তাজমহল: তুখোড় স্থাপত্য, বিরাট রহস্য

তাজমহল, মুঘল সাম্রাজ্যের সেরা স্থাপনা। শুধু মুঘল সাম্রাজ্য কেন, বিশ্বের অন্যতম সেরা স্থাপনা। বিশ্বের অন্যতম আশ্চর্যের একটি এই তাজমহল একই সাথে খুবই রহস্যময়। আসুন, আজকে জানি তাজমহলের অপার সৌন্দর্যের রহস্য!

কথিত আছে, মৃত্যুশয্যায় মুমতাজ মহল শাহজাহানকে তার শেষ ইচ্ছা হিসেবে জানিয়েছিলেন, যেন তাকে এমন এক সমাধিস্থলে সমাহিত করা হয় যার সৌন্দর্য গোটা পৃথিবীর মানুষ মুগ্ধ নয়নে দেখবে। তবে মুমতাজ মহল অন্তিম সময়ে এমন ইচ্ছার কথা সত্যিই ব্যক্ত করেছিলেন কিনা সেটা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে, সম্রাট শাহজাহান যে এই আকস্মিক মৃত্যুতে অসম্ভব প্রভাবিত হয়েছিলেন সেটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

মুমতাজ মহলের মৃত্যুর পর তিনি এক বছর রাজ্যসভার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে একাকী ঘরে স্বেচ্ছায় বন্দী জীবন কাটিয়েছেন আর প্রিয়তমাকে স্মরণ করেছেন। প্রেয়সীর স্মৃতি চিরস্মরণীয় করে রাখতে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এমন এক সমাধি নির্মাণ করার যা দুনিয়ার মানুষ আগে কখনও দেখেনি, যা নির্মাণ করার দুঃসাহস দেখাতে যুগের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষটিও ভয় পাবে।

দুনিয়ার সকল মহলের ‘তাজ’ বা মুকুট হবে যে মহল, মুমতাজ মহলের স্মরণে সেই তাজমহল নির্মাণের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করলেন শাহজাহান। নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ১৬৩২ সালে। প্রায় ২১ বছর ২০,০০০ শ্রমিকের নিরলস প্রচেষ্টায় ১৬৫৩ সালে অবশেষে নির্মাণ শেষ হয়েছিল তাজমহলের, যদিও মূল কাঠামো নির্মাণ করতে মাত্র ১০ বছর সময় লেগেছিল।

বাকি এক যুগ ব্যয় হয়েছিল মার্বেল পাথরের কাজ এবং তাজমহল কমপ্লেক্সের অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করতে। প্রায় ১,০০০ হাতি নিয়োজিত ছিল মালামাল পরিবহনের জন্য। সাদা মার্বেল পাথর আনা হয়েছিল আগ্রা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাজস্থানের মাকরান থেকে। এছাড়া তাজমহলের মোজাইকের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল মহা মূল্যবান এবং অপেক্ষাকৃত কম মূল্যবান ২৯ ধরনের পাথর, যেগুলো আনা হয়েছিল সুদূর শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, তিব্বত, আরব এবং ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে।

অধিকাংশ গবেষকের মতে, তাজমহলের প্রধান স্থপতি ছিলেন পারস্য বংশোদ্ভূত ওস্তাদ আহমদ লাহোরী, যদিও অনেকে ওস্তাদ ঈসা সিরাজিকে তাজমহলের প্রধান স্থপতি হিসেবে দাবি করেছেন। তবে দরবারের নথি এবং ওস্তাদ আহমদ লাহোরীর উত্তরাধিকারদের লিখিত বিবরণী ওস্তাদ আহমদের দিকে পাল্লা ভারি হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে তাজমহলের বিশাল গম্বুজটির স্থপতি ছিলেন অটোম্যান গম্বুজ বিশেষজ্ঞ ইসমাইল ইফেন্দি। তাজমহলের সবচেয়ে বড় রহস্য কি জানেন — সকালের তাজমহল, দুপুরের তাজমহল, গোধূলির তাজমহল, রাতের কিংবা চাঁদনী রাতের তাজমহল কিন্তু একই রকম নয়, ভিন্ন ভিন্ন !

