আগাগোড়াই একজন রহস্যাবৃত মানুষ ছিলেন তিনি

তিনি আগাগোড়াই একজন রহস্যাবৃত মানুষ; তাঁর জন্ম, মৃত্যু, জীবন-যাপন সবকিছুতেই রহস্য লুকিয়ে আছে। অনেকে মনে করে থাকেন তাঁর মৃত্যুর পর যেভাবে আয়ের পরিমান বাড়ছে, নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, মাইকেল জ্যাকসন এখনো জীবিত আছেন!

অনেকেই তাঁকে এখনো তাঁর খামারবাড়িতে নাকি দেখেছে, ইন্টারনেটে ঘাঁটলে নাকি তাঁর বর্তমান সময়ের ঝাপসা ছবিও পাওয়া যায়! পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসন মারা গেছেন ১১ বছর হয়ে গেল। এখনো তাঁকে নিয়ে বিশ্বের অগণিত মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। কারণ, গানের ভুবনে তিনি অনন্য।

মাইকেল জ্যাকসন মারা যান ২০০৯ সালের ২৫ জুন। তাঁর বয়স তখন ৫০। বেঁচে থাকলে এ বছর ৬২ বছরে পা দিতেন তিনি। জীবন তাঁকে হাত ভরে দিয়েছিল ঐশ্বর্য। পেয়েছিলেন ১৫টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড। লাখো ক্যাসেট আর সিডি বিক্রি হয়েছে তাঁর।

১৯৮৪ সালে আটটি গ্র্যামি পুরস্কার অর্জন করে রেকর্ড গড়েছিলেন ‘পপ কিং’। এক আসরে এতগুলো গ্র্যামি পুরস্কার ঝুলিতে ভরার রেকর্ড ভাঙতে পারেননি আর কোনো সংগীতশিল্পী।

জীবদ্দশায় নিজের অর্থায়নে লিউকেমিয়া এবং ক্যান্সার ইনস্টিটিউট স্থাপন করেন মাইকেল জ্যাকসন। শিশুদের জন্য এবং দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য তিনি কোটি কোটি ডলার দান করে গেছেন।

মাইকেল জ্যাকসন শুধু গান-গাওয়া তারকা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, নৃত্যশিল্পী ও অভিনেতা। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি বদলে দিয়েছিলেন সংগীতবিশ্ব।

জ্যাকসন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে বহুল বিক্রিত অ্যালবামের সংগীতশিল্পীদের মধ্যে অন্যতম। বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রিত রেকর্ডের মধ্যে জ্যাকসনের গাওয়া যে পাঁচটি সংগীত অ্যালবাম রয়েছে সেগুলো হলো- অব দ্য ওয়াল (১৯৭৯), থ্রিলার (১৯৮২), ব্যাড (১৯৮৭), ডেনজারাস (১৯৯১) এবং হিস্টোরি (১৯৯৫)।

সংগীত, নৃত্য এবং ফ্যাশন জগতসহ ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে চার দশকেরও অধিককাল ধরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বৈশ্বিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন এই পপ সম্রাট।

১৯৫৮ সাল। আমেরিকার ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের জ্যাকসন স্ট্রিটের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন মাইকেল জোসেফ জ্যাকসন। তাঁর মা ক্ল্যারিনেট (সানাই) এবং পিয়ানো বাজাতেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন বক্সার।

১৯৬৩ সালে মাত্র ৫ বছর বয়স থেকে পেশাদার শিল্পী হিসাবে কাজ শুরু করেন মাইকেল জ্যাকসন। তখন তিনি ‘জ্যাকসন ফাইভ’ নামের এক ব্যান্ডের সঙ্গে গান গাইতেন। ধীরে ধীরে মাইকেল হয়ে উঠেন কিং অব পপ (পপ সম্রাট)। ‘ব্যাড’ অ্যালবামটি হিট হওয়া পর টাকা আর খ্যাতি এই দুইয়ের কোনো অভাব হয়নি মাইকেলের।

সুন্দর এই পৃথিবীর মায়া তাঁরও ছিল। তাই অমর হওয়ার রাস্তা খুঁজছিলেন তিনি। এ জন্য বিশ্বের সর্বোচ্চ চিকিৎসাবিজ্ঞানের নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। নিজের ক্লোন তৈরি করে অমর হতে চেয়েছিলেন মাইকেল জ্যাকসন। মৃত্যুর আগে এর জন্য তিনি লাখ লাখ ডলার ব্যয়ও করেছেন।

জ্যাকসন তার ক্লোন নিয়ে গবেষণার জন্য ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের লাখ লাখ ডলার দিয়েছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল এ ক্লোন থেকে একটি ক্ষুদে জ্যাকসন দলের সৃষ্টি হবে এবং তারাও একদিন তার মতো দুনিয়া মাতাবে।

পানামাভিত্তিক একটি আয়ুষ্কাল কেন্দ্রে মাইকেল জ্যাকসন একটি ‘গোপন শুক্রানু প্রকল্প’ গড়ে তুলেছিলেন বলে দাবি করা হয়। আর এই ইচ্ছার পেছনে কাজ করেছিল ক্লোনিংয়ে সাফল্য।

