আমির খান: দ্য মার্কেটিং জিনিয়াস

পারফেক্ট শব্দের পরিপূর্ণ উদাহরণ টানতে আমির খানের নাম উচ্চারিত হয়ে আসছে বহুকাল আগে থেকে। ৫৪ বছরের বুড়োটা এভারেস্ট এমনি এমনি ছুঁয়ে ফেলেনি। অমিতাভ বচ্চনের মুখ থেকে যখন বের হয় – ‘আমিরের সাথে অভিনয় করতে গেলে আমি নার্ভাস থাকি’; তখন আর কী লাগে দলিল হিসেবে? কিস্সু লাগে না!

আমিরকে না চিনলে দলিল লাগত। তিনি তো আতশি কাচের মতো স্বচ্ছ, দিনের আলোর ন্যায় পরিষ্কার, মসলিন কাপড়ের ন্যায় ফিনফিনে মসৃণ, পরিশ্রমী শ্রমিকের মতোন বিশুদ্ধ ঘাম, বর্ণমালার মতোন স্পষ্ট। তাকে চিনতে তাই কিছু লাগে না, তবে মুগ্ধতার মাত্রা বাড়াতে জানতে হয়, জানার আগ্রহ বাড়ে।

একটা গল্প শোনা যাক।

ফোর্বস ম্যাগাজিনের নামকরা বিনোদন বিশ্লেষক রব কেইন বলেছিলেন গল্পটি, ‘বলিউডের তিন খানের মধ্যে দুই খানই দেরী করে এলেন শ্যুটিংয়ে। দেরী বললে ভুল হবে, বেঁধে দেওয়া সময়ের বেশ পরে এলেন। এরপর ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন নিতান্ত অনিচ্ছায়। অন্য খান শ্যুটিংস্পটে পৌঁছান নির্ধারিত সময়ে। পরিচালক শ্যুটিং শেষ করার পরেও তিনি বললেন, আরেকটা শট নেওয়া যায় কি?

ইনি কে? খান সাহেবের নামের প্রথম অংশ জানার আগ্রহের প্যারামিটার বাড়ছে? তিনি মোহাম্মদ আমির হুসাইন খান। ১৯৮৪ সালে যার প্রথম কামিং অফ এজ ড্রামা মুভি ‘হোলি’-তে একমাত্র ক্রেডিট লাইনে পুরো নাম ব্যবহার করা হয়। সেই প্রথম, সেবার শেষ। তারপর থেকে আমির খান হিসেবেই চলছেন। স্কুলে থাকতে যোগ দেন অবতার নামক থিয়েটারে। দুইবছর কাজ করেছেন ব্যাকস্টেজ আর্টিস্ট হিসেবে। থিয়েটারে যারা কাজ করে অভিনয় তাদের ভেতর হতে আপনাআপনি আসে। ওরা যেন কাঁচা নরম মাটি, যেভাবে গড়াবে ওইভাবেই গড়বে।

স্ক্রিপ্ট শোনার সময় আমিরের নিজের জন্য কোন চরিত্র বরাদ্দ তা না জেনেই শোনেন। পরিচালক বা চিত্রনাট্যকারের কাছে অনুরোধ থাকে- গল্প বলার সময় যাতে তার চরিত্রটি গোপন রাখে। তারপর যেই চরিত্রে নিজেকে দেখতে পান, সেটা বেছে নেন। অধিকাংশ সময় দুইপক্ষের ভাবনা মিলে গেলেও ব্যতিক্রম ঘটেছে।

‘দিল চাহতা হ্যায়…’ – বন্ধুত্ব, প্রেমের যুগলবন্দিতে একবিংশ শতাব্দীতে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিনেমা। পরিচালক হিসেবে ফারহান আক্তারের অভিষেক ঘটে এর মাধ্যমে। সাইফ আলী খান, অক্ষয় খান্নার সাথে ছিলেন আমির খানও। আকাশ চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন চমৎকার দক্ষতায়। অথচ ফারহান চেয়েছিল আমির সিদ্ধার্থ চরিত্রে অভিনয় করা অক্ষয় খান্নার পার্টটুকু করুক! আমিরের মনে হয়েছে, তিনি আকাশ চরিত্রে নিজেকে জাহির করতে পারবেন। তাই, সিড না হয়ে আকাশ হন! পেরেছেন!

