্ষ্যাত হয়ে গেসে!’ এটা খুব একটা উচ্চমার্গীয় গান নয়, তারপরেও মানুষ এটা গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ ভালো গান বানালে মানুষ সেটা গ্রহণ করবে, এই মানসিকতাকে ধরে আপনারা ভালো গান বানান! নিজেদের ‘ক্লাস’ প্রমাণ করার তো কোন মানে নাই! ইতিবাচকভাবে কিছু জিনিস দেখার চেষ্টা করুন।

সিয়াম আহমেদ ‘সালমান শাহ’ ট্রিবিউটের গানটা গাইবার পরে সে ‘সালমান শাহ’ কেন সাজতে চাইলো এই নিয়ে মানুষ তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সিয়ামকে লাইভে এসে ক্ষমা চাইতে হয়েছে, মানুষকে বুঝাতে হয়েছে যে, সে কখনোই সালমান শাহ, কিংবা শাকিব খান হতে পারবে না (কেন পারবে না?), সে তাদের নখেরও যোগ্য না। সে একটা ট্রিবিউট দিতে চেয়েছে।

অথচ এতোদিন পরে সালমান শাহকে নিয়ে একটা গান হলো, নতুন একটা শিক্ষিত ছেলে সিনেমায় আসছে, নিজেকে স্মার্টলি প্রেজেন্ট করতে পারে; এসব দিক ইতিবাচকভাবে ভাবতে আমাদের বয়েই গেছে। আমাদের সেন্সিটিভিটিতে লেগে গেছে। সুতরাং আমাদের তাকে আক্রমণ করতেই হবে।

সেন্সিটিভিটি প্রসঙ্গে আসা যাক, মাহতিম শাকিব ছেলেটার ব্যাপারে। এই ছেলেটা মাত্র এসএসসি দিয়েছে। বয়স মাত্র ১৭ বছর! আবারও বলি, মাত্র এসএসসি দিয়েছে। নিজের এসএসসি দেয়ার পরের ম্যাচিউরিটির কথা চিন্তা করেন। আমরা তো রাস্তায় চিল্লায় বেসুরো গান গাইলেও বুঝতাম না যে আশেপাশের মানুষের সমস্যা হচ্ছে! ছেলেটার ২-৩টা গান গেয়ে খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

তাঁকে কনসার্টে, রেডিওতে ডেকে নিয়ে গেছে। তাঁকে বিভিন্ন গান গাইতে অনুরোধ করা হয়েছে। সে গেয়েছে। তার গলায় ‘হাসিমুখ’ গানটা শুনে আমার নিজেরও খুবই হতাশ লেগেছে। এ নিয়ে সমালোচনা হতে পারে। তাঁকে উপদেশ দেয়া যেতে পারে যেন সে তার নিজের রেঞ্জ বুঝে গায়, নিজের আরও উন্নতি করে। কিন্তু না, আমাদের এতোই সেন্সিটিভিটিতে লেগে গেছে, আমরা এতোই অসহিষ্ণু যে তাঁকে নগ্নভাবে আক্রমণ করতে আমরা এক মুহূর্ত সময় নেই নাই! ঠিক বয়সে বিয়ে করলে মাহতিমের সমান একটা ছেলে থাকতো- এমন বয়সী লোকগুলো মাহতিমের প্রতি ‘এক গানে মেয়েরা কেন ক্রাশড’ এই নিয়ে মাহতিমকে ট্রল করে যাচ্ছে!

নানাভাবে শাকিবের উপর নগ্ন আক্রমণ দেখছি তাঁর চেয়ে দ্বিগুণ বয়সী ম্যাচিউরড মানুষের কাছ থেকে! কতটা ফ্রাস্ট্রেটেড, হোপলেস, আর অসহিষ্ণু হলে কোন চিন্তা না করে এমনভাবে একটা টিন এজারের প্রতি ঝাঁপিয়ে পড়া যায়! এতো ম্যাচিউরিটি ১৬-১৭ বছর বয়সে থাকে না। সে একটা কনসার্টে ছিল। অনুরোধ আসছে, গান গাইসে! খারাপ গাইসে, গঠনমূলক সমালোচনা করেন।

নোংরা আক্রমণের তো মানে নাই! একটু সময় দেন। পারলে প্রথম আলোর আলাপনে, রেডিওতে ছেলেটার সাক্ষাতকার শোনেন। আপনারা যখন ট্রল করতে ব্যস্ত, তার আগেই ছেলেটা সাক্ষাতকারে বলেছে যে, সে নজেল ভয়েসে গান করে, তাঁর হাই রেজিস্টারে গলা উঠে না। এগুলো নিয়ে সে কাজ করছে। ইন ফ্যাক্ট, এই বয়সে তার যে ডিটেইল্ড চিন্তা-ভাবনা, ক্যারিয়ার নিয়ে পরিকল্পনা সেটা বিষ্ময় জাগানিয়া! সে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের স্বপ্ন দেখে। এজন্যে তাঁর ইচ্ছা ম্যানহাটন স্কুল অব মিউজিকে পড়ার।

প্রথম আলোর সাক্ষাতকারে তার যিনি সাক্ষাতকার নিচ্ছিলেন তিনিও বারবার শাকিবের উইজডোমের প্রশংসা করছিলেন। পারলে সেগুলো দেখেন! তারপর সমালোচনা করেন। আপনাদের ক্রমাগত ট্রলে যদি ছেলেটা ডিপ্রেশনে পড়ে তাহলে আমরাই একজন ভবিষ্যত ভালো গায়ক হারাবো! এখনো ছেলেটা টিন এজার। ন্যূনতম সাইকোলজি বোঝার চেষ্টা করেন! একটু ক্ষ্যামা দেন, প্লিজ!

চারপাশে যা আসছে, তা একেবারে খারাপ না হলে ইতিবাচকভাবে নিতে শেখা, আর মানুষকে আক্রমণ না করতে পারাটাও একটা শিক্ষার ব্যাপার!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।