বিজ্ঞানীরা ভেড়ার ক্লোন থেকে সফলভাবে ‘ডলি’র জম্ন দেওয়ার পর নিজের ক্লোনিং নিয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠেন জ্যাকসন। মাইকেল বিশ্বাস করতেন এক সময় তার ক্লোনিং সম্ভব হবে এবং এর পেছনে তিনি যে টাকা-পয়সা ব্যয় করছেন তাও সার্থক হবে।

শুধু ক্লোনিং নয়। কমপক্ষে ১৫০ বছর বেঁচে থাকার জন্য তৈরি করেছিলেন অক্সিজেন চেম্বার। সেখানেই ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে চেয়েছেন। সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু পাওয়ার জন্য তিনি এ পন্থা বেছে নিয়েছিলেন। একবার তিনি দাবি করেছিলেন, অক্সিজেন চেম্বারে ঘুমানোর জন্য অন্তত ১৫০ বছর বাঁচবেন তিনি।

মাইকেল মারা যাওয়ার পর তাকে নিয়ে নানা নতুন নতুন তথ্য ফাঁস করে তার বাড়ির গৃহপরিচালিকা, স্বজন ও বন্ধুরা। এই তথ্যগুলোর কোনোটি বিস্মিত করেছে, কোনোটি বিষাদে মন পুড়িয়েছে ভক্তদের।

মাইকেল ব্যক্তি জীবনে খুবই নিঃসঙ্গ ছিলেন। খুব বেশি মানুষের সঙ্গে মিশতেন না। কেউই পূর্বানুমতি ছাড়া তার বাড়িতে ঢুকতে পারত না। খুবই এলোমেলো জীবনযাপনে অভ্যস্থ ছিলেন তিনি। ঠিকমতো খেতেন না।

ঘুম তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। সারা রাত মাদকে আসক্ত থাকতেন। কড়া ঘুমের ওষুধেও তাঁর ঘুম আসত না। যে কারণে ঘুমের ওষুধে আসক্ত হতে শুরু করেন।

এই অসহনীয় জীবন আরও কষ্টকর ছিল শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে আদালতে প্রমাণ মেলার পর। রাতে না ঘুমিয়ে ঘর ছেড়ে বাড়ির বারান্দায় শুয়ে কাঁদতেন। শিশু যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

যৌন হয়রানির অভিযোগে ২০০৫ সালে আদালতের কাঠগড়ায়ও দাঁড়াতে হয়েছিল এই সংগীত শিল্পীকে। মাইকেলের এ যৌন নির্যাতনের বিষয়টি মূলত আরও খোলাসা হয় তার কন্যা প্যারিসের আÍহত্যার চেষ্টার পর। এফবিআই যে তালিকা দিয়েছে সেখানেও অভিযোগের সত্যতার দেখা মেলে।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই জ্যাকসন সম্পর্কে স্পর্শকাতর গোপন ফাইল প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশুদের প্রতি যৌনাসক্ত ছিলেন মাইকেল জ্যাকসন। জীবদ্দশায় অন্তত ২৪ জন বালককে যৌন হয়রানি করেছেন তিনি। আর এতে তিনি ব্যয় করেছেন ৩ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি এ কর্মে লিপ্ত ছিলেন।

আদালত অবশ্য তাকে নির্দোষ বলে রায় দেয়। কৃষ্ণাঙ্গ বলে সমাজে নিচু চোখে দেখছে সবাই- এই মনোস্তাত্ত্বিক টানাপড়েনে প্লাস্টিক সার্জারি করে নিজেকে ফর্সা করে তুলেছিলেন!

নিজের চেহারার কৃষ্ণাঙ্গ থেকে শ্বেতাঙ্গে রংবদল নিয়ে অনেক সমালোচনা সহ্য করতে হয় তাকে। ১৯৭৯ সালে মাইকেল জ্যাকসন তার প্রথম কসমেটিক অপারেশনটি করান।

এবং তার পরপরই একটি অ্যাক্সিডেন্টে তার নাক ভেঙে যায়। তিনি ত্বকের সমস্যায়ও ভুগছিলেন। প্রায়ই তাকে মুখোশ পরা অবস্থায় দেখা যেত, ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে!

তাঁর খামারবাড়ি নেভারল্যান্ড র‍্যাঞ্চে নাকি এখনো মাইকেল জ্যাকসানের আত্মা ঘুরে বেড়ায়। মাইকেল জ্যাকসনের বাড়ির উল্টো দিকে বাস করা এক ব্যক্তি জানায়, মৃত্যুর পরেও মাইকেল এখনো ওই বাড়িতে ভূত হয়ে ঘোরে। মাঝে-মাঝেই রাতে নাকি জ্যাকসনের ঘর থেকে অদ্ভুত আওয়াজ আসে।

এক মার্কিন ওয়েবসাইট জানিয়েছে, সিসি টিভি ফুটেজে নাকি মৃত্যুর পরেও মাইকেল জ্যাকসনের ছায়া দেখা গেছে। ১৯৯৮ সালে বাড়িটি কিনেছিলেন মাইকেল জ্যাকসন। বলা হয়, তার গাওয়া গানের ভিডিওর মাধ্যমেই এমটিভির প্রসার ঘটেছিলো। এমটিভি কে মানুষ চিনেছে মাইকেল জ্যাকসনের কারনেই!