অনবদ্য আকাশের ঠোঁটের নিচে একফালি গুচ্ছ দাঁড়ি সেসময়কার ট্রেড হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে! অবশ্য, আমির মানেই নিত্যনতুন ট্রেন্ডের জন্মদাতা। ২০০৮ এর গজনীতে দেওয়া তার হেয়ারস্টাইল আজো পাড়ামহল্লার বহু সেলুনের দেয়ালে শোভা বাড়িয়ে যাচ্ছে। স্কুল থেকে শুরু করে ভার্সিটিপড়ুয়া, পাড়ার বড়ভাই, মাঝবয়সী শৌখিন চাকরিজীবী একবারের জন্যে হলেও ট্রাই করেছে গজনী কাট, সেলুনে ভীড় লাগিয়ে! তারপর ধরা যাক ধুম থ্রি’র হ্যাটম্যানকে। ছোটখাটো গড়ন, ডেডলি স্মাইলের চেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন হ্যাট মাথায়।

ধুম সিরিজের এখন অবধি সর্বশেষ সিনেমাটি নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, কারো কারো মতে আগের দুটির তুলনায় সাদামাটা হলেও অভিনয় নিয়ে নো অবজেকশন! সৌন্দর্য এমনি এমনি বাড়েনি। শ্যুটিং শুরুর আগে টানা তিনমাস হ্যাট মাথায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। সামান্য একটা হ্যাট নিয়ে এত্তো কসরত! আমির তো আমিরই। ন্যাচারাল, সুপার ন্যাচারাল।

ক্যারিয়ারের অলটাইম ব্লকবাস্টার রাজা হিন্দুস্তানি মুভির তেরে ইশক মে নাচেঙ্গে গানের মাতাল, মদ্যপ আমিরকে মনে আছে? ড্রিংকস করার নিয়মিত অভ্যাস না থাকলেও সেই গানে ডুবে যেতে এক লিটার ভদকা সাবাড় করেন তিনি! রাজু হিরানীর পিকে-তে ভোজপুরি স্টাইলে বলা কথায় ভিন্ন এক আমিরকে পর্দায় দেখেছে দর্শক। ভোজপুরি রপ্ত করতে পাক্কা দু’বছর খেটেছিলেন, অভিনয় পারফেক্ট না হয়ে যাবে কোথায়! দাঙ্গাল – বলিউডের অলটাইম ব্লকবাস্টার, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে সবচাইতে বেশি আয় করা চলচ্চিত্র। এই সিনেমা দিয়েই চীনের দর্শকমহলে পাকাপোক্ত অবস্থান গড়েন আমির।

তথ্যগুলি মোটামুটি সকলের জানা। অভিনয় নিয়ে নয়, কথা বলব ডেডিকেশনের আরেকটা উদাহরণ নিয়ে। মুভিতে দুই প্রজন্মের আমিরকে দেখানো হয়। ন্যাশনাল লেভেল চ্যাম্পিয়ন একজন তরুণ কুস্তিগিরের ভূমিকায়, আরেকজন বয়স্ক ভুঁড়িওয়ালা বাবার ভূমিকায়। আমিরের ভুঁড়ি এক্কেবারে খাঁটি ছিল! পরিচালক নিতেশ তিওয়ারি বলেছিলেন কৃত্রিমভাবে করতে। কিন্তু আমির যখন বলেন- তাতে সত্যিকার ফিল আসবে না, পরিচালক মুখে রা’টুকুও কাটেননি! মজার ব্যাপার হচ্ছে, বুড়ো অংশের দৃশ্যধারণ হয়েছে প্রথমে।

