পর্নোগ্রাফির দুনিয়া: টাকা যেখানে গাছে ধরে!

তিন কোটি! ঠিক এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বের তিন কোটি মানুষ পর্ন দেখছে। যেকোনো দিন, দিনের যেকোনো সময়ের জন্য এই পরিসংখ্যান সত্য।

বলা হয়, ৮০’র দশকে নাকি তিন ধরণের মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতো – সরকারী কর্মকর্তা, অ্যাক্যাডেমিশিয়ান ও পর্নাসক্তরা। বোঝাই যাচ্ছে ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফিক দুনিয়া কতটা গভীরে পৌঁছে গেছে।

অনলাইনে পর্নোগ্রাফির সেক্টরের মূল্যমান প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। এটা প্রতি বছর আরো বেশি সংখ্যক তরুণদের আকৃষ্ট করে চলেছে। শীর্ষস্থানীয় একটি পর্নোগ্রাফিক ওয়েবসাইটের ডাটা বলছে, ২০১৬ সালে ওয়েবসাইটটি ভ্রমণ করা হয়েছে ৯২ বিলিয়নবার। আর প্রতিদিনে এর পরিমান ৬৪ মিলিয়ন।

মনট্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা বলছে, একজন মানুষ প্রথম নীল ছবির সংস্পর্শে আসে মাত্র ১০ বছর বয়সে। এমনকি তাদের গবেষণায় এটাও উঠে এসেছে যে, ২০ বছর বয়সী এমন কোনো যুবক নেই যে কখনো পর্ন দেখেনি। কি ভয়াবহ ব্যাপার!

পর্নে সবচেয়ে বেশে আসক্ত যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ।  সেখানে ৬৮ মিলিয়ন মানুষ রোজ ইন্টারনেটে নীল ছবির খোঁজ করে। আর এর মধ্যে ২৫ শতাংশই পর্নোগ্রাফির নিয়মিত ভোক্তা। যুক্তরাষ্ট্রেই সবচেয়ে বেশি পর্নোগ্রাফিক ডিভিডি ও ওয়েব কনটেন্ট নির্মিত হয়। প্রতি ৩৯ মিনিটে দেশটিতে একটি করে নীল ছবি নির্মিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পরেই এই তালিকায় আছে জার্মানির নাম। গেল রাশিয়া বিশ্বকাপ থেকে প্রথম পর্বেই দলের বাদ পড়ার হতাশা ভুলতে জার্মান সমর্থকরা কি করেছে জানেন? স্রেফ পর্নে নিজেদের ডুবিয়ে রেখেছে! ইংল্যান্ডে স্যোশাল মিডিয়া, ট্রাভেল ব্লগ, ফিন্যান্স বা শপিং সাইটগুলোর চেয়ে বেশি ভিজিটর থাকে পর্ন সাইটগুলোতে। ইতালিতে পর্নস্টার নির্মানের জন্য একটা বিশ্ববিদ্যালয় অবধি আছে!

মজার ব্যাপার হল, আমেরিকায় পর্নাসক্তির মাত্রাটা সরকার পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীর। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে এর মাত্রা বাড়ে। ২০০৪ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আগমরে পর ২০০৮ সালে আমেরিকানদের পর্নাসক্তির মাত্রা বাড়ে। বারাক ওবামা আসার পর বাড়ে আরো। ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর এর পরিমানটা দ্বিগুণ হয়ে যায়।

২০ শতাংশ আমেরিকান স্বীকার করে নেন যে, অফিস আদালতে কাজের ফাঁকেও তাঁরা পর্ন দেখে থাকেন! তবে, এর পরিমানটা নি:সন্দেহে আরো বেশি। কারণ, পর্ণ ওয়েবসাইটগুলোর ভিসিটরদের ৭০ শতাংশ আসে অফিস টাইম মানে নয়টা থেকে পাঁচটার মধ্যে!

আমেরিকানরা পর্নের ব্যাপারে বেশ স্বাচ্ছন্দ। আমেরিকার দু’টি রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়া ও নেভাডায় পর্ন সিনেমা নির্মানের আনুষ্ঠানিক অনুমতি আছে। ২০১২ সালের আগে এই আইন লস অ্যাঞ্জেলসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।

সেক্স ইন্ডাস্ট্রি হল বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক ইন্ডাস্ট্রি। এর মধ্যে আছে স্ট্রিট প্রস্টিটিউশন, স্ট্রিপ ক্লাব, ফোন সেক্স ও পর্নোগ্রাফি। পর্নোগ্রাফির অন্ধকার জগৎটা হলিউডের চেয়েও বড়। প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার অ্যাডাল্ট ভিডিও নির্মিত হয়। বছর ঘুরে লভ্যাংশের পরিমান দাঁড়ায় ১৩ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে হলিউড এক বছরে ৫০০’র মত সিনেমা বানিয়ে নয় বিলিয়ন ডলার আয় করে। এই ডাটাই প্রমাণ করে অনলাইন পর্ণোগ্রাফিক ইন্ডাস্ট্রি কতটা লাভজনক!

