তুর্কি জোয়ান বাকের + মুর্শিদাবাদের নর্তকী খনি = বাকরখানি!

শৈশবে আমার হিরো ছিলেন একজন বাকের। বাকের ভাই। হাওয়া মে উড়তা যায়ে বাকের ভাই।

যৌবনে আমার হিরো আরেকজন বাকের। আগা বাকের। তুর্কিস্তান থেকে আসা বালক, যাকে নবাব মুর্শিদ কুলি খা কিনে নেন। পড়ালেখা আর সমর প্রশিক্ষণে যৌবনে তিনি হয়ে ওঠেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। যৌবনের অন্যতম ধর্ম থেকে নিস্তার মেলেনি তারও। নর্তকী খনি বেগমকে ভালোবেসে ফেলেন। যাকে ভালোবাসতেন উজির পুত্র জয়নাল খা-ও।

উজিরের চক্রান্তে বাঘের খাচায় নিক্ষিপ্ত হন আগা বাকের। সেই বাঘের করোটি ফাটিয়ে বীরদর্পে হাজির হন খনি বেগমের কাছে। কিন্তু হায়, ততোক্ষণে সেই খনি বেগমকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে জয়নাল খা!

অনেক ঘটনা, অনেক চড়াই-উতড়াই। আগা বাকের – জয়নাল খা সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, মরার আগে জয়নাল খা হত্যা করে যান খনি বেগমকে!

প্রেয়সী চলে গেলে কেউ তাজমহল বানান, কেউ দেবদাস হয়ে লিভারটির বারোটা বাজান, কেউ কলম হাতে পদ্য লেখার মকশো করেন। আমাদের আগা মোহাম্মদ বাকের আফগান-তুর্কি স্টাইলের একটু ভ্যারিয়েশন এনে নতুন এক ধরনের রুটি বানালেন। ময়দার সাথে তাতে দিলেন দুধের মালাই, মাখন। তৈরী হলো ভিন্ন ধরনের খামির। নিজের নামটা রাখলেন, সাথে জুড়ে দিলেন সেই হতভাগী খনির নাম। বাঙালি জিভ পেলো নতুন ধরনের এক স্বাদ – বাকরখানি!

প্রেমকে অমর রাখার জন্য যিনি নতুন রেসিপির জন্ম দেন, তিনি নমস্য না হবেন তো কে হবে? ভালো কথা, তিনি কিন্তু বাবুর্চী ছিলেন না, জমিদার ছিলেন। তার নামানুসারেই চন্দ্রদ্বীপের নাম হয় বাকেরগঞ্জ, এখন যেটা বরিশাল।

এই বাকরখানি কীভাবে খেলে উপাদেয়? খালি খালি খাওয়া যায়, একই সাথে ক্রিসপ এবং মোলায়েম। আজকাল আর দুধের মালাই দেয়া হয় না, সয়াবিন আর ডালডা দেয়া হয়। তাতেও স্বাদ একেবারে খারাপ হয় তা বলা যায় না।

পুরান ঢাকায় বিয়েবাড়িতে এখনও বাকরখানি বানানোর চল আছে। তাতে ঐ দুধের মালাই ব্যবহার করা হয়। আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো খাবার। আহারে, কী স্বাদ!

সাথে পরিবেশন করা হয়েছিলো মুরগির কোরমা। ঘন ক্বাথে চুবানো দেশীয় মুরগির রান। মোলায়েম বাকরখানিটি তার মাঝে ধরতেই সমস্ত রস যেন ব্লটিং পেপারের মতো শুষে নিলো। সুসিদ্ধ মুরগির মাংসে কামড় দিতে দিতে আর অকৃত্রিম ঢাকাইয়া আড্ডায় সেদিন জমেছিলো বেশ!

আরও একবার এই পুরান ঢাকার বাড়িতেই বাকরখানি খাবার ভাগ্য হয়েছিলো। মহররমের আগে আগে। কোরবানির ঝুরা মাংস দিয়ে আরেক প্রকার বাকরখানি হয়। এর স্বাদ আর ধরণ সম্পূর্ণই ভিন্ন। মশলাদার এই বাকরখানি শরীরের দার্ঢ্যই যেন বাড়িয়ে দেয়।

বাড়িতে চর্চা ছিলো কালোজাম মিষ্টি দিয়ে বাকরখানি খাবার। কলায় কামড় দিয়ে বাকরখানি খাবার। কিশোরগঞ্জের পনির চাকের সাথে বাকরখানি খাবার।

প্রথম প্রেমের যেদিন পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটলো, মিষ্টির দোকান থেকে দুটো বাকরখানি কিনেছিলেম। রেস্টুরেন্টে বসে শিক কাবাব দিয়ে দুঃখ ভোলার চেষ্টা করেছিলাম। বাকরখানির ক্রিসপ আর শিক কাবাবের ক্যাচক্যাচে অনুভূতিতে ভুলতে চেষ্টা করেছিলাম শোক। আগা বাকের আর খনি বেগমের যুগল যেন ব্লটিং পেপারের মতোই সব শোক শুষে নিয়ে গেলো। সাময়িকভাবে হলেও!

মরবার আগে খনি বেগম বলেছিলেন- এপারে না হোক, ওপারে আমি মিলনের অপেক্ষা করে রইবো।

হয়তো ওপারে তারা সুখেই আছেন। মুচমুচ করে বাকরখানি চিবুচ্ছেন। কে জানে!

তুর্কি জোয়ান বাকের, মুর্শিদাবাদের নর্তকী খনি- বাংলার জিভ তোমাদের ভুলবে না।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।