একটি বটগাছ, বিস্মরণে খালিদ এবং অপরাজেয় বাংলা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাধীনতা অর্জনের পথে যে প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিল নিজ ছাত্র-শিক্ষকের রক্ত দিয়ে। আজ কলাভবন প্রাঙ্গনের সমুখে ঠিক যে স্থানে ‘অপরাজেয় বাংলা’ সেখানেই ছিল ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা একটি বটগাছ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পতাকা প্রথম উত্তোলন করা হয় ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায়। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের কেন্দ্রও ছিল এই বটতলা।

পাকিস্তানী অমানুষ সেনাবাহিনীর ক্ষোভ থেকে সেই বটগাছটিও রেহাই পায়নি একাত্তরে। তারা স্বাধীনতার ইতিহাসের স্মৃতিবিজড়িত এ গাছটি সমূলে উৎপাটন করেছিল।

অপরাজেয় বাংলা নির্মাণকালে ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একই স্থানে নতুন একটি বটগাছের চারা রোপণ করেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর ও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পরম সুহৃদ সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি। কালক্রমে এ গাছটি মহীরুহ। ওই প্রাঙ্গণে ছাত্র সমাজের সমাবেশ নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। কখনও প্রতিবাদ, কখনও আনন্দ উৎসব। কিন্তু সমাবেশস্থলের নামে পরিবর্তন এসেছে বটতলা থেকে অপরাজেয় বাংলা।

মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনন্যসাধারণ অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু মনোযোগী হয়। এ জন্য বটতলার অদূরে শিল্পী আবদুল লতিফের নকশায় নির্মিত হয় একটি ভাস্কর্য। কিন্তু রাতের আঁধারে কুচক্রী মহল এ ভাস্কর্যের ক্ষতি করে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আবদুল মতিন চৌধুরী, ডাকসু ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মাহবুব জামানসহ ডাকসু নেতৃবৃন্দ মজবুত ভিতের ওপর আরও আকর্ষণীয় করে নির্মাণে উদ্যোগী হন।

এ কাজ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব মুক্তিযোদ্ধা-শিল্পী ম,হামিদের ওপর অর্পণ করা হয়। সে সূত্রেই ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। ভাস্কর খালিদ প্রথমে মাটি দিয়ে মডেল তৈরি করেন, যা সেই পরিকল্পনার সাথে যুক্ত সবার পছন্দ হয়। বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫০ হাজার টাকা। ঠিক হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ডাকসু সমানভাবে এ অর্থ জোগান দেবে।

মডেলের মাটি কেনার জন্য সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদকে দেওয়া হয়েছিল ৩০০ টাকা। তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী এএইচএম কামরুজ্জামানের কাছ থেকে সিমেন্ট কেনার অনুমতি নেয়া হয়। বালু ও পাথর আনা হয়েছিল সিলেট থেকে।

‘অপরাজেয় বাংলা’র নামকরণ করেছিলেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী (১১ নভেম্বর ১৯৩৬ – ১ সেপ্টেম্বর ২০১৭)।

১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে মডেল অনুসারে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। আমাদের ‘জীবন্ত কিংবদন্তী’ প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এই ভাস্কর্য নির্মাণে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেন। ভাস্কর আবদুল্লাহ খালিদ কাজ শুরুর কিছুদিন পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে চাকরি পান।

ফলে নির্মাণ কাজে বিঘ্ন ঘটে। সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসেন তৎকালীন উপাচার্য আবদুল মতিন চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে চিঠি লিখে আবদুল্লাহ খালিদের জন্য ছুটির ব্যবস্থা করেন। মাসে বরাদ্দ হয় মাত্র ৬০০ টাকা ভাতা। এ সামান্য পারিশ্রমিকেই তিনি রাতদিন পরিশ্রম করেন।

ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের(বাঁ দিকে) সাথে আলী রিয়াজ (ডানে)। ছবিটি তুলেছিলেন প্রয়াত সাংবাদিক-চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনির।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অপরাজেয় বাংলার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র জামায়াতে ইসলামী এবং মুক্তিযুদ্ধকালে তাদের কুখ্যাত বাহিনী আলবদরের উত্তরসূরি সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির এ ভাস্কর্য ভেঙে ফেলতে জনমত সৃষ্টির জন্য ছাত্রছাত্রীদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে। ১৯৭৭ সালের ২৭ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাসে স্বাক্ষর সংগ্রহকালে তারা ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ (জাসদ)সহ সব ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়।

ইসলামী ছাত্রশিবিরের কয়েকজন কর্মীকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে ক্যাম্পাস ঘোরানো হয়। পরদিন নির্মাণাধীন অপরাজেয় বাংলার সামনেই অনুষ্ঠিত হয় বিশাল সমাবেশ। পুলিশ ছাত্রশিবিরের পক্ষ নেয়। তাদের হামলায় অনেক ছাত্র আহত হয়। গ্রেফতার করা হয় সে সময়ের ছাত্রনেতা ও বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জাহিদুল বারীকে।