মানে সিনেমায় তরুণ থেকে বৃদ্ধ হবার যে যাত্রাপথ দেখানো হয়, তার উল্টোপথে হেঁটেছিল শ্যুটিং ইউনিট। প্রথমে ধারণ করা হয় বুড়ো অংশের দৃশ্য, তরুণকালের অংশ শেষে। প্রশ্ন জাগতে পারে- কেন এমন হলো? উত্তর শুনুন খান সাহেবের মুখ থেকেই – ‘যদি বুড়ো অংশের কাজটুকু পরে করতাম তাহলে সিনেমা শেষেও আমার ভুঁড়ি থেকে যেত। যেহেতু এরপর হাতে আপাতত কাজ থাকবে না, তাই শরীর কমানোর তাড়াও থাকবে না।’ নিজেকে পেটমোটা ভুঁড়িওয়ালা রূপে দেখতে চাননি আমির। পর্দায় যতখানি সাবলীল সুন্দর দেখিয়েছে, বাস্তবে বোধকরি ততটাই কদর্য দেখাত বলেই সিনেমা চলাকালীনই ওজন কমিয়ে ফেলেন। এককাজে দুইকাজ সারা। চরিত্রের চাহিদা মিটল, ফিটনেসও ফিরল!

১৯৮৪-২০১৯। ৩৫ বছরে ৪০টি সিনেমা। মোটে! বেছে বেছে কাজ করেন দেখেই তো ডাকা হয় মি. পারফেকশনিস্ট নামে। গল্প হলে নায়িকা হয় না, নায়িকা হলে থিম হয় না, এটা হলে সেটা হয় না, সেটা হলে ওটা হয় না! ব্যাটেবলে মিলে কোনরকম বাউন্ডারি হলে নয়, ওভার বাউন্ডারিটা শ’মিটার ছাড়ালেই কেবল সম্মতি দেন।

‘লাগান’- ক্রিকেট আর স্বাধীনতা নিয়ে ভারতীয় ফিল্ম ইতিহাসের অন্যতম স্তম্ভ আশুতোশ গোয়ারিকরের এই এক্সপেরিমেন্টাল ওয়ার্ক। অভিনেতা, প্রযোজক দুই ভূমিকাতে ছিলেন আমির খান তা আমরা জানি। যা জানি না, তা হচ্ছে – আমির এই সিনেমাটি ছয়বার প্রত্যাখান করেছেন! জ্বী, ছয়বার! সপ্তমবারে সব একেবারে ভেঙেচুরে আনলে তবেই সবুজ বাতি জ্বালেন। ভারতীয় সিনেমার সপ্তম দীর্ঘতম ফিল্মটাতে (২২৪ মিনিট বা ৩ ঘন্টা ৪৪ মিনিট রানটাইম) মি. পারফেক্টকে নিতে গোয়ারিকরকেও দীর্ঘ কাঠখড় পোঁড়াতে হয়েছে বটে।

‘দ্য ডার্ক নাইট’ – ব্যাটম্যান ট্রিলজিরই নয় স্রেফ, কমিক দুনিয়ার সর্বকালের সেরা মুভি এটি। সিনেমার ভিলেন চরিত্র জোকারও এযাবৎকালের ইতিহাসে সেরা ভিলেন কি না তা নিয়ে চায়ের আড্ডায় তর্ক উঠে প্রতিনিয়ত। সেখানেই জোকারের সেরা সংলাপ, হাসতে হাসতে বলা- ‘হোয়াই…সো….সিরিয়াস’? শেষে একটা কোশ্চেনমার্ক!

