নাটক-সিনেমা গুলে খেয়েছেন তিনি

২০০২ সাল। টেলিভিশন নাটকের একজন নামকরা অভিনেতার বাসনা জাগলো তিনি সিনেমা বানাবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। তবে সেই জন্য নিজেকে প্রস্তুতও করেছেন। চলচ্চিত্র নির্মানের উপর নিউইয়র্ক থেকে প্রশিক্ষণ শেষে দেশে আসলেন। প্লট হিসেবে বেছে নিলেন বাঙালির গৌরব মুক্তিযুদ্ধকে।

প্রখ্যাত নির্মাতা ও সাহিত্যিক আমজাদ হোসেনের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘অবেলায় অসময়’ অবলম্বনে সিনেমা নির্মানের হাত দিলেন। নাম দিলেন ‘জয়যাত্রা’। সরকারি অনুদানের জন্য জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু বিধিবাম, পেলেন না অনুদান। কোনো প্রযোজকও পাননি।

তরুণ বয়সে

অবশেষে নিজের জমানো অর্থ নিয়ে শুরু করলেন সিনেমা নির্মানের কাজ, অভিনয়ের জন্য নির্বাচিত করলেন দেশসেরা অভিনয়শিল্পীদের। কিন্তু মাঝপথে পড়লেন অর্থ সংকটে, এগিয়ে এলেন অভিনয়শিল্পীরা। বিনা পারিশ্রমিকে সবাই অভিনয় করলেন।

সিনেমা নির্মান শেষ। এবার মুক্তির পালা। কিন্তু এখানেও নানান ঝামেলা। অবশেষে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের সহায়তায় মুক্তি পেলো ২০০৪ সালে। মুক্তির পর একের পর এক প্রশংসা আসতে লাগলো। শুধু তাই নয় আর্ন্তজাতিক ও জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হল সিনেমাটি। তিনি নিজেও পেয়েছিলেন তিনটি জাতীয় পুরস্কার।

সময়ের স্রোত পেরিয়ে তিনি এই মুহুর্তে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা আস্থাভাজন নির্মাতা। বাংলা নাট্যঙ্গনকে সমৃদ্ধ করার পর এখন বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করছেন। তিনি স্বনামখ্যাত অভিনেতা ও নির্মাতা তৌকীর আহমেদ।

বুয়েট থেকে স্থাপত্যকলায় পড়াশোনার সময়ই জড়িয়ে পড়েন মঞ্চ নাটকে। সেখান থেকে টিভি নাটক। দেশের তরুণ সমাজের মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে নির্মিত নাটক ‘ফিরিয়ে দেও অরণ্য’ ছিল প্রথম অভিনীত নাটক। ইমদাদুল হক মিলনের লেখা নাটক ‘যত দূরে যাই’তেও অভিনয় করে আলোচিত হয়েছিলেন। তবে তুমুল জনপ্রিয়তা পান একই লেখকের সাড়া জাগানো ধারাবাহিক নাটক ‘রুপনগর’ দিয়ে।

বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম টেলিফিল্ম ‘আড়াল’-এ মৌসুমির সাথে।

এছাড়া বিশ্বাসঘাতক, আড়াল, আশিক সব পারে, ওপারে নিলয়, ছোট ছোট ঢেউ, বীজ মন্ত্র সহ অসংখ্য আলোচিত নাটকে সু-অভিনয়ের জন্য হয়ে ওঠেন নব্বই দশকের অন্যতম সেরা টিভি অভিনেতা। এর পরবর্তী দশকেও তিনি বেশ সমুজ্জ্বল ছিলেন। বিশেষ করে মুরাদ পারভেজের ‘দৌড়’ ধারাবাহিকে ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করে বেশ আলোচিত হয়েছিলেন। এছাড়া দিল দরিয়া, ঘুনপোকা, নির্জন স্বাক্ষর, মন+হৃদয় অন্যতম।

এই সময় তিনি জড়িয়ে পড়েন নাটক নির্মানেও। একে একে নির্মান করেন তোমার বসন্ত দিনে, শুকতারা, শঙখবাস, স্বর্ণমায়া, গোলাপ কাব্যসহ বেশ কিছু সংখ্যক নাটক। এখনো তিনি নাটক নির্মান ও অভিনয়ের সাথে জড়িত আছেন।

নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করা শুরু করেন। প্রথম অভিনীত চলচ্চিত্র তানভীর মোকাম্মেলের ‘নদীর নাম মধুমতি’। সেই সময়ের এই নবীন অভিনেতা অনেক দক্ষ অভিনেতাদের মাঝেও প্রশংসিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে একই নির্মাতার চিত্রা নদীর পাড়ে, লাল সালু ও রাবেয়া সিনেমায় অভিনয় করেছে।

এছাড়া তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে প্রিয়তমেষু, জালালের গল্প, প্রার্থনা, ফিরে এসো বেহুলা অন্যতম। এসবের মাঝেই জড়িয়ে পড়েন চলচ্চিত্র নির্মানে। প্রথম নির্মিত সিনেমা ‘জয়যাত্রা’র পরপরই নির্মাণ করেন রুপকথার গল্প ও দারুচিনি দ্বীপ। এর মধ্যে রুপকথার গল্পতে তিনি নিজেও অভিনয় করেছেন।

অন্যদিকে, দারুচিনি দ্বীপ’ আটটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। বেশ কয়েক বছর বিরতি দিয়ে নির্মাণ করেন ‘অজ্ঞাতনামা’। দর্শক থেকে সমালোচক সবাই এই সিনেমাটির প্রশংসা করেন। বিভিন্ন উৎসবে পুরস্কৃত ও হন। সম্প্রতি ছবিটি জাতীয় পুরস্কার কমিটিতে মনোনীত হয়েছে। সর্বশেষ তিনি নির্মাণ করেছেন ‘হালদা’। অতি সম্প্রতি ঘোষনা দিয়েছেন ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা ‘ফাগুন হাওয়া’ নির্মানের। ইচ্ছা রাখেন জীবননান্দ দাশের জীবনী নিয়ে সিনেমা বানানোর।

পরিবারের সাথে

বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে পেয়েছেন তিনটি জাতীয় পুরস্কার। ভাগ্য সহায় হলে এই পুরস্কারের সংখ্যা আরো বাড়বে। জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে না পেলেও, নির্মাতা হিসেবে পেয়েছেন একাধিক মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার। ব্যক্তিজীবনে তিনি বিয়ে করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী বিপাশা হায়াতকে। এই জুটি টিভি নাটকে বেশ আলোচিত ছিল। বর্তমানে মিডিয়াঙ্গনে এই জুটি সুখী দম্পতি হিসেবে সুপরিচিত।

এখন অবধি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তৌকির আহমেদ যেখানে হাত দিয়েছেন, তাতেই করেছেন বাজিমাৎ। কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি তাঁকে। তবে, চেষ্টাটা ধরে রেখেছিলেন সব সময়। জিদ ছিল মনের ভেতর। দিন শেষে সেসবই কাজে লাগছে। প্রত্যাশা রইলো, এই কৃতীতটা সামনেও ধরে রাখবেন তিনি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।