গানের তালে তালে মাইকেলের নাচের কৌশলগুলোও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মাইকেলের জনপ্রিয় নাচের মধ্যে রোবোট ও মুনওয়াক (চাঁদে হাঁটা) রয়েছে। মুনওয়াক আসলে হলো সামনের দিকে হাঁটার দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টি করে পিছনে যাবার ভঙ্গিমা।

মাইকেলের মৃত্যুর পর মুক্তিপ্রাপ্ত অ্যালবামের বিক্রয়ের শীর্ষ থাকা আর বছরজুড়ে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের লাভের অঙ্কে চোখ কপালে উঠেছে সবারই। মৃত্যুর পরও বাজার থেকে মাইকেল জ্বর থেকে সেরে ওঠার নাম নেই।

আর এসব তথ্য-উপাত্ত মিলিয়ে আকাশে-বাতাসে উঠেছে নতুন শহুরে উপকথা মাইকেল নাকি মরেইনি। দিব্যি নাকি বেঁচে আছেন। পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে এ পর্যন্ত আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০০ মিলিয়নে।

এটি জ্যাকসনের রেকর্ড পরিমাণ আয় করা ‘থ্রিলার’ অ্যালবামের চেয়েও বেশি। ৬০০ মিলিয়নের বিশাল এই অর্থ মূলত টিকিট বিক্রি থেকে এসেছে। ২০০৯ এর জুনে মৃত্যুর পর অর্জিত হয়েছে এ অর্থ।

তার মৃত্যুর পর থেকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন কপি অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে এ পর্যন্ত। সব মিলিয়ে মৃত্যুর পরও দিন দিন ধনী হচ্ছেন মাইকেল জ্যাকসন। এ ছাড়া ইতিমধ্যে যারা পরলোকগমন করেছেন এমন তারকাদের মধ্যে আয়ে শীর্ষে উঠে এসেছেন পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসন। ফোর্বসের ২০১৫ সালের জরিপে এ তথ্য উঠে আসে।

কিং অফ পপ নামে দুনিয়াজুড়ে পরিচিত লাভ করা মার্কিন সংগীত শিল্পী মাইকেল জ্যাকসনের আচমকা মৃত্যুর জন্য দীর্ঘ মেয়াদে পেইন কিলার সেবনকে দায়ী করা হয়। কিন্তু, এ নিয়ে বিতর্ক বোধ হয় কোনো দিনই শেষ হবে না। শুরুতে জানানো হয়েছিল তার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ঘটেছে।

তখন হুট করেই বোম ফাটায় দ্য সান পত্রিকা। তাদের এক খবরে বলা হয়, ডেমারোল নামের একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যথানাশক ইনজেকশন নেওয়ার কারণেই জ্যাকসনের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

ডেমারোল নেওয়ার পর থেকেই জ্যাকসনের শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে এসে তা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। দুপুরের দিকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া ও মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ার সময়টিতে মাইকেল জ্যাকসনের সঙ্গে ছিলেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক কনরাড মুরে।

রহস্য ঘনীভূত হয় যখন দেখা গেল, মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর সময়টিতে মুরে উপস্থিত থাকলেও ডেথ সার্টিফিকেটে তিনি স্বাক্ষর করেননি। তার মানে কি, সত্যি ই এখনো মাইকেল বেঁচে আছেন!

মাইকেল ভক্তদের বিশ্বাস এখনো বেঁচে আছেন তিনি। খ্যাতি আর সাফল্যের মায়াজালে তিনি নিঃসঙ্গ অনুভব করছেন বলেই এ জীবন থেকে পালিয়ে গেছেন। ছদ্মবেশে ঘুরছেন দেশ থেকে দেশে।

এগুলো মোটেই বানানো কথা নয়। বিশ্বের অধিকাংশ মাইকেল ভক্তের মতে তিনি এখনো বেঁচে আছেন। শুধু লোকচোখের অন্তরালে যেতেই তার মৃত্যুর খবর ও ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। অনেকে তো দাবি করেই বসেছেন, তিনি মৃত্যুর পরও কোথায়, কবে উপস্থিত ছিলেন।

একজন দুনিয়া কাঁপানো বিখ্যাত সেলেব্রেটি যার অর্থ-যশ-খ্যাতি কোনটারই অভার ছিল না, চেয়েছিলেন বিপুল অর্থ দিয়ে হলেও ১৫০ বছর বাঁচবেন, পৃথিবীর সব অক্সিজেন কিনে ফেলবেন কিন্তু নিয়তির অমোঘ নিয়মে ৫০ বছর নামক বয়সের কাছে খুব সহজে হেরে গেলেন। আহারে জীবন!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।