আর এই প্রশ্নবোধকেই লুকিয়ে আছে উত্তর। জীবনে সিরিয়াস না হলে কেউ মনে রাখে না। জীবনের ইতি ঘটানো জোকার চরিত্রে হিথ লেজার নিজেই যার জলজ্যান্ত উদাহরণ! আমির খানও নিজের করণীয় সম্পর্কে অবগত। আমির শব্দের অর্থ ধনী। বলিপাড়ার তিন খানের মাঝে স্ক্রিপ্ট চয়েজে সবচেয়ে খুঁতখুঁতে খানও আক্ষরিক অর্থেই ধনী। না না! অর্থপ্রতিপত্তির দিক তুলছি না। সফলতায়, কর্মদক্ষতায়, জনপ্রিয়তায়। শাহরুখ খানের ওম শান্তি ওম সিনেমার ওম শান্তি ওম গানে পরিচালক ফারাহ খান প্রায় গোটা বলিউডকে এক ছাদের নিচে এনেছিলেন।

রানী মুখার্জি, শিল্পা শেঠি, কাজল, বিদ্যা, কারিশমা, প্রিয়াঙ্কা, টাবু, জুহি চাওলা, প্রীতি জিনতা, লারা দত্ত, রেখা থেকে শুরু করে পুরুষদের মধ্যে সালমান ব্রাদার্স, ধর্মেন্দ্র, ববি দেওল, মিঠুন, গোবিন্দ, রিতেশ, তুষার, সাইফ, সঞ্জয়, সুনীল শেঠি; কে ছিলেন না সেখানে! আমিরকে খুঁজছেন নিশ্চয়ই? ঠিক ধরেছেন, তিনি ছিলেন না। ফারাহ খানকে সম্মানের সহিত ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি, ওখানে যাওয়ার চেয়ে নিজ সিনেমার শ্যুটিংয়ে মনোযোগ দেয়াতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন! নিজেকে কিছুটা আড়ালে রাখতে চান। যে কারণে বিভিন্ন পার্টিতে খুঁজে বেড়ালেও পাপারাজ্জিরা তার দেখা পায় না। গেলে তো পাবে, সেসবে যে খুব কম যান।

ওসবে না গেলেও সিনেমার প্রচারণায় পারঙ্গম, অনন্য, দুর্দান্ত বলা চলে নিঃসন্দেহে। ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তাক’-এর প্রচারণায় শ্যালক রাজ রাজ জ্যোতিষীকে সাথে নিয়ে রিকশা, বাসে করে গোটা শহরে পোস্টার লাগিয়েছেন। পোস্টারে যা লিখা ছিল তাতে সবাই তাকাতে বাধ্য, বিশেষত মেয়েরা! ‘হু ইজ আমির খান? আস্ক দ্য গার্ল নেক্সট ডোর’ – দু’লাইনে কাঁপিয়ে দেন শহর!

হিরো হিসেবে আত্মপ্রকাশের কালে কোথায় নার্ভাসনেসে ভুগবেন, তা না উল্টো শিহরণ জাগিয়ে দেন সবার মাঝে। কতটা এগিয়ে ছিলেন তিনি সময়ের চেয়ে, ভাবতে পারেন? বহু বছর বাদে থ্রি ইডিয়টসের প্রচারণায় ফের রিকশা থেরাপি প্রয়োগ করেন। মুম্বাইয়ের রিকশার পিছনে স্টিকার সাঁটান যাতে লেখা – ‘ক্যাপাসিটি: থ্রি ইডিয়টস’ – সিনেমা মুক্তির পর প্রথম ক’দিন হলগুলি সকাল সাতটার শোতে ঘোষণা করে, টিকিট কিনলেই চা-বিস্কুট ফ্রি! তালাশ মুভির প্রচারণায় তো সনি টিভির জনপ্রিয় সিরিজ সিআইডিতে চলে আসেন একদম পর্দার চরিত্র সজ্জন সিং শিখাওয়াত হয়েই!