শুধু হলিউড নয়, এই ইন্ডাস্ট্রির  অর্থের পরিমান ন্যাশনাল ফুটবল লিগ (এনএফসি), ন্যাশনাল বাসকেটবল লিগের (এনবিএ) চেয়েও বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, ইন্টারনেটে যা আছে, তাঁর অর্ধেকই পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট।

পর্নগ্রাফি নিয়ে হাল আমলে বিশ্বের অনেক দেশই বেশ সচেতন। যেমন এখানে উত্তর কোরিয়ার কথা না বললেই নয়। দেশটিতে পর্ন দেখার সাজা মৃত্যুদণ্ড। তবে, চাইল্ড পর্নোগ্রাফির সব দেশেই নিষিদ্ধ। ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালে চাইল্ড পর্নোগ্রাফির ভোক্তা প্রায় দ্বিগুন হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে রীতিমত মাথার চুল ছিড়তে হচ্ছে এফবিআই, ইন্টারপোলকে!

পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তি যে মোটেই ভাল কিছু নয়, তা বলে না দিলেও চলে। ২০১৪ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক যেমনভাবে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রন করে, পর্নাসক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে পর্ন বা নীল ছবিও ঠিক একইরকম প্রভাব ফেলে।

পর্নোগাফি কিছু সামাজিক-পারিবারিক বিপদও ডেকে আনে।  ২০০৩ সালে আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব ম্যাট্রিমনি লইয়ারদের ৩৫০ জনের ওপর একটা জরিপ চালানো হয়। উঠে আসে বিস্ময়কর তথ্য। তারা বলেন, প্রতি বছর যে কয়টা ডিভোর্স সংক্রান্ত মামলা নিয়ে তাঁরা কাজ করেন, তার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই পর্নাসক্তির সাথে সম্পৃক্ত।

সেক্স ইন্ডাস্ট্রি’র সাথে অবৈধ মানব পাচারও জড়িয়ে আছে। মানব পাচারের অন্ধকার দুনিয়া থেকে ফিরে আসা ৮৫৪ জন মানুষের ওপর ২০০৩ সালে এক গবেষণা করা হয়। সেখানে দেখা যায় পাচারকৃতদের ৫০ শতাংশকেই ব্যবহার করা হয় পর্নোগ্রাফিতে!

২০০৯ সালে টেড টকে এসে অ্যাডভারটাইজিং এক্সিকিউটিভ সিনডি গ্যালোপ বলেছেন, ‘পর্ন ইন্ডাস্ট্রি পুরুষরা নিয়ন্ত্রন করে, অর্থায়ন করে পুরুষরা, পরিচালকা করে পুরুষ, এর টার্গেট অডিয়েন্সও পুরুষ। ফলে, পর্ন ইন্ডাস্ট্রি হল বর্তমান পুরুষশাসিত পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র সংস্করণ।’

যদিও, অবাক করা ব্যাপার হল পর্নোগ্রাফিতে পুরুষের নারীর পারিশ্রমিকই বেশি। এখানে প্রতিটি ভিডিও’র জন্য নারীরা তারকাখ্যাতির ওপর নির্ভর করে ৬০০ থেকে লাখ খানেক ডলার অবধি পেয়ে থাকেন।  পুরষেদের ক্ষেত্রে এই অংকটা সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ডলার।

অস্কার-ফিল্মফেয়ারের মত পর্নোগ্রাফিতেও ‘এভিএন অ্যাওয়ার্ড’ নামের একটি পুরস্কার প্রথা চালু আছে। সেখানে পর্দার ভেতরে ও বাইরে অনেকগুলো ক্যাটাগরিতে কলাকুশলীদের পুরস্কৃত করা হয়। সাধে কি আর আমেরিকান কিশোর কিশোরীদের একটা বড় অংশ বড় হয়ে পর্নস্টার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। তবে, বলাই বাহুল্য নানা রকম ্ক্ষতিকর স্টেরয়েড ব্যবহারের কারণে শারীরিক নানা রকম সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁদের!

পর্নোগ্রাফি নামক এই ভার্চুয়াল রিয়েলিটি অনেকের কাছে হল যৌন স্বাধীনতা। অনেকের কাছে আবার যৌন সমস্যা। তাই তো এর বিরুদ্ধে নানা রকম প্রচারণাও চলে। কম বেশি সব প্রচারণার মূল সুর একটাই – ‘আসুন ভালবাসা ছড়াই, পর্নোগ্রাফি নয়!’

-দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য গার্ডিয়ান, লিস্ট২৫ ও অল প্রো ড্যাড অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।