ছাত্র সমাজের এ সাহসী অবস্থান থেকে প্রমাণ হয়ে যায়, সামরিক স্বৈরশাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা যতই থাকুক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অবিনাশী। এ আদর্শ ধ্বংসের ক্ষমতা কারও নেই। এ প্রেক্ষাপটে দাবি ওঠে ভাস্কর্যটির নির্মাণ কাজ দ্রুত সমাপ্তির। ততদিনে সামরিক শাসকদের নির্দেশে ডাকসু ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু নতুন উপাচার্য ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী, শ্রদ্ধেয় ম,হামিদকে দায়িত্ব দেন শিল্পী আবদুল্লাহ খালিদের সহযোগিতায় নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করার। তৎকালীন ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, যিনি ভাস্কর্য নির্মাণ কমিটিরও সদস্য ছিলেন নব উৎসাহে সাগ্রহে সাড়া দিলেন। চরম প্রতিকূল পরিবেশেও তাঁরা আন্তরিকভাবেই সহযোগিতা করেছিলেন। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, সে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক সামরিক শাসকদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন এবং তারা অপরাজেয় বাংলার নির্মাণ কাজ নানা অজুহাতে বিঘ্নিত করেছিল।

কিন্তু সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ কোনো অবস্থাতেই দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি আবার চট্টগ্রাম থেকে ছুটি নিয়ে ঢাকায় আসেন এবং উদয়াস্ত পরিশ্রম শুরু করেন। তখন তাঁর পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয় প্রতি মাসে মাত্র ১৫০০ টাকা। আরও দু’জনকে এ পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়। এ পর্যায়ে প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এমন একজন দক্ষ রাজমিস্ত্রি দিয়েছিলেন, যিনি কারিগরি দিক থেকে জটিল এ শিল্পকর্ম নির্মাণ কাজের নকশা যত্নের সঙ্গে অনুসরণ করেন।

অপরাজেয় বাংলা নির্মাণকালে দুটি বিষয় মনে রাখতে হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের আঘাত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘাতক স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি বর্তমান নূর হোসেন চত্বর এলাকায় স্থাপিত এক ক্রীড়াবিদের কংক্রিটের ভাস্কর্য রাতের আঁধারে সমূলে উৎপাটন করে ফেলেছিল। অপরাজেয় বাংলার প্রতিও তাদের কুনজর পড়েছিল। এ কারণে নির্মাণ ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল।

ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ।

কিন্তু কতটা বেড়েছিল?

সব কাজ শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, মোট ব্যয় হয়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা! এ ব্যয় অবিশ্বাস্যভাবে কম। আর এটা সম্ভব হয়েছে শিল্পী আবদুল্লাহ খালিদ ও তাঁর সহকর্মীদের আন্তরিকতার কারণে।

স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের সর্বত্র ‘নাই নাই’ রব। খাদ্যে ঘাটতি। যাতায়াত ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত। আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বিপদ বহুগুণ বেড়ে যায় বিশ্ববাজারে চাল, জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বিপুলভাবে বেড়ে যাওয়ায়। এ অবস্থায় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলতে প্রচার শুরু করেছিল মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সব অর্থহীন।

১৯৮৪ সালের অপরাজেয় বাংলা।

বাংলাদেশের ছাত্র সমাজের নেতৃত্ব প্রদানের জন্য বিশেষ মর্যাদার স্থানে অধিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দ এমনই এক সময়ে কলাভবনের সামনের বটতলার অদূরে এ ভাস্কর্য নির্মাণে উদ্যোগী হন। তাদের মনোভাব সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন শিল্পী আবদুল্লাহ খালিদ।

‘অপরাজেয় বাংলা’ নামটি প্রদানের কৃতিত্ব সে সময়ে দৈনিক বাংলার সাংবাদিক সালেহ চৌধুরীর। তিনি ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে দৈনিক বাংলায় একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন, যার শিরোনাম ছিল ‘অপরাজেয় বাংলা’। আমাদের গৌরবের স্মারক অপরাজেয় বাংলা’র জন্য এ নামটিই সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর, আমাদের অষ্টম বিজয় দিবসে একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এর উদ্বোধন করেছিলেন।

গেল ২০ মে ছিল, অপরাজেয় বাংলা’র স্রষ্টা ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গত বছর তিনি আমাদের ছেড়ে পাড়ি দিয়েছেন জীবন সমুদ্রের ওপারে। এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল ভূখণ্ডের প্রতিটি নাগরিকের শুধুমাত্র তাঁকে মনে রাখাই যথেষ্ট নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাঁর প্রতি ঋণী থেকে যাবো আমরা।

কৃতজ্ঞতা: গেরিলা ৭১ ও মুক্তিযোদ্ধা-শিল্পী ম. হামিদ

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।