একদিনে তিনি আজকের আমির হয়ে উঠেননি! পাঁচটি ডিজাস্টারসহ ১৪ টি ফ্লপ সিনেমার হিরো হবার পরেও তিনিই শুধু ভারত থেকে প্রথম শতকোটি রূপি আয়ের ক্লাবে প্রবেশ করা চলচ্চিত্রের হিরো। সেই তিনিই বলিউডের সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমার অভিনেতা। ‘দাঙ্গাল’-এ তো তিনি নায়ক নন, আপাদমস্তক অভিনেতা ছিলেন। যেমনটা তারে জামিন পারে ছিলেন। পরিচালক অবতারের বাইরেও আর্ট টিচার রাম শঙ্কর নিকুম্ব হয়ে অসংখ্য ঈশানের অনুপ্রেরণা হয়েছেন।

থ্রি ইডিয়টসের একজন র‍্যাঞ্চোরদাস সামাদাশ চাঞ্চার হয়ে গেঁথে গেছেন হাসতে ভুলে যাওয়া কোটি মানুষের হৃদয়ে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীনের মানুষের সবচাইতে জনপ্রিয় সিনেমার তালিকায় থ্রি ইডিয়টসের অবস্থান ১২তম। ভাবা যায়! আর দশজনের মতোন তিনিও নিজেকে ভেঙ্গেছেন, গড়েছেন, দর্শকের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়েছেন।

১৯৮৮ সালে ট্র্যাজিক রোমান্টিক ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তাক’ দিয়ে তাক লাগানো ২৩ বছরের যুবকে গোটা ভারত মুগ্ধ হলেও তার মধ্যে আগামীর ছায়া তারও বছর চারেক আগে দেখতে পেয়েছিলেন নিউইয়র্ক টাইমসের একজন চলচ্চিত্রবোদ্ধা! ১৯৮৪ সালে ‘হোলি’ সিনেমায় মাত্র ১৯ বছরের এক কিশোরের সাবলীল অভিনয় দেখে সেই সমালোচক এক বাক্যে মন্তব্য করেছিলেন – ‘খুবই সাধারণভাবে অসাধারণ অভিনয় করেছে ছেলেটি!’

ছেলে থেকে যুবক, যুবক থেকে মাঝবয়সী, মাঝবয়সী থেকে বুড়ো; মহাকালের পাতা থেকে তারপর ৩৫ বছর গত হয়েছে, কিন্তু এতটুকু মলিন হয়নি খুবই সাধারণভাবে বলা অসাধারণ বাক্যটির মাহাত্ম্য। ‘হোলি’ কেবল তার আগমনের হারমোনিয়ামে রাগ তুলেনি, জীবনের বেহালায়ও প্রেমের সুর জাগিয়েছে। যদিও হোলির আগেই সাক্ষাৎ হয় রীনা দত্তের সঙ্গে।

১৯৮৬ সালে একুশতম জন্মদিনে নিজকে নিজে উপহার দেন আমির। রীনাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। সেই বছরই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় দুজন। রোমান্টিক হিরো হিসেবে প্রথম ছবি কেয়ামত সে কেয়ামত তাকেও স্বামীকে সঙ্গ দিয়েছেন রীনা। সিনেমার ‘পাপা কেহতে হ্যায়’ গানে অতিথি শিল্পীর ভূমিকায় অংশ নেন রীনা।

২০০২ সালে রীনার সঙ্গে ১৬ বছরের সম্পর্কের ইতি ঘটলে একাকিত্বে ভুগেন আমির। টানা ১৮ মাস নিজেকে একপ্রকার গৃহবন্দী করে রেখেছিলেন। তখন সালমান খান বন্ধুত্বের ভালবাসা দিয়ে ফিরিয়ে আনেন আমিরকে। ২০০৩ সালে জীবনের একমাত্র মিউজিক ভিডিও ‘জাব ভি চুম লেতা হু’-তে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ফিরে আসেন। ২০০৫ সালে গাঁটছড়া বাঁধেন কিরণ রাওয়ের সঙ্গে। দুইজনের পরিচয় লাগান মুভির সেটে, আশুতোশ গোয়ারিকরের সহকারী হিসেবে সেখানে কাজ করেছিলেন কিরণ।

১৯৬৫ সালের ১৪ মার্চ মুম্বাইয়ে তাহির হোসেন- জিনাত হোসেন দম্পতির ঘর আলো করে আসেন আমির। পড়াশুনায় ভালো ছিলেন বরাবর। চ্যাম্পিয়ন ছিলেন খেলাধুলায়। রজার ফেদেরারের বড়ভক্ত তিনি। টেনিস খেলায় নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন স্ট্যাট লেভেলে। রুবিকস কিউব মেলাতে গলদঘর্ম হতে হয় অনেককে। আমির সেটা ১০০ সেকেন্ডে মেলাতে পারেন। ছোট থাকতে তা মেলাতে একবার সময় নিয়েছেন মাত্র ২৮ সেকেন্ড!