সকালের সোনা রোদে তাজমহলে যে আনন্দ আবহের সৃষ্টি হয়, গোধূলিবেলায় পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ার সময় সে আনন্দ বিচ্ছেদের বেদনায় রূপান্তরিত হয়। আর জোছনা রাতে তাজমহলের স্বর্গীয় সৌন্দর্যের বিবরণ উপেক্ষা করে গেলে তাজমজল উপাখ্যান তো অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে। জ্যোৎস্নাস্নাত রাতে তাজমহলের অপার্থিব দৃশ্যের বিবরণ হয়ত কোনো সাহিত্যের সাহায্যে বর্ণনা করা সম্ভব নয়।

সে দৃশ্যকে উপভোগ করতে হয় অনুভবের শক্তিতে।

তাজমহলে সুচতুরভাবে আলোকীয় বিভ্রম (অপটিক্যাল ইলিউশন) ব্যবহার করা হয়েছে। ঢোকার সময় সুবিশাল তোরণের ভেতর দিয়ে তাজমহল দেখতে দেখতে প্রবেশ করলে হঠাৎ করে মূল আঙিনায় তাজমহলকে বিশাল মনে হয়। তাই আপনি মনে মনে যত প্রস্তুতি নিয়েই তাজমহল দেখতে যান না কেন তাজমহলের বিশালতা আপনাকে মুগ্ধ করবেই।

এছাড়া তাজমহলের চারটি মিনার বাইরের দিকে একটু হেলানো। ফলে মিনারগুলোকে দেখলে মনে হয় যেন একদম সোজা। এর আরও একটি বিশাল সুবিধা হলো বাইরের দিকে কিছুটা হেলানো হওয়ায়। ভূমিকম্পের ফলে মিনারগুলো ভেঙ্গে পড়লেও মূল তাজমহলের উপর পড়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে অক্ষত থাকবে সম্রাটের প্রিয়তমা মুমতাজের সমাধি।

অন্যদিকে তাজমহল থেকে বের হওয়ার সময় প্রধান ফটক দিয়ে তাকালে মনে হয় আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে তাজমহল। এখানেও ব্যবহার করা হয়েছে আলোকীয় বিভ্রমের সূক্ষ্ম কেরামতি। তাই অনেকে বলেন, চলে যাওয়ার সময় তাজমহলকে আপন অন্তরে ধারণ করে নিয়ে যান দর্শনার্থীরা।

তাজমহল সম্পর্কে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো, তাজমহল নির্মাণের পর সম্রাট শাহজাহান নাকি এর নকশাকারক এবং স্থপতিদের হাতের কব্জি কেটে দিয়েছিলেন, যাতে আর কেউ কোনোদিন তাজমহল বানাতে না পারে। কথিত আছে, শাহজাহান নাকি যমুনা নদীর অপর পাড়ে তাজমহলের মতো হুবহু আরও একটি কৃষ্ণবর্ণের সমাধি নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যার নাম লোকমুখে প্রচলিত আছে কালাতাজ হিসেবে।

কিন্তু, তাঁর আগেই ছেলে আওরঙ্গজেব তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করায় তিনি নাকি সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। আসলে কত রহস্যের মুঘল আমল, আকবর-জাহাঙ্গীর-শাহজাহান-আওরঙ্গজেব! শাহজাহানের শেষ পরিণতি না বললে লেখাটা অসম্পূর্ণ থাকবে!

শাহজাহানের বিলাসী জীবনযাপন এবং উচ্চাভিলাষী সব মহাপরিকল্পনার ভারে ধুঁকতে থাকা মুঘল সাম্রাজ্যকে আশু পতনের হাত থেকে বাঁচাতে তাকে ক্ষমতাচ্যুত এবং আগ্রা দুর্গে গৃহবন্দী করেন তারই পুত্র আওরঙ্গজেব। পিতা এবং ভাইদের প্রতি কঠোরতা এবং পূর্ববর্তী মুঘলদের তুলনায় অধিক অনমনীয় নীতির জন্য আওরঙ্গজেব নিজেও হয়ত সমালোচনা এড়িয়ে যেতে পারবেন না কখনও।

কিন্তু এ ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের দ্বিমত নেই যে, তিনিই শেষ গ্রেট মুঘল। কারণ তার মৃত্যুর পর অর্ধ শতাব্দীর মধ্যে বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়েছিল মুঘল সাম্রাজ্য। সে যা-ই হোক, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আরও আট বছর বেঁচে ছিলেন শাহজাহান। সেই বন্দী দিনগুলোতে দুর্গের ছাদ থেকে তিনি দেখতেন তাঁর জীবনের এই শ্রেষ্ঠ কীর্তি।

শেষ বিকেলের বিরহ বেলায় তার হৃদয়ে হয়ত বেজে উঠত প্রিয়হারা বেদনার করুণ সুর। যৌবনের প্রেম-ভালবাসায় ভরা জৌলুসের দিনগুলো স্মরণ করে তার চোখ হয়ত ছলছল করে উঠত। মৃত্যুর পর শাহজাহানকে সমাহিত করা হয়েছিল মুমতাজ মহলের সাথে স্বপ্নের তাজমহলের ভেতরে।

প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অর্ধ কোটিরও বেশি পর্যটক বেড়াতে আসেন তাজমহল দেখতে! আমি বলবো – তাজমহল দেখতে নয়, তারা আসেন আর মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখেন একটি সকাল, একটি দুপুর, একটি গোধূলি কিংবা একটি ভরা জোছনা

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।