ডাক বাবা আফ্রিদি: একটি অমীমাংসিত রহস্য

শহীদ আফ্রিদিকে সবাই ভালবাসে। আবার বিভিন্ন সময় অনেকেই তাঁকে ভুল বুঝেছে।

এই যেমন শুরুর দিকে তাকে আমরা একজন পরিপূর্ণ ক্রিকেটার ভেবেছিলাম, যে সব ফরম্যাটের জন্যেই মানানসই। কিন্তু মাত্র ১০ বছর পর আমরা বুঝতে পারলাম সে আসলে শুধু ওয়ানডে ক্রিকেটের জন্য ভাল। এরও পাঁচ বছর পর আমরা পুনরায় উপলব্ধি করলাম, ওয়ানডেও নয়, সে শুধু টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জন্য উপযুক্ত। আর এখন আমরা সবাই জানি, ক্রিকেট খেলতে শুরু করা কিশোর-তরুণদের জন্য আফ্রিদি হচ্ছে সেই উদাহরণ, যাকে দেখে শেখা উচিত ক্রিকেটটা কখনই যেভাবে খেলা উচিৎ নয়!

১৯৯৬ সালে আমরা ভেবেছিলাম সে একজন ব্যাটসম্যান, যে টুকটাক বোলিং করতে পারে।আবার ২০০৬ এ এসে আমরা বুঝলাম সে আসলে একজন বোলার, যে হালকা ব্যাটিং জানে! আর ২০১৩তে এসে আমরা জানলাম সে আসলে একজন ‘টুকটাক’ যে ব্যাটিং কিংবা বোলিং কিছুই ঠিকমত পারে না!

তবে, এমনিতে সে প্রচণ্ড প্রতিভাধর একজন ক্রিকেটার। তার মানের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ওয়ানডেতে তাঁর স্ট্রাইক রেটই সর্বোচ্চ। তাঁর মানের বাকি ব্যাটসম্যানরা হচ্ছেন মুত্তিয়া মুরালিধরন, দানিশ কানেরিয়া, দিলীপ যোশি আর আব্দুল কাদির!

খেলার মাঠে সে এতটাই কঠোর যে ক্রিকেট বলকেও চেরি ফলের মত খেয়ে ফেলতে পারে! অনেকেই বলে থাকে, আম্পায়ার যখন তাঁকে বলেছিল, ‘ক্যাচ দ্য চেরি’, সে সেটাকে সিরিয়াসলি নিয়ে নিয়েছিল! জোয়েল গার্নার, প্যাট্রিক প্যাটারসন আর মার্ভ হিউজের মত দানবেরাও মাঠভরা দর্শকের সামনে এমন দুঃসাহসিক কাজ করার সাহস পান নি।

একই সাথে যেকোন কিছু দ্রুত শিখে ফেলার দারুণ এক ক্ষমতা আছে তার। এই যেমন মাত্র ১৫ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার পর সে ঠিকই উপলব্ধি করেছে যে, ভরা মাঠে দাঁত দিয়ে বলের আকৃতি নষ্ট করা কেউ পছন্দ করে না, এই জন্য সে এই কাজ জীবনে আর কখনো করেনি।

৩৫০-এর বেশি ওয়ানডে খেলা ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে কম বল ব্যাটিং করার বিশ্বরেকর্ডটি তার দখলে। সত্যি কথা বলতে কি, সে যতগুলো ওয়ানডে খেলেছে, মনে হয় তার চেয়েও কম বল ব্যাটিং করেছে!

পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্যের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আফ্রিদি ব্যাটিংয়ে নামছেন আর গ্যালারিভরা সমর্থকেরা ‘বুম বুম’ চিৎকারে পুরো স্টেডিয়ামের প্রতিটি কোণায় আওয়াজ তুলছেন। অধিকাংশ সময়ই এরপর একটি বল হবার সাথে সাথেই সেই দর্শকদেরই বিস্মিত চোখ, কামড়ে ধরা জিহবা আর মাথায় রাখা দুই হাতের দৃশ্য চোখে পড়ে, যখন আফ্রিদি পিনপতন নীরবতার মাঝে ড্রেসিংরুমে রেখে আসা অর্ধেক খাওয়া গরম কফিটা শেষ করার জন্য দ্রুতপায়ে ফিরতে থাকে! আমাদের অসাধারণ দর্শকেরা শত শতবার এই একই নাটকের পুনরাবৃত্তি করেছেন এবং এই একটা ক্ষেত্রে আফ্রিদি আর তার ভক্তরা এক অন্যকে কখনো নিরাশ করেন নি!

ক্যারিয়ারে অল্প কিছু সময়ের জন্য(প্রায় ১৫ বছর) আফ্রিদি ব্যাট হাতে অফ ফর্মে ছিলেন। কিন্তু আমাদের জনগণ কখনো তাকে নিয়ে হাল ছাড়েনি। এমনিতে আমরা মাত্র ১০০ দিনেই নতুন সরকার এবং দুই বছরেই গণতন্ত্রের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলি, কিন্তু আফ্রিদির জন্য আমাদের ভালবাসাটা এসব কিছুর উর্ধ্বে। আমাদের অধিকাংশ মানুষই এখনো বুকের মাঝে এই বিশ্বাস লালন করে যে, আফ্রিদি এখনো শিখছেন এবং একদিন ঠিকই তিনি তাঁর সমালোচকদের থোতা মুখ ভোঁতা করে দেবেন!

ব্যাটসম্যান হিসেবে আফ্রিদি হচ্ছে প্রতিপক্ষ অধিনায়কের দুঃস্বপ্ন। কারণ বোলিং টিম যদি তিন বলের মধ্যে তাকে আউট করতে ব্যর্থ হয় তবে তাদের অধিনায়ককে বোর্ডের কাছে লিখিত জবাবদিহি দেওয়া লাগে কেন আফ্রিদিকে প্যাভিলিয়নে ফেরাতে এই অনাকাংক্ষিত বিলম্ব ঘটলো! আর কোন দল যদি তাকে কয়েক ওভারের মধ্যে আউট করতে না পারে, তখন তাঁদেরকে বিচার বিভাগীয় তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়!

ক্রিকেট বিশ্বে যেকোন দলে বোলার কিংবা অধিনায়ক হিসেবে টিকে থাকার নুন্যতম যোগ্যতা হচ্ছে আফ্রিদিকে তিন বলের মধ্যে আউট করে দেয়া। একে বলা হয় ‘লালা’ টেস্ট এবং জনশ্রুতি আছে যে, যে কেউ অন্তত টানা তিন দিনের জন্য ক্রিকেট খেলেছে, সেই এই পরীক্ষায় সহজে পাশ করার মত যোগ্যতা অর্জন করে ফেলে!

আফ্রিদি আসলে এক অমীমাংসিত রহস্য। কেউ কেউ বলে সে একজন স্পিনার যে খুব জোরে বল করতে পারে। বাকিরা বলে, সে আসলে একজন ফাস্ট বোলার যে খুব আস্তে বোলিং করে!

এতকিছুর পরেও পাকিস্তানিরা তাকে ভালবাসে। কারণ আমাদের জাতির মতই আফ্রিদি হচ্ছে এমন নির্বোধ আর বেকুব যে কখনই নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে প্রস্তুত নয়। যে এখনো প্রতিবার আকাশে বল তোলার সময় নিরাশার বিপরীতেও এই আশায় চেয়ে থাকে যে শুধু এবারের মত কেউ তাকে ক্যাচ আউট করবে না!
সম্মান!

__________

আফ্রিদিকে নিয়ে নাসির মিনহাস নামক জনৈক পাকিস্তানি লেখাটা ফেসবুকে লিখেছেন। অলিগলি.কমের পাঠকদের জন্য লেখাটা হুবহু অনুবাদ করে দেয়া হল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।