‘গজনী’ ছবির প্রচারণায় আমির খান।

বাবা তাহির হোসেন প্রযোজক ছিলেন, তবে খুব একটা লাভের মুখ দেখেননি। এই জগতটা বড্ড কঠিন, ওসব ভেবে ছেলেকে প্রথমে আসতে দিতে চাননি বাবা মায়ের কেউই। কিন্তু ১৯৭৩ সালে মাত্র ৮ বছর বয়সে চাচা নাসির হোসেনের চলচ্চিত্র ইয়াদো কা বারাতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিষেক ঘটিয়ে ফেলেন। তারপর মঞ্জিল মঞ্জিল আর জবরদস্ত নামের দুটো মুভিতে কাজ করেন চাচার সহকারী পরিচালক হয়ে।

বলিউডের আরো একটি অনবদ্য মুভি সালমান খানের হাম আপকে হ্যায় কৌনের জন্য প্রথমে আমিরকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। শুধু এটিই নয় শাহরুখ খানের স্বদেশ, ডরের জন্যও প্রযোজক পরিচালকের প্রথম পছন্দ ছিলেন এই হিরার টুকরো অভিনেতা। স্রেফ অভিনেতার গন্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি।

একাধারে নির্মাতা, প্রযোজক, প্লেব্যাক সিঙ্গার আমির কেয়ামত সে কেয়ামত তাক, গজিনীর মতো চার্টব্লাস্টার মুভির কো-রাইটারও! গলা ছেড়ে গেয়েছেন রঙ দে বাসন্তী, দাঙ্গাল, তারে জামানি পারসহ আরো কয়েকটি মুভিতে। লাগানে অভিনয়ের জন্য অস্কার নমিনেশন পাওয়া এই অভিনেতার ঝুলিতে রয়েছে নয়টি ফিল্মফেয়ারসহ ভারতের তৃতীয় ও চতুর্থ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদ্মভূষণ এবং পদ্মশ্রী। চীন সরকারের কাছ হতে পেয়েছেন বিশেষ সম্মাননা। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে আমেরিকার বিখ্যাত নিউজউইক ম্যাগাজিনের দেওয়া

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অভিনয়শিল্পীর খেতাব। টাইম ম্যাগাজিনের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান পাওয়া আমির মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে আছেন তার সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও। সত্যমেভ জয়তে, জয় হো’র মতো টিভি শো গুলোর মাধ্যমে গণমানুষের কাছাকাছি গিয়েছেন, তাদের সমস্যা তুলে ধরেছেন। ভারতীয় তারকাদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তিগত ব্লগ চালু করেন, যাতে ভক্তদের আরো কাছাকাছি আসতে পারেন।

আমিরের প্রিয় অভিনেতা লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও, স্বদেশে গোবিন্দ। প্রিয় তারকাদের বহু আগেই ছাড়িয়ে গেছেন, আমিরের লড়াইটা নিজের সঙ্গেই। তাই তো ৫৫ বছর বয়সে এসেও হাতে নিয়েছেন দুঃসাহসিক কাজ। টম হ্যাংকসের কালজয়ী ফরেস্ট গাম্পের অফিশিয়াল রিমেক লাল সিং চাড্ডা নিয়ে আসছেন আসছে বছর, বয়সটা একটু হলেও বেমানান সেই চরিত্রের জন্য! হু কেয়ারস? হি ইজ আমির খান। এ ফর আমির, এ ফর অ্যামেইজিং। মহাভারতের আগে তাই আরো একবার ভাঙাগড়ার নেশায় মত্ত বলিউডের মিস্টার পারফেক্ট খান!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।